ব্রাজিলের ফুটবলে নতুন এক সময়ের গল্প শুরু হয়েছে। বহু বছর ধরে নেইমারকে কেন্দ্র করেই এগিয়েছে সেলেসাওদের স্বপ্ন, পরিকল্পনা আর আক্রমণের নকশা। কিন্তু এবারের বিশ্বকাপের মঞ্চে সেই ছবিতে এসেছে নতুন রং। এখন ব্রাজিলের আক্রমণের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ভিনিসিয়ুস জুনিয়র। সবচেয়ে ইতিবাচক দিক হলো, এই পরিবর্তনকে অসাধারণ পরিণত মানসিকতায় গ্রহণ করেছেন নেইমার। যেখানে অনেক তারকা নিজের জায়গা হারানোর আশঙ্কায় অস্বস্তিতে ভোগেন, সেখানে নেইমার দেখাচ্ছেন সম্পূর্ণ ভিন্ন এক মানসিকতা।
তিনি অকপটে স্বীকার করেছেন, এই মুহূর্তে ব্রাজিল জাতীয় দলের সেরা খেলোয়াড় ভিনিসিয়ুস। শুধু তাই নয়, দলের কৌশলগত পরিকল্পনাও ভিনিকে ঘিরে সাজানো উচিত বলেই মনে করেন তিনি। এই স্বীকারোক্তি কেবল একজন সিনিয়র খেলোয়াড়ের মন্তব্য নয়; এটি একজন নেতার বড় হৃদয়ের প্রতিচ্ছবি। বিশ্বকাপের শুরু থেকেই নেইমার মাঠের ভেতর ও বাইরে নিজের আচরণ দিয়ে প্রশংসা কুড়াচ্ছেন। আগের চেয়ে অনেক বেশি শান্ত, পরিণত এবং দলকেন্দ্রিক একজন নেইমারকে দেখছে ব্রাজিল। জাতীয় দলের কোচিং স্টাফও তার এই পরিবর্তনে মুগ্ধ। বিশেষ করে কোচ কার্লো আনচেলত্তির সঙ্গে নেইমারের সম্পর্ক এখন ব্রাজিল শিবিরের অন্যতম আলোচনার বিষয়। দুজনের পারস্পরিক শ্রদ্ধা, বিশ্বাস এবং বোঝাপড়া দলীয় পরিবেশকে আরও শক্তিশালী করেছে। নেইমার পরিষ্কার করে জানিয়েছেন, দলের প্রয়োজনই তার কাছে প্রথম। সেরা একাদশে থাকুন বা বেঞ্চ থেকে নামুন, ব্রাজিলের জন্য নিজের সর্বোচ্চটা দিতে তিনি সব সময় প্রস্তুত। এখানেই নেইমারের মহত্ত্ব।
ফুটবলে প্রজন্ম বদল অবশ্যম্ভাবী। এক সময় রোনালদো থেকে রোনালদিনহো, রোনালদিনহো থেকে কাকা, কাকা থেকে নেইমার; এভাবেই এগিয়েছে ব্রাজিল। এখন সেই ধারাবাহিকতায় নেইমার থেকে ভিনিসিয়ুসের হাতে আলোটা পৌঁছে যাচ্ছে। কিন্তু এখানে কোনো সংঘাত নেই। নেইমার বনাম ভিনি; এমন বিতর্ক তৈরি করার চেষ্টা বাস্তবতা থেকে অনেক দূরে। বরং সত্যিটা হলো, একজন অভিজ্ঞ শিল্পী নিজের উত্তরসূরির হাতে তুলি তুলে দিচ্ছেন, আবার প্রয়োজন হলে নিজেও আঁকতে প্রস্তুত। চলমান বিশ্বকাপে ব্রাজিলের সবচেয়ে বড় শক্তি হয়তো এখানেই। অভিজ্ঞতা আর তারুণ্যের নিখুঁত সমন্বয়। ভিনিসিয়ুস ব্রাজিলের বর্তমান, নেইমার এখনো তাদের মানসিক শক্তির অন্যতম স্তম্ভ। এই যুগল উপস্থিতিই সাম্বা বাহিনীকে এনে দিতে পারে বহু প্রতীক্ষিত ষষ্ঠ বিশ্বকাপ।
গ্রুপপর্বে দুর্দান্ত পারফরম্যান্সে ভিনিসিয়ুস নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন ব্রাজিলের আক্রমণের সবচেয়ে ভয়ংকর অস্ত্র হিসেবে। এখন পর্যন্ত তিন ম্যাচে ৪ গোল করেছেন তিনি। নকআউট পর্বে জাপানের বিপক্ষে শেষ ৩২ রাউন্ডের ম্যাচে তার দিকেই তাকিয়ে পুরো ব্রাজিল। গ্রুপপর্বে স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে জোড়া গোল করে দলকে শীর্ষে তুলে আনা এই তারকা এখন জাপানের বিপক্ষেও বড় পার্থক্য গড়ে দিতে পারেন–এমনটাই বিশ্বাস সতীর্থ, কোচ এবং ফুটবল বিশ্লেষকদের। ব্রাজিল কোচ কার্লো আনচেলত্তি এ প্রসঙ্গে বলেন, ভিনিসিয়ুস এই টুর্নামেন্টে অসাধারণ ছন্দে আছে। শুধু গোল নয়, তার গতি, ড্রিবলিং আর যেকোনো পরিস্থিতিতে প্রতিপক্ষকে ভাঙার ক্ষমতা আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি। নকআউটে এমন খেলোয়াড়ই ম্যাচের ভাগ্য বদলে দেয়। সেলেসাও কোচ আরও বলেন, জাপান খুব সংগঠিত দল। তাদের বিপক্ষে জায়গা তৈরি করা সহজ হবে না। কিন্তু ভিনির মতো খেলোয়াড় ছোট জায়গাতেও সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে। আনচেলত্তি বলেন, গ্রুপপর্ব ভালো গেছে; কিন্তু আসল পরীক্ষা এখন। নকআউটেই বড় খেলোয়াড়দের নিজেদের প্রমাণ করতে হয়।