দীর্ঘ দুই যুগের হাহাকার। আরও একবার সেই হাহাকার ঘোচানোর মিশনে রয়েছে ব্রাজিল। গ্রুপপর্বে ধীরে ধীরে উন্নতির ছাপ রাখা সেলেসাওরা এবার আসল লড়াইয়ে অবতীর্ণ হচ্ছে। যে লড়াইয়ে স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখতে হলে জয়ের কোনো বিকল্প নেই; হারলেই বিদায়। এমন অবস্থায় উত্তর আমেরিকার বিশ্বকাপের দ্বিতীয় রাউন্ডের (শেষ ৩২) ম্যাচে মাঠে নামার অপেক্ষায় রেকর্ড সর্বোচ্চ পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। যেখানে সেলেসাওদের প্রতিপক্ষ এশিয়ার অদম্য শক্তি জাপান। হিউস্টনে ম্যাচটি শুরু হবে আজ (২৯ জুন) রাত ১১টায়। জয়ী দল পৌঁছে যাবে বিশ্বকাপের প্রি-কোয়ার্টার ফাইনাল অর্থাৎ শেষ ষোলোতে।
দুই দলের এই লড়াই শুধু একটি ফুটবল ম্যাচ নয়। এটি যেন দুই ভিন্ন সংস্কৃতি, দুই ভিন্ন দর্শন আর দুই ভিন্ন ফুটবল আত্মার মুখোমুখি দাঁড়ানোর দিন। একপাশে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন। যাদের পায়ের ছোঁয়ায় ফুটবল কখনো হয়ে ওঠে নৃত্য, কখনো কবিতা। অন্যপাশে এশিয়ার সূর্যোদয়ের দেশ। যারা শৃঙ্খলা, গতি আর অবিশ্বাস্য মানসিক দৃঢ়তায় তৈরি করেছে নিজেদের এক অনন্য পরিচয়। বিশ্বকাপের নকআউট রাউন্ডে এই লড়াই শুধু জয়-পরাজয়ের নয়। এটি সৌন্দর্য বনাম সংগঠন, সৃজনশীলতা বনাম শৃঙ্খলা, সাম্বা বনাম সামুরাইয়ের আত্মিক যুদ্ধ।
ব্রাজিল নকআউট রাউন্ডে এসেছে ‘সি’ গ্রুপের শীর্ষ দল হয়ে। মরক্কোর সঙ্গে ড্র করে মিশন শুরু করলেও হাইতি ও স্কটল্যান্ডকে উড়িয়ে দিয়েছে ৩-০ গোলে। মরক্কো ও ব্রাজিল দু-দলেরই পয়েন্ট ৭ হলেও গোলগড়ে শীর্ষস্থান পায় সাম্বা ছন্দের দেশ। কোচ কার্লো আনচেলোত্তির অধীনে দলটি ধীরে ধীরে ছন্দে ফিরেছে। সামনে থেকে আক্রমণভাগে আগুন ছড়াচ্ছেন ভিনিসিয়ুস জুনিয়র। আর অভিজ্ঞতার আলো ছড়াতে প্রস্তুত নেইমার। অন্যদিকে জাপান এসেছে নীরব কিন্তু দৃঢ় আত্মবিশ্বাস নিয়ে। ‘এফ’ গ্রুপে নেদারল্যান্ডসের সঙ্গে ২-২ গোলে ড্র, তিউনিসিয়াকে ৪-০ গোলে বিধ্বস্ত করা এবং সুইডেনের সঙ্গে ১-১ গোলে ড্র করে জাপান দেখিয়েছে বড় দলকে ভয় পাওয়ার দল তারা নয়। গ্রুপে ব্লু সামুরাইরা দ্বিতীয় হলেও অপরাজিত ছিল। অর্থাৎ তিন ম্যাচের একটিতে জয় দুটিতে ড্র করেছে। দারুণ লড়িয়ে আর আত্মবিশ্বাসী দলটির বিপক্ষে জিততে হলে ব্রাজিলকে তাদের সেরা খেলাটাই খেলতে হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। জাপানের কোচ হাজিমে মোরিয়াসুও সেলেসাওদের ছেড়ে কথা বলবেন না বলে জানিয়ে দিয়েছেন। ইতিহাস অবশ্য ব্রাজিলের পক্ষেই কথা বলছে।
