ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসের পশ্চিমে আঘাত হেনেছে শক্তিশালী দুটি ভূমিকম্প। মাত্র এক মিনিটের ব্যবধানে পরপর এই জোড়া ভূমিকম্পে কেঁপে ওঠে পুরো দেশ। এর মধ্যে দ্বিতীয় ভূমিকম্পটির তীব্রতা এতই বেশি ছিল যে, এটি ১৯০০ সালের পর ভেনেজুয়েলার ইতিহাসে সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্প। এই ভয়াবহ দুর্যোগে এ পর্যন্ত হাজার জনের মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়েছে। ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়েছেন আরও শত শত মানুষ। উদ্ধারকারীরা ভারী যন্ত্রপাতি নিয়ে এখনো উদ্ধারকাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।
ভূমিকম্পের তীব্রতা ও কারাকাসের ভঙ্গুর অবকাঠামোর কারণে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বিশাল আকার ধারণ করেছে। সরকারি প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, এই দুর্যোগে দেশের অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ ভেনেজুয়েলার মোট জিডিপির (১১১ বিলিয়ন ডলার) ১ থেকে ৭ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে।
কতটুকু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কারাকাস?
যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) জানিয়েছে, প্রথম ভূমিকম্পটির মাত্রা ছিল ৭.২, যা কারাকাস থেকে প্রায় ১৬০ কিলোমিটার পশ্চিমে আঘাত হানে। এর ঠিক এক মিনিটেরও কম সময়ের মধ্যে ৭.৫ মাত্রার আরেকটি শক্তিশালী ভূকম্পন অনুভূত হয়।
ভেনেজুয়েলার ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলির প্রধান হোর্হে রদ্রিগেস জানান, দেশজুড়ে অন্তত ২৫০টি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত বা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে। ঘটনার সময় প্রায় ২০০ জন মানুষ বিভিন্ন ভবনে আটকা পড়েছিলেন। রাজধানী কারাকাস ও এর আশপাশের উপকূলীয় এলাকায় অন্তত ৮টি হাসপাতাল, ভেনেজুয়েলান রেড ক্রসের সদর দপ্তর ও ফরাসি দূতাবাস মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এ ছাড়া শহরের বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী কার্লোস আলভারাদো জানিয়েছেন, বিভিন্ন চিকিৎসা কেন্দ্রে শত শত মানুষের মরদেহ আনা হয়েছে। এ ছাড়া আহত হয়েছেন প্রায় ৪,৩০০ মানুষ। নিখোঁজ ও আটকে পড়াদের উদ্ধারে তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে।
অতীতে কারাকাসের ক্ষয়ক্ষতির ইতিহাস
কারাকাসে ভূমিকম্পে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা এবারই প্রথম নয়। এর আগেও শহরটি বড় বড় ভূমিকম্পের শিকার হয়েছে। ১৮১২ সালে মেরিদা ও কারাকাসে একটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে। ইউএসজিএস-এর তথ্য অনুযায়ী, ওই সময় প্রায় ৩০,০০০ মানুষ মারা যায়। কারাকাসের পুরো ঔপনিবেশিক স্থাপত্য সে সময় ধূলিসাৎ হয়ে গিয়েছিল। ঘরবাড়ি, গির্জা ও সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যায়। কারাকাসে আরেকটি বড় ভূমিকম্প আঘাত হানে ১৯৬৭ সালে। সে সময় বেশ কয়েকটি বহুতল ভবন ধসে পড়ে ও ২৪০ জন মানুষের মৃত্যু হয়।
কেন কারাকাস এত বেশি ঝুঁকিপূর্ণ?
ভূমিকম্পে কারাকাসের এত বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পেছনে বেশ কিছু ভৌগোলিক ও অবকাঠামোগত কারণ রয়েছে। ভেনেজুয়েলা ক্যারিবিয়ান ও দক্ষিণ আমেরিকান টেকটোনিক প্লেটের সীমানায় অবস্থিত হওয়ায় এখানে ভূমিকম্পের ইতিহাস বেশ দীর্ঘ। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূ-পদার্থবিদ ভাশান রাইট জানান, কারাকাস একটি গভীর পলল অববাহিকায় অবস্থিত। এই ভৌগোলিক গঠনের কারণে ভূমিকম্পের তরঙ্গ আরও শক্তিশালী হয়ে আঘাত হানে। এ ছাড়া ভূমিকম্পগুলো ছিল ভূপৃষ্ঠের কাছাকাছি, মাত্র ৭.৮ কিলোমিটার গভীরে। অগভীর ভূমিকম্পের শক্তি সরাসরি জনপদে আঘাত করায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ অনেক বেশি হয়।
আরেকটি বড় কারণ হলো, কারাকাসের ভবন ও অবকাঠামো ভূমিকম্পসহনীয় করে তৈরি করা হয়নি। আল-জাজিরার সাংবাদিক তেরেসা বো জানান, কারাকাসের আলতামিরা এলাকায় সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। সেখানকার একটি ২২তলা ভবন ধসে পড়ার পর ধ্বংসস্তূপ থেকে বেঁচে যাওয়া মানুষকে উদ্ধার করা হচ্ছে। আলতামিরার অনেক ভবন পলল বা নরম মাটির ওপর তৈরি হওয়ায় সেগুলো সহজেই ধসে পড়েছে।
পাশাপাশি, ভেনেজুয়েলা দীর্ঘ সময় ধরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য পশ্চিমা দেশের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার মুখোমুখি। যদিও গত জানুয়ারিতে সামরিক অভিযানে সাবেক প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো অপসারিত হওয়ার পর কিছু নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়েছে, তাও কয়েক দশকের অবিনিয়োগের কারণে ভেনেজুয়েলার পক্ষে ভূমিকম্পসহনীয় নগর পরিকল্পনা বা অবকাঠামো তৈরি করা সম্ভব হয়নি।সূত্র: আল-জাজিরা