বাংলাদেশের শিল্প-সংস্কৃতির এক উজ্জ্বল নক্ষত্র নিভে গেল। চারুশিল্পী, নাট্যনির্দেশক, শিল্প গবেষক, পাপেটশিল্পের অন্যতম পথিকৃৎ, শিশুতোষ অনুষ্ঠান নির্মাতা এবং বহুমাত্রিক সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব মুস্তাফা মনোয়ার আর নেই (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।
দীর্ঘদিন নানা শারীরিক জটিলতায় ভোগার পর গতকাল সোমবার সকাল সাড়ে ৮টার দিকে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। এই সব্যসাচী শিল্পীর বয়স হয়েছিল ৯১ বছর।
গতকাল দুপুরে হাসপাতাল থেকে মুস্তাফা মনোয়ারের মরদেহ প্রথমে ধানমন্ডির তাকওয়া মসজিদে নেওয়া হয়। সেখানে গোসল শেষে দুপুরে ধানমন্ডির এক নম্বর সড়কের নিজ বাসভবনে আনা হয়। পরিবারের সদস্য, সহকর্মী, শিল্পী, শুভানুধ্যায়ী ও অনুরাগীরা সেখানে শেষ শ্রদ্ধা জানান। পরে মরদেহ স্কয়ার হাসপাতালের হিমঘরে রাখা হয়।
পরিবার ও সহকর্মীদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আজ মঙ্গলবার সকাল ৯টায় বাংলাদেশ টেলিভিশন প্রাঙ্গণে তার প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। এরপর মরদেহ নেওয়া হবে রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে, যেখানে সকাল সাড়ে ১০টা থেকে দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা জানানোর সুযোগ থাকবে। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে দ্বিতীয় জানাজা শেষে তার দীর্ঘ কর্মস্থল চারুকলা অনুষদে নেওয়া হবে শেষ বিদায়ের জন্য। বিকেলে বনানীর কবরস্থানে তাকে দাফন করা হবে।
মৃত্যুর আগে কয়েক মাস ধরে অসুস্থ ছিলেন মুস্তাফা মনোয়ার। প্রোস্টেট ক্যানসারের পাশাপাশি বয়সজনিত নানা জটিলতা ছিল তার। গত ১৪ জুন নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে স্কয়ার হাসপাতালে ভর্তি হন। শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে নেওয়া হয়। কয়েক দিন আগে অবস্থার কিছুটা উন্নতি হওয়ায় ভেন্টিলেটর সাপোর্ট খুলে দেওয়া হয়। কিন্তু পরে আবার অবস্থার অবনতি হলে তাকে ফের ভেন্টিলেটরে নেওয়া হয়। সেখান থেকে আর ফিরে আসেননি তিনি।
মুস্তাফা মনোয়ারের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। এক শোকবার্তায় রাষ্ট্রপতি বলেন, বাংলাদেশের চিত্রকলা, পাপেটশিল্প, নাটক এবং শিশুতোষ অনুষ্ঠান নির্মাণে মুস্তাফা মনোয়ার ছিলেন অন্যতম পথিকৃৎ। দেশীয় সংস্কৃতির বিকাশ ও শিশুদের সৃজনশীলতা বিকাশে তার অবদান জাতি দীর্ঘদিন শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে। তার মৃত্যু দেশের শিল্প ও সংস্কৃতি অঙ্গনের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শোকবার্তায় বলেন, মুস্তাফা মনোয়ারের মৃত্যু দেশের শিল্প ও সংস্কৃতি অঙ্গনে এক বিরাট শূন্যতা সৃষ্টি করেছে, যা সহজে পূরণ করা সম্ভব নয়। জাতি তার অবদানকে সবসময় গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে। একই সঙ্গে তার কাজ ও আদর্শ আগামী প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করবে।
মুস্তাফা মনোয়ারের মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন বিএনপির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকার, পল্লি উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর; জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদের। সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলন, আইন ও সালিশ কেন্দ্রও শোক জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে।
