ঢাকা ১৫ আষাঢ় ১৪৩৩, সোমবার, ২৯ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
ঐক্যবদ্ধ শক্তিতেই ভরসা জাপান কোচ মোরিয়াসুর ভূমিরূপ পরিবর্তন অধ্যায়ের ২টি বহুনির্বাচনি প্রশ্ন ও উত্তর, ১ম পর্ব, এইচএসসির ভূগোল ১ম পত্র কাঙ্ক্ষিত অর্জন লাভে যে দোয়া পড়তেন রাসুল (সা.) এই গরমে ত্বকের যত্ন নিন সহজে জাপানের মাইন্ড গেমসে পা দিবে না আনচেলত্তি বান্দার হৃদয়ে আল্লাহ কেন মোহর মারেন? এনসিসি ব্যাংকে ম্যানেজমেন্ট ট্রেইনি প্রোগ্রামে জনবল নিয়োগ আইফোন ১৮ প্রোর ফিচার ফাঁস: ডিজাইন, ক্যামেরা ও ডিসপ্লেতে যা থাকছে স্ট্রবেরি মুন দেখা যাবে ৩০ জুন পর্যন্ত সাধারণ এলইডির চেয়ে স্মার্ট বাল্ব কি ব্যয়বহুল? সংসদে বিরোধীদলীয় নেতার আহ্বান শেরপুর সীমান্তে অবৈধ পথে ফেরা ২ বাংলাদেশিকে পুশব্যাক কচুয়ায় সিঁদ কেটে বৃদ্ধাকে গলাকেটে হত্যা আদ-দ্বীন হাসপাতাল বন্ধে শিক্ষার্থীর ক্যারিয়ার অন্ধকারে, দ্রুত চালুর দাবি জামায়াতের নিখোঁজের দুই দিন পর পুকুরে মিলল বৃদ্ধের মরদেহ বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক সংস্থার সমাজ উন্নয়ন কার্যক্রম অধ্যায়ের ৬টি অনুধাবনমূলক প্রশ্ন ও উত্তর, ৪র্থ পর্ব, এইচএসসির সমাজকর্ম ২য় পত্র শৈলকুপায় পিকআপ-মোটরসাইকেল সংঘর্ষে প্রাণ গেল শিক্ষার্থীর মুস্তাফা মনোয়ারের জানাজা মঙ্গলবার, নেওয়া হবে বিটিভি ও শহীদ মিনারে এই গরমে শিশুর যত্ন নেবেন যেভাবে তিস্তা ব্যারেজ প্রকল্প যে কোনো মূল্যে বাস্তবায়ন করা হবে: প্রধানমন্ত্রী শেরপুর সীমান্তে আগ্নেয়াস্ত্রসহ আটক ১ ভেনেজুয়েলায় ভূমিকম্পে আর্জেন্টিনার ফুটবলারের স্ত্রী ও দুই সন্তানের মৃত্যু আলোচনায় মিম আফ্রিকান ফুটবলের অভাবনীয় সাফল্যে উচ্ছ্বসিত কাফ সভাপতি মোতসেপে প্রতিশ্রুতি পূরণ করলেন আর্জেন্টাইন ফরোয়ার্ড রাজশাহীতে ছাদ থেকে পড়ে এইচএসসি পরীক্ষার্থীর মৃত্যু ভেনেজুয়েলায় ভূমিকম্পের ৪ দিন পর জীবিত উদ্ধার বাবা-ছেলে বিয়ে না করায় যুবককে হত্যার অভিযোগ প্রেমিকার বিরুদ্ধে, আটক ২ ইউক্রেনের কস্তিয়ানতিনিভকার দিকে অগ্রসর হচ্ছে রুশ সেনা তিন মাসের সন্তানকে নিয়ে ইইউর বৈঠকে সুইডিশ মন্ত্রী

যুগ্ম সচিবে পদোন্নতি শিগগির

প্রকাশ: ২৯ জুন ২০২৬, ০১:০৯ পিএম
আপডেট: ২৯ জুন ২০২৬, ০১:১০ পিএম
যুগ্ম সচিবে পদোন্নতি শিগগির
ছবি: সংগৃহীত

বহু দিনের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে চলতি মাসেই যুগ্ম সচিব পদে পদোন্নতির ঘোষণা আসতে পারে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র বলছে, প্রশাসন ক্যাডারের ২৫তম ব্যাচের কর্মকর্তাদের উপসচিব থেকে যুগ্ম সচিব পদে পদোন্নতির প্রস্তুতি প্রায় শেষ পর্যায়ে। একই সঙ্গে ২০২৫ সালে পদোন্নতিবঞ্চিত প্রশাসনের ২৪তম ব্যাচের কিছু কর্মকর্তার আবেদন পুনর্বিবেচনার আওতায় আসতে পারে। ফলে দীর্ঘদিন ধরে পদোন্নতির অপেক্ষায় থাকা কর্মকর্তাদের মধ্যে নতুন করে আশার সঞ্চার হয়েছে।

বর্তমানে মাঠ প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদ জেলা প্রশাসক (ডিসি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন প্রশাসনের চারটি ব্যাচের কর্মকর্তারা। এর মধ্যে ২৫তম ব্যাচের ৯ জন, ২৭তম ব্যাচের ২১ জন, ২৮তম ব্যাচের ১৮ জন এবং ২৯তম ব্যাচের ১৪ জন কর্মকর্তা রয়েছেন। ২৫তম ব্যাচের কর্মকর্তারা যুগ্ম সচিব পদে পদোন্নতি পেলে তাদের একটি বড় অংশকে সচিবালয় বা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়ে আসা হবে। ফলে মাঠ প্রশাসনে নতুন করে জেলা প্রশাসক নিয়োগের সুযোগ তৈরি হবে।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ২৫তম ব্যাচের কর্মকর্তাদের পদোন্নতির জন্য সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ডের (এসএসবি) ধারাবাহিক বৈঠক চলছে। ইতোমধ্যেই এ বিষয়ে চার থেকে পাঁচটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। পদোন্নতির আগে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের গোপনীয় প্রতিবেদন, কর্মজীবনের মূল্যায়ন, শৃঙ্খলাজনিত রেকর্ড, কর্মদক্ষতা, শিক্ষাজীবন এবং অন্য প্রশাসনিক তথ্য পর্যালোচনা করা হচ্ছে। প্রায় ৮৬ জন কর্মকর্তা এই ব্যাচে পদোন্নতির যোগ্য বলে জানা গেছে। প্রশাসনের সবচেয়ে ছোট ব্যাচ হওয়ায় গুরুতর শৃঙ্খলা ভঙ্গ, দুর্নীতি বা বড় ধরনের নেতিবাচক প্রতিবেদন না থাকলে অধিকাংশ কর্মকর্তাই পদোন্নতি পেতে পারেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের ধারণা।

এর পাশাপাশি আলোচনায় রয়েছে প্রশাসনের ২৪তম ব্যাচ। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে এই ব্যাচের ১৪২ জন কর্মকর্তা পদোন্নতি পেলেও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক কর্মকর্তা সে সময় ‘রাজনৈতিক’ কারণে বাদ পড়েন। এই ব্যাচের একাধিক কর্মকর্তা অভিযোগ করে বলেন, এই ব্যাচে পদোন্নতির যোগ্য কর্মকর্তা রয়েছেন প্রায় ৩৫০ জন। সে সময় জেলা প্রশাসক (ডিসি), ব্যক্তিগত সচিব (পিএস) ও অন্য গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে কর্মরত অনেক কর্মকর্তাকে ‘ফ্যাসিস্টের দোসর’ ট্যাগ দিয়ে পদোন্নতি থেকে ‘বঞ্চিত’ করে অন্তর্বর্তী সরকার। অথচ এসব পদে দায়িত্ব পালনের জন্য পদোন্নতির ক্ষেত্রে কোনো আইনি বাধা বা এসএসবির বিধিমালায় এমন কোনো শর্ত নেই বলে তারা দাবি করেন।

তাদের ভাষ্য, বাদ পড়া প্রায় সবাই রিভিউ আবেদন করলেও গত দেড় বছরেও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সেগুলো নিষ্পত্তির কোনো উদ্যোগ নেয়নি। ফলে ব্যাচের অনেক মেধাবী ও যোগ্য কর্মকর্তা অন্যায্যভাবে বঞ্চিত হয়েছেন। তাদের অভিযোগ, ২০২৫ সালের পদোন্নতিতে প্রশাসন ক্যাডারের যোগ্য কর্মকর্তাদের মাত্র প্রায় ৪২ শতাংশ পদোন্নতি পেলেও প্রশাসন ক্যাডারে একীভূত (মার্জ) হওয়া ইকোনমিক ক্যাডারের কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে চিত্র ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।

ইকোনমিক ক্যাডার থেকে মার্জ হওয়া ২০ জন কর্মকর্তার মধ্যে ১৭ জনই পদোন্নতি পান, যা প্রায় ৮৫ শতাংশ। এই বড় ব্যবধানকে প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারা বৈষম্যের উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করছেন। তাদের দাবি, পদোন্নতির ক্ষেত্রে সবার জন্য একই নীতি ও সমান মানদণ্ড অনুসরণ করা হলে এমন বৈষম্যের অভিযোগ ওঠার সুযোগ থাকত না।

