ঢাকা ১৬ আষাঢ় ১৪৩৩, মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ইনুর ১০ বছরের কারাদণ্ড সুইডেনের বিপক্ষেও আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলবে ফ্রান্স ফুটবল ও সাম্বার দেশ ব্রাজিলে ইসলামের অজানা অধ্যায় ভেনেজুয়েলায় ভূমিকম্পে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১৭১৯ জন সুনামগঞ্জে আবারও সড়ক অবরোধ মেডিকেল শিক্ষার্থীদের মানসিকভাবে দৃঢ় হতে চাণক্যের নামে প্রচলিত ৮ নীতি ডাচদের বিদায়ে হেগে ভক্তদের হুলুস্থুল ‘আমরা সবার সম্মান অর্জন করেছি’ নরওয়ে ম্যাচের আগে সতর্ক আইভরি কোস্ট বুধবার ‘ব্যাংক হলিডে’, বন্ধ থাকবে লেনদেন মায়ানমারে পাথরের খনি ধসে ৫ জনের মৃত্যু, নিখোঁজ ১৫ তেঁতুলিয়ায় ইউএনওর সম্মানহানির প্রতিবাদে বিক্ষোভ কর্ণফুলীতে পাথরবোঝাই লাইটার জাহাজ ডুবি, ১২ নাবিক উদ্ধার তিস্তা মহাপরিকল্পনায় অন্য কোনো দেশের কনসার্নের সুযোগ নেই: তথ্য উপদেষ্টা ভেনেজুয়েলায় ৫৮ হাজারের বেশি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত দেশের ১১ ভাগ মানুষ আর্সেনিক দূষণের ঝুঁকিতে: মির্জা ফখরুল ফ্রান্সকে হারাতে জীবনের সেরা পারফরম্যান্স দরকার, বললেন সুইডেন কোচ পটার হলমার্কসহ ঋণ কেলেঙ্কারিতে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিন: এমপি আখতার হোসেন রাজধানীতে এআই ক্যামেরায় ১৫০০ মামলা: ডিএমপি কমিশনার বিচার বিভাগের বাজেট ১ টাকায় নামানোর প্রস্তাব, ‘পুলিশি রাষ্ট্র’ হওয়ার শঙ্কা আইনমন্ত্রীর ওয়াইফাই এক্সটেন্ডার নাকি মেশ নেটওয়ার্ক ভালো বিশ্বকাপ যুদ্ধে চার চ্যাম্পিয়ন বজলু ভাইয়ের দল বদলের রহস্য হিলিতে মাদরাসাশিক্ষার্থীকে ধর্ষণচেষ্টা, আটক ১ অপরাধ থামাতে পুলিশকে কঠোর হতে হবে বিশ্ববাজারে তেলের বড় দরপতন শৈলকুপায় প্রতিপক্ষের হামলায় ভ্যানচালক নিহত কেপ ভার্দের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার একাদশে তিন পজিশনে অনিশ্চয়তা ড্রয়ারে লোকানো ছিল অ্যান্টার্কটিকার বিরল ডাইনোসর জীবাশ্ম ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সুদের টাকা নিয়ে তৃতীয় দিনের সংঘর্ষে আহত ২০

