গ্রুপ পর্ব শেষ হয়েছে। কিন্তু আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ যাত্রা যেন এখনই আসল গল্পের দিকে এগোচ্ছে। কারণ জর্ডানকে হারিয়ে তিন ম্যাচে তিন জয় নিয়ে নকআউট নিশ্চিত করা আর্জেন্টিনার আলোচনায় এখন একসঙ্গে তিনটি বিষয়; লিওনেল মেসির বিশ্বরেকর্ড, অবিশ্বাস্য গল্প লিখে শেষ ৩২–এ ওঠা কেপ ভার্দে এবং নক আউট ম্যাচ কেন্দ্র করে লিওনেল স্কালোনির সতর্ক বার্তা।
জর্ডানের বিপক্ষে ম্যাচটা আর্জেন্টিনার জন্য ফলের হিসেবে খুব বড় কিছু ছিল না। ৯টি পরিবর্তন নিয়েও দল জিতেছে ৩-১ ব্যবধানে। জিওভান্নি লো সেলসোর ভুবন ভুলানো ফ্রি-কিক, লাওতারো মার্তিনেজের বুলেট গতির পেনাল্টি; সবই ছিল পরিকল্পনার অংশ। কিন্তু ম্যাচের সবচেয়ে বড় মুহূর্তের জন্য অপেক্ষা করছিল সবাই।
সেটা এল দ্বিতীয়ার্ধে। বেঞ্চ থেকে নামলেন মেসি। তারপর প্রায় ২৫ মিটার দূর থেকে নেওয়া তার ফ্রি-কিক আবারও মনে করিয়ে দিল; কিছু দৃশ্য কখনো পুরোনো হয় না। এই গোলেই ইতিহাস লিখেছেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক। টানা সাতটি বিশ্বকাপ ম্যাচে গোল করার কীর্তি গড়েছেন তিনি, যা পুরুষ ফুটবলের বিশ্বকাপ ইতিহাসে আগে কেউ পারেননি। তিনি পেছনে ফেলেছেন ফ্রান্সের জাস্ট ফন্টেইন ও ব্রাজিলের জেয়ারজিনহোর মতো কিংবদন্তিদের।
তবে আর্জেন্টিনার সামনে এখন অন্য ধরনের পরীক্ষা। শেষ ৩২–এ প্রতিপক্ষ কেপ ভার্দে। যারা এবারের বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় বিস্ময়গুলোর একটি। স্পেনকে রুখেছে, উরুগুয়ের বিপক্ষে পয়েন্ট নিয়েছে, সৌদি আরবকে থামিয়ে প্রথমবার খেলতে এসেই নকআউটে উঠেছে। মাত্র প্রায় পাঁচ লাখ মানুষের দেশটি এখন বিশ্বকাপ নকআউটে ওঠা ইতিহাসের সবচেয়ে ছোট দেশ।
আর তাদের আত্মবিশ্বাসের প্রতীক গোলরক্ষক ভোজিনহা। ৪০ বছর বয়সী এই অভিজ্ঞ গোলরক্ষক স্পেনের বিপক্ষে দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। এখন আর্জেন্টিনা ম্যাচের আগে তার কণ্ঠে চ্যালেঞ্জের সুর। ভোজিনহার ভাষায়, ‘আমরা ছোট দেশ হলেও বড় মঞ্চে লড়তে এসেছি। আমাদের খেলোয়াড়রা যেকোনো প্রতিযোগিতায় নিজেদের প্রমাণ করতে পারে। কেপ ভার্দের মানুষের দৃঢ়তা ও সাহসকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরাই মূল লক্ষ্য। তবে আর্জেন্টিনা ও মেসির বিপক্ষে খেলা যেকোনো ফুটবলারের স্বপ্ন।’ ম্যাচ শেষে মেসির সঙ্গে জার্সি বদলের আগাম আবদারও করে রেখেছেন ভার্দে গোলরক্ষক।
আবেগের বিপরীতে বাস্তবতাও আছে। আর্জেন্টিনা কোচ স্কালোনি প্রতিপক্ষকে হালকাভাবে নিতে নারাজ। তার মতে, কেপ ভার্দে তিন ম্যাচেই প্রমাণ করেছে তারা দ্রুতগতির, সংগঠিত এবং মানসম্পন্ন দল। স্পেন, উরুগুয়ে ও সৌদি আরবের বিপক্ষে তারা যে প্রতিরোধ গড়েছে, সেটি কোনো কাকতালীয় নয়।
স্কালোনি মেসিকেও আলাদা করে প্রশংসা করেছেন। তার মতে, চাইলে জর্ডানের বিপক্ষে মেসি আরও সময় খেলতে পারতেন, নিজের রেকর্ড আরও বড় করতে পারতেন। কিন্তু ব্যক্তিগত অর্জনের চেয়ে দলকে গুরুত্ব দেওয়াই তাকে আলাদা করে।
তাই নকআউটের আগে আর্জেন্টিনার গল্পটা শুধু মেসির নয়। এটা একদিকে ইতিহাস ছোঁয়া এক কিংবদন্তির, অন্যদিকে ভয়হীন এক ছোট্ট দেশের উত্থান। আর মাঝখানে দাঁড়িয়ে স্কালোনির সতর্কতা; বিশ্বকাপে নাম নয়, প্রতিটি ম্যাচই নতুন পরীক্ষা।