রাজধানীর মগবাজারে অবস্থিত আদ্-দ্বীন হাসপাতাল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় শিক্ষাজীবন ও ক্যারিয়ার নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছেন আদ্-দ্বীন উইমেন্স মেডিকেল কলেজের দেশি-বিদেশি শিক্ষার্থীরা। বিশেষ করে ২৯৫ জন বিদেশি শিক্ষার্থী আছেন চরম অনিশ্চয়তায়। নিয়ম অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের ক্লিনিক্যাল ক্লাস ও ইন্টার্নশিপ করতে হয় মেডিকেল কলেজের হাসপাতালেই। কিন্তু হাসপাতাল বন্ধ থাকায় শিক্ষাজীবনের এই পর্যায়গুলো বর্তমানে বন্ধ আছে। শেষ পর্যন্ত এই সংকটের দেশীয় সমাধান হলেও বিদেশি শিক্ষার্থীরা আছেন বেশি বিপাকে।
কারণ এই সমস্যা সমাধানের অপেক্ষায় তাদের এই দেশে অবস্থানের নিয়মিত খরচ চালিয়ে যেতে হচ্ছে। এদিকে বিশেষ করে বিদেশি শিক্ষার্থীরা এমন অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকায় বিদেশে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য শিক্ষাব্যবস্থার সুনাম ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, এই সমস্যা অব্যাহত থাকলে বিদেশি শিক্ষার্থীরা এই দেশে পড়াশোনা করতে আসার ক্ষেত্রে সংশয়ে থাকবেন।
ভারতের কাশ্মীর থেকে আসা আদ্-দ্বীন উইমেন্স মেডিকেল কলেজের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী মেহরিম গত বৃহস্পতিবার দৈনিক খবরের কাগজকে বলেন, মেডিকেলসংক্রান্ত ভারতীয় আইন অনুযায়ী বিদেশে পড়া শিক্ষার্থীদের একই কলেজের অধীন হাসপাতালে ইন্টার্নশিপ সম্পন্ন করা বাধ্যতামূলক। তাই এই পর্যায়ে তার মেডিকেল পড়া সম্পন্ন হতে চললেও ক্যারিয়ার গঠনের ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
একই বর্ষের আরেক শিক্ষার্থী বাংলাদেশি নাগরিক ফারহা জামান পূর্বাশা বলেন, একই আইন বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও। তাই তাদের ক্ষেত্রে একই অনিশ্চয়তা রয়েছে।
বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের কেউ কেউ এখন অন্য মেডিকেল কলেজে মাইগ্রেশনের চেষ্টা করছেন। এ প্রসঙ্গে জিজ্ঞাসা করলে শিক্ষার্থী পূর্বাশা বলেন, নিয়মের পরিবর্তন না হওয়া পর্যন্ত অনিশ্চয়তা তো থেকেই যায়, অর্থাৎ নিজ প্রতিষ্ঠানেই ইন্টার্নি ও ক্লিনিক্যাল ক্লাস করতে হবে।
আদ্-দ্বীন ফাউন্ডেশনের পরিচালক (কোম্পানি অ্যাফেয়ার্স) তারিকুল ইসলাম মুকুল গতকাল রবিবার দৈনিক খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমাদের শিক্ষার্থীদের অন্য মেডিকেল কলেজে ইন্টার্নশিপ করতে সরকার চিঠি দিয়ে আমাদের নির্দেশনা দিয়েছে। কিন্তু বিদ্যমান আইনে আমরা তা করতে পারি না। বিষয়টি চিঠি দিয়ে আমরা সরকারকে জানিয়েছি। এর পরিপ্রেক্ষিতে সরকার কী বলে, তা জানার অপেক্ষায় আছি।’
সম্প্রতি ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় গত ১১ জুন আদ্-দ্বীন ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠান আদ্-দ্বীন হাসপাতালের নিবন্ধন স্থগিত করে স্বাস্থ্যসেবা অধিদপ্তর। ফাউন্ডেশনের সহকারী পরিচালক (মেডিকেল) মো. সিদ্দিকুর রহমান সুমন বলেন, ‘ওই স্থগিতাদেশের বিরুদ্ধে আপিল করা হয়েছে। আশা করি ইতিবাচক কিছু হবে।’
তিনি জানান, কলেজের বিদেশি শিক্ষার্থীদের প্রায় সবাই ভারতীয়। ২৯৫ বিদেশি শিক্ষার্থীর মধ্যে ৮৬ জন ইন্টার্ন এবং ২০৯ জন মেডিকেল শিক্ষার্থী।
এদিকে নিজেদের শিক্ষাজীবন ও ভবিষ্যৎ পেশা জীবনের এমন অনিশ্চয়তা কাটাতে গত সোমবার স্বাস্থ্যসেবা অধিদপ্তর ও স্বাস্থ্যশিক্ষা অধিদপ্তরে যান বিদেশি শিক্ষার্থী ও ইন্টার্ন চিকিৎসকরা। যদিও দীর্ঘ অপেক্ষার পরও দুই অধিদপ্তরের কোনো মহাপরিচালকের দেখা পাননি তারা।
বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল (বিএমডিসি) এবং ভারতের ন্যাশনাল মেডিকেল কমিশনের (এনএমসি) নীতিমালা অনুযায়ী একই কলেজ থেকে কোর্স সম্পন্ন করা এবং ইন্টার্নশিপ নিশ্চিতের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এমন বাস্তবতায় ডিগ্রির কার্যকারিতা হারানোর আশঙ্কায় রয়েছেন শিক্ষার্থী ও ইন্টার্ন চিকিৎসকরা। বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের বাস্তবতা বিবেচনায় সরকার যদি নিয়মে পরিবর্তন আনে, তাতে হয়তো বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা অন্য মেডিকেলে ইন্টার্নশিপ সম্পন্ন করতে পারবেন। কিন্তু বিদেশি শিক্ষার্থীদের অনিশ্চয়তা রয়েই যাবে। তাই তারা অনিশ্চয়তায় ভুগছেন বেশি। বিদেশি শিক্ষার্থীরা অনিশ্চয়তায় থাকলে তা ভবিষ্যতে বিদেশি শিক্ষার্থী বাংলাদেশে আসার সম্ভাবনা কমিয়ে দিতে পারে বলেও মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে আদ্-দ্বীন মেডিকেল কলেজের বিদেশি শিক্ষার্থীদের ইন্টার্নশিপ-সংক্রান্ত চলমান বিষয়াবলি ও সৃষ্ট জটিলতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে চিকিৎসকদের সংগঠন ন্যাশনাল ডক্টরস ফোরাম (এনডিএফ)। গত বুধবার সংগঠনটির সভাপতি অধ্যাপক ডা. মো. নজরুল ইসলাম ও জেনারেল সেক্রেটারি অধ্যাপক ডা. মাহমুদ হোসেন এক যৌথ বিবৃতিতে এই উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
বিবৃতিতে বলা হয়, বাংলাদেশে অধ্যয়নরত বিদেশি মেডিকেল শিক্ষার্থীরা দেশের প্রচলিত আইন, বিধিবিধান ও একাডেমিক নীতিমালা অনুসরণ করে শিক্ষা কার্যক্রম সম্পন্ন করে থাকেন। তাই তাদের ইন্টার্নশিপ-সংক্রান্ত যে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে মানবিক, একাডেমিক ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বিবেচনায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তারা আরও উল্লেখ করেন, বিদেশি শিক্ষার্থীদের ইন্টার্নশিপ বিষয়ে দীর্ঘসূত্রতা বা অনিশ্চয়তা তাদের পেশাগত জীবন, উচ্চশিক্ষা ও ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। একই সঙ্গে এটি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের চিকিৎসা শিক্ষাব্যবস্থার ভাবমূর্তির সঙ্গেও সম্পর্কিত। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের বেসরকারি মেডিকেল কলেজগুলো বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীদের মানসম্মত চিকিৎসা শিক্ষা প্রদানের মাধ্যমে একটি ইতিবাচক অবস্থান তৈরি করেছে। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে অর্জিত এই সুনাম ধরে রাখতে বিদেশি শিক্ষার্থীদের ইন্টার্নশিপ সম্পন্ন করার বিষয়ে সুস্পষ্ট নীতিমালা ও কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
বিজ্ঞপ্তিতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, চিকিৎসা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলা হয়, সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে দ্রুত একটি গ্রহণযোগ্য, ন্যায়সংগত ও টেকসই সমাধান নিশ্চিত করা প্রয়োজন, যেন বিদেশি শিক্ষার্থীদের শিক্ষা কার্যক্রম ও পেশাগত অগ্রগতি কোনোভাবেই ব্যাহত না হয়। দেশের চিকিৎসা শিক্ষাব্যবস্থার আন্তর্জাতিক মর্যাদা অক্ষুণ্ন রাখতে এবং বেসরকারি মেডিকেল শিক্ষার সুনাম বজায় রাখতে এই সমস্যার দ্রুত ও কার্যকর সমাধান জরুরি বলে মনে করে সংগঠনটি।