ঢাকা ১৬ আষাঢ় ১৪৩৩, মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
সাতকানিয়ায় ব্রাজিলের খেলা দেখে ফেরার পথে যুবককে গুলি ও কুপিয়ে জখম মাদারীপুর পৌরসভার ১১০ কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা টাইব্রেকার রোমাঞ্চে নেদারল্যান্ডসকে হারিয়ে শেষ ১৬-তে মরক্কো কেমন ছিল রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জুতার মোবারক রাজস্ব আদায়ে রেকর্ড ঘাটতি নতুন তিন উপজেলা, ১ থানা ও  ঢাকার সীমানা পুনর্গঠন প্রস্তাব ফেনীতে জাইমা রহমানকে নিয়ে কটূক্তি, যুবক আটক ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে পর্তুগাল সমর্থকদের শান্ত থাকার আহ্বান ফেলিক্সের ‘গলদে ভরা’ প্রকল্প ভিএআর বিতর্ক: জার্মানির বিশ্বকাপ থেকে বিদায়ের নেপথ্য কাহিনী দুই লেনে আটকে পদ্মা সেতুর সুফল শিল্প ও টেলিভিশনের এক অনন্য কারিগর মুস্তাফা মনোয়ার আদ্-দ্বীন হাসপাতাল বন্ধ: অনিশ্চয়তায় বিদেশি শিক্ষার্থীরা আমার তো বিশ্বকাপেই থাকার কথা ছিল না: লুকাকু চট্টগ্রাম বিমানবন্দরে যাত্রী ছাউনির অভাবে ভোগান্তি তিস্তা প্রকল্প নিয়ে তৃতীয় পক্ষের নাক গলানো উচিত নয়: ভারতকে উদ্দেশ্য করে চীন বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী ছিলেন মুস্তাফা মনোয়ার আমাদের জন্মই হয়েছে ডিফেন্স করার জন্য: আলফারো চীন-রাশিয়ার যৌথ বিমান টহল রংপুরে এমপির প্রকল্পের সভাপতি ভাগনে-ভগ্নিপতি! অন্তর্বর্তী সরকারের দুর্নীতি অনুসন্ধানে প্রস্তুত দুদক নড়াইলে অনুদানের তালিকায় এমপির ৮ আত্মীয়! পাল্টাপাল্টি হামলায় পুনরায় আলোচনা যুক্তরাষ্ট্র-ইরান এক পাশে দানব, অপর পাশে দ্য এলিফ্যান্ট ৩০ জুন: তুলা, বৃশ্চিক, ধনু, মকর, কুম্ভ ও মীনের আজকের রাশিফল বিআরটিসিতে লোকসান-চুরির লঙ্কাকাণ্ড ৩০ জুন: মেষ, বৃষ, মিথুন, কর্কট, সিংহ ও কন্যার আজকের রাশিফল রাম মন্দির ঘিরে দুর্নীতি, ভারতে তীব্র বিতর্ক অপ্রতিরোধ্য ফ্রান্সের সামনে আত্মবিশ্বাসী সুইডেন গ্রুপপর্বেই ৪৬ লাখ দর্শক, গ্যালারিতে বিশ্বকাপ জ্বর

আজ শায়িত হবেন বনানীতে বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী ছিলেন মুস্তাফা মনোয়ার

প্রকাশ: ৩০ জুন ২০২৬, ০৮:৪৯ এএম
আপডেট: ৩০ জুন ২০২৬, ০৯:১০ এএম
বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী ছিলেন মুস্তাফা মনোয়ার
ছবি: মুস্তাফা মনোয়ার

বাংলাদেশের শিল্প-সংস্কৃতির এক উজ্জ্বল নক্ষত্র নিভে গেল। চারুশিল্পী, নাট্যনির্দেশক, শিল্প গবেষক, পাপেটশিল্পের অন্যতম পথিকৃৎ, শিশুতোষ অনুষ্ঠান নির্মাতা এবং বহুমাত্রিক সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব মুস্তাফা মনোয়ার আর নেই (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।

দীর্ঘদিন নানা শারীরিক জটিলতায় ভোগার পর গতকাল সোমবার সকাল সাড়ে ৮টার দিকে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। এই সব্যসাচী শিল্পীর বয়স হয়েছিল ৯১ বছর।

গতকাল দুপুরে হাসপাতাল থেকে মুস্তাফা মনোয়ারের মরদেহ প্রথমে ধানমন্ডির তাকওয়া মসজিদে নেওয়া হয়। সেখানে গোসল শেষে দুপুরে ধানমন্ডির এক নম্বর সড়কের নিজ বাসভবনে আনা হয়। পরিবারের সদস্য, সহকর্মী, শিল্পী, শুভানুধ্যায়ী ও অনুরাগীরা সেখানে শেষ শ্রদ্ধা জানান। পরে মরদেহ স্কয়ার হাসপাতালের হিমঘরে রাখা হয়।

পরিবার ও সহকর্মীদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আজ মঙ্গলবার সকাল ৯টায় বাংলাদেশ টেলিভিশন প্রাঙ্গণে তার প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। এরপর মরদেহ নেওয়া হবে রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে, যেখানে সকাল সাড়ে ১০টা থেকে দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা জানানোর সুযোগ থাকবে। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে দ্বিতীয় জানাজা শেষে তার দীর্ঘ কর্মস্থল চারুকলা অনুষদে নেওয়া হবে শেষ বিদায়ের জন্য। বিকেলে বনানীর কবরস্থানে তাকে দাফন করা হবে।

মৃত্যুর আগে কয়েক মাস ধরে অসুস্থ ছিলেন মুস্তাফা মনোয়ার। প্রোস্টেট ক্যানসারের পাশাপাশি বয়সজনিত নানা জটিলতা ছিল তার। গত ১৪ জুন নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে স্কয়ার হাসপাতালে ভর্তি হন। শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে নেওয়া হয়। কয়েক দিন আগে অবস্থার কিছুটা উন্নতি হওয়ায় ভেন্টিলেটর সাপোর্ট খুলে দেওয়া হয়। কিন্তু পরে আবার অবস্থার অবনতি হলে তাকে ফের ভেন্টিলেটরে নেওয়া হয়। সেখান থেকে আর ফিরে আসেননি তিনি।

মুস্তাফা মনোয়ারের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। এক শোকবার্তায় রাষ্ট্রপতি বলেন, বাংলাদেশের চিত্রকলা, পাপেটশিল্প, নাটক এবং শিশুতোষ অনুষ্ঠান নির্মাণে মুস্তাফা মনোয়ার ছিলেন অন্যতম পথিকৃৎ। দেশীয় সংস্কৃতির বিকাশ ও শিশুদের সৃজনশীলতা বিকাশে তার অবদান জাতি দীর্ঘদিন শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে। তার মৃত্যু দেশের শিল্প ও সংস্কৃতি অঙ্গনের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শোকবার্তায় বলেন, মুস্তাফা মনোয়ারের মৃত্যু দেশের শিল্প ও সংস্কৃতি অঙ্গনে এক বিরাট শূন্যতা সৃষ্টি করেছে, যা সহজে পূরণ করা সম্ভব নয়। জাতি তার অবদানকে সবসময় গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে। একই সঙ্গে তার কাজ ও আদর্শ আগামী প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করবে।

মুস্তাফা মনোয়ারের মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন বিএনপির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকার, পল্লি উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর; জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদের। সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলন, আইন ও সালিশ কেন্দ্রও শোক জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে।

মুস্তাফা মনোয়ারের চলে যাওয়ায় শোকার্ত হয়ে পড়েছে দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গন। গতকাল দুপুরে ধানমন্ডির বাসভবনে ছুটে আসেন শিল্পী, নাট্যব্যক্তিত্ব, শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও শুভানুধ্যায়ীরা। বরেণ্য চিত্রশিল্পী রফিকুন নবী বলেন, মুস্তাফা মনোয়ারের পাপেট শুধু বিনোদনের মাধ্যম ছিল না; সেখানে দেশের মানুষ, প্রকৃতি, সংস্কৃতি এবং সমাজের নানা বাস্তবতা তুলে ধরা হতো। পাপেটকে তিনি অর্থবহ শিল্পমাধ্যমে রূপ দিয়েছিলেন।

ধানমন্ডির বাসায় আসা চিত্রশিল্পীরা স্মরণ করেন, শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের হাত ধরে পূর্ব পাকিস্তানে চারুকলার বিকাশ, ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, বাংলাদেশ টেলিভিশনের বিকাশ থেকে শুরু করে কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারের পেছনের লাল সূর্যের নকশা–সবখানেই মুস্তাফা মনোয়ারের সক্রিয় ভূমিকা ছিল।

ছেলে সাদাত মনোয়ার স্মরণ করেন এক অন্যরকম বাবাকে। তিনি বলেন, ছোটবেলা থেকেই তারা এমন একটি সাংস্কৃতিক পরিবেশে বড় হয়েছেন, যেখানে প্রতিদিন নতুন কিছু সৃষ্টি হতে দেখেছেন। কখনো পাপেট তৈরি, কখনো গান, কখনো নকশা, কখনো ছবি। রঙ-তুলি হাতে নিলেই যেন জাদুর মতো ছবি ফুটে উঠত। তিনি বলেন, বাবা ছিলেন অত্যন্ত ইতিবাচক মানুষ। মৃত্যু বা বিদায়ের কথা কখনো বলতে চাইতেন না। তিনি ছিলেন অমায়িক, স্নেহশীল এবং নতুন প্রজন্মের জন্য নিবেদিত একজন মানুষ। পাপেটশিল্প যেন টিকে থাকে, সে জন্য জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের প্রশিক্ষণ দিয়েছেন বাবা। আনন্দের মধ্য দিয়ে শিক্ষা সবার মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়াই ছিল তার আজীবনের স্বপ্ন।

১৯৩৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর মাগুরা জেলার শ্রীপুরে নানাবাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন মুস্তাফা মনোয়ার। ১৯৫৯ সালে কলকাতা চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয় থেকে ফাইন আর্টসে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়ে উত্তীর্ণ হন। পরের বছর শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের আহ্বানে ঢাকায় এসে পূর্ব পাকিস্তান চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করেন। ১৯৬৫ সালে মেরী মনোয়ারকে বিয়ে করেন। তাদের এক ছেলে সাদাত মনোয়ার ও এক মেয়ে নন্দিনী মনোয়ার।

চারুকলার গণ্ডিতে নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি তিনি। একই বছর পাকিস্তান টেলিভিশনের ঢাকা কেন্দ্র চালু হলে চারুকলার চাকরি ছেড়ে টেলিভিশনে যোগ দেন। তার বিশ্বাস ছিল, বৈরী রাজনৈতিক সময়ে বাংলার সংস্কৃতিকে মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়ার সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম হতে পারে টেলিভিশন। ১৯৭১ সালের ২৩ মার্চ পাকিস্তান দিবসে পাকিস্তানের পতাকা টেলিভিশনে না দেখানোর ঘটনাটি তার সাহসী সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের অন্যতম উদাহরণ। সেদিন নির্ধারিত সময়ের অনেক পরে অনুষ্ঠান শেষ করে তারিখ বদলে ২৪ মার্চ হওয়ার পর পতাকা প্রদর্শন করা হয়েছিল। ফলে পাকিস্তান দিবসে পাকিস্তানের পতাকা দেখানো হয়নি।

একই সময় তার পরিচালনায় প্রচারিত হয় ফজল-এ-খোদার লেখা এবং আজাদ রহমানের সুর করা গণসংগীত ‘সংগ্রাম সংগ্রাম সংগ্রাম, চলবে দিনরাত অবিরাম’। মাত্র ১০ জন শিল্পী গানটি গাইলেও উপস্থাপনার কারণে দর্শকদের কাছে মনে হয়েছিল শত শত কণ্ঠ একসঙ্গে গাইছে।

বাংলাদেশ টেলিভিশনের ইতিহাসেও তার অবদান অনন্য। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘রক্তকরবী’ এবং মুনীর চৌধুরীর অনূদিত ‘মুখরা রমণী বশীকরণ’-এর টেলিভিশন নাট্যরূপ তার পরিচালনায় সম্প্রচারিত হয়। নাটক দুটি যুক্তরাজ্যের গ্রানাডা টেলিভিশনের বিশ্ব টেলিভিশন নাটকের তালিকায় মনোনয়ন পেয়েছিল।

