পরপর দুবার বাঁচার পর তৃতীয়বারে শেষ রক্ষা হয়নি জাপানের। গ্যাব্রিয়েল মাগালাইয়েসের ক্রসে কাসেমিরোর দারুণ এক হেডে সমতায় ফিরেছে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা।
পরপর দুবার বাঁচার পর তৃতীয়বারে শেষ রক্ষা হয়নি জাপানের। গ্যাব্রিয়েল মাগালাইয়েসের ক্রসে কাসেমিরোর দারুণ এক হেডে সমতায় ফিরেছে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা।
ফিফা বিশ্বকাপের নকআউট পর্ব শুরু হয়েছে রোমাঞ্চকর এক ম্যাচ দিয়ে। যোগ করা সময়ের নাটকীয় জয়সূচক গোলে দক্ষিণ আফ্রিকাকে ১-০ ব্যবধানে হারিয়ে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে জয় তুলে নিয়ে শেষ ষোলো নিশ্চিত করেছে কানাডা। ম্যাচজুড়েই দুই দল লড়াই করলেও নির্ধারিত ৯০ মিনিটে গোলের দেখা মেলেনি। শেষ পর্যন্ত ম্যাচের ৯২তম মিনিটে আসে কাঙ্ক্ষিত মুহূর্ত। দক্ষিণ আফ্রিকার রক্ষণভাগের ক্লিয়ার করা বল বক্সের ঠিক বাইরে পেয়ে কোনো ভুল করেননি স্টিফেন ইউস্তাকিও। দুর্দান্ত এক বজ্রভলিতে বল পাঠিয়ে দেন জালের নিচের কোণায়। তার সেই গোলেই উল্লাসে ফেটে পড়ে কানাডা।
এই জয়ে ইতিহাসও গড়েছে কানাডা। বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে এটিই তাদের প্রথম জয়, আর সেই জয় এসেছে ইনজুরি টাইমের জয়সূচক গোলে। শেষ ষোলোয় কানাডার প্রতিপক্ষ হবে নেদারল্যান্ডস অথবা মরক্কো। দুই দলের মধ্যকার রাউন্ড অব ৩২-এর ম্যাচের বিজয়ীর মুখোমুখি হবে উত্তর আমেরিকার প্রতিনিধিরা।
দক্ষিণ আফ্রিকা ০-১ কানাডা
ফিফা বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে নিজেদের ইতিহাসের প্রথম ম্যাচে জয়ের স্বাদ পেল কানাডা।
২০১৪ বিশ্বকাপের শেষ ষোলোতে গ্রিসকে টাইব্রেকারে হারানো কোস্টারিকার ১২ বছর পর প্রথম কনকাকাফ দল হিসেবে বিশ্বকাপের নকআউট পর্ব অতিক্রম করল কানাডা।
স্টিফেন ইউস্তাকিওর গোলটি ফিফা বিশ্বকাপে কোনো কনকাকাফ দলের হয়ে সর্বশেষ সময়ে (স্টপেজ টাইমে) করা জয়সূচক গোল। এর আগে বিশ্বকাপে কনকাকাফ দলের হয়ে স্টপেজ টাইমে একমাত্র জয়সূচক গোলটি করেছিলেন ল্যান্ডন ডোনোভান, ২০১০ সালের গ্রুপপর্বে আলজেরিয়ার বিপক্ষে (৯০+১ মিনিটে)।
বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে ২০১৮ সালের পর প্রথম ইনজুরি টাইমের জয়সূচক গোলটি করলেন ইউস্তাকিও। এর আগে ২০১৮ সালে জাপানের বিপক্ষে বেলজিয়ামের হয়ে এমন গোল করেছিলেন নাসের শাদলি।
ইউস্তাকিও বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে গোল করা তৃতীয় সক্রিয় এমএলএস খেলোয়াড়। তার আগে এই কীর্তি গড়েছিলেন ল্যান্ডন ডোনোভান (২টি গোল) ও ব্রায়ান ম্যাকব্রাইড।