প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলছেন, বর্তমানে উপসচিব পদের অনুমোদিত সংখ্যা প্রায় আড়াই হাজার। তবে আট শতাধিক পদ শূন্য রয়েছে। অন্যদিকে যুগ্ম সচিব পদের অনুমোদিত সংখ্যাও এক হাজারের বেশি। ফলে পদোন্নতির জন্য প্রশাসনিক কাঠামোয় পর্যাপ্ত সুযোগ রয়েছে। তবে দীর্ঘদিন ধরে নিয়মিত পদোন্নতি না হওয়ায় বিভিন্ন ব্যাচের কর্মকর্তাদের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে।

শুধু ২৫তম বা ২৪তম ব্যাচ নয়, ২১তম ও ৩১তম ব্যাচের কর্মকর্তারাও দীর্ঘদিন ধরে পদোন্নতির অপেক্ষায় রয়েছেন। ২১তম ব্যাচের কর্মকর্তারা অতিরিক্ত সচিব পদে পদোন্নতির যোগ্যতা অর্জনের পরও অপেক্ষা করছেন। একইভাবে ৩১তম ব্যাচের কর্মকর্তারা কয়েক বছর আগে উপসচিব পদে পদোন্নতির যোগ্য হলেও এখন পর্যন্ত তাদের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অভিযোগ, ধারাবাহিকভাবে এসএসবির একাধিক বৈঠক হলেও তাদের বিষয়টি আলোচনায় আসেনি।

একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সময়মতো পদোন্নতি না হওয়ায় প্রশাসনের ভেতরে হতাশা বাড়ছে। মাঠ প্রশাসন থেকে শুরু করে সচিবালয় পর্যন্ত সরকারের গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি বাস্তবায়নের দায়িত্ব পালন করলেও পদোন্নতির ক্ষেত্রে বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হচ্ছে। এতে কর্মস্পৃহা ও পেশাগত আত্মবিশ্বাসে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

কর্মকর্তাদের আরেকটি বড় অভিযোগ, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরপর সচিব ও সচিব পদমর্যাদার গুরুত্বপূর্ণ পদে বেশ কয়েকজন সাবেক কর্মকর্তাকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এতে নিয়মিত কর্মকর্তাদের পদোন্নতির সুযোগ সংকুচিত হচ্ছে। তাদের মতে, অবসরের পরও চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ অব্যাহত থাকায় স্বাভাবিক পদোন্নতির ধারা ব্যাহত হচ্ছে এবং ক্যারিয়ার পরিকল্পনায় অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে।

তবে প্রশাসনের অভিজ্ঞ ব্যক্তিরা বলছেন, শুধু জ্যেষ্ঠতা নয়, দক্ষতা, সততা ও কর্মদক্ষতাকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। 

এসব বিষয়ে সাবেক সচিব ও জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ এ কে এম আব্দুল আউয়াল মজুমদার খবরের কাগজকে বলেন, বর্তমানে কর্মরত যোগ্য কর্মকর্তাদের পাশাপাশি অতীতে বঞ্চিত দক্ষ কর্মকর্তাদেরও মূল্যায়নের সুযোগ থাকা উচিত। তবে কোনো ধরনের পাইকারি পদোন্নতির পরিবর্তে কর্মদক্ষতা, সুনাম, সততা ও রাষ্ট্রীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে প্রশাসন সাজাতে হবে। একই সঙ্গে প্রত্যেক কর্মকর্তাকেও নিজের অবদান ও কর্মদক্ষতার ভিত্তিতে মূল্যায়নের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।

এদিকে প্রশাসনের একাধিক সূত্রের মতে, ২৫তম ব্যাচের কর্মকর্তারা যুগ্ম সচিব পদে পদোন্নতি পেলে মাঠ প্রশাসনে বড় ধরনের রদবদল হতে পারে। তা ছাড়া বর্তমানে দায়িত্বে থাকা কয়েকজন জেলা প্রশাসকের বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন অভিযোগ ও কর্ম সম্পাদনের মূল্যায়নও বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে। ফলে শূন্য হওয়া পদগুলোতে নতুন জেলা প্রশাসক নিয়োগের সম্ভাবনা রয়েছে।

যুগ্ম সচিবে পদোন্নতি শিগগির

প্রকাশ: ২৯ জুন ২০২৬, ০১:০৯ পিএম
আপডেট: ২৯ জুন ২০২৬, ০১:১০ পিএম
যুগ্ম সচিবে পদোন্নতি শিগগির
ছবি: সংগৃহীত

বহু দিনের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে চলতি মাসেই যুগ্ম সচিব পদে পদোন্নতির ঘোষণা আসতে পারে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র বলছে, প্রশাসন ক্যাডারের ২৫তম ব্যাচের কর্মকর্তাদের উপসচিব থেকে যুগ্ম সচিব পদে পদোন্নতির প্রস্তুতি প্রায় শেষ পর্যায়ে। একই সঙ্গে ২০২৫ সালে পদোন্নতিবঞ্চিত প্রশাসনের ২৪তম ব্যাচের কিছু কর্মকর্তার আবেদন পুনর্বিবেচনার আওতায় আসতে পারে। ফলে দীর্ঘদিন ধরে পদোন্নতির অপেক্ষায় থাকা কর্মকর্তাদের মধ্যে নতুন করে আশার সঞ্চার হয়েছে।

বর্তমানে মাঠ প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদ জেলা প্রশাসক (ডিসি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন প্রশাসনের চারটি ব্যাচের কর্মকর্তারা। এর মধ্যে ২৫তম ব্যাচের ৯ জন, ২৭তম ব্যাচের ২১ জন, ২৮তম ব্যাচের ১৮ জন এবং ২৯তম ব্যাচের ১৪ জন কর্মকর্তা রয়েছেন। ২৫তম ব্যাচের কর্মকর্তারা যুগ্ম সচিব পদে পদোন্নতি পেলে তাদের একটি বড় অংশকে সচিবালয় বা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়ে আসা হবে। ফলে মাঠ প্রশাসনে নতুন করে জেলা প্রশাসক নিয়োগের সুযোগ তৈরি হবে।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ২৫তম ব্যাচের কর্মকর্তাদের পদোন্নতির জন্য সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ডের (এসএসবি) ধারাবাহিক বৈঠক চলছে। ইতোমধ্যেই এ বিষয়ে চার থেকে পাঁচটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। পদোন্নতির আগে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের গোপনীয় প্রতিবেদন, কর্মজীবনের মূল্যায়ন, শৃঙ্খলাজনিত রেকর্ড, কর্মদক্ষতা, শিক্ষাজীবন এবং অন্য প্রশাসনিক তথ্য পর্যালোচনা করা হচ্ছে। প্রায় ৮৬ জন কর্মকর্তা এই ব্যাচে পদোন্নতির যোগ্য বলে জানা গেছে। প্রশাসনের সবচেয়ে ছোট ব্যাচ হওয়ায় গুরুতর শৃঙ্খলা ভঙ্গ, দুর্নীতি বা বড় ধরনের নেতিবাচক প্রতিবেদন না থাকলে অধিকাংশ কর্মকর্তাই পদোন্নতি পেতে পারেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের ধারণা।

এর পাশাপাশি আলোচনায় রয়েছে প্রশাসনের ২৪তম ব্যাচ। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে এই ব্যাচের ১৪২ জন কর্মকর্তা পদোন্নতি পেলেও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক কর্মকর্তা সে সময় ‘রাজনৈতিক’ কারণে বাদ পড়েন। এই ব্যাচের একাধিক কর্মকর্তা অভিযোগ করে বলেন, এই ব্যাচে পদোন্নতির যোগ্য কর্মকর্তা রয়েছেন প্রায় ৩৫০ জন। সে সময় জেলা প্রশাসক (ডিসি), ব্যক্তিগত সচিব (পিএস) ও অন্য গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে কর্মরত অনেক কর্মকর্তাকে ‘ফ্যাসিস্টের দোসর’ ট্যাগ দিয়ে পদোন্নতি থেকে ‘বঞ্চিত’ করে অন্তর্বর্তী সরকার। অথচ এসব পদে দায়িত্ব পালনের জন্য পদোন্নতির ক্ষেত্রে কোনো আইনি বাধা বা এসএসবির বিধিমালায় এমন কোনো শর্ত নেই বলে তারা দাবি করেন।

তাদের ভাষ্য, বাদ পড়া প্রায় সবাই রিভিউ আবেদন করলেও গত দেড় বছরেও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সেগুলো নিষ্পত্তির কোনো উদ্যোগ নেয়নি। ফলে ব্যাচের অনেক মেধাবী ও যোগ্য কর্মকর্তা অন্যায্যভাবে বঞ্চিত হয়েছেন। তাদের অভিযোগ, ২০২৫ সালের পদোন্নতিতে প্রশাসন ক্যাডারের যোগ্য কর্মকর্তাদের মাত্র প্রায় ৪২ শতাংশ পদোন্নতি পেলেও প্রশাসন ক্যাডারে একীভূত (মার্জ) হওয়া ইকোনমিক ক্যাডারের কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে চিত্র ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।