শিশু-কিশোরদের প্রতিভা বিকাশে বিটিভির কিংবদন্তিতুল্য অনুষ্ঠান ‘নতুন কুঁড়ি’র নির্মাতা ছিলেন তিনি। তার নির্মিত ‘মনের কথা’ অনুষ্ঠানও ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। দ্বিতীয় সাফ গেমসের মাস্কট ‘মিশুক’ও তার সৃষ্টি। কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারের পেছনের প্রতীকী লাল সূর্যের নকশা বাস্তবায়নের নেপথ্যেও ছিল তার পরিকল্পনা।

বাংলাদেশে পাপেটশিল্পকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা ছিল মুস্তাফা মনোয়ারের। গ্রামবাংলার পুতুলনাচ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি আধুনিক কাহিনিনির্ভর পাপেটচর্চার পথিকৃৎ হয়ে ওঠেন। কলকাতায় পড়াশোনার সময় ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের পাপেটশিল্প সম্পর্কে জানেন, পরে বিশ্বের নানা দেশে ঘুরে সে অভিজ্ঞতা সমৃদ্ধ করেন। নিজস্ব পাপেট দল এবং বাংলাদেশের লোকজ পাপেট দল ‘ধনমিয়া’কে নিয়ে মস্কো ও তাসখন্দ সফর করেন। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও প্রশংসিত হয় তার পাপেট প্রদর্শনী। ১৯৬০-৬১ সালে কলিম শরাফী তার একটি প্রামাণ্যচিত্রে মুস্তাফা মনোয়ারের পাপেট অন্তর্ভুক্ত করেন।

মুক্তিযুদ্ধের সময় শরণার্থী শিবিরে শিশুদের মুখে হাসি ফোটাতে আয়োজন করেছিলেন পাপেট শো। স্বাধীনতার পর তার তৈরি পাপেটচরিত্র ‘পারুল’ দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে ইউনিসেফের র‌্যাচেল কার্নেগির উদ্যোগে জন্ম নেয় আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত শিশু চরিত্র ‘মীনা’। টেলিভিশনের ‘আজব দেশে’ অনুষ্ঠানে তার তৈরি করা ‘বাঘা’ ও ‘মেনি’ চরিত্রও শিশুদের কাছে হয়ে ওঠে অত্যন্ত জনপ্রিয়।

বাংলাদেশ টেলিভিশনের উপ-মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তিনি শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক, জাতীয় গণমাধ্যম ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক, বাংলাদেশ টেলিভিশনের জেনারেল ম্যানেজার, বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক, জনবিভাগ উন্নয়ন কেন্দ্রের চেয়ারম্যান এবং এডুকেশনাল পাপেট ডেভেলপমেন্ট সেন্টারের প্রকল্প পরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন মুস্তাফা মনোয়ার।

শিল্পকলায় অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ২০০৪ সালে তিনি একুশে পদকে ভূষিত হন। 

আজ শায়িত হবেন বনানীতে বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী ছিলেন মুস্তাফা মনোয়ার

প্রকাশ: ৩০ জুন ২০২৬, ০৮:৪৯ এএম
আপডেট: ৩০ জুন ২০২৬, ০৯:১০ এএম
বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী ছিলেন মুস্তাফা মনোয়ার
ছবি: মুস্তাফা মনোয়ার

বাংলাদেশের শিল্প-সংস্কৃতির এক উজ্জ্বল নক্ষত্র নিভে গেল। চারুশিল্পী, নাট্যনির্দেশক, শিল্প গবেষক, পাপেটশিল্পের অন্যতম পথিকৃৎ, শিশুতোষ অনুষ্ঠান নির্মাতা এবং বহুমাত্রিক সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব মুস্তাফা মনোয়ার আর নেই (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।

দীর্ঘদিন নানা শারীরিক জটিলতায় ভোগার পর গতকাল সোমবার সকাল সাড়ে ৮টার দিকে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। এই সব্যসাচী শিল্পীর বয়স হয়েছিল ৯১ বছর।

গতকাল দুপুরে হাসপাতাল থেকে মুস্তাফা মনোয়ারের মরদেহ প্রথমে ধানমন্ডির তাকওয়া মসজিদে নেওয়া হয়। সেখানে গোসল শেষে দুপুরে ধানমন্ডির এক নম্বর সড়কের নিজ বাসভবনে আনা হয়। পরিবারের সদস্য, সহকর্মী, শিল্পী, শুভানুধ্যায়ী ও অনুরাগীরা সেখানে শেষ শ্রদ্ধা জানান। পরে মরদেহ স্কয়ার হাসপাতালের হিমঘরে রাখা হয়।

পরিবার ও সহকর্মীদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আজ মঙ্গলবার সকাল ৯টায় বাংলাদেশ টেলিভিশন প্রাঙ্গণে তার প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। এরপর মরদেহ নেওয়া হবে রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে, যেখানে সকাল সাড়ে ১০টা থেকে দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা জানানোর সুযোগ থাকবে। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে দ্বিতীয় জানাজা শেষে তার দীর্ঘ কর্মস্থল চারুকলা অনুষদে নেওয়া হবে শেষ বিদায়ের জন্য। বিকেলে বনানীর কবরস্থানে তাকে দাফন করা হবে।

মৃত্যুর আগে কয়েক মাস ধরে অসুস্থ ছিলেন মুস্তাফা মনোয়ার। প্রোস্টেট ক্যানসারের পাশাপাশি বয়সজনিত নানা জটিলতা ছিল তার। গত ১৪ জুন নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে স্কয়ার হাসপাতালে ভর্তি হন। শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে নেওয়া হয়। কয়েক দিন আগে অবস্থার কিছুটা উন্নতি হওয়ায় ভেন্টিলেটর সাপোর্ট খুলে দেওয়া হয়। কিন্তু পরে আবার অবস্থার অবনতি হলে তাকে ফের ভেন্টিলেটরে নেওয়া হয়। সেখান থেকে আর ফিরে আসেননি তিনি।