মুস্তাফা মনোয়ারের চলে যাওয়ায় শোকার্ত হয়ে পড়েছে দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গন। গতকাল দুপুরে ধানমন্ডির বাসভবনে ছুটে আসেন শিল্পী, নাট্যব্যক্তিত্ব, শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও শুভানুধ্যায়ীরা। বরেণ্য চিত্রশিল্পী রফিকুন নবী বলেন, মুস্তাফা মনোয়ারের পাপেট শুধু বিনোদনের মাধ্যম ছিল না; সেখানে দেশের মানুষ, প্রকৃতি, সংস্কৃতি এবং সমাজের নানা বাস্তবতা তুলে ধরা হতো। পাপেটকে তিনি অর্থবহ শিল্পমাধ্যমে রূপ দিয়েছিলেন।
ধানমন্ডির বাসায় আসা চিত্রশিল্পীরা স্মরণ করেন, শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের হাত ধরে পূর্ব পাকিস্তানে চারুকলার বিকাশ, ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, বাংলাদেশ টেলিভিশনের বিকাশ থেকে শুরু করে কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারের পেছনের লাল সূর্যের নকশা–সবখানেই মুস্তাফা মনোয়ারের সক্রিয় ভূমিকা ছিল।
ছেলে সাদাত মনোয়ার স্মরণ করেন এক অন্যরকম বাবাকে। তিনি বলেন, ছোটবেলা থেকেই তারা এমন একটি সাংস্কৃতিক পরিবেশে বড় হয়েছেন, যেখানে প্রতিদিন নতুন কিছু সৃষ্টি হতে দেখেছেন। কখনো পাপেট তৈরি, কখনো গান, কখনো নকশা, কখনো ছবি। রঙ-তুলি হাতে নিলেই যেন জাদুর মতো ছবি ফুটে উঠত। তিনি বলেন, বাবা ছিলেন অত্যন্ত ইতিবাচক মানুষ। মৃত্যু বা বিদায়ের কথা কখনো বলতে চাইতেন না। তিনি ছিলেন অমায়িক, স্নেহশীল এবং নতুন প্রজন্মের জন্য নিবেদিত একজন মানুষ। পাপেটশিল্প যেন টিকে থাকে, সে জন্য জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের প্রশিক্ষণ দিয়েছেন বাবা। আনন্দের মধ্য দিয়ে শিক্ষা সবার মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়াই ছিল তার আজীবনের স্বপ্ন।
১৯৩৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর মাগুরা জেলার শ্রীপুরে নানাবাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন মুস্তাফা মনোয়ার। ১৯৫৯ সালে কলকাতা চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয় থেকে ফাইন আর্টসে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়ে উত্তীর্ণ হন। পরের বছর শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের আহ্বানে ঢাকায় এসে পূর্ব পাকিস্তান চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করেন। ১৯৬৫ সালে মেরী মনোয়ারকে বিয়ে করেন। তাদের এক ছেলে সাদাত মনোয়ার ও এক মেয়ে নন্দিনী মনোয়ার।
চারুকলার গণ্ডিতে নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি তিনি। একই বছর পাকিস্তান টেলিভিশনের ঢাকা কেন্দ্র চালু হলে চারুকলার চাকরি ছেড়ে টেলিভিশনে যোগ দেন। তার বিশ্বাস ছিল, বৈরী রাজনৈতিক সময়ে বাংলার সংস্কৃতিকে মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়ার সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম হতে পারে টেলিভিশন। ১৯৭১ সালের ২৩ মার্চ পাকিস্তান দিবসে পাকিস্তানের পতাকা টেলিভিশনে না দেখানোর ঘটনাটি তার সাহসী সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের অন্যতম উদাহরণ। সেদিন নির্ধারিত সময়ের অনেক পরে অনুষ্ঠান শেষ করে তারিখ বদলে ২৪ মার্চ হওয়ার পর পতাকা প্রদর্শন করা হয়েছিল। ফলে পাকিস্তান দিবসে পাকিস্তানের পতাকা দেখানো হয়নি।
