বিশ্বকাপের নকআউট পর্ব মানেই আগুনে লড়াই। সেই আগুনে লড়াইয়ের এক ম্যাচে আজ (২৯ জুন) রাতে মুখোমুখি হচ্ছে চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন জার্মানি ও দক্ষিণ আমেরিকার লড়াকু দল প্যারাগুয়ে। শেষ ষোলোতে ওঠার লড়াই। শেষ বত্রিশের এই লড়াইয়ে বাজির পাল্লা ভারী জার্মানদের দিকেই। তবে প্যারাগুয়ের লড়াকু ফুটবল ম্যাচটিকে কঠিন করে তুলতে পারে যেকোনো সময়। জন্ম দিতে পারে অঘটনের।
গ্রুপপর্বে দুর্দান্ত সূচনা করেছিল জার্মানি। প্রথম দুই ম্যাচে কুরাসাও এবং আইভরি কোস্টের বিপক্ষে গোলবন্যা বইয়ে দিয়েছিল। দুই জয় তুলে নেয় ডাই মানশাফটরা। মাত্র দুই ম্যাচে ৯ গোল করে তারা জানান দেয়, আক্রমণভাগে কতটা ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারে। তবে এই ধারাটা তারা ধরে রাখতে পারেনি। শেষ ম্যাচে ইকুয়েডরের কাছে ২-১ গোলের হার কিছুটা ধাক্কা দিয়েছে জুলিয়ান নাগেলসম্যানের দলকে। তবু ‘ই’ গ্রুপের শীর্ষ দল হিসেবেই নকআউটে উঠেছে তারা।
জার্মানি বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম সফল দল। ১৯৫৪, ১৯৭৪, ১৯৯০ এবং ২০১৪–চারবার শিরোপা জিতেছে তারা। তবে সাম্প্রতিক বিশ্বকাপ স্মৃতি সুখকর নয়; বরং লজ্জাজনক বলা যায়। চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা ২০১৮ ও ২০২২ আসরে গ্রুপপর্ব থেকে বিদায় নিয়েছিল। তাই এবারের মিশন শুধু নকআউট পার হওয়া নয়, নিজেদের হারানো মর্যাদা ফিরিয়ে আনার লড়াই জার্মানদের।
অন্যদিকে প্যারাগুয়ে নকআউটে এসেছে সেরা তৃতীয় স্থান পাওয়া দলগুলোর একটি হিসেবে। ‘ডি’ গ্রুপে তিন ম্যাচে ৪ পয়েন্ট নিয়ে তারা তৃতীয় হয়েছে, গোল ব্যবধানে পিছিয়ে ছিল অস্ট্রেলিয়ার কাছে। গুস্তাভো আলফারো দল টুর্নামেন্টে তাদের একমাত্র জয় পেয়েছে তুরস্কের বিপক্ষে ১-০ ব্যবধানে। শেষ ম্যাচে অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে গোলশূন্য ড্র করে নকআউট নিশ্চিত করে তারা। বিশ্বকাপে প্যারাগুয়ের সেরা সাফল্য ২০১০ সালে। সেবার তারা কোয়ার্টার ফাইনালে উঠেছিল। তার পর থেকে ব্যাকফুটে তারা। ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২২ বিশ্বকাপে দলটি জায়গাই করে নিতে পারেনি। ফলে এবারের আসর তাদের জন্য নতুন করে নিজেদের প্রমাণের বড় মঞ্চ।
দুই দলের অতীত পরিসংখ্যানও জার্মানির পক্ষেই কথা বলে। ২০০২ বিশ্বকাপের শেষ ষোলোয় প্যারাগুয়েকে ১-০ গোলে হারিয়েছিল জার্মানি; সেদিন শেষ মুহূর্তে জয়সূচক গোল করেছিলেন ওলিভার নিউভিলে। তবে সর্বশেষ মুখোমুখিতে কেউ জেতেনি। ২০১৩ সালে অনুষ্ঠিত প্রীতি ম্যাচ শেষ হয়েছিল ৩-৩ সমতায়। এসব ঘটনা এক যুগের আগের। ফলে আজকের ম্যাচে এর কোনো প্রভাব থাকবে না এটাই স্বাভাবিক।
ইনজুরি সমস্যায় কিছুটা উদ্বেগ রয়েছে জার্মান শিবিরে। নিকো শলোটেরবেক গোড়ালির চোটে ছিটকে গেছেন। ফলে রক্ষণে আস্থা রাখতে হবে অ্যান্তোনিও রুডিগার ও জোনাথন তাহ জুটির ওপর। এ ম্যাচে নাথানিয়েল ব্রাউনের ফেরার সম্ভাবনা রয়েছে। কাই হাভার্টজ, ফ্লোরিন উইর্টজ ও জামাল মুসিয়ালা থাকবেন আক্রমণের নেতৃত্বে। এই ত্রয়ীর সৃজনশীলতা ও গতি প্যারাগুয়ের রক্ষণকে বড় পরীক্ষায় ফেলবে। এদিকে প্যারাগুয়ে রয়েছে বড় সমস্যায়। মিডফিল্ডার দিয়েগো গোমেজ নিষেধাজ্ঞার কারণে খেলতে পারবেন না। তবে দলে ফিরছেন মিগুয়েল আলমিরন। তার ফেরা আক্রমণে বাড়তি শক্তি দেবে। সামনে থাকবেন অভিজ্ঞ গ্যাব্রিয়েল আভালস। সব মিলিয়ে লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত তারা।
সব মিলিয়ে কাগজে-কলমে জার্মানিই পরিষ্কার ফেবারিট। তবে নকআউট ফুটবলে ছোট ভুলও বড় মূল্য দাবি করে। প্যারাগুয়ে যদি ম্যাচটিকে ধীরগতির, শারীরিক এবং রক্ষণাত্মক লড়াইয়ে পরিণত করতে পারে, তা হলে জার্মানির কাজ সহজ হবে না। জার্মানির কোচ নাগেলসম্যান বলেছেন, ‘গ্রুপপর্বে আমরা ভালো খেলেছি। শেষ ম্যাচের হার আমাদের জন্য সতর্কবার্তা। নকআউট পর্বে ভুলের সুযোগ নেই। প্যারাগুয়ে শৃঙ্খলাপূর্ণ দল। তাদের বিপক্ষে ধৈর্য ধরতে হবে। জিততে হলে মাঝমাঠ ও রক্ষণভাগকে একই ছন্দে থাকতে হবে।’
অধিনায়ক জসুয়া কিমচি বলেন, ‘প্যারাগুয়ে লড়াকু দল। তাদের সুযোগ দেওয়া যাবে না। সমর্থকদের প্রত্যাশা আমরা জানি। প্রতিটি মুহূর্ত মনোযোগী হতে হবে।’
প্যারাগুয়ের কোচ গুস্তাভো আলফারো বলেন, ‘জার্মানি বিশ্বের অন্যতম সফল দল। তাদের বিপক্ষে খেলতে শতভাগের বেশি দিতে হবে। যা হোক, আমরা এখানে শুধু অংশ নিতে আসিনি, প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে এসেছি। আমরা লড়াই করব।’
অধিনায়ক গুস্তাভো গোমেজ বলেন, ‘জার্মানির বিপক্ষে সবাই আমাদের আন্ডারডগ ভাবছে। কিন্তু ফুটবল মাঠে নামের চেয়ে পারফরম্যান্স বড়। আমরা ভয় পাচ্ছি না, আমরা লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত।’