এই বিশ্বকাপে কানাডা করেছে ৯ গোল। এক আসরে কোনো কনকাকাফ পুরুষ দলের সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড এটি।
বিশ্বকাপ ইতিহাসে নিজেদের প্রথম নকআউট ম্যাচে জয় পাওয়ার পথে দ্বিতীয়ার্ধের যোগ করা সময়ে জয়সূচক গোল করা প্রথম দল কানাডা।
ম্যাচের ছয় মিনিটেই প্রথম শট অন টার্গেট নিয়েছিল দক্ষিণ আফ্রিকা। এর পর পুরো ম্যাচে তারা আর একটি শটও লক্ষ্যে রাখতে পারেনি।
এই ম্যাচে সেট-পিস থেকে পাঁচটি গোলের সুযোগ তৈরি করেছেন ইউস্তাকিও। ১৯৬৬ সালের পর থেকে বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে কোনো খেলোয়াড়ের যৌথভাবে সর্বোচ্চ সেট-পিস সুযোগ তৈরির রেকর্ড এটি। ২০০৬ সালের সেমিফাইনালে জার্মানির বিপক্ষে আন্দ্রেয়া পিরলোও পাঁচটি সুযোগ তৈরি করেছিলেন।
কানাডার বিপক্ষে দক্ষিণ আফ্রিকার এক্সপেক্টেড গোল (এক্সজি) ছিল মাত্র ০.১৩। বিশ্বকাপে এটি তাদের দ্বিতীয় সর্বনিম্ন এক্সজি। এর আগে প্রথম ম্যাচে মেক্সিকোর বিপক্ষে তাদের এক্সজি ছিল ০.০৭।
দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে আরও সাতটি শট অন টার্গেট যোগ করে ২০২৬ বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি শট অন টার্গেটের মালিক এখন কানাডা (২৮টি)। ১৯৬৬ সালের পর থেকে বিশ্বকাপের এক আসরে কোনো কনকাকাফ দলের যৌথভাবে সর্বোচ্চ শট অন টার্গেটের রেকর্ডও এটি। ১৯৮৬ সালে মেক্সিকোও ২৮টি শট অন টার্গেট করেছিল।
বিশ্বকাপে বিরতিতে সমতায় থাকা কোনো ম্যাচে দক্ষিণ আফ্রিকা কখনো হারেনি (১ জয়, ২ ড্র, ০ হার)। অন্যদিকে, বিরতিতে সমতায় থাকা অবস্থায় বিশ্বকাপে এটিই কানাডার প্রথম জয়। এর আগে এমন তিনটি ম্যাচের সবগুলোতেই তারা হেরেছিল।
২০ বছর ২৮২ দিন বয়সে এমবেকেজেলি এমবোকাজি বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে একাদশে নামা সবচেয়ে কম বয়সী আফ্রিকান ফুটবলার হলেন, ২০১৪ সালে ফ্রান্সের বিপক্ষে নাইজেরিয়ার কেনেথ ওমেরুওয়ের (২০ বছর ২৫৬ দিন) পর। (তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচ বাদে)
৩৪ বছর ১৫৮ দিন বয়সে রনওয়েন উইলিয়ামস বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে একাদশে নামা দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বয়সী আফ্রিকান ফুটবলার। তার ওপরে আছেন ১৯৯৮ সালে ডেনমার্কের বিপক্ষে নাইজেরিয়ার পিটার রুফাই (৩৪ বছর ৩০৮ দিন)।
ফিফা র্যাঙ্কিংয়ের ৩২ নম্বর কানাডা ও ৫৪ নম্বর দক্ষিণ আফ্রিকার এই ম্যাচটি বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে এমন মাত্র তৃতীয় ম্যাচ, যেখানে দুই দলই ফিফা র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষ ৩০-এর বাইরে ছিল। এর আগে ২০০৬ সালে (৩৫) সুইজারল্যান্ড বনাম (৪৫) ইউক্রেন এবং ২০১০ সালে (৩১) প্যারাগুয়ে বনাম (৪৫) জাপান মুখোমুখি হয়েছিল। দুটি ম্যাচই ০-০ ড্রয়ের পর টাইব্রেকারে গড়িয়েছিল।