ইকোনমিক ক্যাডার থেকে মার্জ হওয়া ২০ জন কর্মকর্তার মধ্যে ১৭ জনই পদোন্নতি পান, যা প্রায় ৮৫ শতাংশ। এই বড় ব্যবধানকে প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারা বৈষম্যের উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করছেন। তাদের দাবি, পদোন্নতির ক্ষেত্রে সবার জন্য একই নীতি ও সমান মানদণ্ড অনুসরণ করা হলে এমন বৈষম্যের অভিযোগ ওঠার সুযোগ থাকত না।

প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলছেন, বর্তমানে উপসচিব পদের অনুমোদিত সংখ্যা প্রায় আড়াই হাজার। তবে আট শতাধিক পদ শূন্য রয়েছে। অন্যদিকে যুগ্ম সচিব পদের অনুমোদিত সংখ্যাও এক হাজারের বেশি। ফলে পদোন্নতির জন্য প্রশাসনিক কাঠামোয় পর্যাপ্ত সুযোগ রয়েছে। তবে দীর্ঘদিন ধরে নিয়মিত পদোন্নতি না হওয়ায় বিভিন্ন ব্যাচের কর্মকর্তাদের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে।

শুধু ২৫তম বা ২৪তম ব্যাচ নয়, ২১তম ও ৩১তম ব্যাচের কর্মকর্তারাও দীর্ঘদিন ধরে পদোন্নতির অপেক্ষায় রয়েছেন। ২১তম ব্যাচের কর্মকর্তারা অতিরিক্ত সচিব পদে পদোন্নতির যোগ্যতা অর্জনের পরও অপেক্ষা করছেন। একইভাবে ৩১তম ব্যাচের কর্মকর্তারা কয়েক বছর আগে উপসচিব পদে পদোন্নতির যোগ্য হলেও এখন পর্যন্ত তাদের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অভিযোগ, ধারাবাহিকভাবে এসএসবির একাধিক বৈঠক হলেও তাদের বিষয়টি আলোচনায় আসেনি।

একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সময়মতো পদোন্নতি না হওয়ায় প্রশাসনের ভেতরে হতাশা বাড়ছে। মাঠ প্রশাসন থেকে শুরু করে সচিবালয় পর্যন্ত সরকারের গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি বাস্তবায়নের দায়িত্ব পালন করলেও পদোন্নতির ক্ষেত্রে বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হচ্ছে। এতে কর্মস্পৃহা ও পেশাগত আত্মবিশ্বাসে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

কর্মকর্তাদের আরেকটি বড় অভিযোগ, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরপর সচিব ও সচিব পদমর্যাদার গুরুত্বপূর্ণ পদে বেশ কয়েকজন সাবেক কর্মকর্তাকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এতে নিয়মিত কর্মকর্তাদের পদোন্নতির সুযোগ সংকুচিত হচ্ছে। তাদের মতে, অবসরের পরও চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ অব্যাহত থাকায় স্বাভাবিক পদোন্নতির ধারা ব্যাহত হচ্ছে এবং ক্যারিয়ার পরিকল্পনায় অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে।

তবে প্রশাসনের অভিজ্ঞ ব্যক্তিরা বলছেন, শুধু জ্যেষ্ঠতা নয়, দক্ষতা, সততা ও কর্মদক্ষতাকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। 

এসব বিষয়ে সাবেক সচিব ও জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ এ কে এম আব্দুল আউয়াল মজুমদার খবরের কাগজকে বলেন, বর্তমানে কর্মরত যোগ্য কর্মকর্তাদের পাশাপাশি অতীতে বঞ্চিত দক্ষ কর্মকর্তাদেরও মূল্যায়নের সুযোগ থাকা উচিত। তবে কোনো ধরনের পাইকারি পদোন্নতির পরিবর্তে কর্মদক্ষতা, সুনাম, সততা ও রাষ্ট্রীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে প্রশাসন সাজাতে হবে। একই সঙ্গে প্রত্যেক কর্মকর্তাকেও নিজের অবদান ও কর্মদক্ষতার ভিত্তিতে মূল্যায়নের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।

এদিকে প্রশাসনের একাধিক সূত্রের মতে, ২৫তম ব্যাচের কর্মকর্তারা যুগ্ম সচিব পদে পদোন্নতি পেলে মাঠ প্রশাসনে বড় ধরনের রদবদল হতে পারে। তা ছাড়া বর্তমানে দায়িত্বে থাকা কয়েকজন জেলা প্রশাসকের বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন অভিযোগ ও কর্ম সম্পাদনের মূল্যায়নও বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে। ফলে শূন্য হওয়া পদগুলোতে নতুন জেলা প্রশাসক নিয়োগের সম্ভাবনা রয়েছে।

সঞ্চয়পত্রে কর রেয়াত সুবিধা কমায় মধ্যবিত্তের চাপ বাড়বে

প্রকাশ: ২৯ জুন ২০২৬, ০৮:২০ এএম
আপডেট: ২৯ জুন ২০২৬, ০৮:২৩ এএম
সঞ্চয়পত্রে কর রেয়াত সুবিধা কমায় মধ্যবিত্তের চাপ বাড়বে
ছবি: খবরের কাগজ

সায়মা ইসলাম তড়িঘড়ি করে সঞ্চয়পত্র নবায়ন করতে এসেছেন সোনালী ব্যাংকের ভিকারুননিসা নূন স্কুল শাখায়। কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘অবসরের পর সঞ্চয়পত্রের মুনাফা দিয়েই আমাদের সংসার খরচ চালাতে হয়। শুনলাম নতুন অর্থবছর থেকে সঞ্চয়পত্রে কর রেয়াত কমিয়ে দিচ্ছে সরকার। তাই মেয়াদপূর্তি হওয়ায় নতুন অর্থবছর শুরু হওয়ার আগেই নবায়ন করতে এসেছি।’ 

  • কর সুবিধা কমছে: সঞ্চয়পত্রে কর রেয়াত কমানো ও মুনাফার ওপর করের চাপ বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে সরকার।
  • গ্রাহকদের ভিড়: নতুন নিয়ম কার্যকরের আগে সঞ্চয়পত্র কেনা ও নবায়নে ব্যাংকগুলোতে গ্রাহকদের ভিড় বেড়েছে।
  • উদ্বেগ ও পরামর্শ: অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এতে মধ্যবিত্ত ও অবসরপ্রাপ্তরা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন; কর ফাঁকি রোধেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত।

সায়মা ইসলামের মতো অসংখ্য গ্রাহক এখন ভিড় করছেন সঞ্চয়পত্র কেনা বা নবায়ন করতে। সম্প্রতি সোনালী ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট শাখায় গিয়ে দেখা যায়, অন্য সব ডেস্কের তুলনায় সঞ্চয়পত্রের ডেস্কে সবচেয়ে বেশি ভিড়। কারও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ঠিক নেই, আবার কারও সব কাগজপত্র থাকলেও মোবাইল নাম্বার নিজের নামে বায়োমেট্রিক করা নেই। আবার কারও সব ঠিকঠাক থাকলেও সঙ্গে সঙ্গেই কাজটি শেষ করতে পারছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা। এত ভিড় থাকার কারণ জানতে চাইলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক কর্মকর্তা বলেন, নতুন অর্থবছরের বাজেটে কর রেয়াত সুবিধা কমানোর ঘোষণার পর থেকেই সঞ্চয়পত্রের বিনিয়োগে গ্রাহকদের ভিড় অন্য সময়ের চেয়ে কয়েক গুণ বেড়েছে।

আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে সঞ্চয়পত্রের বিনিয়োগে কর রেয়াতের সুবিধা কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। একই সঙ্গে সঞ্চয়পত্রের আয়ের ওপর করের চাপ বাড়ছে। বর্তমানে সঞ্চয়পত্রে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগ থাকলে মুনাফার ওপর ৫ শতাংশ হারে উৎসে কর কাটা হয়। ১০ লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এ হার ১০ শতাংশ। বিদ্যমান ব্যবস্থায় এই উৎসে করই চূড়ান্ত করদায় হিসেবে গণ্য হয় এবং পরবর্তী সময়ে এ আয়ের ওপর আর কোনো কর দিতে হয় না। তবে নতুন বাজেটে এই সুবিধা বাতিলের প্রস্তাব করা হয়েছে। সঞ্চয়পত্রের মুনাফা আর চূড়ান্ত কর আদায় হিসেবে বিবেচিত হবে না। বরং করদাতার মোট আয়ের সঙ্গে এই আয় যোগ হয়ে নির্ধারিত করস্ল্যাব অনুযায়ী কর পরিশোধ করতে হবে। উৎসে কাটা করকে অগ্রিম কর হিসেবে গণ্য করা হবে, যা আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার সময় সমন্বয় করা যাবে। এর ফলে ৫ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্রধারীও আগের তুলনায় বেশি করের আওতায় পড়বেন। আগে যেখানে তিনি সুদ আয়ের ওপর ৫ শতাংশ কর দিতেন, এখন তাকে ন্যূনতম ১০ শতাংশ হারে কর দিতে হতে পারে।

অন্যদিকে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগে কর রেয়াত সুবিধাও কমানো হচ্ছে। নতুন প্রস্তাবে সঞ্চয়পত্রে সর্বোচ্চ বিনিয়োগসীমা ১০ লাখ টাকা থেকে কমিয়ে সাড়ে ৭ লাখ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। ফলে প্রতি ১ লাখ টাকা বিনিয়োগের বিপরীতে করদাতারা আগের তুলনায় প্রায় ৫ হাজার টাকা কম কর ছাড় পাবেন।

