সায়মা ইসলাম তড়িঘড়ি করে সঞ্চয়পত্র নবায়ন করতে এসেছেন সোনালী ব্যাংকের ভিকারুননিসা নূন স্কুল শাখায়। কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘অবসরের পর সঞ্চয়পত্রের মুনাফা দিয়েই আমাদের সংসার খরচ চালাতে হয়। শুনলাম নতুন অর্থবছর থেকে সঞ্চয়পত্রে কর রেয়াত কমিয়ে দিচ্ছে সরকার। তাই মেয়াদপূর্তি হওয়ায় নতুন অর্থবছর শুরু হওয়ার আগেই নবায়ন করতে এসেছি।’
- কর সুবিধা কমছে: সঞ্চয়পত্রে কর রেয়াত কমানো ও মুনাফার ওপর করের চাপ বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে সরকার।
- গ্রাহকদের ভিড়: নতুন নিয়ম কার্যকরের আগে সঞ্চয়পত্র কেনা ও নবায়নে ব্যাংকগুলোতে গ্রাহকদের ভিড় বেড়েছে।
- উদ্বেগ ও পরামর্শ: অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এতে মধ্যবিত্ত ও অবসরপ্রাপ্তরা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন; কর ফাঁকি রোধেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
সায়মা ইসলামের মতো অসংখ্য গ্রাহক এখন ভিড় করছেন সঞ্চয়পত্র কেনা বা নবায়ন করতে। সম্প্রতি সোনালী ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট শাখায় গিয়ে দেখা যায়, অন্য সব ডেস্কের তুলনায় সঞ্চয়পত্রের ডেস্কে সবচেয়ে বেশি ভিড়। কারও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ঠিক নেই, আবার কারও সব কাগজপত্র থাকলেও মোবাইল নাম্বার নিজের নামে বায়োমেট্রিক করা নেই। আবার কারও সব ঠিকঠাক থাকলেও সঙ্গে সঙ্গেই কাজটি শেষ করতে পারছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা। এত ভিড় থাকার কারণ জানতে চাইলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক কর্মকর্তা বলেন, নতুন অর্থবছরের বাজেটে কর রেয়াত সুবিধা কমানোর ঘোষণার পর থেকেই সঞ্চয়পত্রের বিনিয়োগে গ্রাহকদের ভিড় অন্য সময়ের চেয়ে কয়েক গুণ বেড়েছে।
আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে সঞ্চয়পত্রের বিনিয়োগে কর রেয়াতের সুবিধা কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। একই সঙ্গে সঞ্চয়পত্রের আয়ের ওপর করের চাপ বাড়ছে। বর্তমানে সঞ্চয়পত্রে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগ থাকলে মুনাফার ওপর ৫ শতাংশ হারে উৎসে কর কাটা হয়। ১০ লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এ হার ১০ শতাংশ। বিদ্যমান ব্যবস্থায় এই উৎসে করই চূড়ান্ত করদায় হিসেবে গণ্য হয় এবং পরবর্তী সময়ে এ আয়ের ওপর আর কোনো কর দিতে হয় না। তবে নতুন বাজেটে এই সুবিধা বাতিলের প্রস্তাব করা হয়েছে। সঞ্চয়পত্রের মুনাফা আর চূড়ান্ত কর আদায় হিসেবে বিবেচিত হবে না। বরং করদাতার মোট আয়ের সঙ্গে এই আয় যোগ হয়ে নির্ধারিত করস্ল্যাব অনুযায়ী কর পরিশোধ করতে হবে। উৎসে কাটা করকে অগ্রিম কর হিসেবে গণ্য করা হবে, যা আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার সময় সমন্বয় করা যাবে। এর ফলে ৫ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্রধারীও আগের তুলনায় বেশি করের আওতায় পড়বেন। আগে যেখানে তিনি সুদ আয়ের ওপর ৫ শতাংশ কর দিতেন, এখন তাকে ন্যূনতম ১০ শতাংশ হারে কর দিতে হতে পারে।
অন্যদিকে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগে কর রেয়াত সুবিধাও কমানো হচ্ছে। নতুন প্রস্তাবে সঞ্চয়পত্রে সর্বোচ্চ বিনিয়োগসীমা ১০ লাখ টাকা থেকে কমিয়ে সাড়ে ৭ লাখ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। ফলে প্রতি ১ লাখ টাকা বিনিয়োগের বিপরীতে করদাতারা আগের তুলনায় প্রায় ৫ হাজার টাকা কম কর ছাড় পাবেন।
