বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন (বিআরটিসি) অনিয়ম, লোকসান ও অব্যবস্থাপনার অতল গহ্বরে হাবুডুবু খাচ্ছে। বিভিন্ন ডিপোতে সচল বাস বসিয়ে রেখে রাজস্ব ও জ্বালানি হরিলুট চলছে। ইজারাদারের জালিয়াতির বিরুদ্ধে প্রশাসন ‘অজ্ঞাত’ কারণে কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না। পাশাপাশি রাষ্ট্রায়ত্ত এই প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রভিডেন্ট ফান্ড ও গ্র্যাচুইটির কোটি কোটি টাকা লোপাটের ঘটনাও ঘটেছে।
সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ এবং ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ) একাধিক নথি পর্যালোচনা করে মিলেছে এসব বিস্ফোরক তথ্য।
কোটি কোটি টাকার রাজস্ব বকেয়া
বিআরটিসির চালক ও কন্ডাক্টররা প্রদেয় রাজস্ব জমা দিচ্ছেন না। গত মার্চ মাসে তাদের কাছ থেকে ২৪ লাখ টাকা আদায় করা হয়। এখনো ৮ কোটি ৩২ লাখ টাকা অনাদায়ী রয়েছে।
৪০ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছে বিআরটিসির দীর্ঘ মেয়াদে বাস ইজারা দিয়ে রেখেছে। গত ৬ মাসে বিআরটিসির আয়-ব্যয়ের নানা তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, তাদের কাছে এই প্রতিষ্ঠানের বকেয়া জমে আছে ৩ কোটি ১৪ লাখ টাকা। এর মধ্যে সর্বোচ্চ বকেয়া কল্যাণপুর বাস ডিপোর (১২ জন ইজারাদারের কাছে ৮৫ লাখ টাকা) এবং বগুড়া বাস ডিপোর (৫ জন ইজারাদারের কাছে ৭৭ লাখ টাকা)।
এ ছাড়া বিভিন্ন ডিপো ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের গাড়ির নানা যন্ত্রাংশ ও টায়ার মেরামত করে গাজীপুরের সমন্বিত কেন্দ্রীয় মেরামত কারখানা (আইসিডব্লিউএস) ও রাজধানীর তেজগাঁওয়ের সেন্ট্রাল ওয়ার্কশপের (সিডব্লিউএস) বকেয়া দাঁড়িয়েছে ৮১ লাখ টাকা।
সচল বাস বসিয়ে রাজস্ব লোকসান
বিআরটিসির ডিপোগুলোতে ‘অজ্ঞাত’ কারণে সচল বাস বসিয়ে রাখা হয়েছে। ফলে লোকসান গুনতে হচ্ছে সরকারকে। এ বছরের মার্চ ও মে মাসে প্রায় প্রতিটি ডিপোতেই সচল বাসের ১০ শতাংশের বেশি অলস বসিয়ে রাখা হয়। এপ্রিল মাসেও (বগুড়া ও যাত্রাবাড়ী ব্যতীত) সব ডিপোর চিত্র একই ছিল।
বিআরটিসির বিভিন্ন ডিপোর কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শুক্র ও শনিবারের মতো ছুটির দিনেও রাজস্ব বাড়াতে স্টাফ বাস রুটে না পাঠিয়ে বসিয়ে রাখা হচ্ছে। মে মাসে ছুটির দিনে বরিশাল ও রংপুর এবং এপ্রিল মাসে বরিশাল, যাত্রাবাড়ী, নরসিংদী, রংপুর, সিলেট ও টুঙ্গিপাড়া ডিপোর কোনো স্টাফ বাস পরিচালনা করা হয়নি।
গত ১ মে থেকে ২১ মে পর্যন্ত মাত্র ২১ দিনেই ২৩টি ডিপোর মধ্যে ১৮টি ডিপোতে ১ হাজার ৯২টি ট্রিপ পরিচালনা করা হয়নি। এ কারণে বিআরটিসির রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে ১ কোটি ৭ লাখ ৫২ হাজার টাকা। গত এপ্রিল মাসে ১৫৩টি এবং মে মাসে ১৩২টি ব্রেকডাউন হলেও কোনো ডিপোই কারিগরি ও অপারেশন্স বিভাগের প্রত্যয়ন নেয়নি।
ডিপোজুড়েই কেবল ‘লোকসান’
বিআরটিসির রাজস্ব আদায়ের চিত্র কতটা করুণ তা প্রমাণিত হয় ডিপোগুলোর পিলে চমকানো লোকসানের খতিয়ান দেখলে। এই বছরের ফেব্রুয়ারি মাসের হিসাব অনুযায়ী বরিশাল, কল্যাণপুর, খুলনা, রংপুর, সোনাপুর বাস ডিপো এবং সিডব্লিউএস, আইসিডব্লিউএস, ঢাকা ও চট্টগ্রাম ট্রাক ডিপো ব্যতীত দেশের অন্য বাস ও ট্রাক ডিপো সম্পূর্ণ লোকসানে চলেছে। এমনকি জানুয়ারিতে কুমিল্লা, ময়মনসিংহ ও পাবনা ব্যতীত কোনো ডিপো তাদের লক্ষ্যমাত্রার ট্রিপ অর্জন করতে পারেনি। এদিকে ঢাকা ও চট্টগ্রাম ট্রাক ডিপোতেও রাজস্ব আয়ে চরম ধস নেমেছে। এ বছরের জানুয়ারির তুলনায় ফেব্রুয়ারি মাসে চট্টগ্রাম ট্রাক ডিপোতে ৪৫ লাখ ৫৬ হাজার টাকা এবং ঢাকা ট্রাক ডিপোতে ৬৫ লাখ ৫১ হাজার টাকা কম রাজস্ব অর্জিত হয়েছে।
