মানিকগঞ্জের হরিরামপুর উপজেলায় গত দেড় বছরে ঘটে যাওয়া একের পর এক হামলা, সংঘর্ষ, মারধর, ভাঙচুর, বিচার-সালিশে প্রভাব বিস্তার ও প্রতিপক্ষকে ভয়ভীতি প্রদর্শনের ঘটনায় বারবার আলোচনায় এসেছে উপজেলা যুবদলের সদস্যসচিব আবু সাদাত শাহীন ওরফে মোল্লা শাহীন এবং তার ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের নাম।
স্থানীয় বাসিন্দা, রাজনৈতিক কর্মী ও ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, রাজনৈতিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠাকে কেন্দ্র করে মোল্লা শাহীনের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা একটি প্রভাবশালী বলয় দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় অস্থিরতা ও আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি করেছে। অনেকেই প্রকাশ্যে মুখ না খুললেও ব্যক্তিগতভাবে একই ধরনের অভিযোগ তুলে ধরছেন।
তাদের দাবি, সাম্প্রতিক সময়ে হরিরামপুরে সংঘটিত অধিকাংশ আলোচিত সহিংস ঘটনার নেপথ্যে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে শাহীন ও তার অনুসারীদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। এসব ঘটনার জেরে থানায় একাধিক অভিযোগ ও মামলা হয়েছে।
সম্প্রতি বিচার-সালিশকে কেন্দ্র করে চালা ইউনিয়ন পরিষদে উপজেলা যুবদল সদস্য কাজী সালাউদ্দিন শিমুলকে মারধরের অভিযোগ ওঠে মোল্লা শাহীন, কাইয়ুম মোল্লা, মুকুলসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় গত ৫ জুন শিমুল বাদী হয়ে শাহীন, কাইয়ুম, মুকুলসহ ১১ জনের নাম উল্লেখ করে মামলা করেন। মামলার অধিকাংশ আসামি বর্তমানে পলাতক বলে জানিয়েছে পুলিশ।
শিমুল অভিযোগ করেন, ‘শাহীন এলাকায় প্রভাব বিস্তারের জন্য সাধারণ মানুষ ও নিজ দলের নেতা-কর্মীদের ওপরও মারধর, চাপ ও হুমকি দিয়ে থাকেন।’ তিনি জানান, গত ৩ জুন একটি পারিবারিক বিরোধের সালিশে পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করলে তাকে প্রকাশ্যে মারধর করা হয়। তার দাবি, ‘শাহীন নিজের বলয় শক্তিশালী করতে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের সাবেক নেতা-কর্মীদেরও সম্পৃক্ত করেছেন। তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী কাইয়ুম একসময় বয়রা ইউনিয়ন যুবলীগের সহসভাপতি ছিলেন।’
স্থানীয়দের অভিযোগ, কেবল প্রতিপক্ষ নয়, মোল্লা শাহীনের কর্মকাণ্ডে তার নিজ দলের অনেক নেতা-কর্মীও ক্ষুব্ধ। তাদের দাবি, শাহীনের নির্দেশ বা অবস্থানের বাইরে গেলে ভয়ভীতি প্রদর্শন, হামলা কিংবা সামাজিকভাবে হেনস্তার শিকার হতে হয়। এ ধরনের অভিযোগ একাধিক নেতা-কর্মী ও স্থানীয় ব্যক্তির কাছ থেকে পাওয়া গেছে।
বলড়া ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ও উপজেলা বিএনপির যুববিষয়ক সম্পাদক তারিকুল ইসলাম তারেকও শাহীনের বিরুদ্ধে হামলার অভিযোগ তুলেছেন। তিনি বলেন, ‘কোরবানির ঈদের পরদিন গভীর রাতে মোল্লা শাহীনের নেতৃত্বে কাইয়ুম, শাহরুখসহ কয়েকজন তার বাড়িতে হামলা চালান। হামলাকারীরা বাড়ির দরজা-জানালা ভাঙচুরের পাশাপাশি তিনটি মোটরসাইকেলও ভাঙচুর করেন। বিষয়টি স্থানীয় সংসদ সদস্যকে জানানো হয়েছে।’
