শিক্ষা খাতে সর্বোচ্চ বাজেট নিঃসন্দেহে একটি সাহসী এবং ইতিবাচক সিদ্ধান্ত। কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, বাজেটের অঙ্ক উন্নয়ন নিশ্চিত করে না; উন্নয়ন নিশ্চিত করে এর সঠিক ব্যবহার। আজকের বাংলাদেশে প্রশ্নটি তাই বাজেটের আকার নিয়ে নয়। প্রশ্নটি হলো, আমরা কি শিক্ষাকে সত্যিই জাতীয় উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করতে প্রস্তুত?...

বাংলাদেশের নতুন বাজেট নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার ভিড়ে শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন খাতে ইতিহাসের সর্বোচ্চ বরাদ্দের বিষয়টি বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে। অর্থমন্ত্রী শিক্ষা খাতে যে বরাদ্দের প্রস্তাব দিয়েছেন, তা নিঃসন্দেহে দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী হওয়ার সুযোগ তৈরি করে। কারণ শিক্ষা এমন একটি খাত, যেখানে ব্যয় আসলে ব্যয় নয়; এটি এক ধরনের বিনিয়োগ। সড়ক, সেতু কিংবা ভবন নির্মাণ একটি দেশের অবকাঠামো গড়ে তোলে। কিন্তু শিক্ষা গড়ে তোলে মানুষের সক্ষমতা। আর মানুষের সক্ষমতার ওপরই নির্ভর করে একটি রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন।
কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতায় সবচেয়ে বড় একটি প্রশ্ন সামনে এসে যায়। সেটি হলো শিক্ষা খাতে সর্বোচ্চ বাজেট কি সত্যিই শিক্ষার সর্বোচ্চ উন্নয়ন নিশ্চিত করবে? নাকি অতীতের মতো এবারও বিপুল অর্থের একটি বড় অংশ দুর্বল প্রশাসন, অদক্ষতা, অনিয়ম এবং দুর্নীতির জালে আটকে যাবে?
এ কথা সত্য যে দীর্ঘদিন পর শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধির মাধ্যমে সরকার একটি ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে। কারিগরি শিক্ষা সম্প্রসারণ, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার উন্নয়ন, নতুন শিক্ষা অবকাঠামো নির্মাণ, ডিজিটাল ল্যাব স্থাপন এবং দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে প্রায় সব বিশ্লেষণেই একটি সতর্কবার্তা রয়েছে। বরাবরই আমরা লক্ষ করেছি যে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার সবচেয়ে বড় সংকট অর্থ নয়; বরং যথাযথ ব্যবস্থাপনা কিংবা সুশাসনের অভাব।
বাংলাদেশে শিক্ষা নিয়ে আমরা দীর্ঘদিন ধরে একটি অদ্ভুত দ্বৈত বাস্তবতা দেখে আসছি। একদিকে শিক্ষার হার বেড়েছে, বিদ্যালয়ের সংখ্যা বেড়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বেড়েছে, বাজেটও বেড়েছে। অন্যদিকে শিক্ষার গুণগত মান, গবেষণা, উদ্ভাবন, দক্ষতা উন্নয়ন এবং কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি হয়নি। হাজার হাজার শিক্ষার্থী প্রতি বছর ডিগ্রি অর্জন করছে। কিন্তু চাকরির বাজার বলছে, যোগ্য লোক পাওয়া যাচ্ছে না। অর্থাৎ শিক্ষিত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, কিন্তু দক্ষ মানুষের সংখ্যা সেই অনুপাতে বাড়ছে না। এই বৈপরীত্যের পেছনে অন্যতম কারণ শিক্ষা প্রশাসনের দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতা।
বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার দিকে তাকালে দেখা যায়, প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত প্রায় প্রতিটি স্তরে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত কেন্দ্রীভূত। বিদ্যালয়ের শিক্ষক, প্রধান শিক্ষক, উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা, জেলা শিক্ষা প্রশাসন, অধিদপ্তর–সবকিছু এমন একটি আমলাতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যে পরিচালিত হয়, যেখানে অনেক সময় শিক্ষার চেয়ে প্রশাসন বড় হয়ে ওঠে। শিক্ষকরা শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের চেয়ে নানা ধরনের রিপোর্ট, ফরম, ডাটা অ্যান্ট্রি এবং প্রশাসনিক কাজ নিয়ে বেশি ব্যস্ত থাকেন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন অনেক ক্ষেত্রে নির্ভর করে প্রশাসনিক অনুমোদনের ওপর, যা অকারণ বিলম্ব এবং অনিয়মের সুযোগ সৃষ্টি করে।
দুর্নীতির বিষয়টি আরও উদ্বেগজনক। শিক্ষক নিয়োগ, বদলি, পদোন্নতি, বিদ্যালয় নির্মাণ, শিক্ষা উপকরণ ক্রয়, প্রশিক্ষণ কর্মসূচি, প্রকল্প বাস্তবায়ন–বিভিন্ন পর্যায়ে অনিয়মের অভিযোগ নতুন নয়। বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা গেছে, শিক্ষা খাতে বরাদ্দকৃত অর্থের একটি অংশ প্রকৃত উন্নয়নের পরিবর্তে অপচয় কিংবা অনিয়মের কারণে কাঙ্ক্ষিত ফল দিতে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে জনগণের একটি বড় অংশের মধ্যে ধারণা তৈরি হয়েছে যে শিক্ষা খাতে শুধু অর্থ বাড়ালেই সমস্যার সমাধান হবে না।
আসলে বাংলাদেশ এখন এমন এক অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে শিক্ষা খাতে অর্থের পাশাপাশি সুশাসনকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যবস্থার হাতে যত বেশি অর্থ দেওয়া হবে, অপচয়ের ঝুঁকিও তত বেশি বাড়বে।
আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার বড় সমস্যা হলো, এটি এখনো মূলত সনদ উৎপাদনমুখী। একজন শিক্ষার্থী প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত দীর্ঘ পথ পাড়ি দেয়, কিন্তু পুরো ব্যবস্থাটি তাকে চাকরির বাজারের জন্য কতটা প্রস্তুত করছে, সেই প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর নেই।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে হাজার হাজার শিক্ষার্থী ব্যবসায় শিক্ষা, সমাজবিজ্ঞান কিংবা মানবিক বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করছে। কিন্তু প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডেটা অ্যানালিটিক্স, সাইবার নিরাপত্তা, আধুনিক কৃষি, স্বাস্থ্য প্রযুক্তি কিংবা শিল্প ব্যবস্থাপনার মতো খাতে দক্ষ জনবলের ঘাটতি রয়ে যাচ্ছে। ফলে একদিকে বেকারত্ব বাড়ছে, অন্যদিকে শিল্প খাত দক্ষ কর্মীর অভাবে বিদেশি কর্মী নিয়োগ করছে।
এ বাস্তবতায় শিক্ষা বাজেটের একটি বড় অংশ কর্মসংস্থানমুখী দক্ষতা উন্নয়নে বিনিয়োগ করা উচিত। প্রাথমিক শিক্ষায় মৌলিক সাক্ষরতা, গণিত এবং বিশ্লেষণী দক্ষতার ওপর জোর দিতে হবে। মাধ্যমিক পর্যায়ে ডিজিটাল দক্ষতা, যোগাযোগ দক্ষতা, ভাষা শিক্ষা এবং উদ্যোক্তা শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন। উচ্চশিক্ষায় গবেষণা, উদ্ভাবন এবং শিল্প-সংযুক্ত শিক্ষার ওপর জোর বাড়াতে হবে।
বাংলাদেশে এখনো কারিগরি শিক্ষাকে অনেক পরিবার দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষা মনে করে। এ মানসিকতা পরিবর্তন করা প্রয়োজন। একজন দক্ষ টেকনিশিয়ান, প্রোগ্রামার, ইলেকট্রিশিয়ান, মেকানিক বা কৃষি উদ্যোক্তার সামাজিক মর্যাদা বাড়ানো না গেলে কর্মসংস্থানমুখী শিক্ষা বাস্তবায়ন কঠিন হবে।
এবারের বাজেটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মানবসম্পদ উন্নয়নকে আলাদা গুরুত্ব দেওয়া। এটি ইতিবাচক। কারণ চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে প্রতিযোগিতা আর শুধু অবকাঠামো দিয়ে হবে না; হবে দক্ষতা দিয়ে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অটোমেশন এবং প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির যুগে যে দেশ দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করতে পারবে, সেই দেশই এগিয়ে যাবে।
আবারও একই প্রশ্ন সামনে আসে–এ অর্থ ব্যয়ের জবাবদিহি কে নিশ্চিত করবে? বাংলাদেশে শিক্ষা খাতের প্রকৃত সংস্কার শুরু হওয়া উচিত শিক্ষা প্রশাসন থেকে। উপজেলা থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে কর্মসম্পাদন মূল্যায়ন চালু করতে হবে। বিদ্যালয়ভিত্তিক আর্থিক নিরীক্ষা বাধ্যতামূলক করতে হবে। শিক্ষক নিয়োগ সম্পূর্ণ ডিজিটাল ও স্বচ্ছ করতে হবে। শিক্ষাপ্রকল্পগুলোর তথ্য জনগণের জন্য উন্মুক্ত করতে হবে। কোন বিদ্যালয় কত টাকা পেল, কীভাবে ব্যয় করল এবং কী ফল অর্জিত হলো–সেসব তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ করা উচিত।
শিক্ষা খাতে সর্বোচ্চ বাজেট নিঃসন্দেহে একটি সাহসী এবং ইতিবাচক সিদ্ধান্ত। কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, বাজেটের অঙ্ক উন্নয়ন নিশ্চিত করে না; উন্নয়ন নিশ্চিত করে এর সঠিক ব্যবহার। আজকের বাংলাদেশে প্রশ্নটি তাই বাজেটের আকার নিয়ে নয়। প্রশ্নটি হলো, আমরা কি শিক্ষাকে সত্যিই জাতীয় উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করতে প্রস্তুত? আমরা কি শিক্ষাপ্রশাসনের দুর্নীতি ও অদক্ষতার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে প্রস্তুত? আমরা কি ডিগ্রি-নির্ভর শিক্ষা থেকে দক্ষতানির্ভর শিক্ষায় যেতে প্রস্তুত?
যদি উত্তর ‘হ্যাঁ’ হয়, তাহলে এবারের শিক্ষা বাজেট ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আশার আলো হয়ে উঠতে পারে। আর যদি উত্তর ‘না’ হয়, তাহলে ইতিহাসের সর্বোচ্চ শিক্ষা বাজেটও হয়তো কেবল আরেকটি বাজেট হিসেবেই স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
লেখক: অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]

