হিজবুল্লাহর সঙ্গে যুদ্ধ অবসানে চার দিনব্যাপী আলোচনার পর গত শুক্রবার ওয়াশিংটনে ইসরায়েল ও লেবানন একটি কাঠামো চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। নতুন চুক্তি অনুযায়ী দক্ষিণ লেবাননের দুটি এলাকা থেকে ইসরায়েল সেনা প্রত্যাহার করবে বলে ঘোষণা দিয়েছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। উভয় পক্ষই এই চুক্তিকে একটি প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেছে। এদিকে চুক্তি স্বাক্ষরের একদিন পরই নতুন করে দক্ষিণ লেবাননের নাবাতিয়া এলাকায় ইসরায়েল ড্রোন হামলা চালিয়েছে বলে জানিয়েছে লেবাননের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা।
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীও জানিয়েছে, তারা গতকাল শনিবার দক্ষিণ লেবাননের নাবাতিয়ে এলাকায় সন্দেহভাজন জঙ্গিদের লক্ষ্য করে একটি বিমান হামলা চালিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রে লেবাননের রাষ্ট্রদূত নাদা হামাদেহ মোয়াওয়াদ এবং ইসরায়েলি রাষ্ট্রদূত ইয়েচিয়েল লাইটার ওয়াশিংটনের স্টেট ডিপার্টমেন্টে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ত্রিপক্ষীয় চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি।
একজন জ্যেষ্ঠ ইসরায়েলি কর্মকর্তা বলেন, এই চুক্তি ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত শান্তিচুক্তির পথ তৈরি করবে।
নাদা মোয়াওয়াদ বলেন, ‘এটি হবে লেবাননের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা পুনঃপ্রতিষ্ঠার পথে প্রথম পদক্ষেপ।’
নেতানিয়াহু বলেন, ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) লিতানি নদীর উত্তরের একটি এলাকা এবং নদীর দক্ষিণের আরেকটি এলাকা থেকে সেনা সরিয়ে নেবে। বর্তমানে দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলের দখল করা ভূখণ্ডের মধ্যে লিতানি নদীর দক্ষিণাংশও রয়েছে।
শুক্রবার প্রকাশিত এক ভিডিও বার্তায় নেতানিয়াহু বলেন, আইডিএফ লেবাননে যেসব অবস্থান ‘আর প্রয়োজন নেই’, সেগুলোই ছেড়ে দিচ্ছে।
এই চুক্তি সম্পাদনের উদ্দেশ্যে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যে পঞ্চম দফার আলোচনার আয়োজন করে। দুই দেশের মধ্যে কখনো আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক না থাকলেও ট্রাম্প প্রশাসন একটি বৃহত্তর সমঝোতা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন, ‘আজ শুরুরও শুরু। সামনে অনেক কাজ বাকি। আমরা এই কাজের কঠিনতাকে কোনোভাবেই খাটো করে দেখি না, এর গুরুত্ব আমরা বুঝি এবং এই প্রক্রিয়ার অংশ হতে পেরে আমরা সম্মানিত।’
সর্বশেষ যুদ্ধবিরতি চুক্তির আওতায় একটি পরীক্ষামূলক কর্মসূচির অংশ হিসেবে লেবাননের সশস্ত্র বাহিনী এসব এলাকায় মোতায়েন হবে। এর আগে সিএনএন জানিয়েছিল, লেবানন সরকারের প্রতি সদিচ্ছার নিদর্শন হিসেবে দক্ষিণ লেবাননের দখলকৃত কিছু এলাকা থেকে প্রতীকীভাবে সেনা প্রত্যাহারের বিষয়টি বিবেচনা করছিল ইসরায়েল।
বৃহস্পতিবার আইডিএফ জানায়, তারা সাময়িকভাবে লেবাননে সেনাসংখ্যা কমাবে। বিবৃতিতে দখল করা এলাকা ছেড়ে দেওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়নি। এর এক দিন আগে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী জানান, যুক্তরাষ্ট্র চাপ দিলেও লেবানন থেকে সেনা প্রত্যাহার করা হবে না।
নেতানিয়াহু এই চুক্তিকে ইসরায়েলের জন্য বড় সাফল্য হিসেবে উল্লেখ করেন। তার ভাষায়, এর ফলে দক্ষিণ লেবাননের অধিকাংশ দখলকৃত এলাকায় ইসরায়েল অবস্থান বজায় রাখতে পারবে এবং হিজবুল্লাহ নিরস্ত্র না হওয়া পর্যন্ত সেখানে থাকবে।
তিনি বলেন, ‘এটি ইরানের জন্যও বড় ধাক্কা। ইরান দক্ষিণ লেবানন থেকে আমাদের জোর করে সরিয়ে দিতে চেয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে ইসরায়েল, লেবানন ও যুক্তরাষ্ট্র তাদের বলছে, এটি তাদের বিষয় নয়।’
রুবিও বলেন, ‘লেবানন ও ইসরায়েলের জনগণ শান্তিপূর্ণ ও নিরাপদে বসবাসের অধিকার রাখে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে তারা সংঘাতের শিকার।’
চুক্তি স্বাক্ষরের পর এক বিবৃতিতে লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন শান্তি আলোচনা আয়োজনের জন্য ট্রাম্প প্রশাসনকে ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, এই চুক্তি লেবাননের জনগণকে ‘সম্পূর্ণ মুক্ত ভূখণ্ডে ফিরে যাওয়ার সুযোগ করে দেবে, যেখানে সার্বভৌমত্ব শুধু লেবানন রাষ্ট্রের হাতে থাকবে।’ বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি হিজবুল্লাহর মাধ্যমে বৈরুতে ইরানের প্রভাবের প্রতি ইঙ্গিত।
লেবাননের পার্লামেন্ট সদস্য ও হিজবুল্লাহ নেতা হাসান ফাদাল্লাহ সরাসরি ইসরায়েলের সঙ্গে আলোচনাকে প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি সরকারকে এই আলোচনা ও জনগণের বিরুদ্ধে নেওয়া সব সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের আহ্বান জানান।
হিজবুল্লাহ-সমর্থিত টেলিভিশন চ্যানেল আল-মায়াদিনকে তিনি বলেন, যে শত্রুর সঙ্গে করমর্দন করে, সে তাদের মতোই অপরাধী। সূত্র: সিএনএন