বিশ্বকাপ ফুটবল মানেই তারকার মেলা। এসব আসরে সাধারণত গোলদাতারা থাকেন আলোচনার কেন্দ্রে। উইঙ্গারদের গতি কিংবা ফরোয়ার্ডদের ফিনিশিং কাড়ে সব আলো। এবারের উত্তর আমেরিকার বিশ্বকাপেও বিভিন্ন দলের ফরোয়ার্ডদের নিয়ে আলোচনা তুঙ্গে। তেমনি ফেভারিট ব্রাজিলের হয়েও আলোচনার শীর্ষে আছেন নেইমার, ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, ম্যাথুয়াস কুনহারা।
কিন্তু ব্রাজিলের ছন্দ, ভারসাম্য আর নিয়ন্ত্রণের কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে আছেন এক নীরব শিল্পী। যিনি রক্ষণ থেকে মাঝমাঠ, মাঝমাঠ থেকে আক্রমণ– সবখানে সেলোসাওদের সৃষ্টিশীল খেলার উৎস তৈরি করছেন, খেলায় আনছেন প্রাণ। তিনি হচ্ছেন অনেকটা আড়ালে থাকা নেপথ্য নায়ক সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার ব্রুনো গুইমারায়েস। ইংলিশ ক্লাব নিউক্যাসল ইউনাইটেডে খেলা আগামীর এই তারকা বিশ্বকাপে ব্রাজিলের তিনটি গ্রুপ ম্যাচেই নিজের জাত চিনিয়েছেন। বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন, ব্রাজিল এবার প্রত্যাশিত সাফল্য পেলে তার জন্য ২৮ বছর বয়সী অক্লান্ত যোদ্ধা ব্রুনোর অবদান অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
তিনি গোল করেন না নিয়মিত, নাটকীয় উদযাপনও খুব একটা দেখা যায় না। কিন্তু ম্যাচের প্রতিটি মিনিটে তার ছাপ স্পষ্ট। বল পায়ে ব্রুনো যেন এক সুরকার। কখন গতি বাড়াতে হবে, কখন খেলা ধীর করতে হবে, কখন ডিফেন্স ভেঙে সামনে পাস বাড়াতে হবে– সবকিছুর হিসাব যেন তার মস্তিষ্কে আগেই আঁকা। ব্রাজিলের গ্রুপপর্বের ম্যাচগুলোতে সবচেয়ে চোখে পড়ার মতো বিষয় ছিল তাদের মিডফিল্ডের নিয়ন্ত্রণ। প্রতিপক্ষ যতই চাপ সৃষ্টি করুক, ব্রুনো গিমারেজ ঠাণ্ডা মাথায় সেই চাপ সামলে দিয়েছেন। কখনো ছোট ছোট পাসে, কখনো লম্বা সুইচে, আবার কখনো নিখুঁত ট্যাকলে তিনি ব্রাজিলকে এনে দিয়েছেন ছন্দ ও স্থিরতা।
আক্রমণে ভিনিসিয়ুস ঝড় তুলেছেন, কুনহা জাদু দেখিয়েছেন। কিন্তু সেই আক্রমণের ভিত গড়ে দিয়েছেন ব্রুনো। তার পা থেকেই শুরু হয়েছে বহু গুরুত্বপূর্ণ মুভ। প্রতিপক্ষের দেয়াল ভেঙে ব্রাজিলকে সামনে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে তিনি অনন্য। ব্রুনোর সবচেয়ে বড় শক্তি সম্ভবত তার ভারসাম্য। তিনি যেমন ডিফেন্সে নেমে বল কাড়তে পারেন, তেমনি আক্রমণে উঠে গিয়ে তৈরি করতে পারেন গোলের সুযোগ। আধুনিক ফুটবলে এমন ‘বক্স-টু-বক্স’ মিডফিল্ডারের মূল্য আকাশচুম্বী। ব্রুনো তার উজ্জ্বল উদাহরণ।