মুস্তাফা মনোয়ারের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। এক শোকবার্তায় রাষ্ট্রপতি বলেন, বাংলাদেশের চিত্রকলা, পাপেটশিল্প, নাটক এবং শিশুতোষ অনুষ্ঠান নির্মাণে মুস্তাফা মনোয়ার ছিলেন অন্যতম পথিকৃৎ। দেশীয় সংস্কৃতির বিকাশ ও শিশুদের সৃজনশীলতা বিকাশে তার অবদান জাতি দীর্ঘদিন শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে। তার মৃত্যু দেশের শিল্প ও সংস্কৃতি অঙ্গনের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শোকবার্তায় বলেন, মুস্তাফা মনোয়ারের মৃত্যু দেশের শিল্প ও সংস্কৃতি অঙ্গনে এক বিরাট শূন্যতা সৃষ্টি করেছে, যা সহজে পূরণ করা সম্ভব নয়। জাতি তার অবদানকে সবসময় গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে। একই সঙ্গে তার কাজ ও আদর্শ আগামী প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করবে।

মুস্তাফা মনোয়ারের মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন বিএনপির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকার, পল্লি উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর; জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদের। সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলন, আইন ও সালিশ কেন্দ্রও শোক জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে।

মুস্তাফা মনোয়ারের চলে যাওয়ায় শোকার্ত হয়ে পড়েছে দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গন। গতকাল দুপুরে ধানমন্ডির বাসভবনে ছুটে আসেন শিল্পী, নাট্যব্যক্তিত্ব, শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও শুভানুধ্যায়ীরা। বরেণ্য চিত্রশিল্পী রফিকুন নবী বলেন, মুস্তাফা মনোয়ারের পাপেট শুধু বিনোদনের মাধ্যম ছিল না; সেখানে দেশের মানুষ, প্রকৃতি, সংস্কৃতি এবং সমাজের নানা বাস্তবতা তুলে ধরা হতো। পাপেটকে তিনি অর্থবহ শিল্পমাধ্যমে রূপ দিয়েছিলেন।

ধানমন্ডির বাসায় আসা চিত্রশিল্পীরা স্মরণ করেন, শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের হাত ধরে পূর্ব পাকিস্তানে চারুকলার বিকাশ, ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, বাংলাদেশ টেলিভিশনের বিকাশ থেকে শুরু করে কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারের পেছনের লাল সূর্যের নকশা–সবখানেই মুস্তাফা মনোয়ারের সক্রিয় ভূমিকা ছিল।

ছেলে সাদাত মনোয়ার স্মরণ করেন এক অন্যরকম বাবাকে। তিনি বলেন, ছোটবেলা থেকেই তারা এমন একটি সাংস্কৃতিক পরিবেশে বড় হয়েছেন, যেখানে প্রতিদিন নতুন কিছু সৃষ্টি হতে দেখেছেন। কখনো পাপেট তৈরি, কখনো গান, কখনো নকশা, কখনো ছবি। রঙ-তুলি হাতে নিলেই যেন জাদুর মতো ছবি ফুটে উঠত। তিনি বলেন, বাবা ছিলেন অত্যন্ত ইতিবাচক মানুষ। মৃত্যু বা বিদায়ের কথা কখনো বলতে চাইতেন না। তিনি ছিলেন অমায়িক, স্নেহশীল এবং নতুন প্রজন্মের জন্য নিবেদিত একজন মানুষ। পাপেটশিল্প যেন টিকে থাকে, সে জন্য জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের প্রশিক্ষণ দিয়েছেন বাবা। আনন্দের মধ্য দিয়ে শিক্ষা সবার মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়াই ছিল তার আজীবনের স্বপ্ন।

১৯৩৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর মাগুরা জেলার শ্রীপুরে নানাবাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন মুস্তাফা মনোয়ার। ১৯৫৯ সালে কলকাতা চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয় থেকে ফাইন আর্টসে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়ে উত্তীর্ণ হন। পরের বছর শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের আহ্বানে ঢাকায় এসে পূর্ব পাকিস্তান চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করেন। ১৯৬৫ সালে মেরী মনোয়ারকে বিয়ে করেন। তাদের এক ছেলে সাদাত মনোয়ার ও এক মেয়ে নন্দিনী মনোয়ার।

চারুকলার গণ্ডিতে নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি তিনি। একই বছর পাকিস্তান টেলিভিশনের ঢাকা কেন্দ্র চালু হলে চারুকলার চাকরি ছেড়ে টেলিভিশনে যোগ দেন। তার বিশ্বাস ছিল, বৈরী রাজনৈতিক সময়ে বাংলার সংস্কৃতিকে মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়ার সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম হতে পারে টেলিভিশন। ১৯৭১ সালের ২৩ মার্চ পাকিস্তান দিবসে পাকিস্তানের পতাকা টেলিভিশনে না দেখানোর ঘটনাটি তার সাহসী সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের অন্যতম উদাহরণ। সেদিন নির্ধারিত সময়ের অনেক পরে অনুষ্ঠান শেষ করে তারিখ বদলে ২৪ মার্চ হওয়ার পর পতাকা প্রদর্শন করা হয়েছিল। ফলে পাকিস্তান দিবসে পাকিস্তানের পতাকা দেখানো হয়নি।

একই সময় তার পরিচালনায় প্রচারিত হয় ফজল-এ-খোদার লেখা এবং আজাদ রহমানের সুর করা গণসংগীত ‘সংগ্রাম সংগ্রাম সংগ্রাম, চলবে দিনরাত অবিরাম’। মাত্র ১০ জন শিল্পী গানটি গাইলেও উপস্থাপনার কারণে দর্শকদের কাছে মনে হয়েছিল শত শত কণ্ঠ একসঙ্গে গাইছে।

বাংলাদেশ টেলিভিশনের ইতিহাসেও তার অবদান অনন্য। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘রক্তকরবী’ এবং মুনীর চৌধুরীর অনূদিত ‘মুখরা রমণী বশীকরণ’-এর টেলিভিশন নাট্যরূপ তার পরিচালনায় সম্প্রচারিত হয়। নাটক দুটি যুক্তরাজ্যের গ্রানাডা টেলিভিশনের বিশ্ব টেলিভিশন নাটকের তালিকায় মনোনয়ন পেয়েছিল।

