ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) শত শত লিখিত অভিযোগ জমা পড়েছে।ক্ষমতার অপব্যবহার, অর্থ আত্মসাৎ, ঘুষ গ্রহণ, কর ফাঁকি ও অর্থ পাচারসহ বিভিন্ন অপরাধের অভিযোগের তালিকা প্রস্তুত করেছে দুদকের যাচাই-বাছাই কমিটি (যাবাক)। তবে এখন কমিশন না থাকায় সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। নতুন কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার পর এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
এদিকে, সম্প্রতি আন্তর্জাতিক দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের প্রকাশিত প্রতিবেদনে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে সর্বোচ্চ দুর্নীতি হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। গত রবিবার জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদও অন্তর্বর্তী সরকারের দুর্নীতির অভিযোগের তদন্ত চেয়েছেন। তিনি দুদকের মাধ্যমে তদন্ত করার দাবি জানিয়েছেন।
এ ব্যাপারে গতকাল সোমবার দুদকের উপপরিচালক (জনসংযোগ) আকতারুল ইসলাম খবরের কাগজকে জানিয়েছেন, দুদকে যেসব অভিযোগ জমা হয়, সেগুলো দুদকের তফসিলভুক্ত এবং আমলযোগ্য কি না তা যাচাই-বাছাই কমিটির মাধ্যমে চূড়ান্ত হয়ে থাকে। যাবাকের সুপারিশের ভিত্তিতে অনুসন্ধানের জন্য সিদ্ধান্ত নেয় কমিশন।
গত ৩ মার্চ কমিশনের পদত্যাগের পর যেসব অভিযোগ জমা পড়েছে, সেগুলো যাবাকের সুপারিশের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেবে পরবর্তী কমিশন। এখনো কমিশন গঠন হয়নি। নতুন কমিশন দায়িত্ব গ্রহণের পর বিষয়টি সম্পর্কে জানা যাবে।
দুদক সূত্রে জানা গেছে, সবচেয়ে বেশি অভিযোগ এসেছে সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস, উপদেষ্টা আসিফ নজরুল, সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান, নূরজাহান বেগম, আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া ও মাহফুজ আলমের বিরুদ্ধে। অধিকাংশ অভিযোগকারী তাদের নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়েছেন। এ ছাড়া আইন অনুসারে দুদকও অভিযোগকারীর নাম-পরিচয় কঠোরভাবে গোপন রাখে। দুদক আইন-২০০৪ -এর ২৮(খ) ধারায় উল্লেখ করা হয়েছে, কোনো তথ্য প্রদানকারীর নাম, ঠিকানা বা পরিচয় প্রকাশ করা যাবে না এবং কোনো দেওয়ানি বা ফৌজদারি আদালতে সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করা যাবে না।
সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বিরুদ্ধে আসা কয়েকটি অভিযোগের মধ্যে একটিতে ড. ইউনূস কীভাবে নিজের নামে একটি ট্রাস্ট করে গ্রামীণ কল্যাণ ও গ্রামীণ টেলিকমের অর্থ আত্মসাৎ করছেন, সেসবের বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে। এ অভিযোগে বলা হয়েছে, আয়কর ফাঁকি ও অর্থ আত্মসাতের জন্য ড. ইউনূস তার নিজের নামে একটি ট্রাস্ট গঠন করেন। এ ট্রাস্টের একমাত্র কাজ হলো ড. ইউনূসের পরিবারের দেখাশোনা করা। এর মাধ্যমে ড. ইউনূস বিপুল পরিমাণ আয়কর ফাঁকি দিচ্ছেন। গ্রামীণ টেলিকমের কিছু কর্মচারী দুদকে এই অভিযোগ জমা দেন। এ ছাড়া প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব পালনকালে ড. মুহাম্মদ ইউনূস বিভিন্নভাবে বিদেশে অর্থ পাচার করেছেন বলে একাধিক অভিযোগ দাখিল করা হয়।
সাবেক আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুলের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের ১০টিরও বেশি অভিযোগ জমা পড়েছে। এর মধ্যে বিচারক ও সাব রেজিস্ট্রারদের বদলি ও পদোন্নতি বাণিজ্য এবং মামলা ও জামিন বাণিজ্য অন্যতম।
সাবেক পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের বিরুদ্ধে অন্তত আটটি অভিযোগ জমা হয়েছে। এর মধ্যে পরিবেশ অধিদপ্তরের একাধিক প্রকল্প থেকে অর্থ আত্মসাৎ, অন্যের সম্পত্তি জালিয়াতির মাধ্যমে হাতিয়ে নেওয়া ও অবৈধ দখল এবং পরিবেশ দূষণের দোহাই দিয়ে বিভিন্ন ব্যবসায়ীর কাছ থেকে অবৈধ অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।
সাবেক জ্বালানি উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খানের বিরুদ্ধে সামিট গ্রুপের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ জমা পড়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন বেসরকারি বিদ্যুৎ কোম্পানির কাছ থেকে ঘুষ নিয়েছেন বলেও অভিযোগ এসেছে।
টেন্ডার জালিয়াতি, হাসপাতালের কেনাকাটায় অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ এসেছে সাবেক স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমের বিরুদ্ধে।
সাবেক যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে ঘুষ-দুর্নীতির মাধ্যমে অন্তত ১ হাজার কোটি টাকা অর্জন, বেআইনি বিটকয়েন লেনদেন ও অর্থ পাচারের অভিযোগ এসেছে।
দুদক সাবেক তথ্য উপদেষ্টা মাহফুজ আলমের বিরুদ্ধে টিভি চ্যানেলের লাইসেন্স প্রদানে ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ এসেছে।