বিশ্বকাপের মঞ্চে ব্রাজিল এক অনন্য নাম। ৫টি বিশ্বকাপ শিরোপা, অসংখ্য স্মরণীয় রাত, আর ফুটবল রোমান্টিকদের আজীবন ভালোবাসা সবই তাদের ঝুলিতে। অন্যদিকে জাপানের ইতিহাস তুলনামূলক ছোট হলেও গত দুই দশকে তারা নিজেদের প্রমাণ করেছে বিশ্বের অন্যতম শৃঙ্খলাবদ্ধ ও ভয়ংকর আন্ডারডগ হিসেবে। এই ম্যাচের সবচেয়ে বড় লড়াই হবে মাঝমাঠে। ব্রাজিল চাইবে বলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আক্রমণের ঢেউ তুলতে। জাপান চাইবে দ্রুত স্থান পরিবর্তন আর হাই প্রেসিং দিয়ে ব্রাজিলের রক্ষণকে অস্থির করতে। বিশেষ করে ম্যাচের শুরুটা হতে পারে ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। আগে গোল পেলে ব্রাজিল ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে, আর জাপান যদি প্রথম ধাক্কা দিতে পারে তবে চাপ বাড়বে সেলেসাওদের ওপর।
ফুটবলের সৌন্দর্য এখানেই। কাগজে-কলমে ফেভারিট ব্রাজিল, কিন্তু নকআউটে এক মুহূর্তের ভুলেই বদলে যেতে পারে সব হিসাব। সাম্বার সুর কি বাজবে আরও জোরে, নাকি সামুরাইয়ের তরবারি কেটে দেবে ব্রাজিলের স্বপ্ন? হিউস্টনের রাত অপেক্ষায় এক মহারণের, এক নাটকের, এক নতুন ইতিহাসের।
ব্রাজিলের জন্য স্বস্তি আর সুখের খবর হচ্ছে, তাদের সেরা তারকা ও প্রাণভোমরা নেইমার ইনজুরি কাটিয়ে স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে মাঠে ফেরেন। ওই ম্যাচে শেষদিকে নেইমারকে পেয়ে দারুণ চনমনে দেখা যায় ব্রাজিলের ফুটবলারদের। তবে নেইমারের জাপানের বিপক্ষেও সেরা একাদশে থাকার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। অবশ্য আগের ম্যাচের তুলনায় এবার বেশি সময় খেলবেন বলেই ইঙ্গিত দিয়েছেন আনচেলত্তি।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে এখন পর্যন্ত মাত্র একবারই মুখোমুখি হয়েছে ব্রাজিল ও জাপান। সেই ম্যাচটি হয়েছিল ২০০৬ বিশ্বকাপে। সেখানে জাপানকে ৪-১ গোলে হারিয়েছিল ব্রাজিল। সেলেসাওদের হয়ে জোড়া গোল করেছিলেন রোনালদো নাজারিও। এ ছাড়া একটি করে গোল করেছিলেন জুনিনিও পারনাম্বুকানো ও গিলবার্তো সিলভা। তবে দুই দলের সবশেষ লড়াইয়ে জয়ের হাসি জাপানের। এটি আবার ব্রাজিলের বিপক্ষে জাপানিজদের একমাত্র ও প্রথম জয়। এই জয়টি আসে ২০২৫ সালের অক্টোবরে প্রীতি ম্যাচে। নিজেদের মাটিতে জাপান