জলবায়ু পরিবর্তন মানব উন্নয়ন ও নিরাপত্তার জন্যও একটি বড় হুমকি। রোগব্যাধির বিস্তার, মানসিক চাপ এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে।। বিশেষত শিশু, নারী, প্রবীণ ব্যক্তি এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠী এসব ঝুঁকির অধিক শিকার। বস্তুত বিশ্বব্যাপী উন্নয়নের সুযোগের ওপর বিরূপ প্রভাব এবং সামাজিক-মানবিক সংকট দ্রুত তীব্রতর হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত নানা বিধ্বংসী অভিঘাতের কারণে। এই ধারা চলতে থাকলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মগুলোর উত্তরাধিকারই হবে জীবন ধারণের এমন বাস্তবতা ও পারিপার্শ্বিকতা, যা অসহনীয় প্রাকৃতিক ঘনঘটায় আবৃত।...

সম্ভাব্য প্রাকৃতিক মহাবিপর্যয় কত দূরে? বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই-অক্সাইডের ঘনত্ব ২০২৫ সালে ৪২৭ দশমিক ৩৫ পিপিএমে (parts per million) উন্নীত হয়েছে। ৪০০ পিপিএম অতিক্রম করাকেই বিজ্ঞানীরা অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে বিবেচনা করেছিলেন, আর সেই সীমা অতিক্রান্ত হয়েছে ২০১৫ সালেই। উল্লেখ্য, কার্বন ডাই-অক্সাইড ছাড়াও অন্যান্য গ্রিনহাউস গ্যাস রয়েছে। বায়ুমণ্ডলে পুঞ্জীভূত সব গ্রিনহাউস গ্যাসের মধ্যে কার্বন ডাই-অক্সাইডের অংশ প্রায় ৮০ শতাংশ। কাজেই বাস্তব পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। পৃথিবী ক্রমাগত উষ্ণ থেকে উষ্ণতর হয়ে উঠছে। যতদিন থেকে তথ্য সংরক্ষিত আছে তার মধ্যে ২০২৪ সাল সবচেয়ে উষ্ণ বছর ছিল। এ বছর বৈশ্বিক উষ্ণতা নতুন চূড়ায় যেতে পারে। বর্তমান সময়ে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে, বিশেষ করে ইউরোপ এবং দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ার বিভিন্ন দেশে অসহনীয় তাপপ্রবাহ চলমান রয়েছে। এমন বাস্তবতায় মানবসভ্যতা এবং পৃথিবীর জীববৈচিত্র্য ইতোমধ্যেই অস্তিত্বগত সংকটের মুখোমুখি।
তদুপরি, গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ বেড়েই চলেছে এবং সেই সঙ্গে বাড়ছে বৈশ্বিক উষ্ণতা। অর্থাৎ জলবায়ু পরিবর্তন দ্রুত অবনতির পথে এগিয়ে যাচ্ছে। এর অভিঘাত এখন পৃথিবীর সর্বত্র ক্রমবর্ধমান। বৃষ্টিপাতের অস্বাভাবিকতা, বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, খরা, দাবানল, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, জীববৈচিত্র্যের ক্ষয়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন এবং অভ্যন্তরীণ জনস্থানান্তর বিশ্বজুড়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে। জাতিসংঘের তথ্যানুযায়ী, ২০২৪ সালে বিশ্বে ১৫০টিরও বেশি নজিরবিহীন জলবায়ু-সম্পর্কিত দুর্যোগ সংঘটিত হয়েছে। এসব মারাত্মক প্রাকৃতিক দুর্যোগ নির্দেশ করে যে, বৈশ্বিক জলবায়ু সংকট অবনতির দ্রুত গতিধারায়।
ফলে আজ বিশ্বের প্রায় সব মানুষই কোনো না কোনোভাবে ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে যদিও দরিদ্র, প্রান্তিক এবং অতিশয় জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলগুলোর মানুষ গুরুতর ক্ষয়ক্ষতিতে নিপতিত। প্রকৃতপক্ষে, বিশ্বের অসংখ্য মানুষের জীবন, স্বাস্থ্য, খাদ্যনিরাপত্তা, মানসম্পন্ন পানির প্রাপ্যতা, বাসস্থান এবং জীবিকার ওপর গুরুতর বিরূপ প্রভাব পড়ছে।