ফুটবলে সব নায়ক আলোয় থাকেন না। কেউ কেউ আড়ালে থেকেই দলের ভিত্তি শক্ত করেন। ব্রাজিলের এবারের বিশ্বকাপ যাত্রায় ব্রুনো গিমারেজ ঠিক তেমনই এক নায়ক। নিঃশব্দ, স্থির অথচ অপরিহার্য। সাম্বার দেশের আক্রমণভাগ যতই মুগ্ধ করুক, মাঝমাঠের হৃদস্পন্দন কিন্তু একজনই–ব্রুনো। এবার ব্রাজিল যদি অনেক দূর যায়, ইতিহাস হয়তো মনে রাখবে গোলদাতাদের নাম। কিন্তু যারা খেলা গভীরভাবে দেখেছেন, তারা জানবেন এই দলের প্রাণ লুকিয়ে ছিল এক নীরব যোদ্ধার পায়ে। সবশেষ স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে শেষ গ্রুপ ম্যাচেও ব্রুনো নিজের জাত চিনিয়েছেন। ম্যাচে সবচেয়ে বেশি দূরত্ব অতিক্রম করেন তিনি। ম্যাচজুড়ে দৌড়েছেন ১২.১ কিলোমিটার। যা তার নিরলস পরিশ্রম, ফিটনেস এবং দলের প্রতি নিবেদনেরই প্রমাণ। মিডফিল্ডে আক্রমণ গড়ে তোলা, বল পুনরুদ্ধার, প্রতিপক্ষের আক্রমণ ভেঙে দেওয়া এবং সতীর্থদের জন্য জায়াগা তৈরি করা–সব ক্ষেত্রেই ব্রুনো দারুণ কার্যকর। তার এই প্রাণবন্ত উপস্থিতিই ব্রাজিলের মাঝমাঠকে ভারসাম্যপূর্ণ রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে।
বিশ্বকাপের উজ্জ্বল পারফরমেন্সের পুরস্কারও পেতে চলেছেন ব্রুনো। বিশ্বকাপ শেষে তাকে পেতে বিশ্বের বাঘা বাঘা দল যে লাইন দেবে সেটা এখনই স্পষ্ট। ইতোমধ্যে তাকে পেতে প্রথম পদক্ষেপ নিয়েছে আরেক ইংলিশ জায়ান্ট আর্সেনাল। গানার্সরা নিউক্যাসেল ইউনাইটেডের কাছে ৫৫ মিলিয়ন ইউরোর আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব পাঠালেও, সেটি কোনো দ্বিধা ছাড়াই প্রত্যাখ্যান করেছে নিউক্যাসেল। ক্লাবটির অবস্থান একেবারেই পরিষ্কার– ব্রুনো বিক্রির জন্য নন। তাই তার নামের পাশে কার্যত ‘নট ফর সেল’ বার্তাই ঝুলিয়ে দিয়েছে নিউক্যাসেল। তবে এখানেই থেমে যেতে রাজি নয় আর্সেনাল। ব্রুনোকে নিজেদের দলে আনতে তারা এখনো আশাবাদী।
তবে সবকিছু বাদ দিয়ে ব্রুনোর মনোযোগ এখন শুধুই মাঠের খেলায়। তিনি ব্রাজিলকে নিজের সেরাটা দিয়ে সাহায্য করতে চান। এ প্রসঙ্গে ব্রুনো বলেন, ‘মিডফিল্ডাররা যদি ভালো খেলে, তা হলে পুরো দলই ভালো খেলবে। আমাদের কাজ হলো সব সময় ভিনি, কুনহা, রায়ান, রাফিনিয়া, নেইমার যেই খেলুক না কেন; তাদের জন্য খেলাটা যতটা সম্ভব সহজ করে দেওয়া।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা হয়তো গোল করব না। কিন্তু এমন পরিবেশ তৈরি করতে চাই, যেখানে আমাদের ফরোয়ার্ডরা নিজেদের সেরাটা দিতে পারে। কারণ তারা ভালো খেললে, ব্রাজিলও ভালো খেলবে।’