ঢাকা ১৫ আষাঢ় ১৪৩৩, সোমবার, ২৯ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ১৯৮ কোটি টাকা কর আদায় চসিকের নওগাঁয় কর্মবিরতিতে ডাক কর্মচারীরা গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গে ৪ শিশুর মৃত্যু কালিমার পতাকা নিয়ে বিতর্ক ও আমাদের উদ্বেগ উত্তর মেরু অভিযানে যাচ্ছে বাংলাদেশি স্কুলশিক্ষার্থী ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ প্রসঙ্গে কিছু কথা ইউসিবির উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) হিসেবে পদোন্নতি পেলেন মোহাম্মদ শফিকুর রহমান ও মো. রীদওয়ানুল হক সমন্বিত নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়তে চায় বাংলাদেশ পুলিশ ধামরাইয়ে মহাসড়কে ডিম ভেঙে খামারিদের প্রতিবাদ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতি গড়ার প্রতিশ্রুতি অর্থমন্ত্রীর A King and Astrologer বিষয়ক Story Writing নিয়ে আলোচনা,  ৫ম পর্ব, এইচএসসির ইংরেজি ১ম পত্র রেড ক্রিসেন্ট সিলেট ইউনিট পরিদর্শনে রেড ক্রিসেন্ট চেয়ারম্যান একদিনে ডেঙ্গুতে ৫ জনের মৃত্যু, হাসপাতালে ১২৪ হাসপাতালে ভর্তি মিল্টন খন্দকার, দ্রুত অস্ত্রোপচার টাইব্রেকার হলে শুটার বাছবেন জাপান কোচ লালমনিরহাটে পানিবন্দি হাজারো মানুষ নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে চ্যালেঞ্জ নিতে প্রস্তুত মরক্কো সাবেক এমপি আশিকা আবারও রিমান্ডে, হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার নবী নেওয়াজ শিক্ষা খাতে বাজেট: বিনিয়োগ নাকি দুর্নীতির নতুন সুযোগ? জাপান ম্যাচের আগে ভিনির চোখে জল সিংগাইরে অতিরিক্ত দামে সার বিক্রি, তিন প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা কুমিল্লায় স্কুলছাত্র গুলিবিদ্ধের ঘটনায় আরও তিনজন আটক সুমেক হাসপাতাল চালুর দাবিতে ক্লাস বর্জনের অষ্টম দিন, শিক্ষার্থীদের মানববন্ধন বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন: মহাবিপর্যয়ের হাতছানি নির্মাতার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ তুললেন পারসা ইভানা ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স ও র‍্যাংগস ইলেকট্রনিক্সের মধ্যে সমঝোতা চুক্তি চট্টগ্রামে শরিয়াহভিত্তিক ৫ ব্যাংকের আমানতকারীদের স্মারকলিপি চট্টগ্রামে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে নিত্যপণ্যে ছাড় উত্তরায় ইবিয়ানদের প্রথম মতবিনিময় ও নৈশভোজ অনুষ্ঠিত শ্যামনগরে দোকান থেকে অজগর সাপ উদ্ধার

বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন: মহাবিপর্যয়ের হাতছানি

প্রকাশ: ২৯ জুন ২০২৬, ০৪:৪৬ পিএম
আপডেট: ২৯ জুন ২০২৬, ০৪:৪৭ পিএম
বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন: মহাবিপর্যয়ের হাতছানি
ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ

জলবায়ু পরিবর্তন মানব উন্নয়ন ও নিরাপত্তার জন্যও একটি বড় হুমকি। রোগব্যাধির বিস্তার, মানসিক চাপ এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি ব‍্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে।। বিশেষত শিশু, নারী, প্রবীণ ব্যক্তি এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠী এসব ঝুঁকির অধিক শিকার। বস্তুত বিশ্বব‍্যাপী উন্নয়নের সুযোগের ওপর বিরূপ প্রভাব এবং সামাজিক-মানবিক সংকট দ্রুত তীব্রতর হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত নানা বিধ্বংসী অভিঘাতের কারণে। এই ধারা চলতে থাকলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মগুলোর উত্তরাধিকারই হবে জীবন ধারণের এমন বাস্তবতা ও পারিপার্শ্বিকতা, যা অসহনীয় প্রাকৃতিক ঘনঘটায় আবৃত।...

সম্ভাব্য প্রাকৃতিক মহাবিপর্যয় কত দূরে? বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই-অক্সাইডের ঘনত্ব ২০২৫ সালে ৪২৭ দশমিক ৩৫ পিপিএমে (parts per million) উন্নীত হয়েছে। ৪০০ পিপিএম অতিক্রম করাকেই বিজ্ঞানীরা অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে বিবেচনা করেছিলেন, আর সেই সীমা অতিক্রান্ত হয়েছে ২০১৫ সালেই। উল্লেখ্য, কার্বন ডাই-অক্সাইড ছাড়াও অন্যান্য গ্রিনহাউস গ্যাস রয়েছে। বায়ুমণ্ডলে পুঞ্জীভূত সব গ্রিনহাউস গ্যাসের মধ‍্যে কার্বন ডাই-অক্সাইডের অংশ প্রায় ৮০ শতাংশ। কাজেই বাস্তব পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। পৃথিবী ক্রমাগত উষ্ণ থেকে উষ্ণতর হয়ে উঠছে। যতদিন থেকে তথ‍্য সংরক্ষিত আছে তার মধ‍্যে ২০২৪ সাল সবচেয়ে উষ্ণ বছর ছিল। এ বছর বৈশ্বিক উষ্ণতা নতুন চূড়ায় যেতে পারে। বর্তমান সময়ে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে, বিশেষ করে ইউরোপ এবং দক্ষিণ ও মধ‍্য এশিয়ার বিভিন্ন দেশে অসহনীয় তাপপ্রবাহ চলমান রয়েছে। এমন বাস্তবতায় মানবসভ্যতা এবং পৃথিবীর জীববৈচিত্র্য ইতোমধ্যেই অস্তিত্বগত সংকটের মুখোমুখি।

তদুপরি, গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ বেড়েই চলেছে এবং সেই সঙ্গে বাড়ছে বৈশ্বিক উষ্ণতা। অর্থাৎ জলবায়ু পরিবর্তন দ্রুত অবনতির পথে এগিয়ে যাচ্ছে। এর অভিঘাত এখন পৃথিবীর সর্বত্র ক্রমবর্ধমান। বৃষ্টিপাতের অস্বাভাবিকতা, বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, খরা, দাবানল, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, জীববৈচিত্র্যের ক্ষয়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন এবং অভ্যন্তরীণ জনস্থানান্তর বিশ্বজুড়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে। জাতিসংঘের তথ‍্যানুযায়ী, ২০২৪ সালে বিশ্বে ১৫০টিরও বেশি নজিরবিহীন জলবায়ু-সম্পর্কিত দুর্যোগ সংঘটিত হয়েছে। এসব মারাত্মক প্রাকৃতিক দুর্যোগ নির্দেশ করে যে, বৈশ্বিক জলবায়ু সংকট অবনতির দ্রুত গতিধারায়।

ফলে আজ বিশ্বের প্রায় সব মানুষই কোনো না কোনোভাবে ঝুঁকির মধ‍্যে রয়েছে যদিও দরিদ্র, প্রান্তিক এবং অতিশয় জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলগুলোর মানুষ গুরুতর ক্ষয়ক্ষতিতে নিপতিত। প্রকৃতপক্ষে, বিশ্বের অসংখ‍্য মানুষের জীবন, স্বাস্থ‍্য, খাদ‍্যনিরাপত্তা, মানসম্পন্ন পানির প্রাপ‍্যতা, বাসস্থান এবং জীবিকার ওপর গুরুতর বিরূপ প্রভাব পড়ছে।

জলবায়ু পরিবর্তন মানব উন্নয়ন ও নিরাপত্তার জন্যও একটি বড় হুমকি। রোগব্যাধির বিস্তার, মানসিক চাপ এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি ব‍্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে।। বিশেষত শিশু, নারী, প্রবীণ ব্যক্তি এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠী এসব ঝুঁকির অধিক শিকার। বস্তুত বিশ্বব‍্যাপী উন্নয়নের সুযোগের ওপর বিরূপ প্রভাব এবং সামাজিক-মানবিক সংকট দ্রুত তীব্রতর হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত নানা বিধ্বংসী অভিঘাতের কারণে। এই ধারা চলতে থাকলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মগুলোর উত্তরাধিকারই হবে জীবন ধারণের এমন বাস্তবতা ও পারিপার্শ্বিকতা, যা অসহনীয় প্রাকৃতিক ঘনঘটায় আবৃত। দেশ-দেশান্তর বিবেচনায় নিলে দেখা যাবে বাংলাদেশের মতো জলবায়ু-ভঙ্গুর দেশগুলো বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তনের নানা অভিঘাতে পৃথিবীর অন‍্যান‍্য অঞ্চলের তুলনায় অধিক আক্রান্ত এবং ফলে ব্যাপকতর ক্ষয়ক্ষতির শিকার।

