প্রতিদিনের খুব সাধারণ একটি কাজ জুতা পরা এবং খোলা। অথচ চৌদ্দ শত বছর আগে এই সামান্য অভ্যাসটির মধ্যেও এক চমৎকার শৃঙ্খলা ও শিষ্টাচার ফুটিয়ে তুলেছেন রাসুল (সা.)। আজ আমরা জানব জুতা ব্যবহারের সেই অনন্য নববি নির্দেশনা এবং ইসলামের ইতিহাসে জুতার ফ্যাশনে আসা একটি ঐতিহাসিক পরিবর্তনের কথা।
আমরা অনেকেই হয়তো খেয়াল না করেই যেকোনো পায়ে আগে জুতা গলিয়ে দিই। কিন্তু রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ আমাদের প্রতিটি কাজে ইতিবাচক ও সুশৃঙ্খল হওয়ার শিক্ষা দেয়। জুতা পরা ও খোলার ক্ষেত্রে তিনি একটি চিরন্তন নিয়ম বেঁধে দিয়েছেন।
হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘যখন তোমাদের কেউ জুতা পরিধান করে, তখন সে যেন ডান দিক থেকে আরম্ভ করে। আর যখন খোলে, তখন যেন বাম দিক থেকে আরম্ভ করে। অর্থাৎ পরিধানের সময় ডান পা প্রথমে থাকবে এবং খোলার সময় বাম পা প্রথমে থাকবে।’ (সহিহ বুখারি, ৫৮৫৫; মুয়াত্তা মালিক,১৬৩৪)
উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রা.)-এর বর্ণনা থেকে জানা যায়, এটি কেবল জুতার ক্ষেত্রেই নয়, বরং ভালো কাজের প্রতি নবিজি (সা.)-এর এক চিরন্তন ভালোবাসা ছিল। তিনি বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর চুল আঁচড়ানো, জুতা পরিধান করা এবং পবিত্রতা অর্জনের মতো (সব ভালো) কাজের ক্ষেত্রে ডান দিক থেকে শুরু করা পছন্দ করতেন।’ ( বুখারি, ৪২৬; ইবনে হিব্বান, ১০৯১)
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জুতার গঠন কেমন ছিল, তা আমরা জানি। কিন্তু খেলাফতের যুগে এসে জুতার এই নকশায় যে একটি ঐতিহাসিক ও কাঠামোগত পরিবর্তন এসেছিল, তা অনেকেরই অজানা। হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.), আবু বকর (রা.) এবং উমর (রা.) প্রমুখের জুতায় দুটি করে ফিতা ছিল। অতঃপর (আমিরুল মুমিনিন) উসমান (রা.)ই সর্বপ্রথম এক ফিতাবিশিষ্ট জুতো পরিধান করেন।’ (আল-মুজামুল কাবীর, ১২৮)
এই তথ্যটি আমাদের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। জুতায় দুটি ফিতা থাকা কোনো অলঙ্ঘনীয় ধর্মীয় নিয়ম ছিল না, বরং তা ছিল তৎকালীন আরবের সংস্কৃতি। তৃতীয় খলিফা হযরত উসমান (রা.) যখন এক ফিতার জুতা পরা শুরু করলেন, তখন মুসলিম সমাজ বুনেছিল প্রগতি ও ব্যবহারের সহজীকরণের এক নতুন পাঠ।
ডান পা দিয়ে জুতা পরা আর বাম পা দিয়ে খোলা বাইরে থেকে দেখতে সাধারণ মনে হলেও এটি একজন মুমিনের মনস্তাত্ত্বিক শৃঙ্খলা তৈরি করে। আর উসমান (রা.)-এর একক ফিতার জুতার ইতিহাস প্রমাণ করে, ইসলাম সংস্কৃতির সুন্দর ও সুবিধাজনক পরিবর্তনকে কতটা উদারভাবে গ্রহণ করে। বৈচিত্র্যময় এই নববি সিরিজটি বইয়ের পাতায় বা পত্রিকার কলামে আধুনিক পাঠককে প্রাত্যহিক জীবনের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বিষয়েও সচেতন হতে অনুপ্রাণিত করবে।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক