গোল্ডেন বুটের দৌড়ে লিওনেল মেসি, কিলিয়ান এমবাপ্পে, আর্লিং হালান্ড, ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো এবং হ্যারি কেইনের রুদ্ধশ্বাস লড়াই শিরোনাম হয়েছে অসংখ্যবার। এটি ছিল ফিফার জন্য একটি বড় প্রাপ্তি। বিশ্বের সবচেয়ে পরিচিত ফুটবলাররা সবাই এসেছেন, খেলেছেন এবং একে অপরকে ছাড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন। তবে বিশ্বকাপ শুধু তারকাদের নিয়েই নয়, বিশেষ করে গ্রুপপর্বে। এখানে বিশ্বের নানা প্রান্তের ফুটবলের রং, বৈচিত্র্য এবং নিজস্ব চরিত্রই হয়ে ওঠে মূল আকর্ষণ। চার বছর আগে যেমন সৌদি আরব শেষ পর্যন্ত চ্যাম্পিয়ন হওয়া আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে দিয়েছিল, তেমন বড় দলগুলোর বিপক্ষে অর্থবহ কোনো অঘটন এবার দেখা যায়নি।তবে গল্পের অভাব ছিল না।
আটলান্টিক মহাসাগরের দ্বীপপুঞ্জের দেশ কেপ ভার্দে হয়তো বিশ্বকাপে এসেছিল নকআউট পর্বে ওঠার প্রত্যাশা ছাড়াই। দলটি যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশে বিমানে ওঠার আগেই অনেকে তাদের সম্ভাবনা উড়িয়ে দিয়েছিলেন। কেউ কি কল্পনা করতে পারত যে, উরুগুয়ে এবং ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন স্পেন থাকা একটি গ্রুপ থেকে তারা নকআউটে উঠবে? স্পেনের বিপক্ষে কেপ ভার্দের ড্র করা, এমনকি তাদের গোলশূন্যও আটকে রাখা ছিল অসাধারণ এক কীর্তি। শুধু তাই নয়, এর পর উরুগুয়ের বিপক্ষেও তারা ২-২ গোলে ড্র করে। শেষ গ্রুপ ম্যাচে সৌদি আরবের সঙ্গে ড্র করে তারা গ্রুপে দ্বিতীয় স্থান নিশ্চিত করে এবং শুক্রবার মায়ামিতে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার বিপক্ষে রাউন্ড অব ৩২-এর ম্যাচ নিশ্চিত করে।
কেপ ভার্দে হয়তো একমাত্র দল, যারা মাত্র তিন পয়েন্ট নিয়েই গ্রুপের শীর্ষ দুইয়ে জায়গা করে নিয়েছে। কিন্তু প্রয়োজনীয় কাজটি তারা ঠিকই করেছে। ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফ্যান্তিনোর পরিকল্পনার এর চেয়ে বড় সার্থকতা আর হতে পারে না। নতুন ফরম্যাটের ‘পোস্টার’ হয়ে উঠেছে কেপ ভার্দে। স্পেনের বিপক্ষে অসাধারণ পারফরম্যান্সের পর কেপ ভার্দের ৪০ বছর বয়সী গোলরক্ষক ভোজিনহা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নতুন তারকা হয়ে উঠেছেন। ম্যাচ শুরুর সময় ইনস্টাগ্রামে তার অনুসারী ছিল ৫০ হাজার। ম্যাচ শেষ হওয়ার পর তা বেড়ে দাঁড়ায় ৫০ লাখে। সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, এখন তার অনুসারীর সংখ্যা ১ কোটি ৬৭ লাখ।
