ভারতের দক্ষিণাঞ্চলীয় রাজ্য কেরালার বাসিন্দা ৭০ বছর বয়সী টিও ডমিনিকের দিনের শুরুটা হয় ছেলেদের যেকোনো একজনকে ফোন করার মাধ্যমে। তার এক ছেলে থাকেন পার্শ্ববর্তী রাজ্য কর্ণাটকে, আর অন্যজন মধ্যপ্রাচ্যে। উন্নত কাজের খোঁজে বেশ কয়েক বছর আগেই তারা ঘর ছেড়েছেন। বাড়িতে এখন ডমিনিক আর তার স্ত্রী এমজে মার্থারের দিন কাটে নিজেদের মতো করে।
ফোনে টুকটাক খোঁজখবর বা আবহাওয়া নিয়ে কথা বলাটা কিছুটা স্বস্তি দিলেও, ঘরে যখন কোনো জরুরি সাহায্যের প্রয়োজন হয়, তখন ছেলেরা পাশে থাকতে পারেন না।
ভারতের সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল প্রবীণ জনসংখ্যার রাজ্য কেরালায় এই দৃশ্য এখন খুবই সাধারণ। কারণ কর্মসংস্থান আর উচ্চশিক্ষার জন্য তরুণ প্রজন্ম অভিবাসী হচ্ছে। এতে প্রবীণরা ক্রমেই একা হয়ে পড়ছেন।
মে মাসে এই সংকট মোকাবিলায় কেরালা রাজ্যের সরকার প্রবীণদের কল্যাণের জন্য একটি আলাদা ও ডেডিকেটেড বিভাগ চালু করেছে, যা ভারতের ইতিহাসে প্রথম এমন উদ্যোগ।
সন্তানদের কোলাহলে মুখরিত বাড়িতে এখন নীরবতার প্রহর গোনেন ডমিনিক। তিনি বলেন, ‘আমরা এখন পুরোপুরি প্রতিবেশীদের ওপর নির্ভরশীল। আমাদের ছেলেমেয়েরা কমই বেড়াতে আসে এবং আশেপাশে তেমন কোনো আত্মীয়-স্বজনও নেই, যারা আমাদের সাহায্য করবে। দিন দিন পরিস্থিতি কঠিন হয়ে উঠছে।’
পাশে বসা তার স্ত্রী মার্থা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, ‘বার্ধক্যের সবচেয়ে বড় সঙ্গী এখন একাকীত্ব।’
লক্ষ্য ‘এজিং ইন প্লেস’
ভারতে যুগ যুগ ধরে প্রবীণরা সন্তানদের সঙ্গেই থাকতেন এবং তাদের ওপরই নির্ভরশীল ছিলেন। কিন্তু সেই ঐতিহ্য এখন ভাঙনের মুখে।
প্রবীণ কল্যাণ বিভাগের প্রধান ড. রথান কেলকার জানান, তাদের মূল কৌশল হলো ‘এজিং ইন প্লেস’, অর্থাৎ, বয়োবৃদ্ধদের কোনো বৃদ্ধাশ্রমে না পাঠিয়ে তাদের নিজেদের বাড়ি ও চেনা পরিবেশেই সব ধরণের সুযোগ-সুবিধা দেওয়া।
তিনি আরও বলেন, ‘‘পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে- কমিউনিটি ও হোম-বেসড কেয়ারের পরিধি বাড়ানো এবং ‘সোশ্যাল প্রেসক্রাইবিং’ বা সামাজিক ব্যবস্থাপত্রের প্রবর্তন, যার মাধ্যমে প্রবীণদের বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করা হবে। এ ছাড়া কেরালা সরকার সার্টিফাইড কেয়ারগিভার প্রশিক্ষণ কর্মসূচি, প্রবীণদের জন্য পার্ক, ডে-কেয়ার সেন্টার এবং ফিটনেস সেন্টার গড়ে তোলার পরিকল্পনা করছে।’’
ড. কেলকার বলেন, বার্ধক্য এখন আর কেবল সমাজকল্যাণমূলক কোনো বিষয় নয়। এটি এখন স্বাস্থ্যসেবা, আবাসন, পরিবহন, স্থানীয় শাসন, প্রযুক্তি, কর্মসংস্থান, নিরাপত্তা ও আর্থিক খাতের মতো একাধিক বিষয়ের সঙ্গে জড়িত।
