ভারতের উত্তর প্রদেশের অযোধ্যায় রাম মন্দিরকে ঘিরে নতুন করে তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। এক মাস ধরে মন্দির পরিচালনায় দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ভক্তদের দেওয়া কয়েক মিলিয়ন ডলারের অনুদান আত্মসাতের অভিযোগে দেশজুড়ে ব্যাপক জনরোষ তৈরি হয়। এর জেরে গত শুক্রবার ট্রাস্টের দীর্ঘদিনের সাধারণ সম্পাদক চম্পত রায়সহ একাধিক শীর্ষ ট্রাস্টি পদত্যাগ করেন। এর আগে চাপের মুখে বিজেপিশাসিত উত্তর প্রদেশ সরকার তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করতে বাধ্য হয়। কমিটি ইতোমধ্যে প্রতিবেদন জমা দিলেও তা জনসম্মুখে প্রকাশ করা হয়নি। এদিকে রাজ্য পুলিশ ফৌজদারি মামলা দায়ের করে মন্দিরের নগদ অর্থ ও মূল্যবান পূজার সামগ্রী গণনার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিসহ অন্তত আটজনকে গ্রেপ্তার করেছে।
রাম মন্দিরটি দাঁড়িয়ে আছে, সেখানে এক সময় ষোড়শ শতাব্দীর বাবরি মসজিদ ছিল। কিন্তু ১৯৯২ সালে হিন্দু জনতা সেটি ভেঙে ফেলে। যার ফলে দেশজুড়ে ধর্মীয় দাঙ্গায় প্রায় ২,০০০ মানুষ নিহত হয়। যাদের অধিকাংশই ছিলেন মুসলমান। আড়াই বছর আগে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি মহাধুমধামে মন্দিরটি উদ্বোধন করেন। উদ্বোধনের পর থেকে রাম মন্দির ভারতের অন্যতম প্রধান তীর্থস্থান হয়ে উঠেছে। আর এই তীর্থস্থানটি পরিচালনা করেন শ্রী রাম জন্মভূমি তীর্থক্ষেত্র ট্রাস্ট নামে একটি স্বাধীন ট্রাস্ট। যদিও এটি সরকারের আওতার বাইরে। এর কার্যনির্বাহী সদস্যরা রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করেন এবং তাদের মধ্যে কয়েকজন বিজেপির আদর্শিক উৎস রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের সদস্য। ট্রাস্টের হিসাবরক্ষণ দলের সাবেক সুপারভাইজার মহিপাল সিং প্রকাশ্যে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ তোলার পর চলতি মাসে বিষয়টি প্রথম আলোচনায় আসে। এর পর দেশজুড়ে ব্যাপক জনরোষ সৃষ্টি হয়। যা নিয়ে উত্তর প্রদেশের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ও বিরোধী সমাজবাদী পার্টির নেতা অখিলেশ যাদব সরব হন। তিনি অভিযোগ করেন, ভক্তদের দেওয়া অনুদানের কোটি কোটি রুপি রহস্যজনকভাবে গায়েব হয়ে গেছে। একাধিক শীর্ষ ট্রাস্টি পদত্যাগ, মামলা, গ্রেপ্তারের পরও উত্তেজনা কমেনি। বরং এ নিয়ে কিছু বিজেপি সমর্থকসহ হাজার হাজার ভক্ত নিজেদের প্রতারিত বোধ করছেন।
১৯৯২ সালে বাবরি মসজিদ ধ্বংসের ঘটনায় যাদের বিরুদ্ধে বিচার হয়েছিল, সন্তোষ দুবে ছিলেন তাদের অন্যতম। রাম মন্দিরে ভক্তদের অনুদান আত্মসাতের অভিযোগ তাকে ক্ষুব্ধ করেছে। তিনি বলেন, ‘এই দুর্নীতি আমাকে গভীর যন্ত্রণা দেয়, এমন এক বেদনা যা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। আমি শুধু এটুকুই বলতে পারি যে, তাদের জন্য মৃত্যুদণ্ড ছাড়া আর কিছুই যথেষ্ট হবে না।’
এদিকে মন্দিরের ভক্ত ও সরকারবিরোধী সমালোচকদের অভিযোগ, পুরো ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করছে কর্তৃপক্ষ। বিরোধী সমাজবাদী পার্টির নেতা ও উত্তর প্রদেশের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী অখিলেশ যাদব তদন্তের প্রাথমিক ধাপকে ‘সন্দেহজনক’ আখ্যা দিয়ে বলেন, ‘সরকার শুধু অর্থ গণনার দায়িত্বে থাকা কর্মীদের গ্রেপ্তার করছে, অথচ এই কথিত দুর্নীতির মূল হোতাদের আড়াল করছে।’
রাম মন্দির আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হিন্দু সাধু কারপাত্রী মহারাজও একই ধরনের অভিযোগ তুলেছেন। তিনি বলেন, ‘প্রকৃত দায়ীদের রক্ষা করতে সরকার নিম্নপদস্থ কর্মচারীদের বলির পাঁঠা বানাচ্ছে।’
রাম মন্দিরের দুর্নীতির অভিযোগ রাজনৈতিকভাবেও বিজেপির জন্য নতুন সংকট তৈরি করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, আগামী উত্তর প্রদেশ নির্বাচনের আগে এ বিতর্ক দলটির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।সূত্র:আল জাজিরা