বজলু ভাইয়ের দল বদলের রহস্য

প্রকাশ: ৩০ জুন ২০২৬, ০১:৪৭ পিএম
বজলু ভাইয়ের দল বদলের রহস্য
এঁকেছেন মাসুম

বজলু ভাই দল পাল্টিয়ে মহাবিপদে পড়েছেন। ব্রাজিলিয়ান মানে তার সাবেক সাপোর্টার দলের ছেলেপেলে তাকে মনে মনে বিশ্বাসঘাতক, বেঈমান বলে গালি দেয়। আর বর্তমান দলের মানে আর্জেন্টিনা সাপোর্টাররা তাকে সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখে। তিনি দ্বিধা-দ্বন্দ্বের অকূল পাথারে সাঁতার কেটে কেটে ভাবছেন, আবার আগের দলেই ব্যাক করবেন কি না! তবে সেটাতে বিপত্তি আরও বাড়বে, কমবে না। তখন আসল উদ্দেশ্য তো সফল হবেই না, বাড়তি পাওনা হিসেবে ব্রাজিলের সাপোর্টাররা তাকে আর্জেন্টিনার স্পাই আর আর্জেন্টিনার সাপোর্টাররা তাকে ব্রাজিলের স্পাই ভেবে বসে থাকবে।
বজলু ভাইয়ের দল পাল্টানোর পেছনের কারণটা লোকজন নানাভাবে ব্যাখ্যা করছে। এটা এই মহল্লায় এক প্রকার পিএইচডির টপিক হয়ে গেছে।
ব্রাজিলিয়ান সাপোর্টারদের গবেষণা অনুযায়ী, দল পাল্টানোর সম্ভাব্য কারণগুলো হলো–প্রতিপক্ষের থেকে টাকা খেয়েছে, ব্রাজিলের সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স খানিকটা খারাপ, গার্লফ্রেন্ডের প্রেশার কিংবা বিদেশি ষড়যন্ত্র।
অন্যদিকে আর্জেন্টিনা সাপোর্টারদের মতে, ব্রাজিলের স্পাই হয়ে কাজ করবে, আগামীতে আর্জেন্টিনা যাওয়ার প্ল্যান আছে, তাই ভিসা পাওয়ার ক্ষেত্রে সুবিধা হবে কিংবা আর্জেন্টিনার এবার যে পারফরম্যান্স তাতে কাপ ওরাই পাবে–তাই আগেভাগে দল পাল্টিয়ে বিজয় মিছিলে শরিক হওয়ার আয়োজন করছে।
তবে বজলু ভাইয়ের দল পাল্টানোর বিষয়টা অনেক সহজ ছিল না। এর জন্য তাকে অনেক কিছু বিসর্জন দিতে হয়েছে। 
ব্রাজিল যে তার কত প্রিয় ছিল! ২০০৬ ছিল তার প্রথম বিশ্বকাপ দেখা। তখন বড় চাচা, যিনি আর্জেন্টিনার প্লাটিনাম ক্যাটাগরির সমর্থক, বলেছিলেন, মনের ওপর জোরের দরকার নেই। যাদের খেলা মন থেকে ভালো লাগবে তাকেই সাপোর্ট করবি। আমাকে দেখ, ২০০২ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা যে পারফরম্যান্স করেছে, এদের শাস্তিস্বরূপ সামনের একযুগ থাপড়ানো উচিত ছিল। কিন্তু দেখ, এবারও ‘ভামোস ভামোস’ বলে চিল্লাচিল্লি করতেছি। মন রে, সবকিছুই মনের খেলা!
কাকার গতি, আদ্রিয়ানোর তেজ, কার্লোসের ফ্রি-কিক, রোনালদিনহোর ড্রিবলিং আর রোনালদোর চুলের স্টাইল তাকে এমনভাবে বিমোহিত করেছিল যেন ফুটবল বলতেই সে ব্রাজিলকে বুঝত। ব্রাজিল হলো ফুটবলের সূর্য আর বাকি দলগুলো গ্রহ-উপগ্রহ। তবে সেবার ফুটবলের সূর্য অক্ষচ্যুত হয়েছিল কোয়ার্টার ফাইনালেই।
তবু আটকে থাকেনি বজলু ভাই। একে একে চারটি বিশ্বকাপ চলে গেছে। ব্রাজিল কাপ জিততে তো পারেইনি, বরং ২০১৪ সালের সেমিফাইনালে সাত গোল খেয়ে ‘সেভেন আপ’ নামক কোমল পানীয়র সঙ্গে নিজের নাম জড়িয়ে ফেলেছে। তবু ব্রাজিল ছাড়েনি সে। বিপদে দলের পাশে না থাকলে সাপোর্টার হয়ে লাভ কী! তবে এবার কী ঘটল?
এবার আসল ঘটনা বলি–
কয়েক মাস আগে হঠাৎ করেই বজলু ভাইয়ের উচ্চ রক্তচাপ ধরা পড়ে। নিয়মিত মাথাব্যথা, বুক ধড়ফড়, ঘুমের সমস্যা–এসব নিয়ে একদিন ডাক্তার দেখাতে গেলেন। ডাক্তার অনেকক্ষণ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে জিজ্ঞেস করলেন, কোনো মানসিক চাপ আছে?
বজলু ভাই দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ডাক্তার সাহেব, ২০০৬ সাল থেকে ব্রাজিল সাপোর্ট করি।
ডাক্তার চুপ হয়ে গেলেন।
– তারপর?
– তারপর আর কী! ২০০৬ গেল, ২০১০ গেল, ২০১৪ সালে সাত গোল খেলাম, ২০১৮ গেল, ২০২২ গেল...
ডাক্তার এবার সহানুভূতির দৃষ্টিতে তাকালেন, বুঝতে পারছি।
তিনি প্রেসক্রিপশন লিখতে শুরু করলেন। বজলু ভাই উঁকি দিয়ে দেখলেন, ওষুধের তালিকার নিচে মোটা অক্ষরে লেখা, ব্রাজিলের খেলা দেখা সীমিত করুন। প্রয়োজনবোধে আর্জেন্টিনা সাপোর্ট শুরু করুন।
বজলু ভাই অবাক। বললেন, এটা কি কোনো নতুন চিকিৎসা পদ্ধতি?
ডাক্তার গম্ভীর মুখে বললেন, চিকিৎসাবিজ্ঞানে একে বলে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা। রোগ হওয়ার আগে কারণ দূর করা।
– কিন্তু ডাক্তার সাহেব, এত বছরের ভালোবাসা?
– ভালোবাসা থাকুক। তবে রোগীকেও তো বাঁচিয়ে রাখতে হবে।
তারপর এক মাস ধরে দোটানায় ভুগেছেন বজলু ভাই। একদিকে দুই দশকের প্রেম, অন্যদিকে নিজের জীবন। মানুষ ভাবে দল পাল্টানো খুব সহজ। আসলে তা নয়।
২০ বছরের অভ্যাস, হাজারো স্মৃতি, অগণিত তর্ক-বিতর্ক, অসংখ্য ফেসবুক পোস্ট, শত শত ‘হেক্সা আসছে’ স্ট্যাটাস, তিনটি ব্রাজিল জার্সি, দুটি পতাকা আর একখানা হলুদ-সবুজ মাফলারকে বিদায় জানানো চাট্টিখানি কথা নয়।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলার সিদ্ধান্ত নিলেন। তবে বজলু ভাইয়ের সবচেয়ে বড় ভয় অন্য জায়গায়। বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার পর ফলোআপে গিয়ে যদি ডাক্তার প্রেসক্রিপশনের নিচে লিখে দেন, ‘আর্জেন্টিনা বন্ধ করুন। এবার জার্মানি শুরু করুন।’
তাহলে বজলু ভাই নিশ্চিত, রক্তচাপের চেয়ে বড় সমস্যা হবে পরিচয় সংকট।