প্রবীণের সংখ্যায় শীর্ষে কেরালা
উন্নত স্বাস্থ্যসেবা, গড় আয়ু বৃদ্ধি এবং জন্মহার কমে যাওয়ার কারণে কেরালা ভারতের সবচেয়ে বয়োবৃদ্ধ রাজ্যে পরিণত হয়েছে। রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার (আরবিআই) সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০৩৬ সালের মধ্যে কেরালার মোট জনসংখ্যার প্রায় ২২ দশমিক ৮ শতাংশ (প্রতি চারজনে একজন) হবেন প্রবীণ, যেখানে জাতীয় গড় থাকবে ১৪ দশমিক ৯ শতাংশ।
প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স কেরালাবাসীর জীবনযাত্রার মান বাড়ালেও, এর একটি অন্ধকার দিকও স্পষ্ট হচ্ছে। সিডনিতে কর্মরত এক আইটি পেশাদার বলেন, ‘আমি নিয়মিত বাড়িতে টাকা পাঠালেও শুধু আর্থিক সহযোগিতাই তো শেষ কথা নয়। শারীরিক অসুস্থতা বা জরুরি মুহূর্তে মা-বাবার পাশে সশরীরে থাকতে না পারার যে মানসিক কষ্ট, তা টাকা দিয়ে দূর করা যায় না। দূর থেকে ভিডিও কলে মা-বাবাকে অসুস্থ দেখলে নিজেকে বড্ড অসহায় লাগে।’
একাকীত্ব দূর করাই এখন মূল চ্যালেঞ্জ
কেরালা সরকারের এই বিভাগ আগের সব প্রবীণ সেবা প্রকল্পগুলোকে (যেমন- বয়োমিথ্রম বা সামাজিক পেনশন) এক ছাতার নিচে নিয়ে আসবে। তবে ড. কেলকার স্বীকার করেছেন যে, শুধু অবকাঠামো দিয়ে একাকীত্ব দূর করা সম্ভব নয়। তিনি বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য হলো, কেরালার কোনো প্রবীণ মানুষ যেন নিজেকে অদৃশ্য বা পরিত্যক্ত মনে না করেন।’
দিল্লির অ্যাপোলো হাসপাতালের জেরিয়াট্রিক ইউনিটের প্রধান ড. প্রসূন চ্যাটার্জি বলেন, ‘আমার রোগীরা প্রায়ই জিজ্ঞেস করেন- মাঝরাতে হঠাৎ অসুস্থ হলে কে তাদের হাসপাতালে নিয়ে যাবে? ভারতে এখনও প্রবীণদের জন্য বিশেষায়িত চিকিৎসকের (জেরিয়াট্রিক স্পেশালিস্ট) তীব্র সংকট রয়েছে।’
প্রকল্পের বাজেট ও ভবিষ্যৎ রূপরেখা
কেরালা সরকার চলতি বছর এই খাতের জন্য ১০ কোটি রুপি বরাদ্দ করেছে। অনেকে একে ‘প্রতীকী’ বা অপ্রতুল বললেও ড. কেলকার জানান, প্রাথমিক সমন্বয়, পাইলট প্রজেক্ট এবং দীর্ঘমেয়াদি তথ্যভাণ্ডার তৈরির জন্য এই তহবিল ব্যবহার করা হবে।
তবে নীতিমালা কবে পুরোপুরি বাস্তবায়িত হবে, সেই আশায় বসে নেই ডমিনিক ও মার্থা দম্পতি। চিরাচরিত নিয়মে তারা এখনও প্রতিবেশীদের ওপরই ভরসা রাখছেন।
মার্থা বলেন, ‘আমাদের চাওয়া খুব সাধারণ- এমন কেউ একজন থাকুক, যাকে ডাকলে সত্যিই ছুটে আসবে।’
তবে সমুদ্র এবং টাইম জোনের দূরত্বে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া পরিবারগুলোর মাঝে কেরালার এই নতুন বিভাগ কতটা স্বস্তি ফেরাতে পারে, তা সময়ই বলে দেবে।
থিওটোনিয়াস/অমিয়/