আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছে নতুন করে তিন বছর মেয়াদি ঋণের আবেদন করেছে বাংলাদেশ। সংস্থাটি রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা পূরণের শর্ত দিয়ে ঋণচুক্তি নিয়ে আলোচনা শুরু করেছে। চলতি অর্থবছরে মোট রাজস্ব আদায়ে রেকর্ড ঘাটতি দেখা দিয়েছে। এতে অসন্তুষ্ট হয়েছে আইএমএফ। এনবিআরের কাছে ঘাটতির কারণ জানতে চেয়েছে সংস্থাটি। রাজস্ব আদায়ের এই ঘাটতিতে ঋণচুক্তি নিয়ে নতুন করে দর-কষাকষি শুরু করতে পারে আইএমএফ–এমন আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
গতকাল সোমবার জাতীয় সংসদে বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, সরকার আইএমএফের সঙ্গে আলোচনায় ব্যর্থ হয়নি। বরং পূর্ববর্তী সরকার এমন কিছু শর্তে ঋণ নিতে সম্মত হয়েছিল, যা জনগণের স্বার্থের পরিপন্থি ছিল। সে কারণে বর্তমান সরকার ওই কর্মসূচি থেকে সরে এসে নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আইএমএফের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, নতুন করে ঋণ পেতে গত ৯ জুন আইএমএফকে আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি দেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। সম্ভাব্য ঋণের পরিমাণ হতে পারে ৪০০ থেকে ৪৫০ কোটি ডলার। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসবে আইএমএফের নির্বাহী পর্ষদ থেকে। তবে আইএমএফের শর্ত মেনে সরকারকে এই ঋণ নিতে হবে। রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা হবে অন্যতম শর্ত।
২০২৩ সালে আওয়ামী লীগ সরকার আইএমএফের সঙ্গে ৪৭০ কোটি ডলারের ঋণ চুক্তি করে। ২০২৫ সালের জুনে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সেই ঋণের আকার বাড়িয়ে ৫৫০ কোটি ডলার করা হয়। অনুমোদিত ওই ঋণ কর্মসূচির আওতায় পাঁচ কিস্তিতে বাংলাদেশ মোট ৩৬৪ কোটি ডলার পেয়েছে। তবে ষষ্ঠ কিস্তির অর্থছাড় নিয়ে প্রায় এক বছর ধরে আলোচনা চললেও শেষ পর্যন্ত তা পাওয়া যায়নি। এর অন্যতম কারণ সরকার শর্ত পূরণ করতে পারেনি।
আইএমএফকে দেওয়া চিঠিতে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, আগের কর্মসূচি গ্রহণের সময়কার অর্থনৈতিক ও নীতিগত বাস্তবতা এখন আর নেই। দেশে রাজনৈতিক পরিস্থিতি, বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা এবং নতুন চ্যালেঞ্জের কারণে কিছু সংস্কার বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়েছিল। তবে সরকার সংস্কার কর্মসূচি থেকে সরে আসতে চায় না; বরং দেশের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ধাপে ধাপে তা বাস্তবায়ন করতে চায়। চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, নির্বাচিত সরকারের সময়ে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানো হয়েছে। আশা করি শিল্প-বিনিয়োগ ও ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি আসবে। ফলে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হবে। এ ছাড়া রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে অনেক নতুন খাত অর্থনীতির মূলধারায় আনা হয়েছে। রাজস্ব আদায়ের আওতা বাড়ানো হয়েছে, প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো হয়েছে। রাজস্ব ফাঁকি বন্ধ করতে সরকার কঠোর। আশা করছি লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হবে।
এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. নাসির উদ্দিন খবরের কাগজকে বলেন, দেশের রাজস্ব আদায় পরিস্থিতি ভালো নয়। রাজস্ব-জিডিপির (মোট দেশজ উৎপাদন) হার আগের চেয়ে কমেছে। ৮ শতাংশের মধ্যে আটকে আছে। চলতি অর্থবছর শেষে ঘাটতি দাঁড়াতে পারে ৮৮ হাজার কোটি টাকা। আইএমএফ দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশের নিম্ন রাজস্ব-জিডিপি অনুপাতকে বড় দুর্বলতা হিসেবে চিহ্নিত করে আসছে। তাই ভবিষ্যতে ঋণচুক্তি নিয়ে সংস্থাটি আরও কঠোর শর্ত দিতে পারে। নতুন করে সরকারের সঙ্গে দর-কষাকষি হতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের এপ্রিল শেষে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশে। চলতি অর্থবছরের জুলাই-মে সময়ে (১১ মাস) রপ্তানি আয় দাঁড়িয়েছে ৪৩ দশমিক ৮০ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২ দশমিক ৫৫ শতাংশ কম।