নতুন অর্থবছরের বাজেটে জাতীয় সঞ্চয়পত্রে কর রেয়াতের সীমা কমিয়ে আনার সিদ্ধান্ত মধ্যবিত্ত ও স্থায়ী আয়ের মানুষের জন্য নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। তাদের মতে, আমাদের দেশে নিরাপদ বিনিয়োগের ক্ষেত্র এখনো অনেক কম। ফলে অবসরের পর বা নিয়মিত আয়ের সুযোগ না থাকা মানুষের জন্য সঞ্চয়পত্রের বাইরে বিনিয়োগের অন্য কোনো ক্ষেত্র নেই। আর এই কারণেই সরকার কেবল আমাদের ওপরেই করের বোঝা বাড়িয়ে দিচ্ছে। 

বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় উচ্চ মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং প্রকৃত আয় কমে যাওয়ার কারণে মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো এমনিতেই চাপে রয়েছে। এর সঙ্গে সঞ্চয়পত্রে কর সুবিধা কমে যাওয়ায় তাদের করযোগ্য আয় বেড়ে যাবে। ফলে একই পরিমাণ সঞ্চয় ধরে রাখলেও আগের তুলনায় বেশি কর দিতে হবে।

বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরেই জাতীয় সঞ্চয়পত্র সামাজিক নিরাপত্তার একটি অনানুষ্ঠানিক মাধ্যম হিসেবে কাজ করছে। সরকারি চাকরি থেকে অবসর নেওয়া ব্যক্তি, প্রবাসী পরিবারের সদস্য, বিধবা কিংবা স্থায়ী আয়ের ওপর নির্ভরশীল অসংখ্য মানুষ সঞ্চয়পত্রের মুনাফা দিয়ে মাসিক খরচের একটি বড় অংশ মেটান। তাদের জন্য কর রেয়াতের সীমা কমে যাওয়া কার্যত প্রকৃত আয় কমে যাওয়ার সমান।

দীর্ঘদিন ধরে সঞ্চয়পত্র শুধু নিরাপদ বিনিয়োগের মাধ্যমই নয়, বরং অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তি, চাকরিজীবী, শিক্ষক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এবং গৃহিণীদের জন্য নিয়মিত আয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে। ফলে কর রেয়াতের সুযোগ সংকুচিত হওয়ায় একদিকে যেমন করের বোঝা বাড়বে, অন্যদিকে সঞ্চয়ের প্রবণতাও কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। 

তাদের মতে, সঞ্চয়পত্রে কর রেয়াতের মূল উদ্দেশ্য ছিল মানুষকে সঞ্চয়ে উৎসাহিত করা এবং ভবিষ্যতের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। বিশেষ করে যারা শেয়ারবাজার বা ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগে যেতে চান না, তাদের জন্য এটি ছিল সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য বিকল্প। কিন্তু কর সুবিধা কমে গেলে অনেকেই সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগে নিরুৎসাহিত হতে পারেন।

তারা বলছেন, সরকারের রাজস্ব বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা অবশ্যই রয়েছে। কিন্তু রাজস্ব আহরণের জন্য এমন খাতকে লক্ষ্য করা উচিত, যেখানে কর ফাঁকির প্রবণতা বেশি। নিয়মিত করদাতা এবং সঞ্চয়প্রবণ নাগরিকদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করলে তা দীর্ঘ মেয়াদে অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক ফল বয়ে আনবে না।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) সাবেক মহাপরিচালক ও অর্থনীতিবিদ ড. তৌফিক আহমদ চৌধুরী খবরের কাগজকে বলেন, বাংলাদেশে সঞ্চয়ের হার এমনিতেই কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় নেই। ব্যাংকে আমানতের প্রবৃদ্ধি কমেছে, অন্যদিকে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের প্রকৃত সঞ্চয় করার সক্ষমতাও কমে গেছে। এই পরিস্থিতিতে সঞ্চয়ের ওপর কর-প্রণোদনা কমিয়ে দিলে মানুষ ভোগ ব্যয়ের দিকে ঝুঁকতে পারে অথবা বিকল্প অনানুষ্ঠানিক বিনিয়োগের পথ খুঁজতে পারে, যা আর্থিক খাতের জন্যও ইতিবাচক নয়।

তিনি বলেন, উচ্চ আয়ের মানুষ তাদের বিনিয়োগ বিভিন্ন খাতে ছড়িয়ে দিতে পারেন। কিন্তু সীমিত আয়ের চাকরিজীবী ও অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের জন্য সঞ্চয়পত্রই সবচেয়ে সহজ ও নিরাপদ বিনিয়োগের মাধ্যম। ফলে কর রেয়াত কমে যাওয়ার সরাসরি প্রভাব তাদের পরিবারের মাসিক ব্যয় ব্যবস্থাপনায় পড়বে।

তিনি আরও বলেন, কর ভিত্তি সম্প্রসারণের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো নতুন করদাতা অন্তর্ভুক্ত করা, কর প্রশাসনের দক্ষতা বাড়ানো এবং কর ফাঁকি কমানো। একই সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় কর অব্যাহতি বন্ধ করা যেতে পারে। কিন্তু ক্ষুদ্র সঞ্চয়কারীদের প্রণোদনা কমিয়ে রাজস্ব বাড়ানোর চেষ্টা খুব বেশি কার্যকর হবে না।

সঞ্চয়পত্রের কর রেয়াত সুবিধা কমানোর ক্ষেত্রে সরকারের যুক্তি হলো, কর অব্যাহতির পরিমাণ ধীরে ধীরে যৌক্তিক পর্যায়ে আনা প্রয়োজন। অতিরিক্ত করছাড়ের কারণে রাজস্ব আদায়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের কর রেয়াত সীমিত করে কর-কাঠামোকে আরও সমতাভিত্তিক করার উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থাও দীর্ঘদিন ধরে কর অব্যাহতি কমিয়ে কর ভিত্তি সম্প্রসারণের পরামর্শ দিয়ে আসছে।

ব্যাংকিং খাতের সংশ্লিষ্টদের মতে, সঞ্চয়পত্রে কর সুবিধা কমে গেলে কিছু অর্থ ব্যাংক আমানতে ফিরে আসতে পারে। তবে ব্যাংকে প্রকৃত সুদের হার যদি মূল্যস্ফীতির তুলনায় কম থাকে, তাহলে মানুষ সঞ্চয়ের পরিবর্তে জমি, স্বর্ণ কিংবা অন্য সম্পদে বিনিয়োগে আগ্রহী হতে পারেন। এতে উৎপাদনশীল আর্থিক খাতে দীর্ঘমেয়াদি তহবিল সংগ্রহ আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণিই মূলত নিয়মিত কর দেয়, ব্যাংকে সঞ্চয় রাখে এবং আনুষ্ঠানিক অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকে। এই শ্রেণির ওপর ধারাবাহিকভাবে অতিরিক্ত আর্থিক চাপ সৃষ্টি হলে তাদের ভোগক্ষমতা কমবে, যা সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও আবাসন ব্যয়ের চাপের মধ্যে থাকা পরিবারগুলোকে আরও হিসাব করে চলতে হবে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরী খবরের কাগজকে বলেন, রাজস্ব আহরণ এবং সামাজিক সুরক্ষার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। সরকার যদি একদিকে কর আদায় বাড়াতে চায়, অন্যদিকে জনগণকে সঞ্চয়ে উৎসাহিত রাখতেও চায়, তাহলে নিম্ন ও মধ্য আয়ের সঞ্চয়কারীদের জন্য পৃথক কর সুবিধা, ধাপে ধাপে কর রেয়াত কিংবা নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত পূর্ণ কর অব্যাহতির মতো বিকল্প ব্যবস্থা বিবেচনা করা যেতে পারে।

সব মিলিয়ে সঞ্চয়পত্রে কর রেয়াতের সুবিধা কমানোর সিদ্ধান্ত সরকারের রাজস্বনীতির অংশ হলেও এর সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়তে পারে মধ্যবিত্ত ও স্থায়ী আয়ের মানুষের ওপর। তিনি বলেন, রাজস্ব বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই, তবে সেই লক্ষ্য অর্জনের পথে সঞ্চয়প্রবণ ও নিয়মিত করদাতাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ না দিয়ে করব্যবস্থার দক্ষতা বৃদ্ধি, কর ফাঁকি রোধ এবং করের আওতা সম্প্রসারণের দিকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত। তাহলেই একদিকে রাজস্ব বৃদ্ধি সম্ভব হবে, অন্যদিকে মধ্যবিত্তের আর্থিক নিরাপত্তাও অক্ষুণ্ন থাকবে।

৬ কারণে মাদক বন্ধ হচ্ছে না

প্রকাশ: ২৬ জুন ২০২৬, ০৮:৩০ এএম
৬ কারণে মাদক বন্ধ হচ্ছে না
ছবি: সংগৃহীত

হাত বাড়ালেই সহজে মিলছে ইয়াবা, হেরোইন, আইস বা ফেনসিডিলের মতো মাদক। গাঁজা সেবন এখন অনেকটা প্রকাশ্যেই চলে, যেন সাধারণ বিড়ি-সিগারেট টানার মতোই। মাঝেমধ্যেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ইয়াবাসহ বিভিন্ন ধরনের মাদকদ্রব্য জব্দ করছে। কিন্তু তাতেও দমছে না মাদক কারবারিরা। বরং আটক হওয়া মাদকের আর্থিক ক্ষতি পোষাতে আরও পাল্লা দিয়ে বড় বড় চোরাচালান নিয়ে আসছে মাদক চক্র।