গত বছর থেকে চলতি বছরের মে পর্যন্ত সময়কালে ডিপোগুলোর কাছে বিআরটিসির পাওনা ৪ কোটি ১ লাখ টাকা। ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত শুধু চালক ও কন্ডাক্টরদের কাছে বকেয়া রাজস্বের পরিমাণ ৬ লাখ ৬৯ হাজার টাকা। এ ছাড়া বিআরটিসির বিভিন্ন ডিপো ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের গাড়ি মেরামত করে গাজীপুরের সমন্বিত কেন্দ্রীয় মেরামত কারখানা এবং রাজধানীর তেজগাঁওয়ের সেন্ট্রাল ওয়ার্কশপের (সিডব্লিউএস) বকেয়া দাঁড়িয়েছে ৬৫ লাখ টাকা।
জ্বালানি খাতে হরিলুট
বিআরটিসির নিয়ম অনুযায়ী, বাসের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ এবং ট্রাকের ক্ষেত্রে ৪০ শতাংশের বেশি জ্বালানি ব্যয় করা যাবে না। কিন্তু চালক ও কর্মকর্তাদের যোগসাজশে জ্বালানি খাতে এখন হরিলুট চলছে। গত বছরের ডিসেম্বর এবং এ বছরের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত টানা তিন মাস ধরে বগুড়া, দিনাজপুর, সিলেট, রংপুর ও চট্টগ্রাম বাস ডিপো এই সীমার চেয়ে অনেক বেশি জ্বালানি খরচ দেখিয়েছে। ফেব্রুয়ারিতে এই লুটের তালিকায় যুক্ত হয়েছে ময়মনসিংহ ও কক্সবাজার ডিপোও।
সিপিএফ ও গ্র্যাচুইটির টাকাও গায়েব
কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভবিষ্যৎ তহবিলের টাকা জমা দিতেও ব্যর্থ হয়েছে বিআরটিসি। গত বছরের অক্টোবর থেকে এ বছরের মার্চ পর্যন্ত সিপিএফ বাবদ বকেয়া রয়ে গেছে ২ কোটি ৪৯ লাখ টাকা। অন্যদিকে গ্র্যাচুইটি বাবদ ধার্য করা ২ কোটি ১৬ লাখ টাকা এখনো অনাদায়ী। সিপিএফ ও গ্র্যাচুইটির টাকা পরিশোধ করতে পেরেছে কেবল চট্টগ্রাম বাস ডিপো, ঢাকা ট্রাক ডিপো ও চট্টগ্রাম ট্রাক ডিপো।
২২১টি সরকারি ফাইল আটকে আছে
বিআরটিসির প্রধান কার্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগ ও শাখায় যেন ফাইলের পাহাড় জমেছে। গত মার্চ থেকে মে মাস পর্যন্ত প্রশাসন ও অপারেশন বিভাগে ২২১টি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি পত্র সম্পূর্ণ ‘অনিষ্পন্ন’ বা আটকে রাখা হয়েছে।
এসি বাসের মরণদশা: লোকসানে ৬৩টি বিলাসবহুল বাস
বিআরটিসির বিলাসবহুল এসি বাসগুলো এখন যেন ‘গলার কাঁটা’। জানুয়ারিতে যেখানে ৪৫টি এসি বাস লোকসানে ছিল, ফেব্রুয়ারিতে তা একলাফে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৩টিতে। এর মধ্যে বগুড়ায় ৩টি, গাবতলীতে ৪টি, মোহাম্মদপুরে ১টি, মতিঝিলে ১১টি, নারায়ণগঞ্জে ৩টি ও টুঙ্গিপাড়ায় ৪টি বাস নতুন করে লোকসানের খাতায় নাম লিখিয়েছে।
কড়া নির্দেশ ও নতুন উদ্যোগ
এই চরম বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির পর নড়েচড়ে বসেছে প্রধান কার্যালয়। বিআরটিসি চেয়ারম্যান আব্দুল লতিফ মোল্লা প্রতিটি ডিপোকে তাদের আয়ের ৪০ শতাংশ অর্থ সরাসরি ব্যাংকে জমা নিশ্চিত করার নির্দেশ দিয়েছেন। এ ছাড়া দাপ্তরিক স্বচ্ছতা আনতে সব ডিপো ও ইউনিটে বাধ্যতামূলক ‘ডি-নথির’ ব্যবহার শুরু করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বকেয়া আদায়ের জন্য ৩৪ জন ইজারাদারের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা দায়েরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কোনো কারণে বাস বসিয়ে রাখলে ভেহিক্যাল ট্র্যাকিং সিস্টেম (ভিটিএস) দিয়ে তা যাচাইয়ের কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। চুরি ঠেকাতে এখন প্রতিটি এসি বাসে ওয়েবক্যাম লাগানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে।
সরকারি ফাইলগুলো কেন এবং কার স্বার্থে আটকে রাখা হয়েছে, তা নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন। প্রতি মাসে সভা করে এই ফাইল নিষ্পত্তির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।