মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতি গড়ার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
তিনি বলেন, ‘প্রস্তাবিত বাজেট বাস্তবায়নের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ অর্থের সংস্থান নয়; বরং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, বাস্তবায়ন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। একইসঙ্গে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, ব্যাংক ও পুঁজিবাজার সংস্কার এবং ঋণনির্ভর অর্থনীতি থেকে বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতিতে রূপান্তরের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছেন তিনি।’
সোমবার (২৯ জুন) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম বাজেট অধিবেশনের ১৮তম দিনে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সমাপনী বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত পদক্ষেপ
অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘উচ্চ মূল্যস্ফীতি বর্তমানে সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয়। সরকার এটিকে শুধু অর্থনৈতিক নয়, সামাজিক দায়িত্ব হিসেবেও দেখছে। এ জন্য মুদ্রানীতি ও রাজস্ব নীতির সমন্বয়, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করা, বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখা, কৃষি ও শিল্প উৎপাদন বৃদ্ধি, ৬০টি নিত্যপণ্যে উৎসে কর কমানো, সরবরাহব্যবস্থা উন্নয়ন এবং বাজার কারসাজির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা অব্যাহত থাকবে। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে ধাপে ধাপে মূল্যস্ফীতি কমে জনজীবনে স্বস্তি ফিরবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।’
প্রবৃদ্ধি ও বিনিয়োগে সরকারের আস্থা
প্রস্তাবিত ৬ দশমিক ৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য অর্জন সম্ভব বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, শিল্প, কৃষি, তথ্যপ্রযুক্তি ও সেবাখাত সম্প্রসারণ, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং ক্রিয়েটিভ অর্থনীতির বিকাশের মাধ্যমে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য অর্জন করা হবে। তিনি জানান, সরকার ‘রিকভারি অ্যান্ড স্ট্যাবিলাইজেশন, রেস্টোরেশন এবং রিকনস্ট্রাকশন ফর অ্যাকসেলারেশন’ এই ‘থ্রিআর’ কৌশল বাস্তবায়ন করছে, যার মাধ্যমে অর্থনীতিকে টেকসই পুনরুদ্ধারের পথে এগিয়ে নেওয়া হবে।’
করভিত্তি বাড়বে, করহার নয়
রাজস্ব আহরণ প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘সরকার করের হার বৃদ্ধি নয়, বরং করভিত্তি সম্প্রসারণের মাধ্যমে রাজস্ব বাড়াতে চায়। এজন্য রাজস্ব প্রশাসনের আধুনিকায়ন, কর ব্যবস্থার অটোমেশন, কর ফাঁকি রোধ এবং ব্যবসা সহজীকরণে ডিরেগুলেশন কার্যক্রম জোরদার করা হচ্ছে। তিনি দাবি করেন, সরকারের চার মাসের উদ্যোগে প্রথমবারের মতো জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের রাজস্ব আদায় চার লাখ কোটি টাকা অতিক্রম করেছে।’
উন্নয়ন ব্যয়ে গুরুত্ব, কমবে পরিচালন ব্যয়
সরকারি ব্যয়ে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে পরিচালন ব্যয় কমিয়ে উন্নয়ন ব্যয় বাড়ানোর নীতির কথা তুলে ধরেন অর্থমন্ত্রী। প্রস্তাবিত বাজেটে উন্নয়ন ব্যয়ের অংশ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো এবং পরিচালন ব্যয়ের অংশ কমানোর পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান তিনি।
ঋণনির্ভরতা কমিয়ে বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতি
অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘বিগত সময়ে অতিরিক্ত ঋণনির্ভরতার কারণে অর্থনীতিতে চাপ তৈরি হয়েছে। এ পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে আগামী অর্থবছরে ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ গ্রহণ ৬ হাজার কোটি টাকা কমানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত করা, বন্ড মার্কেট উন্নয়ন, ইক্যুইটি ফাইন্যান্সিং এবং বিদেশভিত্তিক বিনিয়োগ তহবিল গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’
ব্যাংক সংস্কার ও পাচার হওয়া অর্থ ফেরানোর উদ্যোগ
ব্যাংক খাতের সংস্কারের বিষয়ে অর্থমন্ত্রী জানান, পাচার হওয়া অর্থ ও সম্পদ ফেরাতে সরকার আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আইনি উদ্যোগ জোরদার করেছে। চলতি বছরের মে পর্যন্ত ১১টি অগ্রাধিকার মামলায় প্রায় ৭২ হাজার কোটি টাকার সম্পদ জব্দ বা ফ্রিজ করা হয়েছে। বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরাতে একাধিক দেশের সঙ্গে আইনি সহযোগিতা কার্যক্রমও চলছে।
একীভূত পাঁচটি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকের আমানতকারীদের আশ্বস্ত করে তিনি বলেন, সাধারণ আমানতকারীরা তাৎক্ষণিকভাবে সর্বোচ্চ দুই লাখ টাকা উত্তোলন করতে পারবেন এবং অবশিষ্ট অর্থ পর্যায়ক্রমে পরিশোধ করা হবে। ক্যানসার, কিডনি ডায়ালাইসিস রোগী ও হজ সঞ্চয়কারীদের জন্য বিশেষ সুবিধাও থাকবে।
পুঁজিবাজার ও বিনিয়োগে প্রণোদনা
পুঁজিবাজারে আস্থা ফেরাতে জিরো কুপন বন্ডের আয় করমুক্ত করা, তালিকাভুক্ত কোম্পানির জন্য করহার কমানো, শেয়ার অফলোডে অতিরিক্ত কর সুবিধা এবং ব্যাংকিং চ্যানেলে লেনদেনকারী প্রতিষ্ঠানের জন্য বিশেষ কর ছাড়ের প্রস্তাব তুলে ধরেন অর্থমন্ত্রী। একই সঙ্গে মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগের কর রেয়াতের সীমাও তুলে দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।
বাস্তবায়নই হবে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা
বাজেটের সফলতা ঘোষণায় নয়, বাস্তবায়নে নিহিত এ কথা উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা, জলবায়ু পরিবর্তন, রাজস্ব আহরণ, আর্থিক খাতের সংস্কার ও বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়ন আগামী দিনের বড় চ্যালেঞ্জ। তবে দক্ষ প্রশাসন, ফলাফলভিত্তিক ব্যবস্থাপনা, ডিজিটাল পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা এবং কার্যকর জবাবদিহিতার মাধ্যমে সরকার এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে বাজেট বাস্তবায়নে সফল হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
এলিস/রিফাত/