দেশে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে গতি না থাকায় খুন, জখম, অপহরণ, ছিনতাই ও ডাকাতির মতো অপরাধ আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। রাজধানী ঢাকায় প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা, জনসমক্ষে ছিনতাইয়ের ঘটনা প্রায়ই ঘটছে। শুধু পেশাদার অপরাধী বা আন্ডারওয়ার্ল্ড সন্ত্রাসীদের মধ্যে এসব সীমাবদ্ধ নয়, বরং সামাজিক ও রাজনৈতিক কোন্দল এবং অস্থিরতার কারণেও এ ধরনের নৃশংস ও নির্মম ঘটনা প্রতিনিয়ত ঘটছে। দেশে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়, প্রায় সব ধরনের অপরাধী এখন অনেকটা আক্রমণাত্মক হয়ে উঠেছে। আগ্নেয়াস্ত্র ও ধারালো অস্ত্রের ব্যবহার বেড়েছে। প্রকাশ্যে খুন-জখম করতেও তারা দ্বিধা করছে না। আসামি ধরতে গিয়ে প্রতিনিয়ত হামলার শিকার হচ্ছেন পুলিশ সদস্যরা। কে কখন কোথায় কীভাবে এ ধরনের বিপদের সম্মুখীন হবেন, সেই দুশ্চিন্তা তাড়া করছে রাজধানীবাসীসহ শহর-নগরাঞ্চলের মানুষকে। মাঠপর্যায়ে কিছু আসামি গ্রেপ্তার হলেও পেশাদার সন্ত্রাসী চক্র পুলিশের ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে। আবার অনেক আসামি জামিনে বেরিয়ে আবার অপরাধে যুক্ত হওয়ার তথ্যও পাওয়া যাচ্ছে। ফলে দেশের সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সাধারণ মানুষের জন্য চরম উদ্বেগ ও আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু এসব অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে না।
পুলিশের মধ্যে একধরনের শৈথিল্য ভাব আর এর সুযোগ নিচ্ছে অপরাধীরা। সামাজিক অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোনো ঘটনা গণমাধ্যমে বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচিত না হলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সক্রিয় হয় না। ফলে পুলিশের তালিকাভুক্ত অপরাধী চক্র একের পর এক ঘটনা ঘটানোর সুযোগ পাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, কোনো একটা অপরাধের ঘটনা ঘটলে মূল পরিকল্পনাকারী বা নির্দেশদাতাদের আইনের আওতায় আনা সম্ভব হয় না। অনেক সময় মূল পরিকল্পনাকারীরা দেশের বাইরে অবস্থান করে। গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিরা মাঠপর্যায়ে হত্যাকাণ্ড বাস্তবায়ন করলেও নির্দেশদাতাদের বিরুদ্ধে আদালতে উপস্থাপনের মতো পর্যাপ্ত পরিমাণে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করা যায় না। ফলে মূল নির্দেশদাতারা আড়ালেই থেকে যায়।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্যমতে, গত পাঁচ মাসে সারা দেশে খুন হয়েছেন ১ হাজার ৪৪৪ জন। অপহরণের ঘটনা ঘটেছে ৪৩৭টি। নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে ৭ হাজার ৯১০টি। ২৬৮ জন পুলিশ সদস্যের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে।
মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্যমতে, জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত সারা দেশে রাজনৈতিক হত্যার শিকার হয়েছেন ৫৫ জন, আহত হয়েছেন ২ হাজার ৬৩৬ জন। নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ২৩৯ জন। এর মধ্যে দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হন ৬৮ জন ও ধর্ষণের শিকার হন ২৭১ জন। ধর্ষণসংশ্লিষ্ট হত্যাকাণ্ড ঘটে ২৮টি এবং ধর্ষণচেষ্টার শিকার হন ৮৫ জন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক খবরের কাগজকে বলেন, সমাজে অপরাধপ্রবণতা বাড়ার নেপথ্যে সাধারণত বাহিনীর শিথিলতা বা দুর্বল তৎপরতার বিষয়গুলোই সামনে আসে। যদিও সেখানে রাজনৈতিক ও সামাজিক নানা প্রেক্ষাপটের দায় থাকে। তবে অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে অপরাধীদের বেপরোয়া কর্মকাণ্ড নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক। এ সময় পুলিশও একটি বিশেষ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে কাজ করে গেছে। সেদিক থেকে কিছুটা নেতিবাচক প্রভাবও পুলিশকে নানাভাবে বাধাগ্রস্ত করেছে বা করছে। দেশে রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় রয়েছে। তাই পুলিশকে অপরাধ দমনে শক্তভাবে হাল ধরতে হবে। পেশাদারত্বের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে হবে। আইনের মধ্য থেকে যেখানে যে ধরনের পদক্ষেপ প্রয়োজন, ঠিক তেমনটাই করতে হবে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির শিথিলতায় দেশে অপরাধ থামছে না। পুলিশের মধ্যে সমন্বয়হীনতা, তদারকি ও জবাবদিহির ঘাটতি রয়েছে। অপরাধ নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের কাজের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশের নেতৃত্বকে আরও সক্রিয় করতে হবে। পেশাদার অপরাধীদের আইনের আওতায় এনে শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। আশা করছি, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অপরাধ থামাতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।