ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সাময়িক যুদ্ধবিরতি চুক্তিকে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা কাঠামোর জন্য ‘বিপর্যয়কর মোড়’ হিসেবে দেখছেন পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর নেতা ও বিশ্লেষকরা। তাদের আশঙ্কা, এই চুক্তি একদিকে ইরানকে আরও শক্তিশালী করবে, অন্যদিকে এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতির বিশ্বাসযোগ্যতাকে দুর্বল করে তুলবে।
দশকের পর দশক ধরে পারস্য উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো যুক্তরাষ্ট্রকে কৌশলগত নিরাপত্তা অংশীদার হিসেবে দেখছে। তবে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রায়ই এ সম্পর্ককে ভিন্নভাবে মূল্যায়ন করেছেন।
২০১৮ সালে সৌদি বাদশাহকে উদ্দেশ করে ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘আমরাই আপনাদের রক্ষা করছি। আমাদের ছাড়া আপনারা দুই সপ্তাহও টিকতে পারবেন না। নিজেদের সামরিক বাহিনীর জন্য আপনাদেরই অর্থ দিতে হবে।’ এর এক বছর পরই সৌদি আরব কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় হামলার মুখে পড়ে। দেশটির অপরিশোধিত তেল উৎপাদনের প্রায় অর্ধেক বন্ধ হয়ে যায় এবং বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়ে যায়। ওয়াশিংটন এ হামলার জন্য ইরানকে দায়ী করে নিন্দা জানালেও উপসাগরীয় দেশগুলোর মনে প্রশ্ন থেকে যায়–তাদের হয়ে তেহরানের মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্র কতদূর যেতে প্রস্তুত?
যুদ্ধের পর নতুন উদ্বেগ
ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে উপসাগরীয় নেতারা এ বাস্তবতা আরও গভীরভাবে উপলব্ধি করেন। উপসাগরীয় দেশগুলো যখন যুক্তরাষ্ট্রে ট্রিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দেয়, তখন ট্রাম্প তার প্রথম সরকারি বিদেশ সফরের জন্য এ অঞ্চলটিকেই বেছে নেন।
গত বছরের মে মাসে কাতারের রাজধানী দোহায় তিনি ঘোষণা করেন, ‘আমরা এ অঞ্চলকে রক্ষা করব।’ তবে চলতি বছর সেই প্রতিশ্রুতির সবচেয়ে বড় পরীক্ষা আসে। আঞ্চলিক সংঘাত এড়াতে উপসাগরীয় দেশগুলোর চেষ্টা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের সঙ্গে মিলে ইরানে হামলা চালায়। জবাবে উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের স্থাপনায় পাল্টা হামলা চালায় তেহরান। ফলে আবারও প্রশ্ন ওঠে– যুক্তরাষ্ট্রের সুরক্ষা আসলে কতটা কার্যকর। এই প্রেক্ষাপটে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও উপসাগরীয় অঞ্চল সফরে এসেছেন। তার অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে উপসাগরীয় দেশগুলোকে বোঝানো যে, ওয়াশিংটনের নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতি এখনো অটুট রয়েছে।
‘বিপর্যয়কর মোড়’
ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের জ্যেষ্ঠ গবেষক হাসান আলহাসান বলেন, ‘উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর দৃষ্টিতে ইরান যুদ্ধ আঞ্চলিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার একটি বিপর্যয়কর মোড়। ইরানের সঙ্গে চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব কমে যাওয়ারই ইঙ্গিত দেয়। তিনি বলেন, ‘উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ধীরে ধীরে সরে যাওয়া এবং ইরানের আর্থিক সম্পদের প্রবাহ তেহরানকে আরও সাহসী করে তুলতে পারে। তার পরও আরব রাষ্ট্রগুলো যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধবিরতিকে সমর্থন করেছে।’
‘তাদের মতামত শুনতে চাই’
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সফরসূচিতে রয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন ও কুয়েত। যুদ্ধের সময় ইরানি হামলায় এই দেশগুলোই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং ওয়াশিংটন-তেহরান সমঝোতা নিয়ে তারাই সবচেয়ে বেশি আগ্রহী ছিল।
গত বুধবার (২৪ জুন) কুয়েতে রুবিও বলেন, ইরানের সঙ্গে আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র কখনোই তার উপসাগরীয় মিত্রদের নিরাপত্তা ক্ষুণ্ন করবে না। আমরা তাদের মতামত শুনতে চাই। আলোচনার প্রতিটি সিদ্ধান্ত নিয়ে তাদের সঙ্গে আলোচনা করতে চাই।’
হরমুজ, ক্ষেপণাস্ত্র ও ৩০০ বিলিয়ন ডলারের তহবিল
চুক্তির আওতায় ওমানের সঙ্গে যৌথভাবে হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল তদারকি করবে ইরান। এর অর্থ, উপসাগরীয় দেশগুলোর সামুদ্রিক বাণিজ্য বিশেষ করে জ্বালানি রপ্তানির বড় অংশ ইরানের তদারকির মধ্যে পরিচালিত হবে।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বুধবার বলেন, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র উপসাগরীয় অংশীদারদের সঙ্গে ‘সম্পূর্ণ সমন্বিত’ অবস্থানে থাকবে। তবে গত সপ্তাহে ট্রাম্প বলেন, সৌদি আরবের যদি ক্ষেপণাস্ত্র থাকে, তাহলে ইরানেরও ক্ষেপণাস্ত্র থাকার অধিকার রয়েছে। চুক্তিতে ইরান পুনর্গঠনের জন্য ৩০০ বিলিয়ন ডলারের একটি তহবিল গঠনের কথাও রয়েছে।
সম্পর্ক নতুনভাবে মূল্যায়ন
উপসাগরীয় অঞ্চলের রাষ্ট্র-ঘনিষ্ঠ গণমাধ্যম ও বিশ্লেষকরাও এখন ইরানকে ঘিরে নতুনভাবে ভাবতে শুরু করেছেন। একসময়কার কেবল সংঘাতমুখী অবস্থানের পরিবর্তে এখন কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনাও আলোচনায় আসছে। প্রভাবশালী সৌদি ভাষ্যকার আবদুল রহমান আল-রাশেদও এর আগে লিখেছিলেন, দুর্বল ও বিচ্ছিন্ন ইরান উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য দীর্ঘমেয়াদে ইতিবাচক নয়। তার মতে, লক্ষ্য হওয়া উচিত ইরানের আচরণ পরিবর্তন করা এবং তাকে আরও স্থিতিশীল আঞ্চলিক কাঠামোর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা। সূত্র: সিএনএন।