চার বছর পরপর এমন একটি সময় আসে, যখন পৃথিবীর ক্রীড়া মানচিত্র যেন একটিমাত্র খেলার দখলে চলে যায়। সেই খেলার নাম ফুটবল। বিশ্বকাপ শুরু হলেই সংবাদপত্রের প্রথম পাতা থেকে শুরু করে টেলিভিশনের পর্দা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, এমনকি চায়ের আড্ডাও দখল করে নেয় গোল, পাস, অফসাইড আর নাটকীয় সব মুহূর্ত। ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপও তার ব্যতিক্রম নয়। বরং ৪৮ দলের নতুন ফরম্যাট, একের পর এক চমক আর নকআউট পর্বের উত্তেজনা বিশ্বকাপকে আরও বড় আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। এর প্রভাব এতটাই প্রবল যে, একই সময়ে ঘটে যাওয়া আরও অনেক বড় ক্রীড়া ঘটনাও প্রায় আড়ালে চলে গেছে।
ক্রিকেট বিশ্বের অন্যতম বড় খবর হওয়ার কথা ছিল আয়ারল্যান্ডের ভারতের বিপক্ষে টি-টোয়েন্টি সিরিজ জয়। ভারতকে টি-টোয়েন্টি সিরিজে হারানোই যেখানে বিরল ঘটনা, সেখানে আয়ারল্যান্ড শুধু সিরিজই জেতেনি, করেছে হোয়াইটওয়াশও। ক্রিকেট ইতিহাসে এটি তাদের অন্যতম বড় অর্জন। ভারতের মতো শক্তিশালী দলের বিপক্ষে এমন ফলাফল আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বড় ধরনের আলোচনার জন্ম দেওয়ার কথা ছিল। স্বাভাবিক সময়ে এই জয় নিয়ে দিনের পর দিন বিশ্লেষণ চলত। ভারতীয় ক্রিকেটের দুর্বলতা, আয়ারল্যান্ডের উন্নতি, বিশ্বকাপের আগে দুই দলের প্রস্তুতি–সবই হতো আলোচনার বিষয়। কিন্তু বিশ্বকাপ ফুটবলের উত্তাপে সেই ঐতিহাসিক সাফল্যও অনেকটাই চাপা পড়ে গেছে।
বাংলাদেশের কথাই ধরা যাক। টিম টাইগ্রেস এখন খেলছে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে। অ্যাওয়ে টেস্টে নাকানিচুবানি খাচ্ছে নাজমুল হোসেন শান্তর দল। তার আগে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে নাকাল হয়েছে টি-টোয়েন্টি সিরিজে। এর মাঝে আবার অজিদের বিপক্ষে এসেছে ঐতিহাসিক সিরিজ জয়। স্বাভাবিকভাবেই টাইগারদের ভালো-মন্দ পারফরম্যান্সে প্রশংসা আর নিন্দার ঝড় উঠার কথা ছিল বাংলাদেশে। কিন্তু ফুটবল উৎসবের মাঝে এ নিয়ে আলোচনার সময় কই ভক্তদের? অদ্ভুত হলেও সত্য যে, বিশ্বকাপে বাংলাদেশ নেই, সেই বিশ্বকাপ নিয়েই এখন মাতাল বাংলাদেশিরা। দেশের কেউ এখন ব্রাজিল, কেউ আর্জেন্টিনা, কেউ পর্তুগাল বা অন্য দলের।
গতকাল টেনিস বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ টুর্নামেন্ট উইম্বলডন শুরু হয়েছে। সাধারণ সময়ে এই টুর্নামেন্ট শুরু হওয়া মানেই বিশ্বজুড়ে টেনিসপ্রেমীদের উৎসব। কিন্তু এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। বিশ্বকাপের নকআউট পর্বের ম্যাচগুলো শুরু হওয়ার পর উইম্বলডনের সংবাদও পেছনের সারিতে চলে গেছে। এর চেয়েও বড় খবর ছিল সেরেনা উইলিয়ামসকে ঘিরে। কিংবদন্তি এই টেনিস তারকার প্রত্যাবর্তন স্বাভাবিক সময়ে বৈশ্বিক ক্রীড়া সংবাদমাধ্যমের প্রধান শিরোনাম হওয়ার মতো ঘটনা। ২৩ গ্র্যান্ড স্ল্যামজয়ী এই কিংবদন্তিকে ঘিরে কোটি ভক্তের আগ্রহ থাকলেও ফুটবল বিশ্বকাপের কারণে সেই আলোচনাও অনেকটাই ম্লান।