জলবায়ু পরিবর্তন মানব উন্নয়ন ও নিরাপত্তার জন্যও একটি বড় হুমকি। রোগব্যাধির বিস্তার, মানসিক চাপ এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে।। বিশেষত শিশু, নারী, প্রবীণ ব্যক্তি এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠী এসব ঝুঁকির অধিক শিকার। বস্তুত বিশ্বব্যাপী উন্নয়নের সুযোগের ওপর বিরূপ প্রভাব এবং সামাজিক-মানবিক সংকট দ্রুত তীব্রতর হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত নানা বিধ্বংসী অভিঘাতের কারণে। এই ধারা চলতে থাকলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মগুলোর উত্তরাধিকারই হবে জীবন ধারণের এমন বাস্তবতা ও পারিপার্শ্বিকতা, যা অসহনীয় প্রাকৃতিক ঘনঘটায় আবৃত। দেশ-দেশান্তর বিবেচনায় নিলে দেখা যাবে বাংলাদেশের মতো জলবায়ু-ভঙ্গুর দেশগুলো বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তনের নানা অভিঘাতে পৃথিবীর অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় অধিক আক্রান্ত এবং ফলে ব্যাপকতর ক্ষয়ক্ষতির শিকার।
বাংলাদেশের দিকে একটু নজর দেওয়া যাক। বাংলাদেশ নানা কারণে একটি উচ্চ জলবায়ু ঝুঁকির দেশ। এগুলোর মধ্যে রয়েছে দেশের ভৌগোলিক অবস্থান, সমুদ্রপীঠ থেকে স্বল্প উচ্চতা, অসংখ্য নদ-নদী, দীর্ঘ উপকূলীয় অঞ্চল এবং উচ্চ জনঘনত্ব। ফলে এ দেশে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত বিশেষভাবে প্রকট। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় ঘন ঘন ও তীব্র বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন, খরা এবং তাপপ্রবাহের ঘটনা বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সঙ্গে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে জলোচ্ছ্বাসের সংখ্যা এবং সেই সঙ্গে লবণাক্ততার অনুপ্রবেশ বেড়ে যাওয়ার ফলে উপকূলীয় অঞ্চলে কৃষি, মৎস্যসম্পদ, সুপেয় পানির প্রাপ্তি এবং মানুষের জীবনযাত্রা ক্রমবর্ধমানভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। জীববৈচিত্র্য, বনভূমি এবং জলাভূমির ওপরও এর ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে, বিশেষ করে সুন্দরবন নানা ধরনের ঝুঁকির সম্মুখীন। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান এবং মানবিক নিরাপত্তার ওপরও চাপ বাড়ছে।
অন্যান্য জলবায়ু-ভঙ্গুর দেশও অব্যাহত জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে একইভাবে নানা ঝুঁকি এবং সংকটে পড়ছে। মালদ্বীপ, টোভালো, কিরিবাতি এবং অন্যান্য কিছু দ্বীপরাষ্ট্র সমুদ্রপীঠ উঁচু হতে থাকার পরিপ্রেক্ষিতে তলিয়ে যেতে পারে। বর্তমান উন্নত বিশ্ব কিছু দেরিতে হলেও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত নানা সংকটের শিকারে পরিণত হবে।
একদিকে বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের ধারা ত্বরান্বিত হচ্ছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র শুধু প্যারিস চুক্তি থেকে বেরিয়ে যায়নি, দেশটির সরকার ও সরকারের অনুসারীরা সাধারণত এখনো জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তবতাকেই অস্বীকার করছে এবং জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহারকে উৎসাহিত করছে। ২০২৫ সালের ৩০তম কপ সম্মেলনও পৃথিবীকে ভবিষ্যতে বাসযোগ্য রাখার লক্ষ্যে গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ দ্রুত ও ব্যাপকভাবে কমিয়ে আনার বিষয়ে আশাব্যঞ্জক কোনো অঙ্গীকার তুলে ধরতে পারেনি।
