কিছু হার আছে, যেগুলো শুধু স্কোরলাইনে ধরা পড়ে না। কিছু জয়ও আছে, যা আসে দীর্ঘ অপেক্ষার পর হঠাৎ নেমে আসা বৃষ্টির মতো। হিউস্টনের রাতে ঠিক তেমনই এক গল্প লিখল ব্রাজিল। যে গল্পের অন্য পাশে রয়ে গেল জাপানের নীরব দীর্ঘশ্বাস।
বিশ্বকাপের রুদ্ধশ্বাস আর স্নায়ুক্ষীয় এক ম্যাচে গ্যাব্রিয়েল মার্তিনেল্লির শেষ মুহূর্তের জাদুতে ২-১ গোলে জাপানকে কাঁদিয়ে বিশ্বকাপের শেষ ষোলো নিশ্চিত করেছে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। আর টানা দুই বিশ্বকাপে শেষ ষোলো খেলা জাপানের যাত্রা থামল এবার শেষ ৩২ এই।
শক্তি আর সামর্থ্যের হিসাবে ব্রাজিল এগিয়ে ছিল শুরু থেকেই। কিন্তু সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স আর আত্মবিশ্বাসে অনেকে জাপানকেই দেখছিলেন চমকের দাবিদার হিসেবে। মাঠে সেই বিশ্বাসের প্রতিফলনও দেখা গেছে। তবে শেষ দৃশ্যটা লিখেছে সাম্বার দেশ।
শুরু থেকেই বলের নিয়ন্ত্রণ ছিল ব্রাজিলের পায়ে। প্রায় ৮২ শতাংশ সময় বল নিজেদের কাছে রেখে জাপানের অর্ধে চাপ তৈরি করে সেলেসাওরা। কিন্তু জাপানের রক্ষণ যেন ইস্পাতের দেয়াল। সুযোগ তৈরি করেও গোলের দেখা পাচ্ছিল না ব্রাজিল।
১৪ মিনিটে বাঁ পায়ে দূরপাল্লার শক্তিশালী শট নিয়েছিলেন মাতেউস কুনিয়া। জাপানের গোলরক্ষক জিওন সুজুকি অসাধারণ দক্ষতায় তা কর্নারে পাঠিয়ে দেন। কিছুক্ষণ পর ব্রুনো গিমারাইসের বিপজ্জনক বলও কাজে লাগাতে পারেনি ব্রাজিল।
জাপান অপেক্ষা করছিল সঠিক মুহূর্তের। আর সেই মুহূর্ত এল ২৯ মিনিটে। ব্রাজিলের ভুল থেকে বল পেয়ে যেন নিজের ছোট্ট এক শিল্পকর্ম এঁকে ফেললেন কাইশু সানো। মাঝমাঠ থেকে এগিয়ে এসে একের পর এক ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে বক্সের বাইরে থেকে নিলেন অসাধারণ এক কোনাকুনি শট। আলিসনের ডানা মেলাও বৃথা গেল। বল জালে, আর হিউস্টনের তখন ব্লু সামুরাইদের উল্লাস।
জাপানের জার্সিতে এটি ছিল সানোর প্রথম আন্তর্জাতিক গোল। কী দুর্দান্ত এক মঞ্চেই না এল সেই মুহূর্ত! ব্রাজিল হতভম্ব, আর ব্লু সামুরাইরা তখন স্বপ্ন দেখছে আরেকটি বড় রাতের।
বিরতির পর বদলে যায় ব্রাজিল। লুকাস পাকেতার জায়গায় মাঠে নামেন এন্দ্রিক। আক্রমণের গতি বাড়ে। ৫২ মিনিটে ব্রুনো গিমারাইসের হেড অবিশ্বাস্যভাবে ঠেকান সুজুকি। পরের মিনিটেই আরেকবার গোললাইন থেকে বল সরিয়ে জাপানকে বাঁচান ডিফেন্ডাররা।
কিন্তু ঢেউ কতক্ষণ আটকে রাখা যায়? ৫৬ মিনিটে অবশেষে আসে প্রতীক্ষার গোল। গ্যাব্রিয়েল মাগালাইয়েসের ক্রসে কাসেমিরোর শক্তিশালী হেড; ১-১। সমতায় ফিরেই যেন নতুন প্রাণ ফিরে পায় ব্রাজিল।
এরপর একের পর এক আক্রমণে জাপানকে পেছনে ঠেলে দেয় সেলেসাওরা। ভিনিসিয়ুসের দারুণ প্রচেষ্টা ঠেকিয়ে দিয়ে কিছুক্ষণ আশার আলো জ্বালিয়ে রাখেন সুজুকি। তবে নাটকের শেষ দৃশ্য তখনও বাকি। দ্বিতীয় পরিবর্তনে মাতেউস কুনিয়ার বদলে মাঠে নামেন গ্যাব্রিয়েল মার্তিনেল্লি। আর শেষ মুহূর্তে তিনি হয়ে ওঠেন ব্রাজিলের নায়ক। যোগ করা সময়ের এক গোছানো আক্রমণ থেকে তার নেওয়া কোনাকুনি শট পোস্ট ছুঁয়ে জালে জড়িয়ে যায়। তারপর? হিউস্টনের গ্যালারিতে হলুদ ঝড়।
আর শেষ বাঁশি বাজতেই হিউস্টনের রাত রঙিন হয়ে উঠে সাম্বার উল্লাসে। ব্রাজিল এগিয়ে গেল শেষ ষোলোয়, হেক্সা স্বপ্নের দিকে। আর জাপান? তারা বিদায় নিল চোখে অপূর্ণতার বিষাদ নিয়ে। তবু ব্লু সামুরাইদের লড়াই মনে করিয়ে দিল, সব গল্প ট্রফি জিতে শেষ হয় না, কিছু গল্প সম্মান আর হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়ার মধ্যেও বেঁচে থাকে।