বাংলাদেশের দিকে একটু নজর দেওয়া যাক। বাংলাদেশ নানা কারণে একটি উচ্চ জলবায়ু ঝুঁকির দেশ। এগুলোর মধ‍্যে রয়েছে দেশের ভৌগোলিক অবস্থান, সমুদ্রপীঠ থেকে স্বল্প উচ্চতা, অসংখ‍্য নদ-নদী, দীর্ঘ উপকূলীয় অঞ্চল এবং উচ্চ জনঘনত্ব। ফলে এ দেশে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত বিশেষভাবে প্রকট। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় ঘন ঘন ও তীব্র বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন, খরা এবং তাপপ্রবাহের ঘটনা বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সঙ্গে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে জলোচ্ছ্বাসের সংখ‍্যা এবং সেই সঙ্গে লবণাক্ততার অনুপ্রবেশ বেড়ে যাওয়ার ফলে উপকূলীয় অঞ্চলে কৃষি, মৎস্যসম্পদ, সুপেয় পানির প্রাপ্তি এবং মানুষের জীবনযাত্রা ক্রমবর্ধমানভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। জীববৈচিত্র্য, বনভূমি এবং জলাভূমির ওপরও এর ব‍্যাপক নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে, বিশেষ করে সুন্দরবন নানা ধরনের ঝুঁকির সম্মুখীন। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান এবং মানবিক নিরাপত্তার ওপরও চাপ বাড়ছে।

অন‍্যান‍্য জলবায়ু-ভঙ্গুর দেশও অব‍্যাহত জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে একইভাবে নানা ঝুঁকি এবং সংকটে পড়ছে। মালদ্বীপ, টোভালো, কিরিবাতি এবং অন‍্যান‍্য কিছু দ্বীপরাষ্ট্র সমুদ্রপীঠ উঁচু হতে থাকার পরিপ্রেক্ষিতে তলিয়ে যেতে পারে। বর্তমান উন্নত বিশ্ব কিছু দেরিতে হলেও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত নানা সংকটের শিকারে পরিণত হবে।

একদিকে বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের ধারা ত্বরান্বিত হচ্ছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র শুধু প্যারিস চুক্তি থেকে বেরিয়ে যায়নি, দেশটির সরকার ও সরকারের অনুসারীরা সাধারণত এখনো জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তবতাকেই অস্বীকার করছে এবং জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহারকে উৎসাহিত করছে। ২০২৫ সালের ৩০তম কপ সম্মেলনও পৃথিবীকে ভবিষ্যতে বাসযোগ্য রাখার লক্ষ্যে গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ দ্রুত ও ব্যাপকভাবে কমিয়ে আনার বিষয়ে আশাব্যঞ্জক কোনো অঙ্গীকার তুলে ধরতে পারেনি।

অবশ্যই অভিযোজন, ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ ও নিরসন, জলবায়ু অর্থায়ন, সক্ষমতা বৃদ্ধি, এবং প্রযুক্তি হস্তান্তর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এসব ব্যবস্থার প্রয়োজন সৃষ্টি হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে, আর জলবায়ু পরিবর্তনের মূল কারণ পৃথিবীর ধারাবাহিক উষ্ণায়ন যার মূল উৎস ক্রমবর্ধমান গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ। কাজেই সর্বাগ্রে বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ দ্রুত কমিয়ে আনার ওপর বিশেষ জোর দিতে হবে। একই সঙ্গে অন্যান্য বিষয়েও যথাযথ গুরুত্ব দিতে হবে। কিন্তু বিজ্ঞান বলছে, মূল সমস্যার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নিয়ে, অর্থাৎ প্রয়োজন অনুযায়ী দ্রুত বৈশ্বিক নিঃসরণ কমানো না গেলে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে। যেখানে অভিযোজনসহ অন্যান্য উদ্যোগে সব দেশ যৌথভাবে এগিয়ে এলেও সেগুলো কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়বে। তখন কাঙ্ক্ষিত সফলতা সুদূরপরাহত হয়ে যেতে পারে।

বলাবাহুল্য, বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশ বিশেষভাবে সংকটাপন্ন হয়ে পড়বে। বাংলাদেশ শুধুই ভুক্তভোগী, জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের কোনো ভূমিকা নেই। কেননা বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ‍্যাস নিঃসরণে বাংলাদেশের অংশ মাত্র শূন্য দশমিক ৪০ শতাংশ। গ্রিনহাউস গ‍্যাস নিঃসরণ কমানোর ক্ষেত্রেও স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে বাংলাদেশের তেমন দায় নেই এবং সার্বিক পরিপ্রেক্ষিতে তেমন কিছু করারও নেই। অবশ‍্য বাংলাদেশ প‍্যারিস চুক্তির আওতায় জাতীয়ভাবে নির্ধারিত অবদানভিত্তিক যথাসম্ভব কম কার্বন নিঃসরণকারী উন্নয়ন প্রক্রিয়া অনুসরণে অঙ্গীকারবদ্ধ। প্রকৃতপক্ষে আমাদের মূল কাজ হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলার লক্ষ্যে দেশ থেকে বরাদ্দ ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডল থেকে সংগৃহীত অর্থের পরিমাণ এবং এক্ষেত্রে সক্ষমতা যতদূর সম্ভব বৃদ্ধি করার প্রচেষ্টা অব‍্যাহত রাখা এবং সব সময় প্রাপ্ত অর্থ ও সক্ষমতার পরিকল্পিত সদ্ব্যবহার করা। পাশাপাশি একই চিন্তাধারার দেশগুলোর সঙ্গে মিলিত হয়ে বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে এমন চাপ সৃষ্টি করার চেষ্টা আমাদের করতে হবে, যাতে বিজ্ঞানের তাগিদ-নির্ধারিত মাত্রায় এবং সময়ে বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ হ্রাসের কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়।

উল্লেখ্য‍, জাতিসংঘের আন্তঃরাষ্ট্রীয় জলবায়ু পরিবর্তন প‍্যানেলের ষষ্ঠ মূল্যায়ন অনুসারে, পৃথিবীকে আগামীতে বাসযোগ‍্য রাখতে হলে বাৎসরিক বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ‍্যাস নিঃসরণ-২০১৯-এর তুলনায় ৪৩ শতাংশ হ্রাস করতে হবে ২০৩০ সাল নাগাদ, ৬০ শতাংশ কমাতে হবে ২০৩৫ সাল নাগাদ এবং ৮৪ শতাংশ কমাতে হবে ২০৫০ সাল নাগাদ। কিন্তু কমানো তো হচ্ছেই না বরং বৈশ্বিক নিঃসরণ বেড়েই চলেছে।

লেখক: অর্থনীতিবিদ এবং পরিবেশ ও 
জলবায়ু পরিবর্তন বিশেষজ্ঞ

শিক্ষা খাতে বাজেট: বিনিয়োগ নাকি দুর্নীতির নতুন সুযোগ?

প্রকাশ: ২৯ জুন ২০২৬, ০৫:০২ পিএম
শিক্ষা খাতে বাজেট: বিনিয়োগ নাকি দুর্নীতির নতুন সুযোগ?
ড. সুলতান মাহমুদ রানা

শিক্ষা খাতে সর্বোচ্চ বাজেট নিঃসন্দেহে একটি সাহসী এবং ইতিবাচক সিদ্ধান্ত। কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, বাজেটের অঙ্ক উন্নয়ন নিশ্চিত করে না; উন্নয়ন নিশ্চিত করে এর সঠিক ব্যবহার। আজকের বাংলাদেশে প্রশ্নটি তাই বাজেটের আকার নিয়ে নয়। প্রশ্নটি হলো, আমরা কি শিক্ষাকে সত্যিই জাতীয় উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করতে প্রস্তুত?...

বাংলাদেশের নতুন বাজেট নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার ভিড়ে শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন খাতে ইতিহাসের সর্বোচ্চ বরাদ্দের বিষয়টি বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে। অর্থমন্ত্রী শিক্ষা খাতে যে বরাদ্দের প্রস্তাব দিয়েছেন, তা নিঃসন্দেহে দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী হওয়ার সুযোগ তৈরি করে। কারণ শিক্ষা এমন একটি খাত, যেখানে ব্যয় আসলে ব্যয় নয়; এটি এক ধরনের বিনিয়োগ। সড়ক, সেতু কিংবা ভবন নির্মাণ একটি দেশের অবকাঠামো গড়ে তোলে। কিন্তু শিক্ষা গড়ে তোলে মানুষের সক্ষমতা। আর মানুষের সক্ষমতার ওপরই নির্ভর করে একটি রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন।

কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতায় সবচেয়ে বড় একটি প্রশ্ন সামনে এসে যায়। সেটি হলো শিক্ষা খাতে সর্বোচ্চ বাজেট কি সত্যিই শিক্ষার সর্বোচ্চ উন্নয়ন নিশ্চিত করবে? নাকি অতীতের মতো এবারও বিপুল অর্থের একটি বড় অংশ দুর্বল প্রশাসন, অদক্ষতা, অনিয়ম এবং দুর্নীতির জালে আটকে যাবে?

