চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) ও চট্টগ্রাম কন্টেইনার টার্মিনাল (সিসিটি) দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে ইজারা দেওয়ার ষড়যন্ত্র বন্ধ এবং বন্দরকে জাতীয় মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণে রাখার দাবিতে আগামী ১ জুলাই চট্টগ্রাম প্রেসক্লাব চত্বরে সমাবেশ ও মানববন্ধন কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছেন নেতারা।
রবিবার (২৮ জুন) বেলা ১১টায় চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের এস রহমান হলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ ঘোষণা দেওয়া হয়।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন কমিটির আহ্বায়ক প্রকৌশলী দেলোয়ার মজুমদার।
লিখিত বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘আমরা গভীর উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ্য করছি, চট্টগ্রাম বন্দরের এনসিটি এবং সিসিটি দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠানের, বিশেষ করে দুবাইভিত্তিক বৈশ্বিক বন্দর অপারেটর ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে ইজারা দিতে সরকারের তৎপরতা ক্রমশ জোরদার হচ্ছে। আমরা জানতে পেরেছি, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব (পিপিপি) কাঠামোর আওতায় এনসিটির পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে আলোচনা এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। এ লক্ষ্যে গঠিত নেগোসিয়েশন কমিটিকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ১২ সদস্যবিশিষ্ট একটি সাপোর্ট টিমও গঠন করেছে। গত ২১ জুন বন্দরের সচিব স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে জানানো হয়, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের ১৮ জুনের নির্দেশনার ভিত্তিতে এই টিম গঠন করা হয়েছে।’
প্রকৌশলী দেলোয়ার মজুমদার বলেন, ‘তবে বিষয়টি আরও উদ্বেগজনক হয়ে ওঠে যখন চলতি মাসের শুরুতে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় থেকে একই দিনে জারি করা দুটি পৃথক চিঠিতে পরস্পরবিরোধী নির্দেশনা দেওয়া হয়। একটি চিঠিতে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চলমান প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন অথবা বাতিল করার নির্দেশ দেওয়া হয়, অন্য চিঠিতে আবার আলোচনার প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়। এতে প্রতীয়মান হয় যে, সরকার নিজেই বিষয়টি নিয়ে স্পষ্ট অবস্থানে নেই। এমন পরিস্থিতিতে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় সম্পদ ইজারা দেওয়ার উদ্যোগ যে জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থি, তা অনুধাবনের জন্য বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন নেই।’
তিনি বলেন, সিসিটি বাংলাদেশের নিজস্ব অর্থায়নে নির্মিত একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ টার্মিনাল। বিএনপির সাবেক চেয়ারপারসন ও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন সরকারের আমলে এই টার্মিনাল প্রতিষ্ঠিত হয়। একইভাবে এনসিটির ভিত্তিপ্রস্তরও স্থাপন করা হয়েছিল তার হাতেই। অতএব, এই দুটি টার্মিনাল কোনো বিদেশি প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগে গড়ে ওঠেনি। দেশের জনগণের অর্থে নির্মিত এই জাতীয় সম্পদে নতুন করে বিদেশি বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তার কোনো যৌক্তিক ভিত্তি নেই। বরং বর্তমানে এই টার্মিনালগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় পরিচালিত হচ্ছে।
নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনাল দীর্ঘদিন ধরে দেশীয় ব্যবস্থাপনায় সফলভাবে পরিচালিত হয়ে আসছে জানিয়ে কমিটির আহ্বায়ক বলেন, বিগত কয়েক বছর ধরে টার্মিনালটি ধারাবাহিকভাবে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি কন্টেইনার হ্যান্ডলিং করেছে। এনসিটির বার্ষিক অবকাঠামোগত সক্ষমতা ১১ লাখ টিইইউস (TEUs)। কিন্তু দক্ষ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বর্তমানে সেখানে বছরে প্রায় ১৩ লাখ টিইইউস কন্টেইনার হ্যান্ডল করা হচ্ছে, যা এর অবকাঠামোগত সক্ষমতারও বেশি। পাশাপাশি চলতি বছরের মে মাসে এনসিটি ১ লাখ ২৬ হাজার ৪৯৬ টিইইউস কন্টেইনার হ্যান্ডল করে নতুন রেকর্ড স্থাপন করেছে। এই অর্জন স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে দেশীয় ব্যবস্থাপনা ব্যর্থ নয়; বরং অত্যন্ত সফল ও কার্যকর।
