জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) ২০২৬-২৭ অর্থবছরের ৩৪৮ কোটি ৭০ লাখ ৫ হাজার টাকার বাজেট অনুমোদন করেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট। বাজেটের প্রায় ৯১ শতাংশ বরাদ্দ রাখা হয়েছে বেতন-ভাতা, পেনশন ও সাধারণ প্রশাসনিক ব্যয়ে।
অন্যদিকে, গবেষণা ও উদ্ভাবন খাতে রাখা হয়নি কোনো বরাদ্দ। একই সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব আয় চার বছরের ব্যবধানে অর্ধেকের নিচে নেমে এসেছে। রাজস্ব তহবিলের ক্রমপুঞ্জিত ঘাটতি বেড়ে প্রায় ১০০ কোটি টাকায় পৌঁছেছে।
শনিবার (২৭ জুন) মধ্যরাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের জান্নাতুল ফেরদৌস সিনেট হলে অনুষ্ঠিত ৪৩তম বার্ষিক সিনেট অধিবেশনে সর্বসম্মতিক্রমে বাজেটটি পাস হয়।
কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মো. আবদুর রব বাজেট উপস্থাপন করেন। গত অর্থবছরের সংশোধিত বাজেট ছিল ৩৪৮ কোটি ২৫ লাখ ৬৪ হাজার টাকা। সে হিসাবে নতুন বাজেট বেড়েছে মাত্র ৪৪ লাখ ৪১ হাজার টাকা।
বাজেট বিশ্লেষণে দেখা যায়, মোট বরাদ্দের ২০১ কোটি ৪৩ লাখ টাকা বা ৫৭ দশমিক ৭৭ শতাংশ রাখা হয়েছে শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বেতন-ভাতা খাতে। পণ্য ও সেবা (সাধারণ আনুষাঙ্গিক) খাতে বরাদ্দ ৭৮ কোটি ৩ লাখ ৩৫ হাজার টাকা বা ২২ দশমিক ৩৮ শতাংশ এবং পেনশন ও অবসর-সুবিধা খাতে ৩৭ কোটি ১৪ লাখ টাকা বা ১০ দশমিক ৬৫ শতাংশ। সব মিলিয়ে এ তিন খাতেই ব্যয় হবে মোট বাজেটের প্রায় ৯১ শতাংশ।
অন্যদিকে যন্ত্রপাতি ক্রয়ে ১১ কোটি ৩৭ লাখ টাকা, মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণে ৯ কোটি ৪৭ লাখ টাকা, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) খাতে ২ কোটি ৮২ লাখ টাকা, যানবাহন ক্রয়ে ২ কোটি ৪৪ লাখ ২০ হাজার টাকা। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা সহায়তা খাতে ৭০ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। তবে গবেষণা ও উদ্ভাবন খাতে কোনো বরাদ্দ রাখা হয়নি। গত অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে এ খাতে ৯ কোটি ২৩ লাখ টাকা বরাদ্দ ছিল।
গবেষণা খাতে বরাদ্দ না রাখার বিষয়ে উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ কামরুল আহসান বলেন, ‘আগামী অর্থবছর থেকে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা কার্যক্রমে সরাসরি অর্থায়ন করবে। সে কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজস্ব বাজেটে এ খাতে আলাদা বরাদ্দ রাখা হয়নি।
চার বছরে অর্ধেকে নেমেছে নিজস্ব আয়
বাজেটের রাজস্ব আয়ের হিসাব বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব উৎস থেকে আয় ধারাবাহিকভাবে কমছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এ খাতে প্রকৃত আয় ছিল ৭৪ কোটি ৫ লাখ ৪৪ হাজার টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়ায় ৪৬ কোটি ১৮ লাখ ৯৮ হাজার টাকায়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে নিজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয় ৩২ কোটি টাকা। নতুন অর্থবছরেও একই পরিমাণ আয় ধরা হয়েছে। চার বছরের ব্যবধানে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব আয়ের পরিমাণ প্রায় ৫৭ শতাংশ কমেছে।