এ কথা সত্য যে দীর্ঘদিন পর শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধির মাধ্যমে সরকার একটি ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে। কারিগরি শিক্ষা সম্প্রসারণ, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার উন্নয়ন, নতুন শিক্ষা অবকাঠামো নির্মাণ, ডিজিটাল ল্যাব স্থাপন এবং দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে প্রায় সব বিশ্লেষণেই একটি সতর্কবার্তা রয়েছে। বরাবরই আমরা লক্ষ করেছি যে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার সবচেয়ে বড় সংকট অর্থ নয়; বরং যথাযথ ব্যবস্থাপনা কিংবা সুশাসনের অভাব।

বাংলাদেশে শিক্ষা নিয়ে আমরা দীর্ঘদিন ধরে একটি অদ্ভুত দ্বৈত বাস্তবতা দেখে আসছি। একদিকে শিক্ষার হার বেড়েছে, বিদ্যালয়ের সংখ্যা বেড়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বেড়েছে, বাজেটও বেড়েছে। অন্যদিকে শিক্ষার গুণগত মান, গবেষণা, উদ্ভাবন, দক্ষতা উন্নয়ন এবং কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি হয়নি। হাজার হাজার শিক্ষার্থী প্রতি বছর ডিগ্রি অর্জন করছে। কিন্তু চাকরির বাজার বলছে, যোগ্য লোক পাওয়া যাচ্ছে না। অর্থাৎ শিক্ষিত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, কিন্তু দক্ষ মানুষের সংখ্যা সেই অনুপাতে বাড়ছে না। এই বৈপরীত্যের পেছনে অন্যতম কারণ শিক্ষা প্রশাসনের দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতা।

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার দিকে তাকালে দেখা যায়, প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত প্রায় প্রতিটি স্তরে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত কেন্দ্রীভূত। বিদ্যালয়ের শিক্ষক, প্রধান শিক্ষক, উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা, জেলা শিক্ষা প্রশাসন, অধিদপ্তর–সবকিছু এমন একটি আমলাতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যে পরিচালিত হয়, যেখানে অনেক সময় শিক্ষার চেয়ে প্রশাসন বড় হয়ে ওঠে। শিক্ষকরা শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের চেয়ে নানা ধরনের রিপোর্ট, ফরম, ডাটা অ্যান্ট্রি এবং প্রশাসনিক কাজ নিয়ে বেশি ব্যস্ত থাকেন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন অনেক ক্ষেত্রে নির্ভর করে প্রশাসনিক অনুমোদনের ওপর, যা অকারণ বিলম্ব এবং অনিয়মের সুযোগ সৃষ্টি করে।

দুর্নীতির বিষয়টি আরও উদ্বেগজনক। শিক্ষক নিয়োগ, বদলি, পদোন্নতি, বিদ্যালয় নির্মাণ, শিক্ষা উপকরণ ক্রয়, প্রশিক্ষণ কর্মসূচি, প্রকল্প বাস্তবায়ন–বিভিন্ন পর্যায়ে অনিয়মের অভিযোগ নতুন নয়। বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা গেছে, শিক্ষা খাতে বরাদ্দকৃত অর্থের একটি অংশ প্রকৃত উন্নয়নের পরিবর্তে অপচয় কিংবা অনিয়মের কারণে কাঙ্ক্ষিত ফল দিতে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে জনগণের একটি বড় অংশের মধ্যে ধারণা তৈরি হয়েছে যে শিক্ষা খাতে শুধু অর্থ বাড়ালেই সমস্যার সমাধান হবে না।

আসলে বাংলাদেশ এখন এমন এক অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে শিক্ষা খাতে অর্থের পাশাপাশি সুশাসনকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যবস্থার হাতে যত বেশি অর্থ দেওয়া হবে, অপচয়ের ঝুঁকিও তত বেশি বাড়বে।

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার বড় সমস্যা হলো, এটি এখনো মূলত সনদ উৎপাদনমুখী। একজন শিক্ষার্থী প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত দীর্ঘ পথ পাড়ি দেয়, কিন্তু পুরো ব্যবস্থাটি তাকে চাকরির বাজারের জন্য কতটা প্রস্তুত করছে, সেই প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর নেই।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে হাজার হাজার শিক্ষার্থী ব্যবসায় শিক্ষা, সমাজবিজ্ঞান কিংবা মানবিক বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করছে। কিন্তু প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডেটা অ্যানালিটিক্স, সাইবার নিরাপত্তা, আধুনিক কৃষি, স্বাস্থ্য প্রযুক্তি কিংবা শিল্প ব্যবস্থাপনার মতো খাতে দক্ষ জনবলের ঘাটতি রয়ে যাচ্ছে। ফলে একদিকে বেকারত্ব বাড়ছে, অন্যদিকে শিল্প খাত দক্ষ কর্মীর অভাবে বিদেশি কর্মী নিয়োগ করছে।

এ বাস্তবতায় শিক্ষা বাজেটের একটি বড় অংশ কর্মসংস্থানমুখী দক্ষতা উন্নয়নে বিনিয়োগ করা উচিত। প্রাথমিক শিক্ষায় মৌলিক সাক্ষরতা, গণিত এবং বিশ্লেষণী দক্ষতার ওপর জোর দিতে হবে। মাধ্যমিক পর্যায়ে ডিজিটাল দক্ষতা, যোগাযোগ দক্ষতা, ভাষা শিক্ষা এবং উদ্যোক্তা শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন। উচ্চশিক্ষায় গবেষণা, উদ্ভাবন এবং শিল্প-সংযুক্ত শিক্ষার ওপর জোর বাড়াতে হবে।

বাংলাদেশে এখনো কারিগরি শিক্ষাকে অনেক পরিবার দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষা মনে করে। এ মানসিকতা পরিবর্তন করা প্রয়োজন। একজন দক্ষ টেকনিশিয়ান, প্রোগ্রামার, ইলেকট্রিশিয়ান, মেকানিক বা কৃষি উদ্যোক্তার সামাজিক মর্যাদা বাড়ানো না গেলে কর্মসংস্থানমুখী শিক্ষা বাস্তবায়ন কঠিন হবে।

এবারের বাজেটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মানবসম্পদ উন্নয়নকে আলাদা গুরুত্ব দেওয়া। এটি ইতিবাচক। কারণ চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে প্রতিযোগিতা আর শুধু অবকাঠামো দিয়ে হবে না; হবে দক্ষতা দিয়ে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অটোমেশন এবং প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির যুগে যে দেশ দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করতে পারবে, সেই দেশই এগিয়ে যাবে।

আবারও একই প্রশ্ন সামনে আসে–এ অর্থ ব্যয়ের জবাবদিহি কে নিশ্চিত করবে? বাংলাদেশে শিক্ষা খাতের প্রকৃত সংস্কার শুরু হওয়া উচিত শিক্ষা প্রশাসন থেকে। উপজেলা থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে কর্মসম্পাদন মূল্যায়ন চালু করতে হবে। বিদ্যালয়ভিত্তিক আর্থিক নিরীক্ষা বাধ্যতামূলক করতে হবে। শিক্ষক নিয়োগ সম্পূর্ণ ডিজিটাল ও স্বচ্ছ করতে হবে। শিক্ষাপ্রকল্পগুলোর তথ্য জনগণের জন্য উন্মুক্ত করতে হবে। কোন বিদ্যালয় কত টাকা পেল, কীভাবে ব্যয় করল এবং কী ফল অর্জিত হলো–সেসব তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ করা উচিত।

শিক্ষা খাতে সর্বোচ্চ বাজেট নিঃসন্দেহে একটি সাহসী এবং ইতিবাচক সিদ্ধান্ত। কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, বাজেটের অঙ্ক উন্নয়ন নিশ্চিত করে না; উন্নয়ন নিশ্চিত করে এর সঠিক ব্যবহার। আজকের বাংলাদেশে প্রশ্নটি তাই বাজেটের আকার নিয়ে নয়। প্রশ্নটি হলো, আমরা কি শিক্ষাকে সত্যিই জাতীয় উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করতে প্রস্তুত? আমরা কি শিক্ষাপ্রশাসনের দুর্নীতি ও অদক্ষতার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে প্রস্তুত? আমরা কি ডিগ্রি-নির্ভর শিক্ষা থেকে দক্ষতানির্ভর শিক্ষায় যেতে প্রস্তুত?