নতুন অর্থবছরের বাজেটে জাতীয় সঞ্চয়পত্রে কর রেয়াতের সীমা কমিয়ে আনার সিদ্ধান্ত মধ্যবিত্ত ও স্থায়ী আয়ের মানুষের জন্য নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। তাদের মতে, আমাদের দেশে নিরাপদ বিনিয়োগের ক্ষেত্র এখনো অনেক কম। ফলে অবসরের পর বা নিয়মিত আয়ের সুযোগ না থাকা মানুষের জন্য সঞ্চয়পত্রের বাইরে বিনিয়োগের অন্য কোনো ক্ষেত্র নেই। আর এই কারণেই সরকার কেবল আমাদের ওপরেই করের বোঝা বাড়িয়ে দিচ্ছে।
বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় উচ্চ মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং প্রকৃত আয় কমে যাওয়ার কারণে মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো এমনিতেই চাপে রয়েছে। এর সঙ্গে সঞ্চয়পত্রে কর সুবিধা কমে যাওয়ায় তাদের করযোগ্য আয় বেড়ে যাবে। ফলে একই পরিমাণ সঞ্চয় ধরে রাখলেও আগের তুলনায় বেশি কর দিতে হবে।
বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরেই জাতীয় সঞ্চয়পত্র সামাজিক নিরাপত্তার একটি অনানুষ্ঠানিক মাধ্যম হিসেবে কাজ করছে। সরকারি চাকরি থেকে অবসর নেওয়া ব্যক্তি, প্রবাসী পরিবারের সদস্য, বিধবা কিংবা স্থায়ী আয়ের ওপর নির্ভরশীল অসংখ্য মানুষ সঞ্চয়পত্রের মুনাফা দিয়ে মাসিক খরচের একটি বড় অংশ মেটান। তাদের জন্য কর রেয়াতের সীমা কমে যাওয়া কার্যত প্রকৃত আয় কমে যাওয়ার সমান।
দীর্ঘদিন ধরে সঞ্চয়পত্র শুধু নিরাপদ বিনিয়োগের মাধ্যমই নয়, বরং অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তি, চাকরিজীবী, শিক্ষক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এবং গৃহিণীদের জন্য নিয়মিত আয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে। ফলে কর রেয়াতের সুযোগ সংকুচিত হওয়ায় একদিকে যেমন করের বোঝা বাড়বে, অন্যদিকে সঞ্চয়ের প্রবণতাও কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
তাদের মতে, সঞ্চয়পত্রে কর রেয়াতের মূল উদ্দেশ্য ছিল মানুষকে সঞ্চয়ে উৎসাহিত করা এবং ভবিষ্যতের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। বিশেষ করে যারা শেয়ারবাজার বা ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগে যেতে চান না, তাদের জন্য এটি ছিল সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য বিকল্প। কিন্তু কর সুবিধা কমে গেলে অনেকেই সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগে নিরুৎসাহিত হতে পারেন।
তারা বলছেন, সরকারের রাজস্ব বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা অবশ্যই রয়েছে। কিন্তু রাজস্ব আহরণের জন্য এমন খাতকে লক্ষ্য করা উচিত, যেখানে কর ফাঁকির প্রবণতা বেশি। নিয়মিত করদাতা এবং সঞ্চয়প্রবণ নাগরিকদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করলে তা দীর্ঘ মেয়াদে অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক ফল বয়ে আনবে না।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) সাবেক মহাপরিচালক ও অর্থনীতিবিদ ড. তৌফিক আহমদ চৌধুরী খবরের কাগজকে বলেন, বাংলাদেশে সঞ্চয়ের হার এমনিতেই কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় নেই। ব্যাংকে আমানতের প্রবৃদ্ধি কমেছে, অন্যদিকে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের প্রকৃত সঞ্চয় করার সক্ষমতাও কমে গেছে। এই পরিস্থিতিতে সঞ্চয়ের ওপর কর-প্রণোদনা কমিয়ে দিলে মানুষ ভোগ ব্যয়ের দিকে ঝুঁকতে পারে অথবা বিকল্প অনানুষ্ঠানিক বিনিয়োগের পথ খুঁজতে পারে, যা আর্থিক খাতের জন্যও ইতিবাচক নয়।