গত ২১ মে অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে আইএমএফের এক ভার্চুয়াল বৈঠকে তিন বছর মেয়াদি নতুন কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা হয়। এরপর ৩ জুন আইএমএফের বাংলাদেশবিষয়ক মিশনপ্রধান আইভো ক্রিজনার এক বিবৃতিতে বলেন, ২০২৩ সালে কর্মসূচি অনুমোদনের পর বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট উল্লেখযোগ্যভাবে বদলে গেছে। ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, নিম্ন রাজস্ব আহরণ এবং নতুন সংস্কার উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা এখন আরও স্পষ্ট। ফলে বর্তমান চ্যালেঞ্জ ও নতুন সরকারের অগ্রাধিকারকে প্রতিফলিত করে একটি নতুন কর্মসূচি নিয়ে সমঝোতার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, আগামী মাসের মাঝামাঝি আইএমএফের একটি প্রাক্-মিশন ঢাকা সফরে আসবে। সম্ভাব্য নতুন ঋণ কর্মসূচির আকার নিয়ে আলোচনা হবে। নতুন আলোচনায় রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি, ভ্যাট সংস্কার, করছাড় কমানো এবং কর প্রশাসনের আধুনিকায়ন গুরুত্ব পাবে।
চলতি অর্থবছরের শুরু থেকেই রাজস্ব আদায়ের ঘাটতি ছিল। সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঘাটতিও বাড়তে থাকে। সাময়িক হিসেবে চলতি অর্থবছরে ঘাটতি প্রায় ৯০ হাজার কোটি টাকা। এমন পরিস্থিতিতেও আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য এনবিআরকে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা আদায়ের জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে হলে এনবিআরকে চলতি বছরের তুলনায় প্রায় ৫০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হবে।
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এনবিআরের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ৫ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকা। এনবিআরের পরিসংখ্যান বিভাগের তথ্যানুসারে, চলতি অর্থবছরের গত ১১ মাসে ৪ লাখ ৪২ হাজার ৮৪ কোটি টাকার রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও আদায় হয়েছে ৩ লাখ ৬০ হাজার ৬৪২ কোটি টাকা। গত ১১ মাসে রাজস্ব ঘাটতি ৮১ হাজার ৪৪২ কোটি টাকা, ঘাটতির হার ১৮ দশমিক ৪২ শতাংশ।
লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে হলে এনবিআরকে শেষ মাসে (জুন) চলতি অর্থবছরের গত ১১ মাসে আদায় করা রাজস্বের প্রায় ৪০ শতাংশ আদায় করতে হবে, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ২৪১ শতাংশ বেশি। লক্ষ্য পূরণে অর্থবছরের শেষ মাস তথা চলতি জুনে আরও ১ লাখ ৪২ হাজার ৩৫৮ কোটি টাকার রাজস্ব আদায় করার কথা থাকলেও এনবিআর তা পারেনি। জুনের প্রথম ২০ দিনে ২৯ হাজার ৩১১ কোটি টাকার রাজস্ব আয় হয়েছে। সে হিসাবে ২০ জুন পর্যন্ত রাজস্ব আয়ের পরিমাণ দাঁড়ায় ৩ লাখ ৮৯ হাজার ৯৫৩ কোটি টাকা। গতকাল ২৯ জুন পর্যন্ত আদায়ের পর সাময়িক হিসাবে ঘাটতি প্রায় ৯০ হাজার কোটি টাকা। প্রসঙ্গত, সাময়িক হিসাবের চেয়ে প্রকৃত হিসাব কিছু কমবেশি হয়।
এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মো. আবদুল মজিদ খবরের কাগজকে বলেন, ‘রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, সামষ্টিক অর্থনীতির পুনর্গঠন, চরম মূল্যস্ফীতির চাপ, বিনিয়োগের নেতিবাচক ধারা এবং বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার কারণে রাজস্ব আদায়ে ধস দেখা দিয়েছে। এ ছাড়া লক্ষ্যমাত্রা বাড়ালেও আদায়কারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে এনবিআরের সক্ষমতা বাড়ানো হয়নি। এমন অবস্থায় আগামী অর্থবছরেও রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানো হয়েছে। এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হবে না বলে আশঙ্কা করছি।’
অর্থনীতির এই বিশ্লেষক হিসাব কষে বলেন, ১১ মাসের মতো শেষ মাসে অর্থাৎ জুনে ১০ শতাংশ রাজস্ব আদায় বেশি হলেও রাজস্ব ঘাটতি থাকবে প্রায় ১ লাখ কোটি টাকার কাছাকাছি।