সংশ্লিষ্টদের মতে, গত তিন মাসে (মার্চ থেকে মে) শুধু বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) অভিযানে ৫০ লাখ ৮৯ হাজার ৮০৩ পিস ইয়াবা জব্দ করা হয়।

বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, দেশের ৮২ লাখ মানুষ বিভিন্ন ধরনের মাদকে আসক্ত। অন্যদিকে পুলিশ সদর দপ্তর জানিয়েছে, সারা দেশে তিন মাসে (মার্চ থেকে মে) মাদকসংক্রান্ত মামলায় ১৮ হাজার ২১০ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এমনই এক ভয়াবহ বাস্তবতার মাঝেই আজ ২৬ জুন দেশে ‘মাদকদ্রব্য অপব্যবহার ও অবৈধ পাচারবিরোধী আন্তর্জাতিক দিবস’ পালন করা হচ্ছে। 

মাদকের বিরুদ্ধে রয়েছে জিরো টলারেন্স। বিভিন্ন সময়ে অনেক হাঁকডাক দিয়ে চলে অভিযান। বিভিন্ন বাহিনী-সংস্থার তৎপরতাও চোখে পড়ার মতো। তা সত্ত্বেও মাদকের আগ্রাসন কেন বন্ধ হচ্ছে না, সে প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে অনেকের মনেই। মাদকের ভয়াবহ বিস্তার বন্ধ না হওয়ার নেপথ্যে অন্তত ছয়টি বিশেষ কারণের কথা উল্লেখ করেছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও অপরাধ বিশ্লেষকরা। তারা মনে করেন, মাদকের প্রবল চাহিদা ও সহজলভ্যতা, ভৌগোলিক ট্রানজিট, গডফাদাররা অধরা থাকা, সিনথেটিক বা কৃত্রিম মাদকের বিস্তার ও অপকৌশল, আইনি ফাঁকফোকর এবং পুনর্বাসনের অভাব থেকেই সমাজে মাদকের ব্যাপক বিস্তার অব্যাহত রয়েছে।

এ প্রসঙ্গে অপরাধ বিশেষজ্ঞ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক খবরের কাগজকে বলেন, ‘বাংলাদেশে যেসব মাদকদ্রব্যের আগ্রাসন দেখা যাচ্ছে, সেগুলোর অধিকাংশই প্রতিবেশী দুই দেশ (ভারত ও মায়ানমার) থেকে আসা। বাংলাদেশের বেশ কিছু অঞ্চলের সীমান্তে জলপথ বা দুর্গম পাহাড় রয়েছে। ফলে সীমান্তের সেই ভৌগোলিক পরিস্থিতির সুযোগ নিচ্ছে দেশি-বিদেশি মাদক চক্র। তা ছাড়া আইস বা ইয়াবার মতো কৃত্রিম মাদকের ব্যাপক বিস্তার, নিত্যনতুন অপকৌশল, মাদক সিন্ডিকেটের হোতারা ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্ষমতা ও সদিচ্ছার অভাব, মাদক মামলাগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তি না হওয়া এবং মাদকসংশ্লিষ্টদের ভালো কোনো কাজে যুক্ত করা বা যথাযথ পুনর্বাসন করতে না পারায় মাদকের আগ্রাসন তীব্র হচ্ছে। সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে যেমন এই বিষয়ে কঠোর হতে হবে, তেমনি পরিবার ও সমাজেরও বড় ভূমিকা পালন করতে হবে। মাদকের বিরুদ্ধে প্রথম নিয়ন্ত্রণটা পরিবার ও সমাজ থেকেই আসা জরুরি।’ 

সম্প্রতি বড় কয়েকটি অভিযানের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত ২২ জুন সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার জারুলিয়াছড়ি সীমান্তবর্তী কাজুবাদাম বাগানে অভিযান চালিয়ে ১ লাখ ৭৯০ পিস ইয়াবা জব্দ করে বিজিবি। তার আগে ৫ জুন রাত সাড়ে ১২টায় কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফ সীমান্তে পৃথক তিনটি অভিযানে ৫ লাখ ৭২ হাজার পিস ইয়াবা ট্যাবলেটসহ একজনকে আটক করে বিজিবি। ওই অভিযানে অন্য চোরাকারবারিরা পালিয়ে যায়। এ ছাড়া গত ১১ এপ্রিল কক্সবাজার সীমান্তে রামু ও উখিয়ায় পৃথক অভিযানে ১০ লাখ ৫৯ হাজার ৪০০ পিস ইয়াবা উদ্ধার করে বিবিজি। এ রকম মাদকদ্রব্যের ছোট-বড় চালান প্রতিনিয়তই ঢুকছে দেশের অভ্যন্তরে।

এ প্রসঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মনজিল মোরসেদ খবরের কাগজকে বলেন, ‘সীমান্ত থেকে শুরু করে রাজধানী পর্যন্ত প্রভাবশালীরা জড়িত এই মাদক ব্যবসার সঙ্গে, যাদের মধ্যে রয়েছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একশ্রেণির কর্মকর্তা বা সদস্য, রাজনৈতিক নেতাসহ সমাজের বিভিন্ন স্তরের লোকজন। অথচ বর্তমান সমাজে মাদকের বিস্তার ভয়ানক পরিস্থিতি তৈরি করেছে। এভাবে চলতে থাকলে খুব অল্প দিনের মধ্যেই তরুণ প্রজন্ম বা আগামীর ‘জেনারেশন’ (প্রজন্ম) ধ্বংস হয়ে যাবে। এতে পুরো জাতি বা বাংলাদেশই মেরুদণ্ডহীন হয়ে পড়বে। ফলে মাদকের ভয়াবহতা রুখতে জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও শাস্তির বিষয়ে জিরো টলারেন্স নীতিতে এগোতে হবে সরকারকে।

মাদক মামলার আসামিরা সহজেই আইনি সুযোগ নিয়ে জামিন পাচ্ছে–এ প্রসঙ্গে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বলেন, অনেক সময় দেখা গেছে, রাজনৈতিক কারণে অনেকে আটক হলেও বিভিন্ন অসৎ উদ্দেশ্যে পাঁচ-দশ পিস ইয়াবা বা অল্প পরিমাণ গাঁজা-ফেনসিডিলসহ অল্প পরিমাণে নানা মাদকদ্রব্য পাওয়ার তথ্য এজাহারে যুক্ত করে অনেককে ফাঁসানো হয়েছে, যা পরে মিথ্যা অভিযোগ হিসেবে প্রমাণ হয়েছে। এ ধরনের প্রবণতায় মূলত বিচারব্যবস্থার প্রতি সন্দেহের জায়গা তৈরি হয়েছে। প্রকৃত মাদক কারবারিরাও যেমন সুযোগ পাচ্ছে, তেমনি নিরীহ অনেকে ভুক্তভোগী হচ্ছে। তাই মাদক আইনের মামলা দায়েরের ক্ষেত্রে অনৈতিক চর্চা বন্ধ করা করা খুব জরুরি। 

রাজধানী ঢাকায় মাদকসেবী ও কারবারিদের তৎপরতা সবচেয়ে বেশি বলে মনে করেন অপরাধ বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্প, পল্লবীর বিহারি ক্যাম্পসহ রাজধানীর চারপাশের এলাকাগুলো এবং নিম্ন আয়ের বসতি বা বস্তি-মহল্লাগুলোতে মাদক তৎপরতা ভয়ানক রূপ নিয়েছে। অবশ্য ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) মাদকের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযানও পরিচালনা করে যাচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (গোয়েন্দা) মো. শফিকুল ইসলাম খবরের কাগজকে বলেন, পুলিশের প্রধান কাজ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণের জন্য একটি অধিদপ্তর রয়েছে, তাদের কাজ মাদক নিয়ন্ত্রণ করা। তা ছাড়া বাংলাদেশে কোনো মাদকদ্রব্য উৎপাদন বা তৈরি হয় না। যেসব মাদক দেখা যাচ্ছে, সেগুলো সীমান্ত পেরিয়ে অন্য দেশ থেকে ঢুকছে। সেখানে নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। তার পরও নিয়মিত অভিযানের মাধ্যমে মাদক নিয়ন্ত্রণ ও জড়িতদের গ্রেপ্তারে পুলিশ কাজ করছে।