তিনি বলেন, উচ্চ আয়ের মানুষ তাদের বিনিয়োগ বিভিন্ন খাতে ছড়িয়ে দিতে পারেন। কিন্তু সীমিত আয়ের চাকরিজীবী ও অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের জন্য সঞ্চয়পত্রই সবচেয়ে সহজ ও নিরাপদ বিনিয়োগের মাধ্যম। ফলে কর রেয়াত কমে যাওয়ার সরাসরি প্রভাব তাদের পরিবারের মাসিক ব্যয় ব্যবস্থাপনায় পড়বে।
তিনি আরও বলেন, কর ভিত্তি সম্প্রসারণের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো নতুন করদাতা অন্তর্ভুক্ত করা, কর প্রশাসনের দক্ষতা বাড়ানো এবং কর ফাঁকি কমানো। একই সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় কর অব্যাহতি বন্ধ করা যেতে পারে। কিন্তু ক্ষুদ্র সঞ্চয়কারীদের প্রণোদনা কমিয়ে রাজস্ব বাড়ানোর চেষ্টা খুব বেশি কার্যকর হবে না।
সঞ্চয়পত্রের কর রেয়াত সুবিধা কমানোর ক্ষেত্রে সরকারের যুক্তি হলো, কর অব্যাহতির পরিমাণ ধীরে ধীরে যৌক্তিক পর্যায়ে আনা প্রয়োজন। অতিরিক্ত করছাড়ের কারণে রাজস্ব আদায়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের কর রেয়াত সীমিত করে কর-কাঠামোকে আরও সমতাভিত্তিক করার উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থাও দীর্ঘদিন ধরে কর অব্যাহতি কমিয়ে কর ভিত্তি সম্প্রসারণের পরামর্শ দিয়ে আসছে।
ব্যাংকিং খাতের সংশ্লিষ্টদের মতে, সঞ্চয়পত্রে কর সুবিধা কমে গেলে কিছু অর্থ ব্যাংক আমানতে ফিরে আসতে পারে। তবে ব্যাংকে প্রকৃত সুদের হার যদি মূল্যস্ফীতির তুলনায় কম থাকে, তাহলে মানুষ সঞ্চয়ের পরিবর্তে জমি, স্বর্ণ কিংবা অন্য সম্পদে বিনিয়োগে আগ্রহী হতে পারেন। এতে উৎপাদনশীল আর্থিক খাতে দীর্ঘমেয়াদি তহবিল সংগ্রহ আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণিই মূলত নিয়মিত কর দেয়, ব্যাংকে সঞ্চয় রাখে এবং আনুষ্ঠানিক অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকে। এই শ্রেণির ওপর ধারাবাহিকভাবে অতিরিক্ত আর্থিক চাপ সৃষ্টি হলে তাদের ভোগক্ষমতা কমবে, যা সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও আবাসন ব্যয়ের চাপের মধ্যে থাকা পরিবারগুলোকে আরও হিসাব করে চলতে হবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরী খবরের কাগজকে বলেন, রাজস্ব আহরণ এবং সামাজিক সুরক্ষার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। সরকার যদি একদিকে কর আদায় বাড়াতে চায়, অন্যদিকে জনগণকে সঞ্চয়ে উৎসাহিত রাখতেও চায়, তাহলে নিম্ন ও মধ্য আয়ের সঞ্চয়কারীদের জন্য পৃথক কর সুবিধা, ধাপে ধাপে কর রেয়াত কিংবা নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত পূর্ণ কর অব্যাহতির মতো বিকল্প ব্যবস্থা বিবেচনা করা যেতে পারে।
সব মিলিয়ে সঞ্চয়পত্রে কর রেয়াতের সুবিধা কমানোর সিদ্ধান্ত সরকারের রাজস্বনীতির অংশ হলেও এর সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়তে পারে মধ্যবিত্ত ও স্থায়ী আয়ের মানুষের ওপর। তিনি বলেন, রাজস্ব বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই, তবে সেই লক্ষ্য অর্জনের পথে সঞ্চয়প্রবণ ও নিয়মিত করদাতাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ না দিয়ে করব্যবস্থার দক্ষতা বৃদ্ধি, কর ফাঁকি রোধ এবং করের আওতা সম্প্রসারণের দিকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত। তাহলেই একদিকে রাজস্ব বৃদ্ধি সম্ভব হবে, অন্যদিকে মধ্যবিত্তের আর্থিক নিরাপত্তাও অক্ষুণ্ন থাকবে।