শিশু-কিশোরদের প্রতিভা বিকাশে বিটিভির কিংবদন্তিতুল্য অনুষ্ঠান ‘নতুন কুঁড়ি’র নির্মাতা ছিলেন তিনি। তার নির্মিত ‘মনের কথা’ অনুষ্ঠানও ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। দ্বিতীয় সাফ গেমসের মাস্কট ‘মিশুক’ও তার সৃষ্টি। কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারের পেছনের প্রতীকী লাল সূর্যের নকশা বাস্তবায়নের নেপথ্যেও ছিল তার পরিকল্পনা।

বাংলাদেশে পাপেটশিল্পকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা ছিল মুস্তাফা মনোয়ারের। গ্রামবাংলার পুতুলনাচ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি আধুনিক কাহিনিনির্ভর পাপেটচর্চার পথিকৃৎ হয়ে ওঠেন। কলকাতায় পড়াশোনার সময় ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের পাপেটশিল্প সম্পর্কে জানেন, পরে বিশ্বের নানা দেশে ঘুরে সে অভিজ্ঞতা সমৃদ্ধ করেন। নিজস্ব পাপেট দল এবং বাংলাদেশের লোকজ পাপেট দল ‘ধনমিয়া’কে নিয়ে মস্কো ও তাসখন্দ সফর করেন। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও প্রশংসিত হয় তার পাপেট প্রদর্শনী। ১৯৬০-৬১ সালে কলিম শরাফী তার একটি প্রামাণ্যচিত্রে মুস্তাফা মনোয়ারের পাপেট অন্তর্ভুক্ত করেন।

মুক্তিযুদ্ধের সময় শরণার্থী শিবিরে শিশুদের মুখে হাসি ফোটাতে আয়োজন করেছিলেন পাপেট শো। স্বাধীনতার পর তার তৈরি পাপেটচরিত্র ‘পারুল’ দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে ইউনিসেফের র‌্যাচেল কার্নেগির উদ্যোগে জন্ম নেয় আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত শিশু চরিত্র ‘মীনা’। টেলিভিশনের ‘আজব দেশে’ অনুষ্ঠানে তার তৈরি করা ‘বাঘা’ ও ‘মেনি’ চরিত্রও শিশুদের কাছে হয়ে ওঠে অত্যন্ত জনপ্রিয়।

বাংলাদেশ টেলিভিশনের উপ-মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তিনি শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক, জাতীয় গণমাধ্যম ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক, বাংলাদেশ টেলিভিশনের জেনারেল ম্যানেজার, বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক, জনবিভাগ উন্নয়ন কেন্দ্রের চেয়ারম্যান এবং এডুকেশনাল পাপেট ডেভেলপমেন্ট সেন্টারের প্রকল্প পরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন মুস্তাফা মনোয়ার।

শিল্পকলায় অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ২০০৪ সালে তিনি একুশে পদকে ভূষিত হন। 

বই-ই তার বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশ: ২৮ জুন ২০২৬, ০৯:১৮ এএম
আপডেট: ২৮ জুন ২০২৬, ০৯:২৪ এএম
বই-ই তার বিশ্ববিদ্যালয়
ছবি: খবরের কাগজ

বিদ্যালয়ে গিয়েছিলেন মাত্র এক দিন। এরপর আর কখনো শ্রেণিকক্ষে বসার সুযোগ হয়নি। সংসারের অভাব-অনটন তাকে বই থেকে নয়, স্কুল থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু যে মানুষটির আনুষ্ঠানিক শিক্ষাজীবন শুরু হওয়ার আগেই থেমে গিয়েছিল, তিনি থামিয়ে রাখেননি নিজের শেখার পথ। বইকেই করেছেন শিক্ষক। বইকেই বানিয়েছেন আজীবনের সঙ্গী। বইয়ের আলোয় নিজেকে গড়ে তুলেছেন স্বশিক্ষিত, আলোকিত মানুষ হিসেবে। বইয়ের জগতে বিচরণ করেই বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাদ পেয়েছেন তিনি।

রাজশাহীর তানোর উপজেলার মাড়িয়া গ্রামের বাসিন্দা সত্যেন্দ্রনাথ প্রামাণিকের (৫৭) জীবন যেন বইয়ের পাতায় লেখা এক অনুপ্রেরণার গল্প। ছোট্ট একটি টিনের ঘরে তার বসবাস। বাইরে থেকে সাধারণ সেই ঘরটির ভেতরে রয়েছে অন্য এক রত্নভান্ডার। এক পাশে শোয়ার জায়গা, অন্য পাশে সারি সারি বই। ঘরে ঢুকতে হলে মাথা নিচু করতে হয়, কিন্তু সেই ঘরে বসে যে মানুষটি জ্ঞানের সাধনা করেন, তার চিন্তার পরিধি অনেক বিস্তৃত। অনেক গভীর।

কৃষক উপেন্দ্রনাথ প্রামাণিকের বড় ছেলে সত্যেন্দ্রনাথ। পরিবারের বড় সন্তান হওয়ায় ছোটবেলা থেকেই সংসারের দায়িত্ব এসে পড়ে তার কাঁধে। আর্থিক সংকটের কারণে নিয়মিত বিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ হয়নি। তবে তার শিক্ষা শুরু হয়েছিল গৃহেই। মা গীতা রানী, যিনি নিজে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছিলেন, তিনিই ছেলের প্রথম বর্ণপরিচয় ঘটান। সেই সামান্য শিক্ষাই হয়ে ওঠে তার সারা জীবনের জ্ঞানের ভিত্তি।

এক দিন গ্রামের শিক্ষক এরফান কাকা তাকে বিদ্যালয়ে নিয়ে যান। শ্রেণিকক্ষে স্বরবর্ণ ও ব্যঞ্জনবর্ণ পড়তে দিলে ছোট্ট সত্যেন্দ্রনাথ সেগুলো অনর্গল পড়ে শোনান। শিক্ষক বিস্মিত হন। কিন্তু সেটিই ছিল তার জীবনের প্রথম এবং শেষ স্কুলে যাওয়া। এরপর অভাব-অনটনের বাস্তবতা তাকে আর বিদ্যালয়ের পথে ফিরতে দেয়নি। তবে শিক্ষা থেকে নয়, তিনি দূরে ছিলেন শুধু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বাইরে। সমবয়সী বন্ধুদের স্কুলে যেতে দেখে তার ভেতরে জন্ম নেয় জানার ও শেখার তীব্র আকাঙ্ক্ষা। সেই আকাঙ্ক্ষা থেকেই কৈশোরে বই পড়ার অভ্যাস গড়ে ওঠে। প্রথমে উপন্যাস, তারপর ধীরে ধীরে ইতিহাস, দর্শন, বিজ্ঞান, নৃতত্ত্ব, সমাজচিন্তা–একসময় বইয়ের জগৎই হয়ে ওঠে তার প্রকৃত শিক্ষাঙ্গন।

ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়, নীহাররঞ্জন গুপ্ত, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সাহিত্য দিয়ে শুরু হওয়া সেই যাত্রা আজও থামেনি। বই পড়ে তিনি আজ বিস্ময়কর এক জ্ঞানভান্ডার। তার বিশ্বাস, ‘বইপুস্তক বা সাহিত্যচর্চা ছাড়া মানবতার পূর্ণ বিকাশ হয় না।’ জীবিকার প্রয়োজনে কৃষিকাজের পাশাপাশি দীর্ঘদিন দেশের বিভিন্ন স্থানে পদাবলী কীর্তন গেয়ে বেড়িয়েছেন তিনি। কিন্তু ভ্রমণের প্রতিটি পথই তার কাছে ছিল বই খোঁজার নতুন নতুন সুযোগ। রেলস্টেশনের ছোট্ট লাইব্রেরি, পুরোনো বইয়ের দোকান কিংবা যেখানেই ভালো বইয়ের সন্ধান পেয়েছেন, সেখান থেকেই সংগ্রহ করেছেন। আজও কোনো বই ভালো লাগলে সেটি সংগ্রহ করার চেষ্টা করেন।

নিজে কখনো স্কুলের গণ্ডি পেরোতে না পারলেও সন্তানদের শিক্ষিত করে তুলেছেন স্বপ্নসম উচ্চতায়। বড় ছেলে সঞ্জয় কুমার প্রামাণিক বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং (ইইই) বিভাগে পড়াশোনা শেষ করে বর্তমানে ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানিতে কাজ করছেন। মেয়ে নীপা প্রামাণিক রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর শেষ করে সরকারি চাকরির প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

সত্যেন্দ্রনাথের বিশ্বাস, তার বইপড়ার অভ্যাসই সন্তানদের পড়াশোনায় অনুপ্রাণিত করেছে। তিনি বলেন, ‘আমার ছেলেমেয়েরা আমাকে বুঝত। আমার বই পড়ার ঝোঁক তাদেরও পড়াশোনার প্রতি আগ্রহী করে তোলে।’

তার ছোট ভাই ভবেন্দ্রনাথ প্রামাণিক বর্তমানে একটি উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক। তবুও বড় ভাই সত্যেন্দ্রনাথকেই তিনি নিজের অন্যতম শিক্ষক মনে করেন। তার স্মৃতিতে এখনো ভাসে বিদ্যুৎবিহীন রাতের সেই দৃশ্য–তেলের বাতির ক্ষীণ আলোয় ঘণ্টার পর ঘণ্টা বই পড়ে গেছেন সত্যেন্দ্রনাথ। বাবার বকুনি, সংসারের অভাব–কিছুই তাকে বই থেকে দূরে রাখতে পারেনি।

নিজের লেখাপড়ার সুযোগ না থাকলেও ছোট দুই ভাইকে মানুষ করতে, তাদের শিক্ষিত করে তুলতে নিজের স্বপ্ন বিসর্জন দিয়েছেন তিনি। আজ সেই ত্যাগকে জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি বলে মনে করেন। জীবনের দীর্ঘ সংগ্রামের গল্প আমাদের বলতে গিয়ে তার কণ্ঠে কোনো অভিযোগ ছিল না। শুধু আক্ষেপ একধরনের অপূর্ণতার। তার মনে নতুন গান আসে, নতুন সুর জন্ম নেয়। কীর্তন গাইতে পারেন, কিন্তু লিখে রাখতে পারেন না। লেখার অক্ষমতাই তার জীবনের একমাত্র আক্ষেপ। তবুও তিনি থেমে যাননি। প্রতিদিন বইয়ের পাতা উল্টেপাল্টে তিনি নতুন করে জীবনকে চিনতে শেখেন। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সনদ ছাড়াও একজন মানুষ যে জ্ঞানের আলোয় আলোকিত হতে পারেন, সত্যেন্দ্রনাথ প্রামাণিক তার জীবন্ত উদাহরণ। তার জীবন যেন বলে–বিদ্যালয়ে যাওয়া নয়, শেখার ইচ্ছাই একজন মানুষকে প্রকৃত অর্থে শিক্ষিত করে তোলে।

সত্যেন্দ্রনাথ প্রামাণিক বলেন, ‘আমি স্কুলে পড়ার সুযোগ পাইনি, কিন্তু বইকে কখনো ছেড়ে দিইনি। আমার বিশ্বাস, মানুষের সবচেয়ে বড় শিক্ষক বই। বই মানুষকে শুধু জ্ঞান দেয় না, মানুষ হতে শেখায়। আজ যদি আমার জীবনে কোনো আলোর দিক থেকে থাকে, সেটি এই বই পড়ার অভ্যাসের কারণেই অর্জিত হয়েছে।’

গান, কবিতা ও স্মৃতিচারণে কামাল লোহানীর জন্মবার্ষিকী উদযাপন

প্রকাশ: ২৬ জুন ২০২৬, ০৮:৩৪ পিএম
আপডেট: ২৬ জুন ২০২৬, ০৯:০৫ পিএম
গান, কবিতা ও স্মৃতিচারণে কামাল লোহানীর জন্মবার্ষিকী উদযাপন
ছবি: খবরের কাগজ

গান, কবিতা আর সহযোদ্ধাদের সশ্রদ্ধ স্মৃতিচারণের মধ্য দিয়ে উদযাপিত হয়েছে বিশিষ্ট সাংবাদিক, ভাষা সংগ্রামী ও স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শব্দসৈনিক কামাল লোহানীর ৯২তম জন্মবার্ষিকী।

শুক্রবার (২৬ জুন) বিকেলে রাজধানীর পুরানা পল্টনের কমরেড মনিসিংহ-ফরহাদ স্মৃতি ট্রাস্ট মিলনায়তনে বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী এই উদযাপন অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।