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরের আয় রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা হয় এবং দেশের উন্নয়নে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু কোনো বিদেশি প্রতিষ্ঠানের নিকট টার্মিনাল ইজারা দেওয়া হলে সেই আয়ের একটি বড় অংশ লভ্যাংশ ও মুনাফার নামে বৈদেশিক মুদ্রা হিসেবে বিদেশে চলে যাবে। ফলে দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্র বিপুল পরিমাণ রাজস্ব এবং বৈদেশিক মুদ্রা হারানোর ঝুঁকিতে পড়বে।
সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, পতেঙ্গা কন্টেইনার টার্মিনাল, পানগাঁও টার্মিনাল কিংবা লালদিয়া চর সংক্রান্ত চুক্তিগুলোর পূর্ণাঙ্গ বিবরণ আজ পর্যন্ত জনগণের সামনে প্রকাশ করা হয়নি। অথচ দেশের টাকায় নির্মিত জাতীয় সম্পদের বিষয়ে জানার অধিকার জনগণের রয়েছে। এই গোপনীয়তা স্বাভাবিকভাবেই সন্দেহের জন্ম দেয়। জনগণের কাছে চুক্তিগুলো প্রকাশ না করার মাধ্যমে অতীতের সরকারগুলো কার্যত এমন ধারণার সৃষ্টি করেছে যে এসব চুক্তির মধ্যে জাতীয় স্বার্থবিরোধী শর্ত থাকার আশঙ্কা রয়েছে।
পিসিটিতে দৃশ্যমান কোনো বড় বিনিয়োগ সেখানে হয়নি উল্লেখ করে এই নেতা বলেন, ২০২৩ সালে শেখ হাসিনা সরকারের আমলে পতেঙ্গা কন্টেইনার টার্মিনাল (পিসিটি) সৌদি আরবের রেড সি গেটওয়ে টার্মিনালের কাছে হস্তান্তর করা হয়। কিন্তু দৃশ্যমান কোনো বড় বিনিয়োগ সেখানে হয়নি। সম্প্রতি কয়েকটি গ্যান্ট্রি ক্রেন স্থাপন ছাড়া উল্লেখযোগ্য নতুন অবকাঠামোগত উন্নয়নও দেখা যায়নি। সংশ্লিষ্ট জনেরা জানিয়েছেন, রেড সি গেটওয়ে বিগত দুই বৎসরের অধিক সময় ব্যবসা করে অর্জিত মুনাফা দিয়েই গেন্ট্রি ক্রেনগুলো স্থাপন করেছে। ফলে এটা অনেকটা ‘কৈয়ের তেলে কৈ ভাজা’র মতো হয়েছে।
কর্মসূচির ঘোষণা দিয়ে তিনি বলেন, অতীতে এনসিটি ডিপিওয়ার্ল্ড এর হাতে তুলে দেওয়ার উদ্যোগ দেশের শ্রমিক ও জনগণের প্রতিরোধের মুখে বাস্তবায়িত হয়নি। কিন্তু বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর একই ধরনের উদ্যোগ পুনরায় নেওয়ায় জনগণের মধ্যে উদ্বেগ ও হতাশা সৃষ্টি হয়েছে। তাই আগামী ১ জুলাই বেলা ১১টায় চট্টগ্রাম প্রেসক্লাব চত্বরে এনসিটি ও সিসিটি দেশি-বিদেশি কোনো প্রতিষ্ঠানের নিকট ইজারা প্রদানের ষড়যন্ত্র বাতিলের দাবিতে সমাবেশ ও মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হবে।
৫ দফা দাবির মধ্যে রয়েছে-
১) এনসিটি ও সিসিটি দেশি-বিদেশি কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছে ইজারা প্রদানের সব উদ্যোগ অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে।
২) চট্টগ্রাম বন্দরের সব টার্মিনাল চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হতে হবে।
৩) পতেঙ্গা, পানগাঁও, লালদিয়া চরসহ বন্দর-সংশ্লিষ্ট সব চুক্তি জনগণের সামনে প্রকাশ করতে হবে।
৪) জাতীয় স্বার্থবিরোধী কোনো গোপন সমঝোতা বা চুক্তি করা যাবে না।
৫) চট্টগ্রাম বন্দরকে জাতীয় মালিকানা, জাতীয় নিয়ন্ত্রণ এবং জাতীয় নিরাপত্তার আওতায় সংরক্ষণের বিষয়ে সরকারকে সুস্পষ্ট ঘোষণা দিতে হবে।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন টিইউসি চট্টগ্রাম জেলা কমিটির সভাপতি তপন দত্ত, জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদল চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক কাজী শেখ নুরুল্লাহ বাহার, প্রকৌশলী সুভাষ চন্দ্র বড়ুয়া, টিইউসি চট্টগ্রাম জেলা কমিটির যুগ্ম সম্পাদক ইফতেখার কামাল খান, জাতীয়তাবাদী ডক শ্রমিকদলের সাধারণ সম্পাদক তসলিম হোসেন সেলিম এবং বন্দর রক্ষা কমিটির সদস্যসচিব ফজলুল কবির মিন্টু প্রমুখ।
তারেক মাহমুদ/অমিয়/