এর পর তার মা, যিনি যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা পাওয়ার উচ্চ ব্যয়ের কারণে বিশ্বকাপে আসতে পারেননি, উরুগুয়ের বিপক্ষে ম্যাচটি দেখতে শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে উড়ে আসতে সক্ষম হন। এটি এমন এক গল্প, যা শুধু বিশ্বকাপই সৃষ্টি করতে পারে ভোজিনহার মতো একজন ফুটবলারের জন্য, যিনি পুরো ক্যারিয়ার কাটিয়েছেন মলদোভা, সাইপ্রাস, স্লোভাকিয়া এবং পর্তুগালের দ্বিতীয় বিভাগের লিগে।
ক্যারিবীয় দ্বীপদেশ কুরাসাও, যারা বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করা ইতিহাসের সবচেয়ে ছোট দেশ, তারা নকআউটে উঠতে পারেনি। তবে ইকুয়েডরের বিপক্ষে একটি ড্র আদায় করেছিল। পর্তুগালের বিপক্ষে ডিআর কঙ্গোর কঠিন লড়াই করে ১-১ গোলে ড্র করাও তাদের সেরা তৃতীয় স্থান পাওয়া দলগুলোর একটি হিসেবে পরের রাউন্ডে উঠতে সাহায্য করেছে। মরক্কোর বিপক্ষে হাইতির উইলসন ইসিদোর টুর্নামেন্টের সেরা গোলের অন্যতম দাবিদার একটি গোল করেছেন।
বিশ্বকাপের দলসংখ্যা বাড়ানোর ফলে আরও কিছু নতুন গল্পও তৈরি হয়েছে। বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা, কানাডা, আইভরি কোস্ট এবং দক্ষিণ আফ্রিকা– এই চার দলই প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে জায়গা করে নিয়েছে। তবে অবশ্যই এখন এটি অনেক সহজ। কারণ গ্রুপগুলো তুলনামূলক দুর্বল এবং পরের রাউন্ডে আরও বেশি দল উঠছে। ৩২ দলের প্রথম নকআউট পর্বের আকারই মূলত আগের বিশ্বকাপের পুরো টুর্নামেন্টের সমান। প্রত্যাশামতোইl টুর্নামেন্টে এখন পর্যন্ত আধিপত্য দেখিয়েছে ইউরোপ এবং দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলো। অপ্রত্যাশিতভাবে, আফ্রিকার দেশগুলো ছিল দুর্দান্ত। তাদের ১০ দলের মধ্যে ৯টিই শেষ ৩২-এ জায়গা করে নিয়েছে। কনকাকাফ অঞ্চলের মোট ২০ পয়েন্টের মধ্যে একটি ছাড়া বাকি সব পয়েন্টই এসেছে তিনটি সহ-আয়োজক দেশের কাছ থেকে।
অতিরিক্ত কোটার সুবিধা পাওয়া কুরাসাও, হাইতি এবং পানামা–এই তিন দল মিলিয়ে করেছে মাত্র তিনটি গোল এবং হজম করেছে ২১টি। কিন্তু সবচেয়ে হতাশাজনক পারফরম্যান্স ছিল এশিয়ার। নয়টি দল নিয়ে অংশ নিয়ে ২৭ ম্যাচে তারা জিতেছে মাত্র তিনটি। ম্যাচপ্রতি গড়ে পেয়েছে মাত্র ০.৬৭ পয়েন্ট। শুধু অস্ট্রেলিয়া ও জাপানই গ্রুপপর্ব পেরোতে পেরেছে। এই বিশ্বকাপে এশিয়ার সরাসরি কোটা চার থেকে বেড়ে আটে উন্নীত হয়েছিল। প্লে-অফ পেরিয়ে ইরাকও জায়গা করে নিয়েছিল। যেখানে আফ্রিকা নতুন ফরম্যাটের যৌক্তিকতা প্রমাণ করেছে, সেখানে এশিয়া এবং কনকাকাফ যেন তার ঠিক উল্টো চিত্রই তুলে ধরেছে।
গ্রুপপর্বে কনফেডারেশনগুলো
কনফেডারেশন ম্যাচ জয় ড্র হার পয়েন্ট গড় গোল
কনমেবল ১৮ ৯ ৬ ৩ ৩৩ ১.৮৩
উয়েফা ৪০ ২০ ১২ ৮ ৭২ ১.৮০
কাফ ৩০ ১০ ১০ ১০ ৪০ ১.৩৩
কনকাকাফ ১৮ ৬ ২ ১০ ২০ ১.১১
এএফসি ২৭ ৩ ৯ ১৫ ১৮ ০.৬৭
ওএফসি ৩ ০ ১ ২ ১ ০.৩৩