যদি উত্তর ‘হ্যাঁ’ হয়, তাহলে এবারের শিক্ষা বাজেট ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আশার আলো হয়ে উঠতে পারে। আর যদি উত্তর ‘না’ হয়, তাহলে ইতিহাসের সর্বোচ্চ শিক্ষা বাজেটও হয়তো কেবল আরেকটি বাজেট হিসেবেই স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

লেখক: অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]

করিডর : বিশিষ্টজনের অভিমত

প্রকাশ: ২৯ জুন ২০২৬, ১১:৩০ এএম
আপডেট: ২৯ জুন ২০২৬, ১১:৩৪ এএম
করিডর : বিশিষ্টজনের অভিমত
খবরের কাগজ ইনফোগ্রাফ

বাংলাদেশ থেকে মায়ানমার হয়ে চীন পর্যন্ত একটি অর্থনৈতিক করিডর করার প্রস্তাব দিয়েছে বেইজিং। গত শুক্রবার বেইজিংয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের মধ্যে অনুষ্ঠিত দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে এ প্রস্তাব দেওয়া হয়। চীনের এই প্রস্তাবকে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখছে বিএনপি সরকার। প্রস্তাবটি বাস্তবায়িত হলে সে দেশের কুনমিংয়ের সঙ্গে বাংলাদেশের সরাসরি বাণিজ্যিক রুট তৈরি হবে। এই করিডরের প্রধান রুটটি হবে মায়ানমারের রাখাইনের ওপর দিয়ে। এ ছাড়া বাংলাদেশের চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরের মাধ্যমে জলপথেও এই করিডর কার্যকর হবে। 

এদিকে চীনের সঙ্গে ত্রিদেশীয় এই করিডর নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার ডালপালা মেলতে শুরু করেছে বিভিন্ন মহলে। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিভিন্ন সংগঠন বিষয়টি নিয়ে এখনো পর্যালোচনা করছে।

এটা আসলে কানেকটিভিটি: মুন্সি ফয়েজ আহমেদ, সাবেক রাষ্ট্রদূত

চীন-মায়ানমার-বাংলাদেশ ইকোনমিক করিডর বলা হলেও এটা আসলে একধরনের কানেকটিভিটি। চীনের এই প্রস্তাবিত করিডরের মূল রুট যাবে মায়ানমারের রাখাইনের ভেতর দিয়ে। কিন্তু রাখাইনসহ সে দেশের বিভিন্ন স্থানে এখন গৃহযুদ্ধ চলছে। এ কারণে নিরাপত্তার বিষয়টি এখন ঝুঁকিপূর্ণ ঠিকই, কিন্তু চীন চাইলে নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করতে পারে। তবে অর্থনৈতিক কানেকটিভিটিকে কাজে লাগানোর উপায় নিয়ে আগে থেকেই ভাবতে হবে। এর সঙ্গে মায়ানমারের রাখাইনের অর্থনৈতিক উন্নয়নও জড়িত। এটি হলে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সহজ হতে পারে। কারণ রাখাইন শান্ত হলে এবং সেখানে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড শুরু হলে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের পরিবেশ সৃষ্টি হবে, যা বাস্তবায়ন সহজ হবে। চীনের এই করিডরের বিষয়টিকে নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখার সুযোগ কম। 

এটিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া উচিত: অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক

যেহেতু চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের কাছ থেকে এই ত্রিদেশীয় করিডরের প্রস্তাব এসেছে, তাই এটিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া উচিত। এটিকে আমি ইতিবাচক প্রস্তাব বলে মনে করি। এটি আমাদের জন্য একটি বড় সুযোগ, একে অবহেলা করা ঠিক হবে না। চীনের এই প্রস্তাবটি নিয়ে আমাদের শিগগিরই গবেষণা শুরু করা উচিত, এ কারণেই যে এর মাধ্যমে আমাদের ব্যবসায়ীদের, ফার্মাসিউটিক্যাল খাতে, শিক্ষা, কৃষি, চিকিৎসাসহ অন্যান্য কোন কোন খাতে উপকার হবে। সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের অধীনে ৬ থেকে ৯ মাসের মধ্যে অথবা যত দ্রুত সম্ভব বাংলাদেশের পক্ষ থেকে একটি সদিচ্ছার বার্তা দিতে হবে চীনকে। মায়ানমারের ভেতর দিয়ে চীনের সঙ্গে করিডর হলে শুধু চীনের পণ্য আমদানি নয়, বাংলাদেশের পণ্যও কীভাবে চীন ও মায়ানমারে রপ্তানি করা সম্ভব, সেটি খতিয়ে দেখতে হবে, না হলে এটি টেকসই হবে না। এই করিডরের মাধ্যমে রাখাইনের অর্থনীতিও চাঙা হবে, এতে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনেরও সুযোগ সৃষ্টি হবে। এই করিডরের সঙ্গে ভূ-রাজনীতিরও একটি যোগসূত্র আছে। কাজেই প্রস্তাবটি যেহেতু দুই দেশের শীর্ষ পর্যায়ের মাধ্যমে এসেছে, তাই এটিকে হালকাভাবে নেওয়া বা দেরি করা ঠিক হবে না। 

নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে করিডর করা সম্ভব হবে না: ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) স ম মাহবুব-উল-আলম, নিরাপত্তা বিশ্লেষক

যেকোনো কানেকটিভিটির অন্যতম শর্তই হচ্ছে নিরাপত্তা। নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে করিডর করা সম্ভব হবে না। আর যদি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায় তবে করিডর করা সম্ভব হবে। তবে নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে বলেই চীন হয়তো করিডরের প্রস্তাব দিয়েছে। চীনের পক্ষে রাখাইনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব। এই করিডর হলে নিরাপত্তা থাকবে, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়বে, কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। এতে সবার জন্যই ভালো হবে। যদিও এই করিডর নিয়ে অনেক আগে থেকেই আলোচনা চলছে। এর আগে কুনমিং থেকে রেললাইন করার বিষয়টি আলোচনায় ছিল। কিন্তু মায়ানমারে অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে তা আর এগোয়নি। সব পক্ষ চেষ্টা করলে মায়ানমারের পরিস্থিতি স্থিতিশীল করা সম্ভব।

ভেনেজুয়েলায় ভূমিকম্প দুর্যোগ প্রস্তুতিতে বাংলাদেশের করণীয়

প্রকাশ: ২৮ জুন ২০২৬, ০৫:০৩ পিএম
দুর্যোগ প্রস্তুতিতে বাংলাদেশের করণীয়
ড. মো. আব্দুল মোমেন

ভূমিকম্প এমন এক প্রাকৃতিক দুর্যোগ যার কোনো পূর্বাভাস আজ পর্যন্ত বিজ্ঞান দিতে পারেনি। ভেনেজুয়েলার জোড়া ধাক্কা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, প্রকৃতির আদালতে মানুষের অবহেলা, দুর্নীতি বা অসচেতনতার কোনো ক্ষমা নেই। ভেনেজুয়েলার এই প্রলয়ংকরী ট্র্যাজেডি থেকে শিক্ষা নিয়ে আমরা যদি আজ অবহেলা ও উদাসীনতা ঝেড়ে জেগে না উঠি, তবে আগামীর যেকোনো একটি বড় ভূকম্পন আমাদের চিরতরে শতাব্দীর সবচেয়ে বড় মানবিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিতে পারে।...

সম্প্রতি দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলায় মাত্র ৩৯ সেকেন্ডের ব্যবধানে আঘাত হানা ৭.২ ও ৭.৫ মাত্রার প্রলয়ংকরী জোড়া ভূমিকম্প বিশ্ববাসীকে প্রকৃতির রুদ্ররূপের সামনে দাঁড় করিয়েছে। দেশটির রাজধানী কারাকাসসহ উত্তর-কেন্দ্রীয় অঞ্চলে শতাব্দীর ভয়াবহতম এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে মুহূর্তের মধ্যে ধসে পড়েছে অসংখ্য বহুতল ভবন, অচল হয়ে পড়েছে যোগাযোগ ও বিদ্যুৎ অবকাঠামো এবং প্রাণ হারিয়েছেন শতাধিক মানুষ। ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত পরিমাণ এখনো নিরূপণ করা সম্ভব না হলেও, এ ঘটনাটি বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ এবং তীব্র ভূমিকম্প ঝুঁকিতে থাকা দেশের জন্য এক চরম ও জরুরি সতর্কবার্তা। ভূমিকম্পের মতো মহাবিপর্যয়কে রুখে দেওয়ার সাধ্য মানুষের নেই। কিন্তু সঠিক পূর্বপ্রস্তুতি ও সতর্কতার মাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতি এবং প্রাণহানি যে বহুলাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব, সেটিই বিজ্ঞানের চরম সত্য। মহান আল্লাহ না করুন, ভেনেজুয়েলার মতো এমন জোড়া বা একক কোনো শক্তিশালী ভূকম্পন যদি আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি, বিশেষ করে রাজধানী ঢাকায় আঘাত হানে, তবে আমাদের পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে এবং তা সামাল দিতে আমাদের কী প্রস্তুতি প্রয়োজন–সেটি আজ অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে এবং বৈজ্ঞানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক দৃষ্টিকোণ থেকে ভাবার সময় এসেছে।

