এটি যেন কোনো সিনেমার শেষ দৃশ্য। জায়গাটাও যেন ঠিক তেমনই– হলিউডের শহর লস অ্যাঞ্জেলেস, গ্যালারিভর্তি দর্শক আর মঞ্চে ফিফা বিশ্বকাপ। নির্ধারিত সময় পেরিয়ে ম্যাচ তখন যোগ করা সময়ে। স্কোরবোর্ডে এখনো ০-০। এমন সময় দক্ষিণ আফ্রিকার রক্ষণভাগের ক্লিয়ার করা বল গিয়ে পড়ে বক্সের ঠিক বাইরে। সেখানে অপেক্ষায় ছিলেন স্টিফেন ইউস্তাকিও। এক মুহূর্তও দেরি করেননি কানাডিয়ান মিডফিল্ডার। ডান পায়ের দুর্দান্ত এক ভলিতে বল পাঠিয়ে দেন জালের নিচের কোণায়। গোলরক্ষক রনওয়েন উইলিয়ামসের ডাইভও থামাতে পারেনি সেই শট।
৯২ মিনিটের ওই গোলেই বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো নকআউট পর্বে জয় তুলে নেয় কানাডা এবং নিশ্চিত করে শেষ ষোলো। আর বিশ্বকাপের প্রথম নকআউট ম্যাচেই ইউস্তাকিও হয়ে উঠেছেন কানাডার নতুন নায়ক।
ফুটবল ছিল রক্তেই
অন্টারিওর লিমিংটনে পর্তুগিজ বাবা-মায়ের ঘরে জন্ম ইউস্তাকিওর। ফুটবল যেন জন্মগতভাবেই তার জীবনের অংশ ছিল। মাত্র চার বছর বয়সে প্রথম বল পায়ে তোলেন তিনি। এর পর ক্যারিয়াজুড়ে কখনো কানাডা, কখনো আবার বাবা-মায়ের দেশ পর্তুগাল, এই দুই দেশের মাঝেই এগিয়েছে তার ফুটবলযাত্রা। তার প্রথম ক্লাব ছিল লিমিংটন মাইনর সকার। পরে পরিবার নিয়ে পর্তুগালে চলে যান। সেখানে বড় ভাই মাউরোর সঙ্গে ক্লাব ফুটবলে পথচলা শুরু হয়। ২০১৭ সালে পর্তুগালের দ্বিতীয় বিভাগের ক্লাব লেইশোয়েসে যোগ দেন। এক বছর পর পাড়ি জমান জিডি শাভেসে।
২০১৯ সালে নতুন চ্যালেঞ্জ নিতে যোগ দেন মেক্সিকোর লিগা এমএক্সের ক্লাব ক্রুস আজুলে। পরে ধারে খেলতে যান পর্তুগিজ ক্লাব পাকোস দে ফেরেইরায়। ২০২০ সালের জানুয়ারিতে অভিষেকের পর একই বছরের আগস্টে ইউরোপীয় প্রতিযোগিতায় প্রথম ম্যাচ খেলেন। উয়েফা ইউরোপা কনফারেন্স লিগে লার্নের বিপক্ষে ৪-০ গোলের জয়ে দলের তৃতীয় গোলটিও করেন তিনি। ২০২২ সালের জানুয়ারিতে ধারে যোগ দেন পর্তুগালের ঐতিহ্যবাহী ক্লাব পোর্তোতে। কয়েক মাস পরই স্থায়ীভাবে তাকে দলে ভেড়ায় ক্লাবটি।
সবশেষ ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে চার মাসের ধারে যুক্তরাষ্ট্রের এমএলএস ক্লাব লস অ্যাঞ্জেলেস এফসিতে যোগ দেন ইউস্তাকিও। চুক্তিতে স্থায়ীভাবে দলে নেওয়ার সুযোগও রাখা হয়েছে।
মাঠের বাইরের লড়াই ছিল আরও কঠিন
২০২৩ সালের এপ্রিলে পোর্তোর হয়ে সান্তা ক্লারার বিপক্ষে ম্যাচ চলাকালে মস্তিষ্কের ক্যানসারে মারা যান ইউস্তাকিওর মা এসমেরালদা। সেই শোক কাটিয়ে ওঠার আগেই এক বছর পর হঠাৎ হৃদ্রোগে মারা যান তার বাবা। এই দুই মর্মান্তিক ঘটনার মাঝেই ইউস্তাকিও ও তার বান্ধবী কনস্তান্তার ঘর আলো করে জন্ম নেয় তাদের কন্যাসন্তান বেনেদিতা। জীবনে আনন্দের সময় হারানোর বেদনাও মনে পড়ে যায় ইউস্তাকিওর। তাই তো দক্ষিণ আফ্রিকা ম্যাচের পর আবেগ ধরে রাখতে পারেননি তিনি। ভেজা চোখে বলেন, ‘আমি যা কিছু করি, সবই আমার পরিবারের জন্য, আমার বাবা-মায়ের জন্য, আমার বান্ধবীর জন্য, আমার মেয়ের জন্য, আমার ভাইয়ের জন্য, আমার নিজের শহরের বন্ধুদের জন্য– সবার জন্য।’