উদীচী কেন্দ্রীয় সংসদের নেতারা কামাল লোহানীর প্রতিকৃতিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ ও প্রদীপ প্রজ্জ্বলনের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সূচনা করেন। এরপর উদীচী কেন্দ্রীয় সঙ্গীত বিভাগের শিল্পীরা ‘কোন আলোতে প্রাণের প্রদীপ’ গানটি সমবেত কণ্ঠে পরিবেশন করেন। একক আবৃত্তি পরিবেশন করেন উদীচীর কেন্দ্রীয় সম্পাদকণ্ডলীর সদস্য শিখা সেন গুপ্তা এবং ঢাকা মহানগর সংসদের আবৃত্তি সম্পাদক সুমিত পাল। একক সঙ্গীত পরিবেশন করেন বিজয় বণিক।

উদীচী কেন্দ্রীয় সংসদের সহসভাপতি শিবাণী ভট্টাচার্য্যের সভাপতিত্বে আলোচনা পর্বে বক্তব্য রাখেন উদীচীর সাধারণ সম্পাদক অমিত রঞ্জন দে, সহ-সভাপতি প্রবীর সরদার, সহসাধারণ সম্পাদক প্রদীপ ঘোষ, সদস্য নিবাস দে, বাংলাদেশ যুব ইউনিয়নের সভাপতি খান আসাদুজ্জামান মাসুম, কেন্দ্রীয় খেলাঘর আসরের সাধারণ সম্পাদক রেজাউল কবির, উদীচীর সাবেক সভাপতি প্রয়াত অধ্যাপক বদিউর রহমানের কন্যা সুপা সাদিয়া এবং ঢাকা মহানগর সংসদের সাধারণ সম্পাদক কংকন নাগ। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন উদীচীর সংগঠন বিষয়ক সম্পাদক শেখ আনিসুর রহমান।

আলোচনায় বক্তারা কামাল লোহানীর প্রগতিশীল আন্দোলন-সংগ্রাম ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে তার অনবদ্য ভূমিকার কথা তুলে ধরেন।

উদীচীর সাধারণ সম্পাদক অমিত রঞ্জন দে বলেন, "কামাল লোহানী তার দীর্ঘ জীবনে ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ছয় দফা, গণঅভ্যুত্থান ও মহান মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর নিয়াজির আত্মসমর্পণের ঐতিহাসিক সংবাদটি তিনি নিজেই লিখে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে পাঠ করেছিলেন।

তিনি আরও উল্লেখ করেন, ২০১২ সালে উদীচীর সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর কামাল লোহানী সারাদেশে সংগঠনকে বিস্তৃত করেন এবং ২০১৩ সালে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে দেশব্যাপী কর্মসূচিতে নেতৃত্ব দেন। এছাড়া গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলন ও উদীচীর নেতৃত্বে সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী দক্ষিণ এশীয় কনভেনশন আয়োজনে তার ভূমিকা ছিল অনন্য।

সভাপতির বক্তব্যে শিবাণী ভট্টাচার্য্য বলেন, কামাল লোহানী ছায়ানট ও ক্রান্তির মতো সংগঠনে যুক্ত থেকে নৃত্য, আবৃত্তি ও অভিনয়ে অংশ নিয়েছেন। তিনি আমৃত্যু প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক সংগ্রামের সাথে যুক্ত ছিলেন।

অন্যান্য বক্তারা বলেন, বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড, স্বৈরাচারবিরোধী উদীচী কেন্দ্রীয় সঙ্গীত বিভাগের শিল্পীদের সমবেত কণ্ঠে ‘আজি শুভদিনে পিতার ভবনে’ গানটি পরিবেশনার মধ্য দিয়ে কামাল লোহানীর ৯২তম জন্মবার্ষিকীর অনুষ্ঠান শেষ হয়।

জয়ন্ত সাহা/এএফ

শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে সাত দশকের অগ্রগতির দাবি প্রশ্নবিদ্ধ: সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

প্রকাশ: ২৩ জুন ২০২৬, ০৭:১১ পিএম
আপডেট: ২৩ জুন ২০২৬, ০৭:৫৯ পিএম
শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে সাত দশকের অগ্রগতির দাবি প্রশ্নবিদ্ধ: সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
বাংলা একাডেমিতে নিজের ৯১তম জন্মদিনের আয়োজনে বক্তৃতা করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। ছবি: খবরের কাগজ

বাইরে চকচকে দালানকোঠা আর রাস্তাঘাটের বিপুল উন্নতি হলেও ভেতরে ভেতরে সমাজ কতটা পচে গেছে, সেই রূঢ় বাস্তবতা তুলে ধরে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী।

বাংলাদেশের শিশুদের ভয়াবহ পরিস্থিতির তুলনা করে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, সাত-আট দশকের এই বস্তুগত উন্নয়ন ও তথাকথিত অগ্রগতির শেষ পরিণতি কী তবে অবোধ শিশুদের ওপর পাশবিক নির্যাতন আর হত্যাকাণ্ড?

মঙ্গলবার (২৩ জুন) বিকেলে বাংলা একাডেমিতে নিজের ৯১তম জন্মদিনের আয়োজনে ‘কী দেখেছি, কী বুঝেছি’ শিরোনামে এক আত্মজৈবনিক বক্তৃতায় প্রবীণ এই চিন্তাবিদ রাষ্ট্র ও সমাজের গতিপ্রকৃতি নিয়ে নিজের এসব গভীর পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীকে জন্মদিনে ফুলেল শ্রদ্ধা। ছবি: খবরের কাগজ

অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, 'অনেক উন্নতি হয়েছে উপর কাঠামোতে, বস্তুগতভাবে, চেহারায়, দালানকোঠায়, রাস্তাঘাটে প্রচুর উন্নতি হয়েছে। কিন্তু ভেতরে?'