গড় বয়স ২৬ বছর ১৮৬ দিন নিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার শুরুর একাদশ ছিল বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে কোনো আফ্রিকান দলের সবচেয়ে কম বয়সী একাদশ, ২০১৪ সালে জার্মানির বিপক্ষে আলজেরিয়ার (২৬ বছর ৭২ দিন) পর।
৭৪ বছর বয়সে দক্ষিণ আফ্রিকার প্রধান কোচ হুগো ব্রুস বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে কোনো দলের দায়িত্ব নেওয়া সবচেয়ে বেশি বয়সী কোচ হয়েছেন।
এটি যেন কোনো সিনেমার শেষ দৃশ্য। জায়গাটাও যেন ঠিক তেমনই– হলিউডের শহর লস অ্যাঞ্জেলেস, গ্যালারিভর্তি দর্শক আর মঞ্চে ফিফা বিশ্বকাপ। নির্ধারিত সময় পেরিয়ে ম্যাচ তখন যোগ করা সময়ে। স্কোরবোর্ডে এখনো ০-০। এমন সময় দক্ষিণ আফ্রিকার রক্ষণভাগের ক্লিয়ার করা বল গিয়ে পড়ে বক্সের ঠিক বাইরে। সেখানে অপেক্ষায় ছিলেন স্টিফেন ইউস্তাকিও। এক মুহূর্তও দেরি করেননি কানাডিয়ান মিডফিল্ডার। ডান পায়ের দুর্দান্ত এক ভলিতে বল পাঠিয়ে দেন জালের নিচের কোণায়। গোলরক্ষক রনওয়েন উইলিয়ামসের ডাইভও থামাতে পারেনি সেই শট।
৯২ মিনিটের ওই গোলেই বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো নকআউট পর্বে জয় তুলে নেয় কানাডা এবং নিশ্চিত করে শেষ ষোলো। আর বিশ্বকাপের প্রথম নকআউট ম্যাচেই ইউস্তাকিও হয়ে উঠেছেন কানাডার নতুন নায়ক।
ফুটবল ছিল রক্তেই
অন্টারিওর লিমিংটনে পর্তুগিজ বাবা-মায়ের ঘরে জন্ম ইউস্তাকিওর। ফুটবল যেন জন্মগতভাবেই তার জীবনের অংশ ছিল। মাত্র চার বছর বয়সে প্রথম বল পায়ে তোলেন তিনি। এর পর ক্যারিয়াজুড়ে কখনো কানাডা, কখনো আবার বাবা-মায়ের দেশ পর্তুগাল, এই দুই দেশের মাঝেই এগিয়েছে তার ফুটবলযাত্রা। তার প্রথম ক্লাব ছিল লিমিংটন মাইনর সকার। পরে পরিবার নিয়ে পর্তুগালে চলে যান। সেখানে বড় ভাই মাউরোর সঙ্গে ক্লাব ফুটবলে পথচলা শুরু হয়। ২০১৭ সালে পর্তুগালের দ্বিতীয় বিভাগের ক্লাব লেইশোয়েসে যোগ দেন। এক বছর পর পাড়ি জমান জিডি শাভেসে।
২০১৯ সালে নতুন চ্যালেঞ্জ নিতে যোগ দেন মেক্সিকোর লিগা এমএক্সের ক্লাব ক্রুস আজুলে। পরে ধারে খেলতে যান পর্তুগিজ ক্লাব পাকোস দে ফেরেইরায়। ২০২০ সালের জানুয়ারিতে অভিষেকের পর একই বছরের আগস্টে ইউরোপীয় প্রতিযোগিতায় প্রথম ম্যাচ খেলেন। উয়েফা ইউরোপা কনফারেন্স লিগে লার্নের বিপক্ষে ৪-০ গোলের জয়ে দলের তৃতীয় গোলটিও করেন তিনি। ২০২২ সালের জানুয়ারিতে ধারে যোগ দেন পর্তুগালের ঐতিহ্যবাহী ক্লাব পোর্তোতে। কয়েক মাস পরই স্থায়ীভাবে তাকে দলে ভেড়ায় ক্লাবটি।