ওই ম্যাচে দুই গোলে পিছিয়ে পড়েও শেষ পর্যন্ত ব্রাজিলকে হারিয়েছিল ৩-২ গোলে। যা এখন পর্যন্ত দেশটির ইতিহাসের অন্যতম সেরা সাফল্য। ওই সাফল্য আজ রাতের ম্যাচে টনিক হিসেবে কাজ করবে বলে জানিয়েছেন জাপান কোচ, ‘এক সময় ব্রাজিলের কাছে জাপান ছিল সহজ প্রতিপক্ষ। কিন্তু সর্বশেষ ম্যাচে আমরা প্রমাণ করেছি, এখন আর আমরা সেই দল নই। এটা আমাদের জন্য বড় একটি অগ্রগতি। কারণ ব্রাজিল বিশ্বের অন্যতম সেরা দল। ম্যাচে কী হবে, সেটা আগে থেকে বলা যায় না। তবে আমরা জয়ের লক্ষ্য নিয়েই মাঠে নামব।’
তিনি আরও বলেন, ‘অবশ্য কোচ হিসেবে আমি আনচেলত্তিকে ভীষণ শ্রদ্ধা করি। তিনি চ্যাম্পিয়ন্স লিগে অসাধারণ সাফল্য পেয়েছেন। পাঁচটি শিরোপা জিতেছেন এবং সেগুলোও ভিন্ন ভিন্ন দলের হয়ে। তিনি একজন অসাধারণ কোচ। আমার মনে হয়, আমি কখনোই তার মতো হতে পারব না। ব্রাজিল ফুটবলের অন্যতম সেরা দেশ, আর সেই জাতীয় দলের দায়িত্ব নেওয়া মোটেও সহজ নয়। তারা যে ফলাফল দেখাচ্ছে, সেটাই তার সামর্থ্যের প্রমাণ।’
জাপানের খেলোয়াড় কেন্তো শিওগাইও ব্রাজিলকে ভয় পাচ্ছেন না, ‘ব্রাজিল আগে পরাশক্তি ছিল। কিন্তু এখন? আমার মতে এখন শুধু ফ্রান্স আর আর্জেন্টিনাই শক্তিশালী। আজকাল ব্রাজিল সম্পর্কে তেমন একটা আলোচনা শুনি না।’
নেইমারের ফেরা নিয়ে তিনি বলেন, ‘সে কি সেই আগের নেইমার আছে? তা হলে তো আমাদের চিন্তার কিছু নেই।’ জাপান অধিনায়ক কো ইতাকুরা বলেন, ‘ব্রাজিলের বিপক্ষে খেলতে নামা সব সময় বিশেষ কিছু। আমরা তাদের সম্মান করি, কিন্তু ভয় পাই না। যদি আমরা নিজেদের পরিকল্পনা ঠিকভাবে বাস্তবায়ন করতে পারি, তা হলে যে কাউকে হারানো সম্ভব।’
ব্রাজিল কোচ কার্লো আনচেলত্তি জাপানকে সমীহ করে বলেন, ‘নকআউট পর্বে কোনো সহজ ম্যাচ নেই। জাপান খুবই সংগঠিত, শৃঙ্খলাবদ্ধ এবং দ্রুত আক্রমণে ভয়ংকর। আমাদের সর্বোচ্চ মনোযোগ নিয়েই খেলতে হবে।’
আনচেলত্তি আরও বলেন, ‘ব্রাজিলের ইতিহাস বড়, কিন্তু ইতিহাস মাঠে খেলে না। আমাদের মাঠের লড়াইয়ে নিজেদের প্রমাণ করতে হবে।’
অধিনায়ক মারকুইনহোস বলেন, ‘বিশ্বকাপের নকআউট মানেই ভুলের সুযোগ নেই। আমরা জানি জাপান কতটা পরিশ্রমী দল। তাদের বিপক্ষে ধৈর্য, শৃঙ্খলা আর কার্যকারিতা খুব গুরুত্বপূর্ণ হবে।’
মুখোমুখি ব্রাজিল-জাপান
মোট ম্যাচ: ১৫
ব্রাজিল জয়: ১২
ড্র: ২
জাপান জয়: ১
ব্রাজিলের গোল: ৩৮
জাপানের গোল: ১৪
বিশ্বকাপে মুখোমুখি
মোট ম্যাচ: ১
ব্রাজিল জয়: ১
জাপান জয়: ০
ড্র: ০