ইতালির রাজধানী রোমে অবৈধ পরকিয়ার জেরেই প্রেমিকা আরজু ও তার স্বামী-সন্তানসহ একই পরিবারের তিন বাংলাদেশি খুন হয়েছেন বলে দাবি করেছেন সেখানে অবস্থানরত প্রতিবেশি আনোয়ার হোসেন।
তিনি খবরের কাগজকে বলেন, পরকিয়া প্রেমিক মো. শাহাদাত হোসেনের ছুরিকাঘাতেই আরজু, তার স্বামী কামাল উদ্দিন বাবুল ও মেয়ে আরিশা খুন হয়েছেন। এ ঘটনায় আহত হয়েছে তাদের ছেলে অয়ন।
অভিযুক্ত মো. শাহাদাত হোসেন নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্য সচিব এবং চরকাঁকড়া ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের আবদুল আহাদের ছেলে।
প্রবাসী আনোয়ার হোসেন জানান, দেশে থাকতেই কামালের স্ত্রী আরজুর সঙ্গে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা শাহাদাতের পরকিয়ার সম্পর্ক ছিল। তাতে নিভৃত করতে না পেরে দুই বছর আগে কামাল উদ্দিন তার স্ত্রী ও সন্তানদের ইতালি নিয়ে যান।
এদিকে চার বছর আগে শাহাদাতের স্ত্রী বাড়ির সম্পত্তি বিক্রি করে তাকে যুক্তরাজ্য নিয়ে যান। সেখানে পরকিয়ার বিষয় নিয়ে স্ত্রী সঙ্গে বনিবনা না হওয়ায় তাদের মধ্য বিচ্ছেদ ঘটে। পরে প্রেমিকা আরজু ইতালী যাওয়ার খবর পেয়ে ওই বছর শাহাদাতও যুক্তরাজ্য ছেড়ে ইতালি পাড়ি জমান।
জানা গেছে, শুক্রবার (২৬ জুন) রাতে কামাল তার রোমের বাসার পাশে একটি পার্কে স্ত্রী আরজুর পরকিয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে প্রেমিক শাহাদাতের সঙ্গে বৈঠকে বসেন। এ সময় কামালের দুই সন্তানও উপস্থিত ছিলেন।
আনোয়ারের দাবি, বৈঠকে বাকবিতন্ডার এক পর্যায়ে শাহাদাত ছুরিকাঘাত করে প্রেমিকা আরজু (৩৮), তার স্বামী কামাল উদ্দিন বাবুল (৩৯) ও মেয়ে আরিশাকে (৫) ঘটনাস্থলেই হত্যা করে। কামালের ছেলে অয়ন আহত হলেও পালিয়ে জীবন রক্ষা পান।
এদিকে ঘটনার পরপর অভিযুক্ত শাহাদাত হোসেন নিজের ফেসবুক আইডিতে একটি স্ট্যাটাস দেন। যাতে তিনি লিখেন, 'একজন মানুষ শুধু নিজে একা মরে না, নিজেও মরে অন্যকেও মরার মতো করে রেখে যায়। তাই মরার সময় প্রিয়জনদেরও সাথে নিয়ে মরা উচিৎ। তাতে কারো জন্য কাউকে কষ্ট পেতে হয় না।'
অন্যদিকে চাঞ্চল্যকর এ ঘটনার জন্য মো. শাহাদাত হোসেনকে প্রধান সন্দেহভাজন উল্লেখ করে শনিবার (২৭ জুন) তার ছবি প্রকাশ করেছে ইতালিয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
এ নিয়ে ফেসবুকের এক স্ট্যাটাসে বলা হয়, 'ছবিতে থাকা ব্যক্তি রোমে গতরাতে ঘটে যাওয়া ট্রিপল মার্ডারের রচয়িতা বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। লোকটি শাহাদাত হোসেন নামে পরিচিত। ১৯৮৩ সালের ১০ মে বাংলাদেশে জন্ম। তার সম্পর্কে কারো কাছে কোনো তথ্য থাকলে তা রোম কোয়েস্টের মোবাইল টিমকে (৩৩৪৬৯০৩২৯৫) জানাতে পারেন।'
কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক শামসুদ্দিন হায়দার বলেন, শাহাদাত হোসেন চার বছর আগে যুক্তরাজ্য যাওয়ার পর থেকে দলের সঙ্গে তার কোনো সম্পৃক্ততা নেই। তবে শাহাদাতের পদত্যাগ বা পদ থেকে অব্যাহতির লিখিত কিছু তিনি দেখাতে পারেননি।
বাড়িতে গেলে শাহাদাতের বড়ভাই সৌদি প্রবাসী ইসমাইল হোসেন হারুন বলেন, চার বছর আগে বাড়ির সকল সম্পত্তি বিক্রি করে পরিবার নিয়ে যুক্তরাজ্য যাওয়ার পর থেকে শাহাদাতের সঙ্গে পরিবারের কোনো যোগাযোগ নাই।
তিনি আরও বলেন, আমি দুই মাস আগে দেশে এসেছি। এরমধ্যে আমার সঙ্গে তার কোনোদিন কথা হয়নি। বাড়িতে তার সহায় সম্পত্তি কিছুই অবশিষ্ট নাই। ৫০ লাখ টাকায় বিক্রি করে একবারেই দেশ ত্যাগ করেন শাহাদাত।
শুক্রবার (২৬ জুন) ইতালির সময় রাত প্রায় ৯টার দিকে রোমের পশ্চিমাঞ্চলীয় অরেলিও এলাকার ভিয়া মন্টিগ্লিও সড়কের একটি পার্কে একই পরিবারের তিনজনকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়।
নিহতরা হলেন, নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জের চরকাঁকড়া ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের সিরাজুল ইসলামের ছেলে কামাল উদ্দিন বাবুল (৩৯), তার স্ত্রী আরজু (৩৮) ও মেয়ে আরিশা (৫)। এসময় নিহত কামালের ছেলে অয়নও (১৮) গুরুতর আহত হন। তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
ইতালির সংবাদমাধ্যমগুলোর বরাতে জানা গেছে, শুক্রবার রাতে ওই পার্ক থেকে থেকে চিৎকার শুনতে পেয়ে আশপাশের লোকজন পুলিশে খবর দেন। পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে রক্তাক্ত অবস্থায় তিনজনের মরদেহ উদ্ধার করে। প্রাথমিক সুরতহাল শেষে তদন্ত কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ধারালো অস্ত্র দিয়ে উপর্যুপরি আঘাত করে তাদের হত্যা করা হয়েছে।
নিহত কামালের বাবা সিরাজুল ইসলাম ছেলে, ছেলের বউ ও নাতিনের মরদেহ দেশে আনতে সরকারের সহযোগিতা কামনা করেছেন। এছাড়া তিনি এ হত্যাকাণ্ডের তদন্তপূর্বক সঠিক বিচার দাবি করেন।
ইকবাল হোসেন মজনু/এসএন