এর আগে রাজনৈতিক বিরোধের জেরে বয়রা ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ও উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক জাহিদুর রহমান তুষারের ওপরও হামলার অভিযোগ ওঠে। তুষার জানান, শাহীন ও তার সহযোগীরা তাকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে গুরুতর আহত করেন। ঘটনার পর দীর্ঘ সময় তাকে চিকিৎসা নিতে হয়েছে। এ ঘটনায় করা একটি মামলা বর্তমানে আদালতে বিচারাধীন রয়েছে।
শাহীনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত কাইয়ুম মোল্লার বিরুদ্ধেও বিভিন্ন সময়ে হামলা ও নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় কয়েকজন ভুক্তভোগী তার বিরুদ্ধে মারধর, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও সহিংস কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ করেছেন।
উপজেলার চালা ইউনিয়নের দড়িকান্দি রাজরা গ্রামের ওষুধ ব্যবসায়ী সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘২০২৪ সালের ২০ নভেম্বর সন্ধ্যায় কাইয়ুম, শাহরুখসহ ১৫-২০ জন আমার দোকানে হামলা চালিয়ে আমাকে মারধর করে। ক্যাশবাক্স থেকে টাকা নিয়ে যায়। এ ঘটনায় করা মামলাটি বর্তমানে আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। এসবের মূলে আছে শাহীনের আশকারা।’
একই গ্রামের প্রবাসীর স্ত্রী চায়না বেগমের অভিযোগ, ‘একই দিন আমার দশম শ্রেণিতে পড়ুয়া ছেলে সোহানের সঙ্গে কাইয়ুম মোল্লার ছেলের কথা-কাটাকাটি হয়। এ ঘটনার জেরে কাইয়ুম ও তার সহযোগীরা আমার ছেলেকে মারধর করেন। পরে এ ঘটনায় কাইয়ুম মোল্লাসহ ১৮ জনের নাম উল্লেখ করে একটি মামলা করা হয়। এখনো ভয়ে থাকি আমাদের আবার কোনো ক্ষতি না করে।’
এ বিষয়ে কাইয়ুম মোল্লা বলেন, ‘আমি মাটি ব্যবসায়ী। কারও না কারও সঙ্গে আমাকে ব্যবসা করতে হয়। এখন শাহীন ভাইয়ের সঙ্গে থেকে ব্যবসা করছি। ব্যবসায়িক দ্বন্দ্বের কারণে যাদের স্বার্থে আঘাত লাগছে, তারাই আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ ও মামলা করেছেন।’ আপনি ইউনিয়ন যুবলীগের সহসভাপতি কি না, এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘আমি বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে আগে থেকেই জড়িত।’
উপজেলা যুবদলের সদস্যসচিব মোল্লা শাহীন বলেন, ‘আমার ব্যাপারে যে অভিযোগগুলো আনা হয়েছে সেগুলোর সঙ্গে আমি জড়িত নই। আর কাইয়ুম একজন ড্রেজার ব্যবসায়ী। তার সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক নেই। একটি মহল নিজেরা মারামারি করে আমার নামে অপপ্রচার করছে।’
জেলা যুবদলের সদস্যসচিব তুহিনুর রহমান বলেন, ‘হরিরামপুরে একের পর এক যেসব ঘটনা ঘটছে, সেসব বিষয়ে আমরা অবগত হয়েছি। সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য এগোচ্ছি। মানুষকে যারা নির্যাতন করছেন, তিনি যত বড় নেতাই হোন না কেন, তাকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হবে।’
হরিরামপুর থানার ওসি মোহাম্মদ আফজাল হোসাইন বলেন, ‘আমি অল্প কয়েক দিন হয় এসেছি। সম্প্রতি শিমুলকে মারধরের ঘটনায় একটা মামলা হয়েছে। মামলার অধিকাংশ আসামি পলাতক। আর কিছু ঘটনা ঘটলেও ভুক্তভোগীরা কোনো অভিযোগ দেননি। আর যেখানেই কোনো সহিংসতার ঘটনা ঘটছে, পুলিশ দ্রুত সেখানে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনছে।’ এসব ঘটনায় ভুক্তভোগীদের দ্রুত পুলিশের শরণাপন্ন হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।