ক্রিকেটের অন্যতম বড় বৈশ্বিক আসর নারী টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপও চলছে একই সময়ে। বিশ্বের সেরা নারী ক্রিকেটাররা শিরোপার লড়াইয়ে মাঠে নামছেন। প্রতিদিনই হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ। নতুন তারকা উঠে আসছেন, ভাঙছে রেকর্ড, তৈরি হচ্ছে নতুন ইতিহাস। তবুও এই টুর্নামেন্ট যেন প্রত্যাশিত আলো পাচ্ছে না। বিশ্বকাপ ফুটবলের প্রতিটি ম্যাচের পর যে পরিমাণ বিশ্লেষণ, আলোচনা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে, তার তুলনায় নারী টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ একেবারেই নীরব।
ইংল্যান্ড ক্রিকেটের সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম সফল অধিনায়কও বিদায় বলেছেন সব ধরনের ক্রিকেটকে। তার নেতৃত্বে ইংল্যান্ড সীমিত ওভারের ক্রিকেটে নতুন যুগে প্রবেশ করেছিল। আক্রমণাত্মক ক্রিকেট, সাহসী সিদ্ধান্ত এবং বিশ্ব ক্রিকেটে আধিপত্য প্রতিষ্ঠার পথে তার অবদান অনস্বীকার্য। এমন একজন অধিনায়কের অবসর সাধারণ সময়ে আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনের অন্যতম বড় সংবাদ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বিশ্বকাপ ফুটবলের উত্তেজনায় সেই সংবাদও জায়গা করে নিতে পারেনি।
ফুটবলের প্রভাব এত বেশি কেন?
বিশ্বকাপ শুধু একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতা নয়, এটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় বৈশ্বিক ক্রীড়া আয়োজন। ফুটবল এমন একটি খেলা–যা প্রায় প্রতিটি মহাদেশ, প্রতিটি সংস্কৃতি এবং শত শত কোটি মানুষের আবেগের সঙ্গে জড়িয়ে আছে।
বিশ্বকাপ চলাকালে–
• সংবাদমাধ্যমের বড় অংশের জনবল বিশ্বকাপ কভারেজে ব্যস্ত থাকে।
• টেলিভিশনের সম্প্রচারসূচি বদলে যায়।
• সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রেন্ডিংয়ের শীর্ষে থাকে বিশ্বকাপ।
• অন্যান্য খেলার সংবাদ তুলনামূলক কম গুরুত্ব পায়।
• দর্শকদের মনোযোগও প্রায় পুরোপুরি ফুটবলের দিকে চলে যায়।
ফলে একই সময়ে যত বড় ঘটনাই ঘটুক না কেন, সেগুলো অনেক ক্ষেত্রেই বিশ্বকাপের বিশাল ঢেউয়ের নিচে চাপা পড়ে যায়। এটি নতুন কিছু নয়। ইতিহাস বলছে, প্রতিটি ফুটবল বিশ্বকাপেই এমনটা হয়েছে। অলিম্পিক বাদ দিলে পৃথিবীর আর কোনো ক্রীড়া আয়োজন বিশ্বকাপের মতো বৈশ্বিক মনোযোগ টানতে পারে না। ফলে ক্রিকেট, টেনিস, গলফ, অ্যাথলেটিকস কিংবা মোটরস্পোর্টস–সব খেলাই এই সময়ে কিছুটা হলেও প্রচারের দিক থেকে পিছিয়ে পড়ে। তবে এর অর্থ এই নয় যে, অন্য খেলাগুলোর গুরুত্ব কমে যায়। বরং সাময়িকভাবে বিশ্ব ক্রীড়ার আলো এক জায়গায় কেন্দ্রীভূত হয়। ফুটবল বিশ্বকাপের শেষ বাঁশি বাজলেই আবার বদলে যাবে দৃশ্যপট।