ভূতাত্ত্বিক অবস্থানগত কারণে বাংলাদেশ দীর্ঘকাল ধরেই ভূমিকম্পের এক বিশাল এবং সক্রিয় ডেডজোনের ওপর অবস্থান করছে। আমাদের উত্তর ও পূর্বে ভারতীয়, ইউরেশীয় ও বার্মিজ প্লেটের সংযোগস্থল বা বাউন্ডারি রয়েছে, যা রিখটার স্কেলে ৮ মাত্রারও বেশি শক্তিশালী মেগা আর্থকোয়েক তৈরি করতে সক্ষম। বিশেষ করে মধুপুর ফল্ট, ডাউকি ফল্ট এবং সিলেট-চট্টগ্রামের সাবডাকশন জোনগুলো দীর্ঘ সময় ধরে ভূগর্ভে বিপুল পরিমাণ শক্তি সঞ্চয় করে চলেছে। বিজ্ঞানী ও দুর্যোগ বিশেষজ্ঞরা বারবার সতর্ক করছেন যে, বাংলাদেশে যেকোনো সময় বড় ধরনের ভূমিকম্প আঘাত হানতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমরা কি মানসিক ও পরিকাঠামোগতভাবে আসলেই প্রস্তুত? ভেনেজুয়েলার সাম্প্রতিক ট্র্যাজেডি থেকে শিক্ষা নিয়ে আমাদের রাষ্ট্রীয়, প্রাতিষ্ঠানিক, ব্যবসায়িক এবং সামাজিক পর্যায়ে সুনির্দিষ্ট পূর্বপ্রস্তুতি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা এখন আর বিলাসিতা নয়, বরং টিকে থাকার লড়াই।

সরকারি পর্যায়ে সবচেয়ে প্রাথমিক ও জরুরি পদক্ষেপ হলো ‘ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড’ (বিএনবিসি)-এর কঠোর, আপসহীন এবং দুর্নীতিমুক্ত বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা। ভেনেজুয়েলায় ২২ তলার বহুতল ভবন ধসে পড়ার প্রধান কারণ হিসেবে প্রাথমিক তদন্তে ভবনের কাঠামোগত দুর্বলতা এবং নির্মাণসামগ্রীর নিম্নমানের বিষয়টি উঠে এসেছে। আমাদের দেশে, বিশেষ করে ঢাকা, চট্টগ্রাম বা সিলেটের মতো মেগা সিটিগুলোয় অপরিকল্পিত আবাসন এবং ভবন নির্মাণ বিধিমালা বা রাজউকের নিয়ম লঙ্ঘনের এক ভয়াবহ মহোৎসব চলছে। রাজউক, সিডিএ বা স্থানীয় পৌর কর্তৃপক্ষগুলোকে শুধু কাগজে-কলমে নকশা অনুমোদন করলেই চলবে না; ভবন নির্মাণকালে শতভাগ ভূমিকম্প সহনীয় প্রযুক্তির সঠিক প্রয়োগ হচ্ছে কি না, তা মাঠপর্যায়ে কঠোরভাবে তদারকি করতে হবে। একই সঙ্গে শহরের পুরোনো এবং অতি ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলোকে বৈজ্ঞানিক উপায়ে চিহ্নিত করে জরুরি ভিত্তিতে ‘রেট্রোফিটিং’ বা শক্তিশালীকরণ করতে হবে, অন্যথায় সেগুলোকে ভেঙে ফেলার জন্য কঠোর আইন প্রয়োগ করতে হবে।

ভূমিকম্পের মূল কম্পনের চেয়েও পরবর্তী অনুষঙ্গ বিষয়, যেমন–গ্যাস লাইনের লিকেজ থেকে অগ্নিকাণ্ড এবং বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট অনেক সময় বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটায়। ভেনেজুয়েলার ঘটনায় দেখা গেছে, মূল কম্পনের সঙ্গে সঙ্গেই স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির মাধ্যমে শহরের গ্যাস ও বিদ্যুৎ লাইন বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল, যা একটি বড় ধরনের বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ড থেকে শহরটিকে রক্ষা করেছে। আমাদের দেশেও বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোগের ক্ষেত্রে অবিলম্বে স্বয়ংক্রিয় শাট-অফ সংবলিত স্মার্ট গ্রিড প্রযুক্তি প্রবর্তন করা প্রয়োজন।

পাশাপাশি, ভূমিকম্প-পরবর্তী অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযানের সক্ষমতা বহুগুণ বৃদ্ধি করা দরকার। আমাদের ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স এবং সশস্ত্র বাহিনীকে আরও আধুনিক জিপিএস ট্র্যাকার, লাইভ ডিকটেটর ড্রোন, থার্মাল ইমেজিং ক্যামেরা এবং ভারী রাবল-রিমুভার বা ধ্বংসস্তূপ সরানোর অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতির মাধ্যমে সুসজ্জিত করতে হবে। ঢাকার মতো পুরোনো ও ঘনবসতিপূর্ণ শহরের সরু গলিগুলোয় যেন উদ্ধারকারী যান ও ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি সহজে পৌঁছাতে পারে, সে জন্য এখনই দীর্ঘমেয়াদি নগর পুনর্বাসন পরিকল্পনা এবং রাস্তা প্রশস্তকরণ প্রকল্প হাতে নেওয়া দরকার।

একটি বিপণন ও ব্যবস্থাপনা বিষয়ের শিক্ষক হিসেবে আমি মনে করি, দুর্যোগ-পরবর্তী পরিস্থিতি ও ক্ষয়ক্ষতি সামাল দিতে ‘স্ট্র্যাটেজিক লজিস্টিকস ও সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট’ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ভূমিকম্পের পর প্রথম কয়েক ঘণ্টার মধ্যে লাখ লাখ আহত ও গৃহহীন মানুষের জন্য তাৎক্ষণিক খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, জরুরি জীবন রক্ষাকারী ওষুধ এবং অস্থায়ী আশ্রয়ের ব্যবস্থা করতে হয়। ভেনেজুয়েলার প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরটির রানওয়েতে ফাটল ধরায় এবং এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় আন্তর্জাতিক উদ্ধার তৎপরতা ও ত্রাণ পৌঁছাতে ব্যাপকভাবে ব্যাহত হয়েছে। এই ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে বাংলাদেশ সরকারকে দেশের প্রধান বিমানবন্দর ও মহাসড়কগুলোর বিকল্প ব্যাকআপ ব্যবস্থা প্রস্তুত রাখতে হবে। দেশের প্রতিটি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ‘ডিজাস্টার রিলিফ হাব’ বা জরুরি রসদ ভাণ্ডার গড়ে তুলতে হবে, যেখানে আপৎকালীন সময়ের জন্য শুকনো খাবার, পানি বিশুদ্ধকরণ কিট এবং জরুরি চিকিৎসা সরঞ্জাম সব সময় মজুত থাকবে। এটি দুর্যোগের প্রথম গোল্ডেন আওয়ার বা ৭২ ঘণ্টায় হাজারো জীবন বাঁচাতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখবে।

ভূমিকম্পের মতো মেগা দুর্যোগের প্রস্তুতি কেবল সরকারের একার পক্ষে নেওয়া সম্ভব নয়। এখানে অন্যান্য স্টেকহোল্ডার, বিশেষ করে করপোরেট সেক্টর, বেসরকারি সংস্থা (এনজিও), গণমাধ্যম এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যাপক ও সমন্বিত ভূমিকা রয়েছে। দেশের বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোর তাদের করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতার তহবিলের একটি নির্দিষ্ট অংশ জাতীয় দুর্যোগ প্রস্তুতি, গবেষণা এবং কমিউনিটি-ভিত্তিক উদ্ধারকর্মী তৈরিতে বরাদ্দ করা উচিত। আমাদের এনজিওগুলো তৃণমূল পর্যায়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় দক্ষ, তাদের মাধ্যমে প্রত্যন্ত অঞ্চল ও ওয়ার্ড পর্যায়ে ভলান্টিয়ার বা স্বেচ্ছাসেবী দল গঠন করে উন্নত প্রশিক্ষণ দেওয়া যেতে পারে।