সীমান্তে মাদক তৎপরতা কেন বন্ধ করা যাচ্ছে না–এমন প্রশ্নের উত্তরে বিজিবি সদর দপ্তরের উপমহাপরিচালক (গণমাধ্যম) কর্নেল আবুল হাসনাত মোহাম্মদ মাহমুদ আজম খবরের কাগজকে বলেন, ‘বাংলাদেশের দীর্ঘ সীমান্ত এবং প্রতিবেশী অঞ্চলে সক্রিয় মাদক পাচার চক্রের কারণে সীমান্ত দিয়ে মাদক প্রবেশের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। এ ধরনের প্রচেষ্টা প্রতিরোধে সীমান্তরক্ষী বাহিনী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা, গোয়েন্দা সংস্থা এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো সমন্বিতভাবে কাজ করে যাচ্ছে। গত এক বছরে বিজিবি উল্লেখযোগ্য পরিমাণ মাদকদ্রব্য জব্দ করেছে। সীমান্ত দিয়ে মাদক প্রবেশের প্রচেষ্টা থাকলেও তা প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তবে এর স্থায়ী সমাধান শুধু সীমান্তে অভিযান বা আইন প্রয়োগের মাধ্যমে সম্ভব নয়, বরং সীমান্তে কঠোর নজরদারি, গোয়েন্দা তথ্যভিত্তিক অভিযান ও আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সর্বস্তরের জনগণের সচেতন অংশগ্রহণের মাধ্যমেই মাদকমুক্ত বাংলাদেশ গড়া সম্ভব।’

মাদক প্রতিরোধ বা নিয়ন্ত্রণের প্রধান দায়িত্ব ‘মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি)’। মাদক নির্মূলের জন্য সংস্থাটির অভিযানসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও সদস্যরা এখন আগ্নেয়াস্ত্রও ব্যবহার করছেন। কিন্তু মাদকদ্রব্য জব্দ বা জড়িতদের গ্রেপ্তারে উল্লেখযোগ্য বা বড় কোনো সাফল্য দেখছেন না বিশ্লেষকরা। এমনকি প্রতিষ্ঠানটির মাদকবিরোধী ভূমিকা নিয়েও সাধারণ মানুষ এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যেও রয়েছে নানা প্রশ্ন। 

এ বিষয়ে জানতে চাইলে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) মো. হাসান মারুফ খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমরা নিয়মিত অভিযান বজায় রেখেছি। বাংলাদেশ পুলিশ, বিজিবি, কোস্টগার্ডসহ অন্য বাহিনী, র‍্যাব–সবাই চেষ্টা করছে। মাদক নির্মূলে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। আর সবচেয়ে বড় বিষয়–যারা মাদক সেবন করে, সেসব পরিবারের মানুষজনকে সচেতন হতে হবে। অভিভাবকদের, শিক্ষকদের, সমাজের যারা নেতা, তাদের আন্তরিক ভূমিকা প্রয়োজন। অভিযান চলবেই, তবে গণসচেতনতা তৈরি হলে মাদক থেকে মানুষ দূরে থাকবে। 

পরিসংখ্যান যা বলছে

বিজিবি সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত তিন মাসে (মার্চ থেকে মে) ৫০ লাখ ৮৯ হাজার ৮০৩ পিস ইয়াবা উদ্ধার করে বিজিবি। এর মধ্যে মার্চে ১১ লাখ ২৫ হাজার ৯৭৫ পিস, এপ্রিলে ২৩ লাখ ১৩ হাজার ৮৭৬ পিস এবং মে মাসে ১৬ লাখ ৪৯ হাজার ৯৫২ পিস ইয়াবা জব্দ করা হয়। ক্রিস্টাল মেথ বা আইস মার্চে ১ কেজি ৭৯০ গ্রাম এবং মে মাসে ৩ কেজি ৮৮৩ গ্রাম উদ্ধার করা হয়। অন্যদিকে মে মাসে ২৬০ গ্রাম কোকেনও জব্দ করা হয়েছে। হেরোইন উদ্ধার হয়েছে মার্চে ৮৪৫ গ্রাম, এপ্রিলে ৪৪২ গ্রাম এবং মে মাসে ৩৩৭ গ্রাম।

ফেনসিডিল উদ্ধার ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে গত তিন মাসে। এতে দেখা গেছে–মার্চে ২ হাজার ৪৫ বোতল, এপ্রিলে ২ হাজার ৪২৩ বোতল এবং মে মাসে ২ হাজার ৮০৭ বোতল। মে মাসে সর্বোচ্চ ১ হাজার ৭৫২ কেজি গাঁজা উদ্ধার করা হয়। মার্চে উদ্ধার ছিল ১ হাজার ১৩৩ কেজি ৪৫০ গ্রাম এবং এপ্রিলে ১ হাজার ১৪৯ কেজি।

ডিএমপির তথ্যমতে, গত মে মাসে রাজধানীতে বিপুল পরিমাণ মাদকদ্রব্য উদ্ধার করে পুলিশ। এর মধ্যে ইয়াবা ট্যাবলেট ১ লাখ ৭৪ হাজার ১৪ পিস, আইস মাদক ৩১ গ্রাম, গাঁজা ৭৪৩ কেজি ৮৩৩ গ্রাম, হেরোইন ৬৭৫ গ্রাম ৪৪ পুরিয়া, ফেনসিডিল ১ হাজার ২৮০ বোতল অন্যতম। মে মাসে মাদকসহ মোট ৪১৬ জনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। অন্যদিকে এপ্রিল মাসে রাজধানীতে ইয়াবা ট্যাবলেট ৩ লাখ ৩৪ হাজার ৯৭৪ পিস, কোকেন ৪৫০ গ্রাম, গাঁজা ৯২৯ কেজি ৪২১ গ্রাম, হেরোইন ৯ কেজি ১৪১ গ্রাম এবং মার্চে ইয়াবা ট্যাবলেট ৯৯ হাজার ৮২৭ পিস, কোকেন ৪৫০ গ্রাম, গাঁজা ৪৩৯ কেজি ৩৩৭ গ্রাম, হেরোইন ৫৬৬ গ্রাম জব্দ করা হয়।

অন্যদিকে পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে চলতি বছরের মার্চ থেকে মে পর্যন্ত তিন মাসে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে ১৮ হাজার ২১০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর মধ্যে মার্চে ৫ হাজার ৪০৯ জন, এপ্রিলে ৫ হাজার ৭০৯ জন এবং মে মাসে ৭ হাজার ৯২ জন।

দুদক পুনর্গঠনে আলোচনায় যাদের নাম

প্রকাশ: ২৫ জুন ২০২৬, ০৮:৫৮ এএম
দুদক পুনর্গঠনে আলোচনায় যাদের নাম
ছবি: সংগৃহীত

দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) চেয়ারম্যান ও দুই কমিশনার নিয়োগ হবে শিগগিরই। এ জন্য যথাযথ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। কমিশনের দায়িত্ব পেতে পারেন এমন অনেকের নাম শোনা যাচ্ছে। ইতোমধ্যে বাছাই কমিটি গঠন করা হয়েছে। বাছাই কমিটির সুপারিশের পর দুদকের চেয়ারম্যান ও দুই কমিশনার নিয়োগ করবেন রাষ্ট্রপতি। রাষ্ট্রপতির দেওয়া নিয়োগের মধ্য দিয়েই নিশ্চিত হবে কারা দুদকের সবোর্চ্চ কর্তৃত্বের অধিকারী হচ্ছেন। 

চেয়ারম্যান ও দুই কমিশনারের পদত্যাগের মধ্য দিয়ে গত ৩ মার্চ কমিশনশূন্য হয় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। সাড়ে তিন মাস পর দুদক পুনর্গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। দুদকের চেয়ারম্যান ও দুই কমিশনারের নাম প্রস্তাব করতে ইতোমধ্যে গঠন হয়েছে বাছাই কমিটি। গত সোমবার ৫ সদস্যের বাছাই কমিটির তালিকাসংবলিত প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। প্রজ্ঞাপনে বাছাই কমিটির প্রধান আপিল বিভাগের বিচারপতি মো. রেজাউল হক ও সদস্য রয়েছেন হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি রাজিক আল জলিল, মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক (সিএজি) মো. নুরুল ইসলাম, সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মোবাশ্বের মোনেম এবং মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি। এই বাছাই কমিটি দুদকের কমিশনার হিসেবে মনোনয়ন দিতে অনেকের নাম সংগ্রহ করবে। এর মধ্য থেকে বাছাই করে ৬ জনের নামের তালিকা রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠানো হবে। সেই তালিকা থেকে তিনজনকে কমিশনার নিয়োগ করে সেই তিনজনের মধ্যে একজনকে চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেবেন রাষ্ট্রপতি। 

ইতোমধ্যে বাছাই কমিটির মিটিং হয়েছে কি না, তা জানা যায়নি। তবে দুদকের কমিশনার হতে পারেন এমন অনেকের নাম বিভিন্ন মহলে আলোচনা হচ্ছে। এর মধ্যে গত মার্চ মাস থেকেই ঢাকা মহানগর আদালতের সাবেক সিনিয়র স্পেশাল জজ মোতাহার হোসেনের নাম শোনা যাচ্ছে। তিনি ২০১৩ সালের ১৭ নভেম্বর এক রায়ে অর্থ পাচারসংক্রান্ত এক মামলায় বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে বেকসুর খালাস দিয়েছিলেন। সে সময় তিনি ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৩-এর বিচারক ছিলেন। ওই বছরের ডিসেম্বর মাসে তিনি অবসরে যান। 

এ ছাড়া সাবেক সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ ড. আবুল হোসেন খন্দকার, অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধিভুক্ত ফিন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিলের (এফআরসি) চেয়ারম্যান ড. সাজ্জাদ হোসেন ভূঁইয়া, নির্বাচন কমিশনের সচিব আখতার আহমেদ, লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) চৌধুরী হাসান সারওয়ার্দী, পুলিশের সাবেক আইজিপি শহুদুল হকের নাম শোনা যাচ্ছে। 