সবশেষ ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে চার মাসের ধারে যুক্তরাষ্ট্রের এমএলএস ক্লাব লস অ্যাঞ্জেলেস এফসিতে যোগ দেন ইউস্তাকিও। চুক্তিতে স্থায়ীভাবে দলে নেওয়ার সুযোগও রাখা হয়েছে।
মাঠের বাইরের লড়াই ছিল আরও কঠিন
২০২৩ সালের এপ্রিলে পোর্তোর হয়ে সান্তা ক্লারার বিপক্ষে ম্যাচ চলাকালে মস্তিষ্কের ক্যানসারে মারা যান ইউস্তাকিওর মা এসমেরালদা। সেই শোক কাটিয়ে ওঠার আগেই এক বছর পর হঠাৎ হৃদ্রোগে মারা যান তার বাবা। এই দুই মর্মান্তিক ঘটনার মাঝেই ইউস্তাকিও ও তার বান্ধবী কনস্তান্তার ঘর আলো করে জন্ম নেয় তাদের কন্যাসন্তান বেনেদিতা। জীবনে আনন্দের সময় হারানোর বেদনাও মনে পড়ে যায় ইউস্তাকিওর। তাই তো দক্ষিণ আফ্রিকা ম্যাচের পর আবেগ ধরে রাখতে পারেননি তিনি। ভেজা চোখে বলেন, ‘আমি যা কিছু করি, সবই আমার পরিবারের জন্য, আমার বাবা-মায়ের জন্য, আমার বান্ধবীর জন্য, আমার মেয়ের জন্য, আমার ভাইয়ের জন্য, আমার নিজের শহরের বন্ধুদের জন্য– সবার জন্য।’
২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে স্পোর্টসনেট কানাডাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বড় ভাই ও ইন্টার টরন্টো এফসির প্রধান কোচ মাউরো ইউস্তাকিও জানান, বাবা-মায়ের মৃত্যু তাদের ভেঙে দিলেও তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন শোককে শক্তিতে পরিণত করবেন, ‘আমাদের বাবা-মা... তারা আমাদের ডানা দিয়েছেন। এখন উড়ে যাওয়ার দায়িত্ব আমাদের। আমরা কৃতজ্ঞ যে আমরা দুজনই এমন একটি কাজ করতে পারছি, যেটাকে আমরা হৃদয় দিয়ে ভালোবাসি।’
মাউরোর ভাষ্য, লিমিংটনের পর্তুগিজ সম্প্রদায়ের মধ্যেই তাদের বেড়ে ওঠা। সেখানেই পরিবারগুলো একত্র হতো, আর শিশুদের সবচেয়ে প্রিয় খেলা ছিল ফুটবল।
দুই দেশের জার্সি, শেষ পর্যন্ত কানাডাই ঠিকানা
যুব পর্যায়ে প্রথমে কানাডার হয়েই আন্তর্জাতিক ফুটবল শুরু করেন ইউস্তাকিও। ২০১২ সালের এজিএস কাপে খেলেন তিনি। পরে ২০১৯ সালের উয়েফা অনূর্ধ্ব-২১ ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপের বাছাইপর্বে পর্তুগালের অনূর্ধ্ব-২১ দলের প্রতিনিধিত্বও করেন। তবে ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন– সিনিয়র পর্যায়ে খেলবেন কানাডার হয়ে। একই বছরের অক্টোবরে কনকাকাফ নেশনস লিগে প্রথমবার জাতীয় দলে ডাক পান। এর পর ২০২১ সালের গোল্ডকাপে করেন প্রথম আন্তর্জাতিক গোল। খেলেছেন ২০২২ কাতার বিশ্বকাপ, ২০২৩ কনকাকাফ নেশনস লিগের ফাইনাল এবং পোর্তোর হয়ে ২০২৫ ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপেও।
দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ম্যাচে আলফোনসো ডেভিস ইনজুরিতে মাঠের বাইরে থাকায় ভারপ্রাপ্ত অধিনায়কের দায়িত্বও পালন করেন ইউস্তাকিও। ম্যাচ শেষে তিনি বলেন, ‘এই জয় পেতে আমরা অনেক পরিশ্রম করেছি। আমরা সত্যিই এই জয়টা কানাডার সব মানুষের জন্য উৎসর্গ করতে চেয়েছিলাম। আমরা বিশ্বাস ধরে রেখেছিলাম এবং লড়াই চালিয়ে গেছি। অন্য কোনোভাবে এই ম্যাচ শেষ হবে, আমরা তা কল্পনাই করিনি।’ নিজের স্মরণীয় গোলটি নিয়ে ইউস্তাকিওর অনুভূতি ছিল আরও আবেগঘন, ‘এটি ছিল অসাধারণ একটি গোল। কিন্তু যখন আমি শট নিয়েছিলাম, আমার মনে হয়েছে সবাই আমার সঙ্গে শট নিয়েছে। সবাই যেন একটু করে শক্তি দিয়েছে, আর বলটা জালের পেছনে গিয়ে ঢুকেছে।’
কিছু হার আছে, যেগুলো শুধু স্কোরলাইনে ধরা পড়ে না। কিছু জয়ও আছে, যা আসে দীর্ঘ অপেক্ষার পর হঠাৎ নেমে আসা বৃষ্টির মতো। হিউস্টনের রাতে ঠিক তেমনই এক গল্প লিখল ব্রাজিল। যে গল্পের অন্য পাশে রয়ে গেল জাপানের নীরব দীর্ঘশ্বাস।
বিশ্বকাপের রুদ্ধশ্বাস আর স্নায়ুক্ষীয় এক ম্যাচে গ্যাব্রিয়েল মার্তিনেল্লির শেষ মুহূর্তের জাদুতে ২-১ গোলে জাপানকে কাঁদিয়ে বিশ্বকাপের শেষ ষোলো নিশ্চিত করেছে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। আর টানা দুই বিশ্বকাপে শেষ ষোলো খেলা জাপানের যাত্রা থামল এবার শেষ ৩২ এই।
শক্তি আর সামর্থ্যের হিসাবে ব্রাজিল এগিয়ে ছিল শুরু থেকেই। কিন্তু সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স আর আত্মবিশ্বাসে অনেকে জাপানকেই দেখছিলেন চমকের দাবিদার হিসেবে। মাঠে সেই বিশ্বাসের প্রতিফলনও দেখা গেছে। তবে শেষ দৃশ্যটা লিখেছে সাম্বার দেশ।
শুরু থেকেই বলের নিয়ন্ত্রণ ছিল ব্রাজিলের পায়ে। প্রায় ৮২ শতাংশ সময় বল নিজেদের কাছে রেখে জাপানের অর্ধে চাপ তৈরি করে সেলেসাওরা। কিন্তু জাপানের রক্ষণ যেন ইস্পাতের দেয়াল। সুযোগ তৈরি করেও গোলের দেখা পাচ্ছিল না ব্রাজিল।
১৪ মিনিটে বাঁ পায়ে দূরপাল্লার শক্তিশালী শট নিয়েছিলেন মাতেউস কুনিয়া। জাপানের গোলরক্ষক জিওন সুজুকি অসাধারণ দক্ষতায় তা কর্নারে পাঠিয়ে দেন। কিছুক্ষণ পর ব্রুনো গিমারাইসের বিপজ্জনক বলও কাজে লাগাতে পারেনি ব্রাজিল।
জাপান অপেক্ষা করছিল সঠিক মুহূর্তের। আর সেই মুহূর্ত এল ২৯ মিনিটে। ব্রাজিলের ভুল থেকে বল পেয়ে যেন নিজের ছোট্ট এক শিল্পকর্ম এঁকে ফেললেন কাইশু সানো। মাঝমাঠ থেকে এগিয়ে এসে একের পর এক ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে বক্সের বাইরে থেকে নিলেন অসাধারণ এক কোনাকুনি শট। আলিসনের ডানা মেলাও বৃথা গেল। বল জালে, আর হিউস্টনের তখন ব্লু সামুরাইদের উল্লাস।
জাপানের জার্সিতে এটি ছিল সানোর প্রথম আন্তর্জাতিক গোল। কী দুর্দান্ত এক মঞ্চেই না এল সেই মুহূর্ত! ব্রাজিল হতভম্ব, আর ব্লু সামুরাইরা তখন স্বপ্ন দেখছে আরেকটি বড় রাতের।
বিরতির পর বদলে যায় ব্রাজিল। লুকাস পাকেতার জায়গায় মাঠে নামেন এন্দ্রিক। আক্রমণের গতি বাড়ে। ৫২ মিনিটে ব্রুনো গিমারাইসের হেড অবিশ্বাস্যভাবে ঠেকান সুজুকি। পরের মিনিটেই আরেকবার গোললাইন থেকে বল সরিয়ে জাপানকে বাঁচান ডিফেন্ডাররা।
কিন্তু ঢেউ কতক্ষণ আটকে রাখা যায়? ৫৬ মিনিটে অবশেষে আসে প্রতীক্ষার গোল। গ্যাব্রিয়েল মাগালাইয়েসের ক্রসে কাসেমিরোর শক্তিশালী হেড; ১-১। সমতায় ফিরেই যেন নতুন প্রাণ ফিরে পায় ব্রাজিল।
এরপর একের পর এক আক্রমণে জাপানকে পেছনে ঠেলে দেয় সেলেসাওরা। ভিনিসিয়ুসের দারুণ প্রচেষ্টা ঠেকিয়ে দিয়ে কিছুক্ষণ আশার আলো জ্বালিয়ে রাখেন সুজুকি। তবে নাটকের শেষ দৃশ্য তখনও বাকি। দ্বিতীয় পরিবর্তনে মাতেউস কুনিয়ার বদলে মাঠে নামেন গ্যাব্রিয়েল মার্তিনেল্লি। আর শেষ মুহূর্তে তিনি হয়ে ওঠেন ব্রাজিলের নায়ক। যোগ করা সময়ের এক গোছানো আক্রমণ থেকে তার নেওয়া কোনাকুনি শট পোস্ট ছুঁয়ে জালে জড়িয়ে যায়। তারপর? হিউস্টনের গ্যালারিতে হলুদ ঝড়।
আর শেষ বাঁশি বাজতেই হিউস্টনের রাত রঙিন হয়ে উঠে সাম্বার উল্লাসে। ব্রাজিল এগিয়ে গেল শেষ ষোলোয়, হেক্সা স্বপ্নের দিকে। আর জাপান? তারা বিদায় নিল চোখে অপূর্ণতার বিষাদ নিয়ে। তবু ব্লু সামুরাইদের লড়াই মনে করিয়ে দিল, সব গল্প ট্রফি জিতে শেষ হয় না, কিছু গল্প সম্মান আর হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়ার মধ্যেও বেঁচে থাকে।
পরপর দুবার বাঁচার পর তৃতীয়বারে শেষ রক্ষা হয়নি জাপানের। গ্যাব্রিয়েল মাগালাইয়েসের ক্রসে কাসেমিরোর দারুণ এক হেডে সমতায় ফিরেছে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা।
রেফারির বাঁশি, প্রথমার্ধের সমাপ্তি! শেষ হলো প্রথম ৪৫ মিনিটের লড়াই। কাইশু সানোর সেই দুর্দান্ত গোলে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে থেকেই বিরতিতে গেল জাপান। অন্যদিকে, ঘুরে দাঁড়ানোর নতুন ছক কষতে ড্রেসিংরুমের দিকে ছুটল ব্রাজিল।
একে একে প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়দের বোকা বানিয়ে বক্সের ঠিক বাইরে থেকে নিলেন এক দুর্দান্ত কোণাকুণি শট! বল ব্রাজিলের রক্ষণ ভেঙে আশ্রয় নিল জালের বাঁ দিকের একদম নিচের কোণায়। আলিসনের মতো বিশ্বসেরা গোলকিপারেরও সাধ্য ছিল না সেই বুলেট গতির শট ঠেকানোর। স্তব্ধ ব্রাজিল শিবির, হিউস্টনে উল্লাসে মাতল ব্লু সামুরাইরা!
নাঈম/