অবশ্যই অভিযোজন, ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ ও নিরসন, জলবায়ু অর্থায়ন, সক্ষমতা বৃদ্ধি, এবং প্রযুক্তি হস্তান্তর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এসব ব্যবস্থার প্রয়োজন সৃষ্টি হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে, আর জলবায়ু পরিবর্তনের মূল কারণ পৃথিবীর ধারাবাহিক উষ্ণায়ন যার মূল উৎস ক্রমবর্ধমান গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ। কাজেই সর্বাগ্রে বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ দ্রুত কমিয়ে আনার ওপর বিশেষ জোর দিতে হবে। একই সঙ্গে অন্যান্য বিষয়েও যথাযথ গুরুত্ব দিতে হবে। কিন্তু বিজ্ঞান বলছে, মূল সমস্যার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নিয়ে, অর্থাৎ প্রয়োজন অনুযায়ী দ্রুত বৈশ্বিক নিঃসরণ কমানো না গেলে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে। যেখানে অভিযোজনসহ অন্যান্য উদ্যোগে সব দেশ যৌথভাবে এগিয়ে এলেও সেগুলো কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়বে। তখন কাঙ্ক্ষিত সফলতা সুদূরপরাহত হয়ে যেতে পারে।
বলাবাহুল্য, বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশ বিশেষভাবে সংকটাপন্ন হয়ে পড়বে। বাংলাদেশ শুধুই ভুক্তভোগী, জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের কোনো ভূমিকা নেই। কেননা বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণে বাংলাদেশের অংশ মাত্র শূন্য দশমিক ৪০ শতাংশ। গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কমানোর ক্ষেত্রেও স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে বাংলাদেশের তেমন দায় নেই এবং সার্বিক পরিপ্রেক্ষিতে তেমন কিছু করারও নেই। অবশ্য বাংলাদেশ প্যারিস চুক্তির আওতায় জাতীয়ভাবে নির্ধারিত অবদানভিত্তিক যথাসম্ভব কম কার্বন নিঃসরণকারী উন্নয়ন প্রক্রিয়া অনুসরণে অঙ্গীকারবদ্ধ। প্রকৃতপক্ষে আমাদের মূল কাজ হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলার লক্ষ্যে দেশ থেকে বরাদ্দ ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডল থেকে সংগৃহীত অর্থের পরিমাণ এবং এক্ষেত্রে সক্ষমতা যতদূর সম্ভব বৃদ্ধি করার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখা এবং সব সময় প্রাপ্ত অর্থ ও সক্ষমতার পরিকল্পিত সদ্ব্যবহার করা। পাশাপাশি একই চিন্তাধারার দেশগুলোর সঙ্গে মিলিত হয়ে বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে এমন চাপ সৃষ্টি করার চেষ্টা আমাদের করতে হবে, যাতে বিজ্ঞানের তাগিদ-নির্ধারিত মাত্রায় এবং সময়ে বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ হ্রাসের কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়।
উল্লেখ্য, জাতিসংঘের আন্তঃরাষ্ট্রীয় জলবায়ু পরিবর্তন প্যানেলের ষষ্ঠ মূল্যায়ন অনুসারে, পৃথিবীকে আগামীতে বাসযোগ্য রাখতে হলে বাৎসরিক বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ-২০১৯-এর তুলনায় ৪৩ শতাংশ হ্রাস করতে হবে ২০৩০ সাল নাগাদ, ৬০ শতাংশ কমাতে হবে ২০৩৫ সাল নাগাদ এবং ৮৪ শতাংশ কমাতে হবে ২০৫০ সাল নাগাদ। কিন্তু কমানো তো হচ্ছেই না বরং বৈশ্বিক নিঃসরণ বেড়েই চলেছে।
লেখক: অর্থনীতিবিদ এবং পরিবেশ ও
জলবায়ু পরিবর্তন বিশেষজ্ঞ