২০০৪ সালে দুদক প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর থেকে বেশির ভাগ সময়ে প্রশাসনের অর্থাৎ সাবেক সচিবদের মধ্য থেকেই দুদকের চেয়ারম্যান নিয়োগ করতে দেখা গেছে। বিচার বিভাগের মধ্য থেকে একজন বিচারপতিকে ২০০৪ সালে অর্থাৎ প্রথম কমিশনের চেয়ারম্যান নিয়োগ করা হয়েছিল। 

সশস্ত্র বাহিনীর লে. জে. (অব.) হাসান মশহুদ চৌধুরীকে চেয়ারম্যান নিয়োগ করা হয়েছিল ২০০৭ সালে। অন্য সব সময় সাবেক সচিবরাই হয়েছেন দুদকের চেয়ারম্যান। বিগত কমিশনগুলোতে বিচার বিভাগ থেকে একজন কমিশনার (সাবেক জেলা জজ), সশস্ত্র বাহিনী থেকে একজন কমিশনার (অসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার) অথবা এনবিআরের সদস্যকে কমিশনার হিসেবে নিয়োগ দিতে দেখা গেছে। কমিশন নিয়োগের ক্ষেত্রে একই ধরনের ধারাবাহিকতা থাকতে পারে বলে জানা গেছে। 

মার্চের শুরুতে পুরো কমিশন পদত্যাগ করার সময়েই দুদকের অভিযোগ যাচাই-বাছাই কমিটিতে (যাবাক) কয়েক হাজার অভিযোগের যাচাই চলছিল। সেগুলো যাচাই শেষে অনুসন্ধানের সুপারিশ করা হলেও কমিশন না থাকায় সিদ্ধান্ত হয়নি। এরপরও প্রায় প্রতিদিনই শত শত নতুন অভিযোগ দুদকে জমা হচ্ছে। বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ও কয়েকজন উপদেষ্টাসহ তাদের সংশ্লিষ্ট অনেকের বিরুদ্ধে বেশ কিছু অভিযোগ দাখিল হয়েছে। সরকারি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোতে বিড়ম্বনা, হয়রানি ও ঘুষ-দুর্নীতির শিকার হয়ে দুদকে অভিযোগ দিয়েছেন অনেকেই।

বিআরটিএ, পাসপোর্ট অফিস, ভূমি অফিস, সাব-রেজিস্ট্রি অফিস, হাসপাতাল, গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ, সিটি করপোরেশন, পৌরসভাসহ দুর্নীতিপ্রবণ প্রতিষ্ঠানগুলোর চলমান অবৈধ ঘুষ-দুর্নীতি ও অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ এসেছে। দুদকের হটলাইন ১০৬ নম্বরে ফোন করেও প্রতিদিন অভিযোগ দেওয়া হচ্ছে। রাজধানীর সেগুনবাগিচায় দুদকের প্রধান কার্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় থাকা দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয়গুলোতে লিখিত অভিযোগ জমা হচ্ছে। এসব অভিযোগের কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা যাচ্ছে না। নতুন কমিশন নিয়োগ ও যোগদান না করা পর্যন্ত এ অবস্থার কোনো পরিবর্তন হওয়ার সুযোগও নেই। যদিও বিদায়ী কমিশনের অনুমোদিত অভিযোগের অনুসন্ধান ও মামলার তদন্তসংশ্লিষ্ট এখতিয়ারভুক্ত কাজ চলছে বলে জানিয়েছেন দুদকের উপপরিচালক (জনসংযোগ) আকতারুল ইসলাম। 

দুদকের একাধিক কর্মকর্তা খবরের কাগজকে জানিয়েছেন, যেসব অভিযোগের অনুসন্ধান ও মামলার তদন্ত ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে, সেগুলোর মামলা দায়ের ও চার্জশিট দাখিলের বিষয়ে কমিশনের অনুমোদন নেওয়া বাধ্যতামূলক। তাই মামলা দায়ের ও চার্জশিট দাখিল করতে পরবর্তী কমিশনের জন্য অপেক্ষা করতে হচ্ছে। তবে এমন ঘটনাও আছে যে, কমিশন না থাকার সুযোগে দুদকের কিছুসংখ্যক কর্মকর্তা ইচ্ছাকৃতভাবে অনুসন্ধান ও মামলার তদন্তকাজ থামিয়ে রেখেছেন। তারা চাইলে এসব কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারতেন। কিন্তু তা করছেন না।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি শিথিলতায় বেপরোয়া অপরাধীরা

প্রকাশ: ২৫ জুন ২০২৬, ০৮:৪৮ এএম
আপডেট: ২৫ জুন ২০২৬, ০৮:৫২ এএম
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি শিথিলতায় বেপরোয়া অপরাধীরা
খবরের কাগজ ইনফোগ্রাফিক

খুন-জখম, অপহরণ ও ডাকাতির মতো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বর্তমানে আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। শুধু পেশাদার অপরাধী বা আন্ডারওয়ার্ল্ডের সন্ত্রাসীদের মধ্যেই এসব সীমাবদ্ধ নয়, বরং সামাজিক ও রাজনৈতিক কোন্দল এবং অস্থিরতার কারণেও এই ধরনের নৃশংস ও নির্মম ঘটনা প্রতিনিয়ত ঘটছে। এর ফলে দেশের সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সাধারণ মানুষের জন্য চরম উদ্বেগ ও আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের হিসাবেই চলতি বছরের পাঁচ মাসে (জানুয়ারি-মে) সারা দেশে খুন হয়েছেন ১ হাজার ৪৪৪ জন। এই পাঁচ মাসে বিভিন্ন ঘটনায় অন্তত ২৬৮ জন পুলিশ সদস্য হামলার শিকার হয়েছেন। 

সাম্প্রতিক সময়েও রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে খুন, অপহরণ, ধর্ষণসহ নানা ধরনের অপরাধ ঘটতে দেখা গেছে উদ্বেগজনক হারে। অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে পুলিশ বাহিনীর মধ্যে যে মানসিক বিপর্যয় দেখা দিয়েছিল, তার রেশ এখনো রয়ে গেছে। বর্তমান অপরাধের ধরন ও বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় পুলিশকে এখন কঠোর ও জোরালো পদক্ষেপ নিতে হবে। তা না হলে অপরাধপ্রবণতা আরও বাড়তে থাকবে।

এ প্রসঙ্গে সাবেক আইজিপি মুহাম্মদ নুরুল হুদা গত মঙ্গলবার খবরের কাগজকে বলেন, ‘সময় ও প্রেক্ষাপটের পরিবর্তনের কারণে বর্তমান সমাজে অপরাধপ্রবণতা বাড়ছে। পুলিশও বারবার হামলার শিকার হচ্ছে। পুলিশ কেন হামলার শিকার হচ্ছে সেটি অনুধাবন করতে হবে। আগেও পুলিশ হামলার শিকার হয়েছে, কিন্তু বর্তমানে পরিমাণটা খুব বেড়েছে। ফলে কিছু ক্ষেত্রে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। তা ছাড়া আমাদের দেশের সামাজিক বাস্তবতায় এবং অপরাধের ধরন অনুসারে অবশ্যই যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। আইনশৃঙ্খলার উন্নয়নে এবং পুলিশের সক্ষমতা বাড়াতে সরকার ও রাজনীতিকদের আরও দৃশ্যমান ভূমিকা পালন করতে হবে।’ 

সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করে পাওয়া গেছে, প্রায় সব ধরনের অপরাধী এখন অনেকটা আক্রমণাত্মক হয়ে উঠেছে। আগ্নেয়াস্ত্র ও ধারালো অস্ত্রের ব্যবহার বেড়ে গেছে। প্রকাশ্যে খুন-জখম করতেও অনেকে দ্বিধা করছে না। গভীর রাত বা নির্জন এলাকা লাগছে না, জনসমাগমপূর্ণ এলাকা ও রাস্তার মোড়েও মোবাইল ফোন, টাকা বা মূল্যবান সামগ্রী ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনা ঘটছে। আসামি ধরতে গিয়ে প্রতিনিয়ত হামলার শিকার হচ্ছেন পুলিশ সদস্যরাও। কে কখন কোথায় কীভাবে এই ধরনের বিপদের সম্মুখীন হবেন, সেই দুশ্চিন্তা তাড়া করছে রাজধানীবাসীসহ বিভিন্ন শহর-নগরাঞ্চলের মানুষদের।

পুলিশের মধ্যে একধরনের শিথিলতার সুযোগ নিয়ে অপরাধীরা বেপরোয়া হয়ে উঠছে বলে মনে করেন সামাজিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক। তিনি গত মঙ্গলবার খবরের কাগজকে বলেন, ‘সমাজে অপরাধপ্রবণতা বাড়ার নেপথ্যে সাধারণত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শিথিলতা বা দুর্বল তৎপরতার বিষয়গুলোই সামনে আসে। যদিও সেখানে রাজনৈতিক ও সামাজিক নানা প্রেক্ষাপটের দায় থাকে। তবে অভ্যুত্থান-পরবর্তী এই সময়ে এসেও অপরাধীদের বেপরোয়া কর্মকাণ্ড নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক। আমরা সবাই জানি, পুলিশ একটি বিশেষ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে দেড়-দুই বছর ধরে কাজ করে যাচ্ছে। সেদিক থেকে কিছুটা নেতিবাচক প্রভাবও পুলিশকে নানাভাবে বাধাগ্রস্ত করেছে বা করছে। কিন্তু বর্তমানে রাজনৈতিক সরকার রয়েছে, সার্বিক পরিস্থিতিও আগের তুলনায় স্বাভাবিক করার চেষ্টা চলছে। ফলে পুলিশকে অপরাধ দমনে শক্তভাবেই হাল ধরতে হবে। পেশাদারত্বের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারে। আইনের মধ্যে থেকে যেখানে যে ধরনের পদক্ষেপ প্রয়োজন, ঠিক তেমনটাই করতে হবে।’