একই সময় তার পরিচালনায় প্রচারিত হয় ফজল-এ-খোদার লেখা এবং আজাদ রহমানের সুর করা গণসংগীত ‘সংগ্রাম সংগ্রাম সংগ্রাম, চলবে দিনরাত অবিরাম’। মাত্র ১০ জন শিল্পী গানটি গাইলেও উপস্থাপনার কারণে দর্শকদের কাছে মনে হয়েছিল শত শত কণ্ঠ একসঙ্গে গাইছে।
বাংলাদেশ টেলিভিশনের ইতিহাসেও তার অবদান অনন্য। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘রক্তকরবী’ এবং মুনীর চৌধুরীর অনূদিত ‘মুখরা রমণী বশীকরণ’-এর টেলিভিশন নাট্যরূপ তার পরিচালনায় সম্প্রচারিত হয়। নাটক দুটি যুক্তরাজ্যের গ্রানাডা টেলিভিশনের বিশ্ব টেলিভিশন নাটকের তালিকায় মনোনয়ন পেয়েছিল।
শিশু-কিশোরদের প্রতিভা বিকাশে বিটিভির কিংবদন্তিতুল্য অনুষ্ঠান ‘নতুন কুঁড়ি’র নির্মাতা ছিলেন তিনি। তার নির্মিত ‘মনের কথা’ অনুষ্ঠানও ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। দ্বিতীয় সাফ গেমসের মাস্কট ‘মিশুক’ও তার সৃষ্টি। কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারের পেছনের প্রতীকী লাল সূর্যের নকশা বাস্তবায়নের নেপথ্যেও ছিল তার পরিকল্পনা।
বাংলাদেশে পাপেটশিল্পকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা ছিল মুস্তাফা মনোয়ারের। গ্রামবাংলার পুতুলনাচ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি আধুনিক কাহিনিনির্ভর পাপেটচর্চার পথিকৃৎ হয়ে ওঠেন। কলকাতায় পড়াশোনার সময় ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের পাপেটশিল্প সম্পর্কে জানেন, পরে বিশ্বের নানা দেশে ঘুরে সে অভিজ্ঞতা সমৃদ্ধ করেন। নিজস্ব পাপেট দল এবং বাংলাদেশের লোকজ পাপেট দল ‘ধনমিয়া’কে নিয়ে মস্কো ও তাসখন্দ সফর করেন। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও প্রশংসিত হয় তার পাপেট প্রদর্শনী। ১৯৬০-৬১ সালে কলিম শরাফী তার একটি প্রামাণ্যচিত্রে মুস্তাফা মনোয়ারের পাপেট অন্তর্ভুক্ত করেন।
মুক্তিযুদ্ধের সময় শরণার্থী শিবিরে শিশুদের মুখে হাসি ফোটাতে আয়োজন করেছিলেন পাপেট শো। স্বাধীনতার পর তার তৈরি পাপেটচরিত্র ‘পারুল’ দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে ইউনিসেফের র্যাচেল কার্নেগির উদ্যোগে জন্ম নেয় আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত শিশু চরিত্র ‘মীনা’। টেলিভিশনের ‘আজব দেশে’ অনুষ্ঠানে তার তৈরি করা ‘বাঘা’ ও ‘মেনি’ চরিত্রও শিশুদের কাছে হয়ে ওঠে অত্যন্ত জনপ্রিয়।
বাংলাদেশ টেলিভিশনের উপ-মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তিনি শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক, জাতীয় গণমাধ্যম ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক, বাংলাদেশ টেলিভিশনের জেনারেল ম্যানেজার, বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক, জনবিভাগ উন্নয়ন কেন্দ্রের চেয়ারম্যান এবং এডুকেশনাল পাপেট ডেভেলপমেন্ট সেন্টারের প্রকল্প পরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন মুস্তাফা মনোয়ার।
শিল্পকলায় অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ২০০৪ সালে তিনি একুশে পদকে ভূষিত হন।