২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে স্পোর্টসনেট কানাডাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বড় ভাই ও ইন্টার টরন্টো এফসির প্রধান কোচ মাউরো ইউস্তাকিও জানান, বাবা-মায়ের মৃত্যু তাদের ভেঙে দিলেও তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন শোককে শক্তিতে পরিণত করবেন, ‘আমাদের বাবা-মা... তারা আমাদের ডানা দিয়েছেন। এখন উড়ে যাওয়ার দায়িত্ব আমাদের। আমরা কৃতজ্ঞ যে আমরা দুজনই এমন একটি কাজ করতে পারছি, যেটাকে আমরা হৃদয় দিয়ে ভালোবাসি।’
মাউরোর ভাষ্য, লিমিংটনের পর্তুগিজ সম্প্রদায়ের মধ্যেই তাদের বেড়ে ওঠা। সেখানেই পরিবারগুলো একত্র হতো, আর শিশুদের সবচেয়ে প্রিয় খেলা ছিল ফুটবল।
দুই দেশের জার্সি, শেষ পর্যন্ত কানাডাই ঠিকানা
যুব পর্যায়ে প্রথমে কানাডার হয়েই আন্তর্জাতিক ফুটবল শুরু করেন ইউস্তাকিও। ২০১২ সালের এজিএস কাপে খেলেন তিনি। পরে ২০১৯ সালের উয়েফা অনূর্ধ্ব-২১ ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপের বাছাইপর্বে পর্তুগালের অনূর্ধ্ব-২১ দলের প্রতিনিধিত্বও করেন। তবে ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন– সিনিয়র পর্যায়ে খেলবেন কানাডার হয়ে। একই বছরের অক্টোবরে কনকাকাফ নেশনস লিগে প্রথমবার জাতীয় দলে ডাক পান। এর পর ২০২১ সালের গোল্ডকাপে করেন প্রথম আন্তর্জাতিক গোল। খেলেছেন ২০২২ কাতার বিশ্বকাপ, ২০২৩ কনকাকাফ নেশনস লিগের ফাইনাল এবং পোর্তোর হয়ে ২০২৫ ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপেও।
দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ম্যাচে আলফোনসো ডেভিস ইনজুরিতে মাঠের বাইরে থাকায় ভারপ্রাপ্ত অধিনায়কের দায়িত্বও পালন করেন ইউস্তাকিও। ম্যাচ শেষে তিনি বলেন, ‘এই জয় পেতে আমরা অনেক পরিশ্রম করেছি। আমরা সত্যিই এই জয়টা কানাডার সব মানুষের জন্য উৎসর্গ করতে চেয়েছিলাম। আমরা বিশ্বাস ধরে রেখেছিলাম এবং লড়াই চালিয়ে গেছি। অন্য কোনোভাবে এই ম্যাচ শেষ হবে, আমরা তা কল্পনাই করিনি।’ নিজের স্মরণীয় গোলটি নিয়ে ইউস্তাকিওর অনুভূতি ছিল আরও আবেগঘন, ‘এটি ছিল অসাধারণ একটি গোল। কিন্তু যখন আমি শট নিয়েছিলাম, আমার মনে হয়েছে সবাই আমার সঙ্গে শট নিয়েছে। সবাই যেন একটু করে শক্তি দিয়েছে, আর বলটা জালের পেছনে গিয়ে ঢুকেছে।’