এ প্রসঙ্গে পুলিশ সদর দপ্তরের গণমাধ্যম শাখার এআইজি এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন খবরের কাগজকে বলেন, ‘আইনের মধ্যে থেকে পুলিশ যথাযথ দায়িত্ব পালন করছে। যেখানেই অপরাধ ঘটছে বা পুলিশ খবর পাচ্ছে, সেখানেই আন্তরিকতার সঙ্গে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এরই মধ্যে চাঞ্চল্যকর বেশ কিছু খুন বা ধর্ষণের ঘটনায় পুলিশ অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে তদন্ত এবং গ্রেপ্তার করে তদন্ত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছে। দ্রুততম সময়ে রহস্য উদ্ঘাটন, জড়িতদের গ্রেপ্তার নানা ক্ষেত্রেই পুলিশ যথেষ্ট সাফল্যের স্বাক্ষর রাখছে।’

পাঁচ মাসে ১ হাজার ৪৪৪ জন খুন
পুলিশ সদর দপ্তরের অপরাধের পরিসংখ্যানেও উদ্বেগজনক চিত্র দেখা গেছে। এর মধ্যে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত পাঁচ মাসে সারা দেশে মোট ১ হাজার ৪৪৪টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। মাসভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, বছরের শুরুতেই জানুয়ারিতে ২৮৭টি এবং ফেব্রুয়ারিতে ২৫০টি খুনের ঘটনা ঘটেছে। তবে মার্চ মাসে এই সংখ্যা এক লাফে বেড়ে ৩১৭টিতে পৌঁছায়। এরপর এপ্রিলে কিছুটা কমে ২৮০টি হত্যাকাণ্ড ঘটলেও মে মাসে তা আবার বৃদ্ধি পেয়ে ৩১০টিতে দাঁড়ায়। চলতি জুনের এই কয়েক দিনে সারা দেশের চিত্র বিভিন্ন গণমাধ্যমে যেমনটি দেখা গেছে, তাতে হত্যার সংখ্যা গত মাসকে ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

নারী ও শিশু নির্যাতন ৭ হাজার ৯১০টি
গত পাঁচ মাসে সারা দেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের ভয়াবহ চিত্র সামনে এসেছে। মোট ৭ হাজার ৯১০টি নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনার রেকর্ড করেছে পুলিশ সদর দপ্তর। এর মধ্যে জানুয়ারিতে ১ হাজার ২৮১টি, ফেব্রুয়ারিতে ১ হাজার ১৮১টি নির্যাতনের ঘটনা ঘটে। মার্চ মাসে এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ৪৮৫টিতে। এপ্রিল ও মে মাসে নির্যাতনের ঘটনা সবচেয়ে বেশি ছিল; এপ্রিলে ২ হাজার ১১টি এবং মে মাসে ১ হাজার ৯৫২টি নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটে। 

অপহরণের ঘটনা ৪৩৭টি
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্যমতে, গত পাঁচ মাসে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে মোট ৪৩৭টি অপহরণের ঘটনা ঘটেছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জানুয়ারিতে ৮৭টি এবং ফেব্রুয়ারিতে বছরের সর্বনিম্ন ৬৪টি অপহরণের ঘটনা ঘটে। মার্চ মাসে ঘটে ১০২টি। পরে এপ্রিলে ৯৪টি এবং মে মাসে ৯০টি অপহরণের ঘটনা পুলিশ সদর দপ্তরের নথিতে নিবন্ধিত হয়েছে। 

প্রতিনিয়ত হামলার শিকার হচ্ছে পুলিশ
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য বলছে, এই পাঁচ মাসে কর্তব্যরত অবস্থায় অপরাধী ও দুষ্কৃতকারীদের দ্বারা পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। পাঁচ মাসে দেশজুড়ে মোট ২৬৮ জন পুলিশ সদস্যের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে ৪২টি করে হামলার ঘটনা ঘটে। তবে পরবর্তী মাসগুলোতে এই প্রবণতা বৃদ্ধি পায়; মার্চে ৬৩টি, এপ্রিলে বছরের সর্বোচ্চ ৬৬টি এবং মে মাসে পুলিশের ওপর হামলার ৫৫টি ঘটনা ঘটে।

এরই মধ্যে গত ১৬ জুন রাজধানীর আদাবরে ‘কবজি কাটা’ নামে পরিচিত একটি ছিনতাইকারী চক্রের আস্তানায় অভিযান চালাতে গিয়ে ওসি জাহিদুল ইসলাম ও এসআই তরুণ চাপাতির কোপে আহত হন। পরে পুলিশের গুলিতে এক ছিনতাইকারী আহত হন। আটক করা হয় চারজনকে। তার আগে ১১ জুন শেরেবাংলা নগরের জিয়া উদ্যান এলাকায় ছিনতাইকারীদের ধাওয়া করতে গিয়ে ছুরিকাঘাতে আহত হন দুই পুলিশ সদস্য। 

পাঁচ মাসে রাজনৈতিক হত্যার শিকার ৫৫ জন
মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্যমতে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত সারা দেশে রাজনৈতিক হত্যার শিকার হয়েছেন ৫৫ জন, আহত হয়েছেন ২ হাজার ৬৩৬ জন। অন্যদিকে সে সময়ে ২৩৯ জন নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে গণধর্ষণের শিকার হন ৬৮ জন ও ধর্ষণের শিকার হন ২৭১ জন। এ ছাড়া ধর্ষণসংশ্লিষ্ট হত্যাকাণ্ড ঘটে ২৮টি এবং ধর্ষণচেষ্টার শিকার হন ৮৫ জন। 

সাম্প্রতিক খুন-জখমের আলোচিত ঘটনা
গত ২০ জুন তেজগাঁও এলাকায় চলন্ত ট্রেনে ছিনতাইকারীদের হামলার শিকার হন এইচএসসি পরীক্ষার্থী তোফায়েল ইসলাম (২০)। ব্রাহ্মণবাড়িয়া যাওয়ার পথে তিন ছিনতাইকারী তার আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টায় বাধা দিলে তাকে ছুরিকাঘাত করা হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় তিনি বর্তমানে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তার আগে ১৯ জুন মোহাম্মদপুরে বিএনপির ৩৩ নম্বর ওয়ার্ডের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ নূর ইসলাম (৫৫) দুর্বৃত্তদের হামলার শিকার হন। মোটরসাইকেলে আসা কয়েকজন হামলাকারী তাকে কুপিয়ে গুরুতর আহত করে। গত ১৮ জুন কদমতলীতে রাতে বাসায় ফেরার পথে কুপিয়ে হত্যা করা হয় সবজি ব্যবসায়ী আব্দুল কুদ্দুসকে (৫০)। গত ১৭ জুন বাড্ডার সাঁতারকুল এলাকায় খাল থেকে অজ্ঞাতপরিচয় এক যুবকের গলিত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ১৬ জুন কেরানীগঞ্জের আব্দুল্লাপুর ফ্লাইওভারের ওপর ছিনতাইকারীদের ছুরিকাঘাতে নিহত হন তরিকুল ইসলাম পাপন (২৮)। গত ১৩ জুন দুপুরে চট্টগ্রামের রাউজানে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয় রাঙ্গুনিয়া উপজেলা যুবদলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক মাকসুদুল হক চৌধুরী মাসুদকে (৪৫)। তার আগে ১২ জুন হাতিরঝিল-রামপুরা এলাকার ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’ ইয়াসিন খান পলাশ ওরফে ‘কাইল্যা পলাশ’কে মাথায় গুলি করে দুর্বৃত্তরা। এক সপ্তাহ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকার পর গত শুক্রবার দিনগত রাতে তার মৃত্যু হয়। পুলিশ বলছে, অপরাধ জগতের আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে এ হামলার ঘটনা ঘটেছে। 

অন্যদিকে গত ৮ জুন রাজধানীর মৌচাক এলাকায় স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা বিল্লাল হোসেনকে প্রকাশ্যে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়। সাম্প্রতিক সময়ে বরগুনার গৌরীচন্না বাজারের খাল থেকে শামীম নামের এক ব্যক্তির মস্তকবিহীন মরদেহ উদ্ধার ও পাশের এলাকায় কালু নামের এক স্থানীয় যুবককে নৃশংসভাবে কুপিয়ে হত্যা করে বিবস্ত্র অবস্থায় ফেলে রেখে যাওয়ার ঘটনা ঘটে। স্থানীয় বাসিন্দা ও পুলিশের মতে, মাদকের টাকার ভাগাভাগি ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডগুলো ঘটেছে।