বিশ্বকাপে ইতিহাস দীর্ঘ হয়নি দক্ষিণ আফ্রিকার। প্রথমবার নকআউটে উঠে রাউন্ড-৩২-এ বিদায়ঘণ্টা বেজেছে বাফানা বাফানাদের। সহ-আয়োজক কানাডার কাছে হেরে তারা এখন বাড়ির বিমান ধরার অপেক্ষায়। বিদায় নিলেও মাথা উঁচু আফ্রিকানদের। কেননা প্রথমবার নকআউটে উঠেই ইতিহাস গড়েছে তারা। বিদায়ের আগমুহূর্তে সেটাই মনে করিয়ে দিলেন আফ্রিকার কোচ হুগো ব্রুস, যিনি নিজেও থামছেন স্মরণীয় এক অধ্যায়ের মধ্য দিয়ে।
হলিউডের শহর লস অ্যাঞ্জেলেস নাটকীয় এক বিদায়ের সাক্ষী হয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকা। ম্যাচের ইনজুরি টাইমের একেবারে অন্তিম মুহূর্তে গোল হজম করে তারা। সেই এক গোলই বিদায় করে দিয়েছে ব্রুস ও তার দলকে। যদিও এ নিয়ে বিন্দুমাত্র আক্ষেপ নেই কোচের, ‘ম্যাচটি কঠিন হবে, তা আমরা আগেই জানতাম। প্রতিপক্ষের শক্তি ও গতির বিষয়টি বিশ্লেষণ করেছিলাম। আমরা তাদের মোকাবিলার পরিকল্পনা করেছিলাম, কিন্তু সব সময় তা কার্যকর করতে পারিনি।’
৭৪ বছর ৭৯ দিন বয়সী ব্রুস এই ম্যাচের মাধ্যমে ফিফা বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে দায়িত্ব পালন করা সবচেয়ে বয়স্ক কোচের রেকর্ড গড়েছেন। নিজের ঐতিহাসিক রাতে দুঃখ নয়, স্বপ্নের কথাই বলেছেন তিনি, ‘ম্যাচের বিভিন্ন সময়ে আমরা তাদের গতির সঙ্গে তাল মেলাতে পারিনি। ওয়ান-অন-ওয়ান পরিস্থিতিতেও বেশির ভাগ সময় পিছিয়ে ছিলাম। ভবিষ্যতে দক্ষিণ আফ্রিকার ফুটবলে শক্তি ও গতির উন্নয়নে কাজ করতে হবে।’
প্রিয় শিষ্যদের মানসিকতার ভূয়সী প্রশংসা করতে ভুল করেননি এই অভিজ্ঞ কোচ। একই সঙ্গে বলেছেন গর্বের কথা, ‘খেলোয়াড়দের মানসিকতা নিয়ে আমার কোনো অভিযোগ নেই। টুর্নামেন্টের দিকে ফিরে তাকালে আমাদের গর্বিত হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। দ্বিতীয় রাউন্ডে ওঠার কথা টুর্নামেন্ট শুরুর আগে খুব কম মানুষই ভাবতে পেরেছিল।’ বিশ্বকাপে মেক্সিকোর কাছে ২-০ গোলের হারে যাত্রা শুরু হয়েছিল বাফানা বাফানাদের। পরে চেকের সঙ্গে ১-১ গোলে ড্র এবং দক্ষিণ কোরিয়াকে ১-০ ব্যবধানে হারিয়ে প্রথমবারের মতো নকআউটে উঠে ‘এ’ গ্রুপের রানার্সআপ হয়ে।
যাই হোক, গর্বিত ব্রুস তার হতাশাও লুকিয়ে রাখেননি। তিনি বলেন, ‘এই মুহূর্তে হতাশাই সবচেয়ে বেশি কাজ করছে। কারণ আমরা জিততে চেয়েছিলাম। ড্রেসিংরুম এখন একেবারে নীরব। তবে বাস্তবতা হলো, ১৬ বছর পর বিশ্বকাপে ফিরে আমরা দারুণ খেলেছি এবং দ্বিতীয় রাউন্ডে উঠেছি। এই অর্জন ভবিষ্যতের জন্য আমাদের আত্মবিশ্বাস জোগাবে।’ এই পরাজয়ের মধ্য দিয়ে নিজের বিশ্বকাপ অধ্যায়ের ইতি টানলেন ব্রুস। ১৯৮৬ বিশ্বকাপে বেলজিয়ামের জার্সিতে মাঠ কাঁপানো ব্রুস জানিয়েছেন, এটাই তার শেষ বিশ্বকাপ। তবে দক্ষিণ আফ্রিকার কোচের পদ থেকে তিনি এখনই অবসর নিচ্ছেন কি না, তা স্পষ্ট করেননি।
দীর্ঘদিন ধরেই ব্রুস বেলজিয়ামে থাকা তার পরিবারের কাছে ফিরে যাওয়ার ইচ্ছার কথা প্রকাশ করে আসছিলেন, ‘হতাশা বা মন খারাপের মুহূর্তে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ নয়। আগামী দিনগুলোতে আমি ভেবে দেখব ভবিষ্যতে কী করব। তবে এটুকু নিশ্চিত, এটাই আমার শেষ বিশ্বকাপ।’
২০২১ সালে দায়িত্ব নেওয়ার পর, ২০১০ সালের পর বিশ্বকাপে জায়গা করে নিতে না পারা দক্ষিণ আফ্রিকাকে নতুন করে গড়ে তোলেন ব্রুস। তার অধীনে দলটি একটি সুশৃঙ্খল ও লড়াকু শক্তিতে পরিণত হয়, যা তাদের দীর্ঘ সময় পর বিশ্বমঞ্চে ফিরিয়ে এনে সেরা ৩২-এ জায়গা করে দেয়। ঘরোয়া লিগের খেলোয়াড়দের ওপর ভিত্তি করেই মূলত তিনি তার এই দল গঠন করেছিলেন। এর আগে ১৯৯৮, ২০০২ এবং ২০১০ সালে আয়োজক দেশ হিসেবে খেলেও গ্রুপপর্ব পার হতে পারেনি দক্ষিণ আফ্রিকা।
১৯৫২ এপ্রিলে হুম্বেকে জন্মগ্রহণ করা হুগো ব্রুস আন্ডারলেখটের সেন্ট্রাল ডিফেন্ডার হিসেবে ফুটবল অঙ্গনে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। সেখানে তিনি বেশ কয়েকটি ঘরোয়া ও ইউরোপীয় ট্রফি জেতেন। পরবর্তী সময়ে ক্লাব ব্রুগেতে গিয়ে তার খেলোয়াড়ি জীবনের ইতি টানেন। বেলজিয়াম জাতীয় দলের হয়ে তিনি ২৪টি ম্যাচ খেলেছেন। খেলোয়াড়ি জীবন শেষে কোচ হিসেবেও তিনি এক দীর্ঘ ও সফল ক্যারিয়ার গড়ে তোলেন। ক্লাব ব্রুগে এবং আন্ডারলেখটসহ বেশ কয়েকটি দলের হয়ে তিনি লিগ শিরোপা ও কাপ জিতেছেন। পাশাপাশি চারবার ‘বেলজিয়ান কোচ অব দ্য ইয়ার’ নির্বাচিত হন। এ ছাড়া ২০১৭ সালে ক্যামেরুনকে ‘আফ্রিকা কাপ অব নেশনস’ জেতানোর গৌরব অর্জন করেন এই অভিজ্ঞ কোচ।