শৈশবের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, "৪৩-এর দুর্ভিক্ষের সময়ে রাজশাহীতে আমার মা এক পরিত্যক্ত শিশুকে নিজের কাছে আশ্রয় দিয়েছিলেন, যাকে জঙ্গল থেকে কুড়িয়ে পাওয়া গিয়েছিল। মা তার নাম দিয়েছিলেন ‘কুরানি’। সে আমাদের সাথেই বড় হয়েছে। সেই শিশু তখন পরিত্যক্ত অবস্থায় থাকলেও, তার ওপর অন্য কোনো অত্যাচার হয় নাই।"

বর্তমান সময়ের নির্মমতার চিত্র টেনে তিনি ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, "আজকে বাংলাদেশে শিশুদের কী অবস্থা, তা আপনাদের সবারই জানা। আজকে শিশুরা কীভাবে ধর্ষিত হচ্ছে, কীভাবে ধর্ষণের পরে তাকে হত্যা করা হচ্ছে! ভেতরে ওই যে শিশু পরিত্যক্ত হয়েছিল ৪৩-এর দুর্ভিক্ষে, আজকে ২০২৬ সালে সেই শিশু ধর্ষিত হচ্ছে এবং তাকে ধর্ষণের পরে হত্যা করা হচ্ছে। এই ধারাবাহিকতাটা আমি লক্ষ্য করেছি।"

নিজের দীর্ঘ জীবনে ব্রিটিশ, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ—এই তিনটি রাষ্ট্র দেখার অভিজ্ঞতা ব্যক্ত করে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, আয়তন, নাম, পতাকা কিংবা শাসকের পরিচয়ে পার্থক্য থাকলেও চরিত্রগতভাবে এই তিন রাষ্ট্রের মধ্যে এক গভীর ও নির্মম সাদৃশ্য রয়েছে। তিনটি রাষ্ট্রই ছিল মূলত পিতৃতান্ত্রিক, পুঁজিবাদী এবং আমলাতান্ত্রিক।

রাষ্ট্র ও সমাজের পারস্পরিক সম্পর্ক তুলে ধরে তিনি বলেন, রাষ্ট্র ও সমাজ বিচ্ছিন্ন নয়, বরং রাষ্ট্র সবসময় সমাজের ওপর কর্তৃত্ব খাটায়। তার ভাষায়, "আমাদের সকলেরই অভিজ্ঞতা এই যে, রাষ্ট্র কি রকম পিতৃতান্ত্রিক এবং সমাজ অনেকটা মায়ের মতো। সমাজ আমাদেরকে আশ্রয় দেয়, লালন-পালন করে; কিন্তু কর্তৃত্ব থাকে ওই পিতৃতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ওপর। রাষ্ট্র ভাঙলেও সমাজ কিন্তু রাষ্ট্রের তুলনায় অনেক বেশি দীর্ঘস্থায়ী হয়।"

অনুষ্ঠানে দেশের বিশিষ্ট নাগরিক, শিক্ষাবিদ ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরা উপস্থিত ছিলেন। 

জয়ন্ত সাহা/এসএন

জাতীয়ভিত্তিক গ্রন্থপাঠ প্রতিযোগিতায় সেরা হলো বাতিঘর আদর্শ পাঠাগার

প্রকাশ: ২৩ জুন ২০২৬, ১২:৩৪ পিএম
জাতীয়ভিত্তিক গ্রন্থপাঠ প্রতিযোগিতায় সেরা হলো বাতিঘর আদর্শ পাঠাগার
সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী। ছবি: খবরের কাগজ

জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র আয়োজিত জাতীয়ভিত্তিক গ্রন্থপাঠ প্রতিযোগিতায় স্কুল পর্যায়ে দেশসেরা ১০ জনের মধ্যে নির্বাচিত হয়েছেন বাতিঘর আদর্শ পাঠাগারের সদস্য ও পাঠক ফাওজিয়াহ হক জিনাত।

সোমবার (২২ জুন) বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সংগীত ও নৃত্যশালা মিলনায়তনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে তার হাতে সনদ ও পুরস্কার তুলে দেন সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী। 

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব কানিজ মওলা। এছাড়া মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন জাতীয়ভিত্তিক গ্রন্থপাঠ কার্যক্রমের বিচারকমণ্ডলীর সদস্য লেখক ও অধ্যাপক ড. কাজী মোস্তাক গাউসুল হক, কথাসাহিত্যিক শাহনাজ মুন্নী এবং লেখক ও সংগঠক সাবিদিন ইব্রাহিম। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের পরিচালক আফসানা বেগম।

অনুষ্ঠানে দেশের বিভিন্ন বেসরকারি গ্রন্থাগারের প্রতিনিধি, পাঠক-শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং সংস্কৃতি অঙ্গনের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।

দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ৭২টি বেসরকারি গ্রন্থাগার থেকে মোট ৬৪৭ জন পাঠক-শিক্ষার্থী এ কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করেন। প্রাথমিক মূল্যায়নের ভিত্তিতে ১৪৫ জনকে চূড়ান্ত মূল্যায়নের জন্য নির্বাচিত করা হয়। নির্বাচিতদের নিয়ে ৮ থেকে ১০ জুন ২০২৬ পর্যন্ত তিন দিনব্যাপী জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র মিলনায়তনে পাঠ-উত্তর মূল্যায়ন অনুষ্ঠিত হয়। এতে অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের পাঠ-অনুভূতি মৌখিকভাবে গ্রহণ করা হয় এবং উপস্থাপনার ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা হয়।

স্কুল পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের পাঠ-পরবর্তী প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করার জন্য হুমায়ূন আহমেদ রচিত সায়েন্স ফিকশন গ্রন্থ তোমাদের জন্য ভালোবাসা নির্ধারণ করা হয়েছিল।

উল্লেখ্য, ‘এসো বই পড়ি, নিজেকে আলোকিত করি’ স্লোগানকে সামনে রেখে ২০১০ সালে টাঙ্গাইল সদর উপজেলার চৌরাকররা গ্রামে গড়ে ওঠে বাতিঘর আদর্শ পাঠাগার। প্রতিষ্ঠার পর থেকে পাঠাগারটি মানুষের মধ্যে পাঠাভ্যাস গড়ে তোলা এবং জ্ঞানভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণে সেলুন, বাসস্ট্যান্ড ও স্টেশনে অণু-পাঠাগার স্থাপনসহ বিভিন্ন শিক্ষামূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে আসছে। পাশাপাশি আর্তমানবতার সেবায় বিভিন্ন সামাজিক কার্যক্রমও পরিচালনা করে আসছে।

জুয়েল রানা/রিফাত/