চাহিদার তুলনায় কম বরাদ্দ, ঘাটতি প্রায় ১০০ কোটি
কোষাধ্যক্ষের লিখিত বক্তব্য অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয় ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৪৪১ কোটি ১ লাখ ৬১ হাজার টাকার বাজেট চেয়ে ইউজিসিতে প্রস্তাব পাঠিয়েছিল। তবে ইউজিসি অনুমোদন দিয়েছে ৩৪৮ কোটি ৭০ লাখ ৫ হাজার টাকা। অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয়ের চাহিদার তুলনায় প্রায় ৯২ কোটি ৩২ লাখ টাকা কম বরাদ্দ পেয়েছে।
একই সঙ্গে ২০২৪-২৫ অর্থবছর শেষে বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজস্ব তহবিলের ক্রমপুঞ্জিত ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৯৯ কোটি ৭ লাখ ৭০ হাজার টাকা। কোষাধ্যক্ষ বলেন, প্রকৃত চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ কম হওয়ায় একটি কল্যাণমুখী বাজেট বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়ছে। সরকারি বিধির বাইরে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় স্কুল অ্যান্ড কলেজ পরিচালনা, গবেষণা ভাতা, নৈশ ভাতা, গার্ড বোনাস, স্বাস্থ্য ও গোষ্ঠী বীমায় ভর্তুকি এবং ডাইনিং হলের অস্থায়ী কর্মচারীদের বেতন বহন করাও এ ঘাটতির অন্যতম কারণ।
জাকসুর পরিচালন বাজেট কমানোয় আপত্তি
বাজেটে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (জাকসু) ও হল সংসদগুলোর পরিচালন ব্যয় কমানো নিয়ে সিনেটে আপত্তি জানান শিক্ষার্থী প্রতিনিধি সদস্যরা। সংশোধিত বাজেটে জাকসুর পরিচালন ব্যয় ১০ লাখ টাকা থেকে কমিয়ে ৫ লাখ ৩২ হাজার টাকা করা হয়েছে। একইভাবে ২১টি হল সংসদের পরিচালন বরাদ্দ ৬ লাখ ৩০ হাজার টাকা থেকে কমিয়ে ৩ লাখ ৪ হাজার টাকা করা হয়েছে।
শিক্ষার্থী প্রতিনিধি সদস্যরা বলেন, ’একদিকে জাকসু ভবন সংস্কারের জন্য ৪৬ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, অন্যদিকে ছাত্র সংসদের কার্যক্রম পরিচালনার বরাদ্দ প্রায় অর্ধেকে নামিয়ে আনা হয়েছে। এতে নিয়মিত জাকসু পরিচালনা নিরুৎসাহিত হবে এবং এটি ছাত্র সংসদকে কার্যত অকার্যকর করার ইঙ্গিত দেয়।’
নতুন ইনস্টিটিউট নিয়ে বিতর্ক
সিনেটে প্রস্তাবিত ইনস্টিটিউট অব ইসলামিক স্টাডিজ অ্যান্ড থিওলজির সংবিধি অনুমোদনের বিষয়েও আলোচনা ও বিতর্ক হয়। কয়েকজন সিনেট সদস্য অভিযোগ করেন, একাডেমিক কাউন্সিলে কোরাম সংকটের মধ্যে সম্পূরক এজেন্ডা হিসেবে বিষয়টি উপস্থাপন করা হয়েছিল। পরে আলোচনা শেষে বিষয়টি পুনরায় সিন্ডিকেট হয়ে একাডেমিক কাউন্সিলে পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়।
উপাচার্য তার ভাষণে বিশ্ববিদ্যালয়ে 'জাবিয়ান ট্র্যাক' নামে একটি সমন্বিত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম চালুর ঘোষণা দেন। পাশাপাশি দীর্ঘদিনের দাবি পূরণে বিশ্ববিদ্যালয়ের পূর্ণাঙ্গ মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নের জন্য সরকারি বরাদ্দ পাওয়ার তথ্য জানান। তিনি বর্তমান বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনকে পূর্ণাঙ্গ উচ্চশিক্ষা কমিশনে রূপান্তরের দাবিও জানান।
আমানউল্লাহ খান/খাদিজা রুমি/