লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর নতুন প্রযুক্তির ড্রোন এখন ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর জন্য সবচেয়ে বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের একটি কৌশল কাজে লাগিয়ে হিজবুল্লাহ এমন কিছু সস্তা ও নিখুঁত ড্রোন ব্যবহার করছে, যা ইসরায়েলের অত্যাধুনিক প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকেও ফাঁকি দিচ্ছে। ফাইবার-অপটিক প্রযুক্তির এই ড্রোনগুলো শনাক্ত করা প্রায় অসম্ভব হওয়ায় একের পর এক ইসরায়েলি সামরিক ঘাঁটিতে আঘাত হানছে। মারা যাচ্ছেন সেনারা। এই নতুন প্রযুক্তিগত হুমকি রুখতে মরিয়া হয়ে চেষ্টা চালাচ্ছে ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী ও বড় বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দক্ষিণ লেবানন ও উত্তর ইসরায়েলের আকাশে এখন একধরনের ছোট ছোট ড্রোন উড়তে দেখা যায়। এগুলো কোনো রাডারে ধরা পড়ে না। ড্রোনগুলোর ক্যামেরায় দেখা গেছে, এগুলো উড়ে এসে খুব নিখুঁতভাবে ইসরায়েলের মারকাভা ট্যাংকের দুর্বল জায়গায়, আয়রন ডোম প্রতিরক্ষাব্যবস্থায় কিংবা অসতর্ক সেনাদের ওপর গিয়ে আছড়ে পড়ছে।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে হিজবুল্লাহর এই বিশেষ এফপিভি (ফার্স্ট-পারসন ভিউ) ড্রোনগুলো ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রধান অস্ত্র হয়ে উঠেছে। গত মার্চ মাসে সংঘাত নতুন করে শুরু হওয়ার পর থেকে হিজবুল্লাহর ড্রোনে অন্তত ১২ জন ইসরায়েলি সেনা নিহত হয়েছে, যা লেবাননে মোট ইসরায়েলি সেনা নিহতের এক-তৃতীয়াংশ।
এই ড্রোনগুলো আকারে একটা ডিনারের প্লেটের চেয়ে বড় নয়। কিন্তু এর কার্যকারিতা মারাত্মক। এগুলো চালকের সঙ্গে কোনো রেডিও তরঙ্গের মাধ্যমে যুক্ত থাকে না, বরং ড্রোনের পেছনে থাকা একটি রিল থেকে মাইলের পর মাইল লম্বা চিকন ফাইবার-অপটিক তারের মাধ্যমে যুক্ত থাকে। ড্রোনগুলো কোনো রেডিও সিগনাল ছড়ায় না। এ কারণে এগুলো শনাক্ত করা যেমন কঠিন, তেমনি ইলেকট্রনিক যুদ্ধপদ্ধতি ব্যবহার করে জ্যাম করাও অসম্ভব।
বিপদ সামলাতে ইসরায়েল প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) এখন যুদ্ধক্ষেত্রে লাখ লাখ বর্গমিটারের বিশেষ জাল ব্যবহার করছে, যেন ড্রোনগুলো লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করার আগেই জালে আটকে যায়। পাশাপাশি সেনাদের শটগান ও বিশেষ ধরনের গুলি দেওয়া হয়েছে, যেন খুব কাছ থেকে ড্রোনগুলোকে গুলি করে নামানো যায়। কিন্তু সমস্যা হলো, ড্রোনগুলো ধেয়ে আসার খবর সেনারা আগে থেকে জানতে পারছেন না।
আইডিএফ এই ড্রোন শনাক্ত করার কোনো প্রযুক্তি বানাতে পেরেছে কি না, তা এখনো জানায়নি। তবে তারা দেশের নামকরা প্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষা কোম্পানিগুলোর কাছে সাহায্য চেয়েছে। গত মাসে এ নিয়ে সামরিক কর্মকর্তা ও প্রযুক্তিবিদদের একটি জরুরি বৈঠকও হয়েছে। সেখানে এমন কিছু সেন্সর ও সফটওয়্যার নিয়ে আলোচনা হয়েছে, যা রেডিও তরঙ্গ ছাড়াই ড্রোন শনাক্ত করতে পারবে এবং আঘাত হানার আগেই সেগুলোকে ধ্বংস করতে পারবে।
এই বৈঠকে ছিল ‘এয়ারওয়েজ’ নামের একটি ড্রোন সফটওয়্যার কোম্পানি। কোম্পানির সহ-প্রতিষ্ঠাতা শাই কুরিয়ানস্কি জানান, তাদের তৈরি একটি বিশেষ সফটওয়্যার কম উচ্চতায় উড়তে থাকা ড্রোন শনাক্ত করতে পারে। এই প্রযুক্তিটি কিছুদিন আগে যুক্তরাষ্ট্রের মিয়ামি পুলিশ ফুটবল বিশ্বকাপের স্টেডিয়াম সুরক্ষায় ব্যবহার করেছিল। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই অদৃশ্য ড্রোনগুলো ধরতে হলে একসঙ্গে আলো, শব্দ, রাডার ও লেজার প্রযুক্তির একাধিক সেন্সর ব্যবহার করতে হবে।
শাই কুরিয়ানস্কি বলেন, ‘এখন সেনারা ড্রোন আসার খবর পায় মাত্র ৩-৪ সেকেন্ড আগে। কিন্তু আমরা যদি তাদের ২০ বা ৩০ সেকেন্ড আগেও সতর্ক করতে পারি, তবে ক্ষয়ক্ষতির চিত্রটা পুরো বদলে যাবে।’ তিনি আরও জানান, ইসরায়েলের প্রযুক্তি খাত এখন অনেক চাপের মুখে আছে, কারণ লেবাননে থাকা তাদের তরুণ সেনারা এই বিস্ফোরক ড্রোনের মুখে পুরোপুরি অরক্ষিত অবস্থায় আছে।
তবে এই সংকটের মাঝে অনেক ইসরায়েলি নাগরিকদের মনে ক্ষোভও জমছে। কারণ দুই বছর আগেই ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে এই ফাইবার-অপটিক ড্রোন প্রথম দেখা গিয়েছিল। ইউক্রেনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তারা ইসরায়েলকে এই সস্তা ড্রোনের বিপদ সম্পর্কে আগেই সতর্ক করেছিলেন। প্রতিটির দাম মাত্র ৩০০ থেকে ৪০০ ডলারের এই ড্রোনগুলো যে এক দিন তাদের শত্রুদের হাতে পৌঁছাবে, সেই ইঙ্গিত দিয়ে তারা ইসরায়েলকে সাহায্য করতে চেয়েছিলেন।
ইসরায়েলে নিযুক্ত ইউক্রেনের রাষ্ট্রদূত ইয়েভগেন কর্নিচুক গত মে মাসে ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম ‘ওয়াইনেট’-কে বলেন, ‘আমরা এই বিষয়ে ইসরায়েলি নেতাদের তেমন কোনো আগ্রহ দেখিনি। এর পেছনের কারণ নিয়ে আমি মন্তব্য করতে চাই না। তবে ইসরায়েল যে তাদের সেনাদের জীবন বাঁচানোর একটা বড় সুযোগ হাতছাড়া করেছে, তা এখন স্পষ্ট।’
সূত্র: সিএনএন