বহু দিনের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে চলতি মাসেই যুগ্ম সচিব পদে পদোন্নতির ঘোষণা আসতে পারে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র বলছে, প্রশাসন ক্যাডারের ২৫তম ব্যাচের কর্মকর্তাদের উপসচিব থেকে যুগ্ম সচিব পদে পদোন্নতির প্রস্তুতি প্রায় শেষ পর্যায়ে। একই সঙ্গে ২০২৫ সালে পদোন্নতিবঞ্চিত প্রশাসনের ২৪তম ব্যাচের কিছু কর্মকর্তার আবেদন পুনর্বিবেচনার আওতায় আসতে পারে। ফলে দীর্ঘদিন ধরে পদোন্নতির অপেক্ষায় থাকা কর্মকর্তাদের মধ্যে নতুন করে আশার সঞ্চার হয়েছে।
বর্তমানে মাঠ প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদ জেলা প্রশাসক (ডিসি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন প্রশাসনের চারটি ব্যাচের কর্মকর্তারা। এর মধ্যে ২৫তম ব্যাচের ৯ জন, ২৭তম ব্যাচের ২১ জন, ২৮তম ব্যাচের ১৮ জন এবং ২৯তম ব্যাচের ১৪ জন কর্মকর্তা রয়েছেন। ২৫তম ব্যাচের কর্মকর্তারা যুগ্ম সচিব পদে পদোন্নতি পেলে তাদের একটি বড় অংশকে সচিবালয় বা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়ে আসা হবে। ফলে মাঠ প্রশাসনে নতুন করে জেলা প্রশাসক নিয়োগের সুযোগ তৈরি হবে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ২৫তম ব্যাচের কর্মকর্তাদের পদোন্নতির জন্য সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ডের (এসএসবি) ধারাবাহিক বৈঠক চলছে। ইতোমধ্যেই এ বিষয়ে চার থেকে পাঁচটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। পদোন্নতির আগে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের গোপনীয় প্রতিবেদন, কর্মজীবনের মূল্যায়ন, শৃঙ্খলাজনিত রেকর্ড, কর্মদক্ষতা, শিক্ষাজীবন এবং অন্য প্রশাসনিক তথ্য পর্যালোচনা করা হচ্ছে। প্রায় ৮৬ জন কর্মকর্তা এই ব্যাচে পদোন্নতির যোগ্য বলে জানা গেছে। প্রশাসনের সবচেয়ে ছোট ব্যাচ হওয়ায় গুরুতর শৃঙ্খলা ভঙ্গ, দুর্নীতি বা বড় ধরনের নেতিবাচক প্রতিবেদন না থাকলে অধিকাংশ কর্মকর্তাই পদোন্নতি পেতে পারেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের ধারণা।
এর পাশাপাশি আলোচনায় রয়েছে প্রশাসনের ২৪তম ব্যাচ। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে এই ব্যাচের ১৪২ জন কর্মকর্তা পদোন্নতি পেলেও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক কর্মকর্তা সে সময় ‘রাজনৈতিক’ কারণে বাদ পড়েন। এই ব্যাচের একাধিক কর্মকর্তা অভিযোগ করে বলেন, এই ব্যাচে পদোন্নতির যোগ্য কর্মকর্তা রয়েছেন প্রায় ৩৫০ জন। সে সময় জেলা প্রশাসক (ডিসি), ব্যক্তিগত সচিব (পিএস) ও অন্য গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে কর্মরত অনেক কর্মকর্তাকে ‘ফ্যাসিস্টের দোসর’ ট্যাগ দিয়ে পদোন্নতি থেকে ‘বঞ্চিত’ করে অন্তর্বর্তী সরকার। অথচ এসব পদে দায়িত্ব পালনের জন্য পদোন্নতির ক্ষেত্রে কোনো আইনি বাধা বা এসএসবির বিধিমালায় এমন কোনো শর্ত নেই বলে তারা দাবি করেন।
তাদের ভাষ্য, বাদ পড়া প্রায় সবাই রিভিউ আবেদন করলেও গত দেড় বছরেও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সেগুলো নিষ্পত্তির কোনো উদ্যোগ নেয়নি। ফলে ব্যাচের অনেক মেধাবী ও যোগ্য কর্মকর্তা অন্যায্যভাবে বঞ্চিত হয়েছেন। তাদের অভিযোগ, ২০২৫ সালের পদোন্নতিতে প্রশাসন ক্যাডারের যোগ্য কর্মকর্তাদের মাত্র প্রায় ৪২ শতাংশ পদোন্নতি পেলেও প্রশাসন ক্যাডারে একীভূত (মার্জ) হওয়া ইকোনমিক ক্যাডারের কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে চিত্র ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।
ইকোনমিক ক্যাডার থেকে মার্জ হওয়া ২০ জন কর্মকর্তার মধ্যে ১৭ জনই পদোন্নতি পান, যা প্রায় ৮৫ শতাংশ। এই বড় ব্যবধানকে প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারা বৈষম্যের উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করছেন। তাদের দাবি, পদোন্নতির ক্ষেত্রে সবার জন্য একই নীতি ও সমান মানদণ্ড অনুসরণ করা হলে এমন বৈষম্যের অভিযোগ ওঠার সুযোগ থাকত না।
প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলছেন, বর্তমানে উপসচিব পদের অনুমোদিত সংখ্যা প্রায় আড়াই হাজার। তবে আট শতাধিক পদ শূন্য রয়েছে। অন্যদিকে যুগ্ম সচিব পদের অনুমোদিত সংখ্যাও এক হাজারের বেশি। ফলে পদোন্নতির জন্য প্রশাসনিক কাঠামোয় পর্যাপ্ত সুযোগ রয়েছে। তবে দীর্ঘদিন ধরে নিয়মিত পদোন্নতি না হওয়ায় বিভিন্ন ব্যাচের কর্মকর্তাদের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে।
শুধু ২৫তম বা ২৪তম ব্যাচ নয়, ২১তম ও ৩১তম ব্যাচের কর্মকর্তারাও দীর্ঘদিন ধরে পদোন্নতির অপেক্ষায় রয়েছেন। ২১তম ব্যাচের কর্মকর্তারা অতিরিক্ত সচিব পদে পদোন্নতির যোগ্যতা অর্জনের পরও অপেক্ষা করছেন। একইভাবে ৩১তম ব্যাচের কর্মকর্তারা কয়েক বছর আগে উপসচিব পদে পদোন্নতির যোগ্য হলেও এখন পর্যন্ত তাদের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অভিযোগ, ধারাবাহিকভাবে এসএসবির একাধিক বৈঠক হলেও তাদের বিষয়টি আলোচনায় আসেনি।
একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সময়মতো পদোন্নতি না হওয়ায় প্রশাসনের ভেতরে হতাশা বাড়ছে। মাঠ প্রশাসন থেকে শুরু করে সচিবালয় পর্যন্ত সরকারের গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি বাস্তবায়নের দায়িত্ব পালন করলেও পদোন্নতির ক্ষেত্রে বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হচ্ছে। এতে কর্মস্পৃহা ও পেশাগত আত্মবিশ্বাসে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
কর্মকর্তাদের আরেকটি বড় অভিযোগ, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরপর সচিব ও সচিব পদমর্যাদার গুরুত্বপূর্ণ পদে বেশ কয়েকজন সাবেক কর্মকর্তাকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এতে নিয়মিত কর্মকর্তাদের পদোন্নতির সুযোগ সংকুচিত হচ্ছে। তাদের মতে, অবসরের পরও চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ অব্যাহত থাকায় স্বাভাবিক পদোন্নতির ধারা ব্যাহত হচ্ছে এবং ক্যারিয়ার পরিকল্পনায় অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে।
তবে প্রশাসনের অভিজ্ঞ ব্যক্তিরা বলছেন, শুধু জ্যেষ্ঠতা নয়, দক্ষতা, সততা ও কর্মদক্ষতাকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
এসব বিষয়ে সাবেক সচিব ও জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ এ কে এম আব্দুল আউয়াল মজুমদার খবরের কাগজকে বলেন, বর্তমানে কর্মরত যোগ্য কর্মকর্তাদের পাশাপাশি অতীতে বঞ্চিত দক্ষ কর্মকর্তাদেরও মূল্যায়নের সুযোগ থাকা উচিত। তবে কোনো ধরনের পাইকারি পদোন্নতির পরিবর্তে কর্মদক্ষতা, সুনাম, সততা ও রাষ্ট্রীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে প্রশাসন সাজাতে হবে। একই সঙ্গে প্রত্যেক কর্মকর্তাকেও নিজের অবদান ও কর্মদক্ষতার ভিত্তিতে মূল্যায়নের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।
এদিকে প্রশাসনের একাধিক সূত্রের মতে, ২৫তম ব্যাচের কর্মকর্তারা যুগ্ম সচিব পদে পদোন্নতি পেলে মাঠ প্রশাসনে বড় ধরনের রদবদল হতে পারে। তা ছাড়া বর্তমানে দায়িত্বে থাকা কয়েকজন জেলা প্রশাসকের বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন অভিযোগ ও কর্ম সম্পাদনের মূল্যায়নও বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে। ফলে শূন্য হওয়া পদগুলোতে নতুন জেলা প্রশাসক নিয়োগের সম্ভাবনা রয়েছে।