গণমাধ্যমগুলোর দায়িত্ব কেবল দুর্যোগ ঘটে যাওয়ার পর ক্ষয়ক্ষতির লাইভ কভারেজ বা সংবাদ পরিবেশন করা নয়, বরং দুর্যোগের আগে নিয়মিত জনসচেতনতামূলক ও শিক্ষণীয় ক্যাম্পেইন পরিচালনা করা। দেশের প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, বিশেষ করে প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত তিন মাস পরপর বাধ্যতামূলক ‘আর্থকোয়েক ড্রিল’ বা ভূমিকম্প মহড়া আয়োজন করা উচিত। ফলে নতুন প্রজন্ম ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা জানতে পারবে যে, ভূমিকম্পের প্রথম কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে আতঙ্কিত না হয়ে কীভাবে নিজেদের রক্ষা করতে হয় (যেমন–ড্রপ, কভার অ্যান্ড হোল্ড অন পদ্ধতি)।

ভূমিকম্প এমন এক প্রাকৃতিক দুর্যোগ যার কোনো পূর্বাভাস আজ পর্যন্ত বিজ্ঞান দিতে পারেনি। ভেনেজুয়েলার জোড়া ধাক্কা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, প্রকৃতির আদালতে মানুষের অবহেলা, দুর্নীতি বা অসচেতনতার কোনো ক্ষমা নেই। সরকারের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার, রাজউক এবং নগর পরিকল্পনাবিদদের সমন্বয়ে একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন স্বায়ত্তশাসিত ‘জাতীয় ভূমিকম্প প্রস্তুতি ও বাস্তবায়ন সেল’ গঠন করে যুদ্ধকালীন তৎপরতায় কাজ শুরু করা এখন সময়ের দাবি।

আল্লাহতায়ালা আমাদের প্রিয় মাতৃভূমিকে প্রাকৃতিক বিপর্যয় থেকে রক্ষা করুন। তবে পবিত্র কোরআনেও বলা হয়েছে, মানুষ নিজের ভাগ্য নিজে পরিবর্তন না করলে আল্লাহ তার ভাগ্য পরিবর্তন করেন না। তাই স্রষ্টার ওপর ভরসা রাখার পাশাপাশি আমাদের নিজেদের সর্বোচ্চ বৈজ্ঞানিক ও বাস্তবিক প্রস্তুতি নিশ্চিত করতে হবে। ভেনেজুয়েলার এই প্রলয়ংকরী ট্র্যাজেডি থেকে শিক্ষা নিয়ে আমরা যদি আজ অবহেলা ও উদাসীনতা ঝেড়ে জেগে না উঠি, তবে আগামীর যেকোনো একটি বড় ভূকম্পন আমাদের চিরতরে শতাব্দীর সবচেয়ে বড় মানবিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিতে পারে।

লেখক: সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান
মার্কেটিং বিভাগ, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, ত্রিশাল, ময়মনসিংহ
[email protected]

বাস্তবমুখী বাজেটে ব্যয়ের দক্ষতা থাকতে হবে

প্রকাশ: ২৮ জুন ২০২৬, ০৪:৪৪ পিএম
আপডেট: ২৮ জুন ২০২৬, ০৪:৪৬ পিএম
বাস্তবমুখী বাজেটে ব্যয়ের দক্ষতা থাকতে হবে
ড. হোসেন জিল্লুর রহমান

শুধু ঋণ নিলে হবে না। অপচয় কীভাবে কমানো যায়, সে ব্যাপারে পদক্ষেপ নিতে হবে। পাশাপাশি ব্যয় যৌক্তিকীকরণ করতে হবে। এ ছাড়া আয় বাড়াতে নিতে হবে কার্যকর পদক্ষেপ। বেসরকারি খাতে নীতি সহায়তা দিয়ে ব্যবসার পরিবেশ তৈরি করতে হবে। এ ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার জরুরি। তবে যাদের জন্য সংস্কার, অবশ্যই তাদের সঙ্গে আলাপ করতে হবে। কারণ বাজেট বাস্তবসম্মত ও বাস্তবায়নযোগ্য হওয়াটা সবচেয়ে জরুরি।...

 

বাজেটে দেশের অর্থনীতির প্রকৃত অবস্থা মূল্যায়নে বিদ্যমান বাস্তবতার গ্রহণযোগ্য বিশ্লেষণ থাকতে হবে। নানারকম সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও নতুন সরকারের কাছে মানুষের আকাঙ্ক্ষা অনেক বড়। এ প্রত্যাশা সম্পূর্ণভাবে পূরণ করা সম্ভব না হলেও, সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহারের মাধ্যমে যতটুকু প্রত্যাশা পূরণ করা যায়, আমাদের সে চেষ্টা থাকতে হবে। একই সঙ্গে বাস্তবায়নযোগ্য ও বাস্তবমুখী বাজেটে যৌক্তিক বরাদ্দ ও ব্যয়ের দক্ষতা বাড়াতে হবে। ২০১৩ সাল থেকে দুর্নীতিগ্রস্ত স্বৈরাচারী শাসন ছিল। তার অন্যতম একটি কারণ হলো কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্টকে (স্বার্থের দ্বন্দ্ব) মেইন স্ট্রিম করে ফেলা। অর্থাৎ স্বার্থের দ্বন্দ্বকে নিয়ন্ত্রণ তো দূরের কথা, সরকারের পক্ষ থেকে চূড়ান্তভাবে প্রশ্রয় দেওয়া হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ–বিভিন্নভাবে ব্যাংক, বিমা কিংবা মিডিয়ার মালিকানা দখল করা হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান থেকে সম্পদ লুট করে বিদেশে পাচার করা হয়েছে। সরকারের ভেতরে এখনো তাদের ক্যাপাসিটি আছে। ফলে নতুন শক্তি নিয়ে তাদের ফিরে আশার আশঙ্কা রয়েছে। এ কারণে মূল্যস্ফীতি এবং বিনিয়োগ এই দুই সূচক স্বস্তির জায়গায় নিয়ে যাওয়া বড় চ্যালেঞ্জ। 

দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি, রাজস্ব আয় এবং আর্থিক খাতের ব্যাপক সংস্কার দরকার। সামষ্টিক অর্থনীতি যেভাবে ভঙ্গুর অবস্থায় চলে গিয়েছিল, সেখানে বর্তমানে অনেকটা স্থিতিশীল হয়েছে। তবে দুটি সূচক এখনো উদ্বেগজনক। এর মধ্যে একটি হলো মূল্যস্ফীতি, অপরটি বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ। এখানে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি হয়নি। আর অগ্রগতি না হওয়ার অন্যতম কারণ, দেশের অর্থনীতিকে যেভাবে গোষ্ঠীতন্ত্রের কবলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, সেখান থেকে এখনো সম্পূর্ণ উত্তরণ হয়নি। অর্থাৎ আগের সরকার বিদায় নিয়েছে, আর গোষ্ঠীতন্ত্র চলে গেছে বিষয়টি এমন নয়। সামষ্টিক অর্থনীতির অন্য সূচকগুলো বিবেচনা করলে দেখা যাবে ঋণ ব্যবস্থাপনায় ঝুঁকি ছিল। কিন্তু আমরা খেলাপি হইনি। এ ছাড়া বর্তমানে বৈদেশিক রিজার্ভ বাড়ছে। মুদ্রার বিনিময় হার যৌক্তিক করা হচ্ছে।

এবারের বাজেটের প্রেক্ষাপট অবশ্যই ভিন্ন। কারণ গভীর রাজনৈতিক পট-পরিবর্তনের মধ্যদিয়ে নতুন সরকার ক্ষমতায় এসেছে। এর আগের বাজেটগুলো গোষ্ঠীতন্ত্র প্রভাবিত দুর্নীতিগ্রস্ত নীতির মধ্যদিয়ে হচ্ছিল। কিন্তু এবার মানুষের সীমাহীন প্রত্যাশা আছে। সমাজের বা অর্থনীতির প্রয়োজনে প্রতি বছরই আগের বাজেটগুলোর কিছু ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে হয়। যেমন, দারিদ্র্যবিমোচন, কৃষকের সমস্যা মেটানো এবং মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির গতি স্বস্তিদায়ক পর্যায়ে নিয়ে আসা অন্যতম।

বাজেটে তিন ধরনের চ্যালেঞ্জ আছে। এর মধ্যে দেশে সম্পদের স্বল্পতা রয়েছে। রাজস্ব আহরণ কম এবং নানাভাবে বিদেশে অর্থ পাচার হয়েছে। এটি একটি বাস্তবতা। দ্বিতীয়ত, বিশাল পট-পরিবর্তন হয়েছে। ফলে মানুষের মধ্যে নানা ধরনের চাহিদা বা আকাঙ্ক্ষা সৃষ্টি হয়েছে। এর একটি চাপ আছে। আবার এই দুই বাস্তবতার মধ্যে আমলাতান্ত্রিক গতানুগতিকতা পরিহার করে উদ্ভাবনী নেতৃত্ব (লিডারশিপ) দেখানোর সুযোগ আছে। তবে সুযোগের মানে এই নয় যে, হঠাৎ করে বিশাল কোনো প্রকল্প নিতে হবে। চ্যালেঞ্জের তৃতীয় বিষয় হলো–অর্থ বরাদ্দের আকার। এ আকার অবশ্যই বাস্তবসম্মত হবে, পাশাপাশি বাড়াতে হবে ব্যয়ের দক্ষতা। স্বৈরাচারী শাসনামলে তিনটি অগ্রহণযোগ্য প্রবণতা দিয়ে সেই সময়ের বাজেটকে সংজ্ঞায়িত করা যায়। একটি হলো, বাস্তবতাবিবর্জিত অর্থনীতির বিশ্লেষণ। এমনভাবে বিশ্লেষণ করা হতো, যেন অর্থনীতিতে কোনো সমস্যা নেই। সবকিছু ভালো আছে। দ্বিতীয়ত, গোষ্ঠীতন্ত্রকে তোয়াজ করার জন্যই নীতিজগৎকে জানানো হতো। অর্থাৎ এমন পদক্ষেপ নেওয়া হতো যাতে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তে উৎসাহিত হয়। তৃতীয়টি হলো, ব্যয় অদক্ষতা। অনেকে মেগা প্রকল্পের সমস্যার কথা বলেন। কিন্তু আমার মতে, মেগা প্রকল্প বড় সমস্যা নয়। সমস্যা হলো ব্যয়ের দক্ষতা ছিল না। যেমন বালিশের দাম এবং রাস্তা নির্মাণ খরচসহ বেশকিছু অস্বাভাবিক ব্যয়ের তথ্য প্রকাশ হয়েছে। এই তিন খাতেই এবারের বাজেটে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

বাজেটের তিনটা দিক খুব গুরুত্বপূর্ণ। একটি হলো–অর্থনৈতিক বাস্তবতার গ্রহণযোগ্য বিশ্লেষণ করতে হবে। দ্বিতীয় বিষয় হলো বিভিন্ন খাতে সিগন্যাল জরুরি। বেসরকারি খাত, সম্পদ আহরণ এবং ব্যবহারের বিষয়ে কী সিগন্যাল দেওয়া হচ্ছে সেটি গুরুত্বপূর্ণ। অগ্রাধিকার খাত বা সমাজের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর ব্যাপারে সরকার কী তা স্পষ্টভাবে জানাতে হবে। অর্থাৎ সব খাতে বরাদ্দ বাড়ানো সম্ভব না হলেও পলিসি সাপোর্ট (নীতি সহায়তা) দেওয়া জরুরি। যেমন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) ইতোমধ্যে দুভাগ করা হয়েছে। এটি বড় ধরনের সিগন্যাল। এর মাধ্যমে একটি বার্তা দেওয়া হয়েছে, রাজস্ব আহরণকে সরকার আরও বাস্তবমুখী করতে চায়। সর্বশেষ বিষয় হলো বরাদ্দ। আবার বরাদ্দের দুটি অংশ আছে। প্রথমত, বরাদ্দ দেওয়া এবং দ্বিতীয়ত, ব্যয়ের দক্ষতা বাড়ানো। এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এর বাইরেও কিছু বিষয় রয়েছে। যেমন, কর্মসংস্থান বাড়াতে নিতে হবে কার্যকর পদক্ষেপ। তবে কর্মসংস্থান মানে এই নয় যে, সরকার নিজেই কর্মসংস্থান বাড়াবে। বেসরকারি খাতের বিকাশে সরকারকে নীতি-সহায়তা দিতে হবে। কৌশলের ক্ষেত্রে আমার কিছু প্রত্যাশা আছে। যেমন, লো হ্যাংগিং ফ্রুটস (সহজে অর্জনযোগ্য লক্ষ্য) বাস্তবায়নে জোর দেওয়া। এটি বাস্তবায়নে গভীর কাঠামোগত সংস্কারের প্রয়োজন নেই। যেমন, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বাড়াতে হবে। এখানে বাজেটের আকারের বিষয় আছে। এরপরও সেখানে নজর দিতেই হবে। শিক্ষা খাতে প্রাইমারি স্টাইফেন নামে একটি কর্মসূচি আছে। ২০০৪ সালে এটি শুরু হয়। ৭৮ লাখ শিক্ষার্থীকে মাসে ১০০ টাকা করে দেওয়া হতো। এখানে স্বচ্ছতা আছে। লিকেজের আশঙ্কা কম। ফলে এই খাতে বরাদ্দ বাড়ানো উচিত। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার বিভিন্ন প্রকল্পে ৪০ শতাংশ পদ এখনো খালি আছে। জনবলের এ ঘাটতির কারণে মানুষ সেবা পান না। ফলে এখানে বিশেষ বরাদ্দ দিলে একটি উদাহরণ হয়ে থাকত। চূড়ান্ত কথা হলো সম্পদের নানা সীমাবদ্ধতা থাকলেও আকাঙ্ক্ষা বিশাল। এটি মাথায় রাখতে হবে।

বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির প্রক্রিয়ায় গত তিন-চার দশক ধরে দুটি চালকই প্রতিষ্ঠিত হয়ে আছে। একটি হলো তৈরি পোশাক এবং অন্যটি রেমিট্যান্স (প্রবাসী আয়)। এই দুটি থাকবে। এর সঙ্গে প্রবৃদ্ধির নতুন চালক তৈরি করতে হবে। এ ক্ষেত্রে কৃষি, ওষুধ খাত, আইটি সেবা এবং চামড়াশিল্প অন্যতম। বাজেটে এসব খাত নিয়ে একটি বার্তা আসা উচিত। খাতগুলোকে উৎসাহিত করতে প্রণোদনা দিতে হবে। অবশ্যই আয়ের খাতগুলো দুর্বল হয়েছে। এটি একটি বাস্তবতা। এ অবস্থার উত্তরণ জরুরি। সে ক্ষেত্রে ঋণ নেওয়া একটি কৌশলগত দিক। কিন্তু শুধু ঋণ নিলে হবে না। অপচয় কীভাবে কমানো যায়, সে ব্যাপারে পদক্ষেপ নিতে হবে। পাশাপাশি ব্যয় যৌক্তিকীকরণ করতে হবে। এ ছাড়া আয় বাড়াতে নিতে হবে কার্যকর পদক্ষেপ। বেসরকারি খাতে নীতি সহায়তা দিয়ে ব্যবসার পরিবেশ তৈরি করতে হবে। এ ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার জরুরি। তবে যাদের জন্য সংস্কার, অবশ্যই তাদের সঙ্গে আলাপ করতে হবে। কারণ বাজেট বাস্তবসম্মত ও বাস্তবায়নযোগ্য হওয়াটা সবচেয়ে জরুরি। 

লেখক: অর্থনীতিবিদ ও এক্সিকিউটিভ চেয়ারম্যান (পিপিআরসি)

শিক্ষা বাজেট বাড়ল, এবার কি বদলাবে শ্রেণিকক্ষ?

প্রকাশ: ২৬ জুন ২০২৬, ১০:৫২ এএম
শিক্ষা বাজেট বাড়ল, এবার কি বদলাবে শ্রেণিকক্ষ?

বাংলাদেশের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে শিক্ষা খাত নতুন করে আলোচনায় এসেছে। বরাদ্দ বেড়েছে, জিডিপির হিসাবে অংশও বেড়েছে। আগের অর্থবছরে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ ছিল ৮৭ হাজার ২০৬ কোটি টাকা, এবার তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬০৬ কোটি টাকায়। জিডিপির হিসাবে এটি ১ দশমিক ৩৯ শতাংশ থেকে ২ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। সংখ্যার দিক থেকে এটি অবশ্যই আশাব্যঞ্জক। কিন্তু শিক্ষা খাতের প্রশ্ন কখনো শুধু সংখ্যার প্রশ্ন নয়। এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্ম, শিক্ষক, শ্রেণিকক্ষ, গবেষণা, দক্ষতা, কর্মসংস্থান এবং রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নচিন্তার প্রশ্ন। তাই বড় বরাদ্দের আনন্দের সঙ্গে সবচেয়ে জরুরি প্রশ্নটি তুলতে হবে–এই অর্থ কি সত্যিই শিক্ষার মান বদলাবে?

শিক্ষায় বরাদ্দ বৃদ্ধি একটি ইতিবাচক রাজনৈতিক বার্তা। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ নিয়ে হতাশা ছিল। অনেকেই বলতেন, উন্নয়ন যদি মানুষকেন্দ্রিক হতে হয়, তবে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যকে অগ্রাধিকার দিতেই হবে। এবার শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধির মাধ্যমে সেই প্রত্যাশার একটি অংশ প্রতিফলিত হয়েছে। তবে এখানেই আলোচনার শেষ নয়, বরং শুরু। কারণ টাকা বাড়লেই শিক্ষা বদলায় না। শিক্ষা বদলায় তখনই, যখন অর্থ সঠিক জায়গায়, সঠিক পদ্ধতিতে এবং সঠিক জবাবদিহির মাধ্যমে ব্যয় হয়। তাই বাজেটের পরবর্তী বড় প্রশ্ন হলো–এই অতিরিক্ত বরাদ্দ কোন খাতে যাবে, কীভাবে যাবে এবং তার ফল কীভাবে মাপা হবে?

