বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী এবং কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ের স্পন্দন যিনি, তাঁর পায়ের জুতাজোড়া কেমন ছিল? রাজকীয় কোনো পাদুকা, নাকি সোনা-রুপায় মোড়ানো চটি? ইতিহাসের পাতা ওল্টালে দেখা যায়, সৃষ্টির শ্রেষ্ঠতম এই মানব ব্যবহার করতেন অত্যন্ত সাধারণ, লোমহীন চামড়ার এবং কখনো কখনো তালি দেওয়া জুতা! আসুন, নবিজি (সা.)-এর জুতার সেই অনন্য অবয়ব সম্পর্কে জেনে নিই।
আজ থেকে চৌদ্দ শত বছর আগে আরব সমাজে পশম বা লোমযুক্ত চামড়া দিয়ে জুতা তৈরির একটি সাধারণ রেওয়াজ ছিল। কিন্তু রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জুতা ছিল পরিচ্ছন্ন ও আলাদা।
হযরত আনাস ইবনে মালিক (রা.)-এর সূত্রে বর্ণিত, ঈসা ইবনে তাহমান (রহ.) বলেন, আনাস (রা.) আমাদের সামনে দুটি লোমশূন্য জুতা নিয়ে আসেন, যে দুটিতে দুটি করে চামড়ার ফিতা ছিল। পরে সাবিত (রহ.) আমাকে জানান যে, জুতা দুটি ছিল স্বয়ং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৩১২৭)।
একই বিষয়ে হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) এবং হযরত আবু হুরায়রা (রা.)-এর বর্ণনা থেকে জানা যায়, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতিটি জুতার উপরিভাগে দুটি করে চামড়ার ফিতা বা বেল্ট যুক্ত থাকত, যা জুতাকে পায়ের সাথে মজবুত ও আরামদায়কভাবে ধরে রাখত। (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৩৬১৪; আল-মুজামুস সাগীর, হাদিস:২৫৪)
রাসুলুল্লাহ (সা.) কেবল সাধারণ জুতাই পরতেন না, বরং জুতা ছিঁড়ে গেলে তা নিজে হাতে মেরামত করে বা তালি দিয়েও পরিধান করতেন। বর্তমানের ভোগবাদী সমাজে যেখানে সামান্য ত্রুটি হলেই আমরা জিনিসপত্র ফেলে দিই, সেখানে আল্লাহর রাসুলের এই আমল এক বিরাট শিক্ষা।
হযরত আমর ইবনে হুরায়ছ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে তালিযুক্ত জুতা পরিধান করে সালাত (নামাজ) আদায় করতে দেখেছি।’ (সুনানে কুবরা লিন-নাসাঈ, হাদিস : ৯৭১৭; মুসনাদে আবু ইয়ালা, হাদিস :১৪৬৫)
এই হাদিসটি থেকে আমরা নতুন একটি বিধান ও চমৎকার তথ্য জানতে পারি। তা হলো, পবিত্র ও তালিযুক্ত জুতা পায়ে দিয়েও নামাজ আদায় করা জায়েজ, যা স্বয়ং নবিজি (সা.) করে দেখিয়েছেন।
লোমহীন মসৃণ চামড়া, পায়ের খাঁজে আটকে থাকা দুটি সুদৃশ্য ফিতা আর প্রয়োজনের সময় তাতে লেগে থাকা তালি, এই ছিল বিশ্বনবির জুতার অবয়ব। এটি কেবল জুতার বিবরণ নয়, বরং তাঁর চরম বিনয়, মিতব্যয়িতা এবং অনাড়ম্বর জীবনদর্শনের এক জীবন্ত প্রতীক। বই বা পত্রিকার পাতায় নবিজি (সা.)-এর এই দৈহিক অবয়বের গল্প আধুনিক মানুষকে শেখাবে কীভাবে বিলাসিতা বর্জন করে পায়ের মাটির সঙ্গে মিশে থাকা যায়।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক