যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলে সাম্প্রতিক সংঘাত বন্ধ এবং হরমুজ প্রণালি নিয়ে বিরোধ নিষ্পত্তিতে পুনরায় আলোচনায় বসতে সম্মত হয়েছে। গত রবিবার (২৮ জুন) এক মার্কিন কর্মকর্তা এ তথ্য জানিয়ে বলেছেন, এতে পাল্টাপাল্টি হামলায় হুমকিতে থাকা অন্তর্বর্তী শান্তিচুক্তি টিকিয়ে রাখার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
ওই মার্কিন কর্মকর্তা জানান, সমঝোতা স্মারকের ১৪ দফা নিয়ে কারিগরি পর্যায়ের আলোচনা অব্যাহত থাকবে। আপাতত উভয় পক্ষ সামরিক তৎপরতা স্থগিত রাখবে এবং হরমুজে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক থাকবে। গত ১৭ জুন স্বাক্ষরিত ওই সমঝোতার আওতায় হরমুজ প্রণালি পুনরায় নৌ চলাচলের জন্য খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছিল।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস জানায়, উভয় পক্ষের মধ্যে শত্রুতা বন্ধে সমঝোতা হয়েছে। এক জ্যেষ্ঠ মার্কিন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে অ্যাক্সিওস জানায়, আজ মঙ্গলবার কাতারে নতুন দফার বৈঠক শুরু হবে।
গত বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) হরমুজ প্রণালিতে একটি পণ্যবাহী জাহাজে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানার পর থেকে উভয় দেশই একে অপরের বিরুদ্ধে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ করে ধারাবাহিক হামলা চালায়। রবিবার ভোরে ইরান কুয়েত ও বাহরাইনে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়। এর কিছুক্ষণ আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন, যুদ্ধবিরতির সমঝোতা না মানলে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যাবে।
ইসরায়েল জানিয়েছে, তারা আবারও লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলের একটি গ্রামে ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর ভূগর্ভস্থ অবকাঠামোতে হামলা চালিয়েছে। গত শুক্রবার লেবাননের সঙ্গে নতুন যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর শনিবারও একই ধরনের হামলা চালানো হয়। ইরান বলেছে, বৃহত্তর সমঝোতা কার্যকর রাখতে হলে লেবাননেও সংঘাত বন্ধ করতে হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী জানায়, হরমুজ প্রণালিতে একটি তেলবাহী জাহাজে হামলার কয়েক ঘণ্টা পর তারা আবারও ইরানে আঘাত হেনেছে। বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ হিসেবে পরিচিত এই প্রণালি যুদ্ধের বেশির ভাগ সময়ই কার্যত বন্ধ ছিল।
ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বলেন, ‘এমন সময় আসতে পারে যখন আমাদের আর সংযম দেখানো সম্ভব হবে না। তখন আমরা যে সামরিক অভিযান সফলভাবে শুরু করেছি, তা সম্পূর্ণ করতে বাধ্য হব।’
গত ১৭ জুন স্বাক্ষরিত ১৪ দফার অন্তর্বর্তী শান্তি সমঝোতার উদ্দেশ্য ছিল ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া যুদ্ধ বন্ধ করা, হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা চালিয়ে যাওয়া।
শান্তিচুক্তি সত্ত্বেও থামেনি সহিংসতা
এক সপ্তাহ আগে সুইজারল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফের নেতৃত্বে মধ্যস্থতাকারীদের উপস্থিতিতে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এরপর ওয়াশিংটন তেহরানের ওপর আরোপিত কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিল করে। তা সত্ত্বেও আবারও সংঘর্ষ শুরু হয় এবং তা তীব্র আকার ধারণ করে।
ট্রাম্পের বার্তার প্রায় এক ঘণ্টা পর কুয়েতের সেনাবাহিনী জানায়, তারা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা প্রতিহত করছে। একই সময়ে বাহরাইনেও সতর্কতামূলক সাইরেন বেজে ওঠে।
ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী এক বিবৃতিতে জানায়, তাদের নৌ ও বিমান ইউনিট কুয়েত ও বাহরাইনে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। বাহিনীটির দাবি, যুক্তরাষ্ট্র ওই হামলা চালিয়ে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করেছে এবং এর ফলে সব ধরনের কূটনৈতিক প্রক্রিয়া সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে যাবে।
ইরানের নৌ কমান্ড হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন ঘাঁটিগুলো আগামী দিনগুলোতে ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হবে। এক মার্কিন কর্মকর্তা বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেন, ইরানের হামলায় মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো সেনা হতাহত হননি এবং বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির খবরও পাওয়া যায়নি। তবে পরিস্থিতি এখনো পরিবর্তনশীল। কয়েক ঘণ্টা পর বাহরাইনে দ্বিতীয় দফায় আবারও সতর্কসংকেত বাজে।
দেশটির কর্তৃপক্ষ জানায়, ইরানের একটি হামলায় মুহাররাক প্রদেশের একটি আবাসিক ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। বাহরাইন এ ঘটনায় ইরানকে জবাবদিহির আওতায় আনতে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের জরুরি বৈঠক আহ্বানের দাবি জানায়।
কুয়েতের সেনাবাহিনী জানায়, তারা দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করেছে। এতে কোনো ক্ষয়ক্ষতি বা হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। কাতার জানিয়েছে, সামরিক অভিযানের মধ্যে নিখোঁজ হওয়া একটি জাহাজে থাকা তাদের এক নাগরিক ছিটকে আসা ধাতব টুকরার আঘাতে আহত হয়ে মারা গেছেন। একই ঘটনায় আরও একজন আহত হয়েছেন। তবে ঘটনাস্থল কোথায় এবং এর জন্য কে দায়ী, সে বিষয়ে দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কোনো তথ্য দেয়নি। সূত্র: রয়টার্স