শিক্ষা সংস্কারের কেন্দ্রে থাকতে হবে শিক্ষককে। ভবন, যন্ত্রপাতি, বই, প্রযুক্তি–সবই প্রয়োজন; কিন্তু শ্রেণিকক্ষের প্রাণ হলো শিক্ষক। একজন দক্ষ, অনুপ্রাণিত ও প্রশিক্ষিত শিক্ষক একটি দুর্বল শ্রেণিকক্ষকেও জীবন্ত করে তুলতে পারেন। আবার বিপরীতে, দুর্বল শিক্ষকতা ভালো অবকাঠামোকেও অকার্যকর করে দিতে পারে। তাই এই বাজেটে শিক্ষক প্রশিক্ষণ, পেশাগত উন্নয়ন, গবেষণাভিত্তিক শিক্ষণপদ্ধতি এবং শিক্ষক মূল্যায়ন ব্যবস্থাকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। শুধু একবারের প্রশিক্ষণ নয়, ধারাবাহিক প্রশিক্ষণ দরকার। একজন শিক্ষক যেন নতুন পাঠ্যক্রম, প্রযুক্তি, মূল্যায়ন পদ্ধতি এবং শিক্ষার্থীর মানসিক পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেকে নিয়মিতভাবে আপডেট করতে পারেন–সে ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

বাংলাদেশে শিক্ষার বড় দুর্বলতা হলো, অনেক সময় পরীক্ষার ফল ভালো হলেও বাস্তব দক্ষতা দুর্বল থাকে। শিক্ষার্থী পাস করে, কিন্তু সমস্যা সমাধান করতে পারে না; ডিগ্রি নেয়, কিন্তু কর্মক্ষেত্রের প্রস্তুতি থাকে না; মুখস্থ করে, কিন্তু চিন্তা করতে শেখে না। এই জায়গায় বাজেটের অর্থকে নতুনভাবে ব্যবহার করতে হবে। স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে সমস্যা সমাধান, যোগাযোগ দক্ষতা, ডিজিটাল দক্ষতা, ভাষা দক্ষতা, উদ্যোক্তা মনোভাব এবং হাতে-কলমে শিক্ষাকে গুরুত্ব দিতে হবে। শিক্ষা যেন শুধু সনদ না দেয়; শিক্ষা যেন মানুষকে কাজের যোগ্য, চিন্তার যোগ্য এবং সমাজের জন্য দায়িত্বশীল করে তোলে।

বাংলাদেশে কারিগরি শিক্ষাকে এখনো অনেক পরিবার দ্বিতীয় সারির শিক্ষা হিসেবে দেখে। এই মানসিকতা বদলানো জরুরি। উন্নত দেশগুলোতে দক্ষতা, প্রযুক্তি, উৎপাদন ও উদ্ভাবনের সঙ্গে কারিগরি শিক্ষার গভীর সম্পর্ক রয়েছে। বাংলাদেশ যদি কর্মসংস্থানমুখী অর্থনীতি গড়তে চায়, তাহলে 
কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাকে মর্যাদাপূর্ণ ধারায় আনতে হবে। এ জন্য শুধু ট্রেড কোর্স খুললেই হবে না। শিল্প খাতের সঙ্গে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সরাসরি সংযোগ তৈরি করতে হবে। কোন খাতে কী ধরনের দক্ষ জনবল দরকার, সে চাহিদা বুঝে কোর্স তৈরি করতে হবে। স্থানীয় শিল্প, কৃষি, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ, আইসিটি, স্বাস্থ্যসেবা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও সেবা খাতের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের হাতে-কলমে যুক্ত করতে হবে।

বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে শুধু পরীক্ষা নেওয়া ও ডিগ্রি দেওয়ার প্রতিষ্ঠানে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান শক্তি হওয়া উচিত গবেষণা, নতুন জ্ঞান সৃষ্টি, নীতি-সহায়তা এবং সমাজের সমস্যার বাস্তব সমাধান দেওয়া। শিক্ষা বাজেটের একটি স্পষ্ট অংশ গবেষণার জন্য রাখতে হবে। তবে গবেষণা বরাদ্দও যেন কাগজে আটকে না থাকে। 

শিক্ষা সংস্কারের ভিত্তি হলো প্রাথমিক শিক্ষা। একটি শিশু যদি প্রাথমিক পর্যায়েই পড়া, লেখা, গণিত, ভাষা, কৌতূহল ও আত্মবিশ্বাসে পিছিয়ে পড়ে, তাহলে পরবর্তী স্তরে গিয়ে তার ক্ষতি পূরণ করা কঠিন হয়ে যায়। তাই প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকসংকট, শ্রেণিকক্ষের মান, পুষ্টি, উপস্থিতি, শেখার ঘাটতি এবং গ্রাম-শহর বৈষম্য কমাতে বিশেষ উদ্যোগ প্রয়োজন। দরিদ্র পরিবারের শিশু, চরাঞ্চল, পাহাড়ি এলাকা, উপকূলীয় অঞ্চল ও প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা সহায়তা দরকার। কারণ শিক্ষায় সমতা না এলে উন্নয়নও অসম থেকে যায়।

শিক্ষক প্রশিক্ষণ ছাড়া প্রযুক্তি দিলে তা অনেক সময় অব্যবহৃত সরঞ্জামে পরিণত হয়। তাই প্রযুক্তির সঙ্গে শিক্ষক প্রশিক্ষণ, বাংলা ভাষায় মানসম্মত পাঠ্যবস্তু, শিখন মূল্যায়ন, শিক্ষার্থীর শিখন-উপাত্ত এবং দূরবর্তী এলাকার জন্য মিশ্র শিক্ষাব্যবস্থা যুক্ত করতে হবে। প্রযুক্তি যেন প্রদর্শনী না হয়ে শিক্ষার মানোন্নয়নের হাতিয়ার হয়।

ভালো নীতি ও বরাদ্দ থাকলেও দুর্বল বাস্তবায়নের কারণে কাঙ্ক্ষিত ফল আসে না। শিক্ষা বাজেটে শুধু কত টাকা বরাদ্দ হলো, তা নয়; টাকা সময়মতো খরচ হলো কি না, কী কাজে খরচ হলো এবং তার ফল কী–এসবও গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিটি বড় শিক্ষা প্রকল্পে পরিমাপযোগ্য সূচক থাকা দরকার। যেমন–শেখার মান কতটা বাড়ল, কতজন শিক্ষক প্রশিক্ষণ পেলেন, কত বিদ্যালয়ে বাস্তব পরিবর্তন হলো, কারিগরি শিক্ষার কত শিক্ষার্থী কর্মসংস্থানে গেল এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা থেকে কতটি নীতি বা শিল্পসমাধান তৈরি হলো। জবাবদিহি না থাকলে বড় বরাদ্দও পরিবর্তন আনতে পারে না।

এই বাজেটকে বিচ্ছিন্ন বরাদ্দ হিসেবে না দেখে জাতীয় শিক্ষা রূপান্তরের সূচনা হিসেবে দেখতে হবে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন, কারিগরি শিক্ষা বোর্ড, শিল্প খাত, স্থানীয় সরকার, শিক্ষক সংগঠন এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠান–সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। একটি পাঁচ বছরমেয়াদি শিক্ষা রূপান্তর পরিকল্পনা দরকার, যেখানে থাকবে স্পষ্ট অগ্রাধিকার: শিক্ষক উন্নয়ন, প্রাথমিক শিক্ষার মান, কারিগরি দক্ষতা, গবেষণা, প্রযুক্তি, মূল্যায়ন সংস্কার এবং কর্মসংস্থান সংযোগ। বাজেটের অর্থ সেই পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত না হলে বরাদ্দ বাড়বে, কিন্তু পরিবর্তন ছড়িয়ে পড়বে না।

শিক্ষা খাতে এবারের বরাদ্দ বৃদ্ধি আশার জায়গা তৈরি করেছে। কেবল অর্থ বরাদ্দ নয়, অর্থের ব্যবহার, ব্যবহারকারীর দক্ষতা এবং ফলাফলের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে তার তরুণ প্রজন্মের ওপর। আর তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে শিক্ষার ওপর। তাই শিক্ষা বাজেটকে শুধু হিসাবের খাতা হিসেবে দেখা যাবে না; এটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণের নকশা। বরাদ্দ বাড়ল–এবার দরকার শিক্ষার বাস্তব রূপান্তর।

লেখক: শিক্ষক, গবেষক ও লেখক, চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও অ্যানিমেল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম
[email protected]