বিশ্বকাপ যুদ্ধে চার চ্যাম্পিয়ন

প্রকাশ: ৩০ জুন ২০২৬, ০১:৫৫ পিএম
বিশ্বকাপ যুদ্ধে চার চ্যাম্পিয়ন
এঁকেছেন মাসুম

বিশ্বকাপ এলেই গ্রামের রহিম কাকার চায়ের দোকান আর চায়ের দোকান থাকে না। টকশো অনুষ্ঠান হয়ে যায় । চায়ের চেয়ে সেখানে বেশি চলে ফুটবল নিয়ে তর্ক-বিতর্ক । সেখানে উপস্থিত হয় চারদলের চারজন বিশেষ ভক্ত। তারা হলেন– আরহাম (ব্রাজিল), আব্রাম (ফ্রান্স), নাবিল (আর্জেন্টিনা) আর বিপ্লব (জার্মানি)। তাদের আলোচনায় জমে ওঠে ফুটবল বিষয়ের তুমুল টকশো। 
আরহাম বুক ফুলিয়ে বলে, ব্রাজিল মানেই ফুটবলের রাজা! পাঁচটা বিশ্বকাপ এমনি এমনি আসেনি।
নাবিল হেসে উত্তর দেয়, ইতিহাসের গল্প বাদ দাও, এখন মাঠ কাঁপায় আর্জেন্টিনা!
আব্রাম বলে, আধুনিক ফুটবলের নাম ফ্রান্স।
বিপ্লব চশমা ঠিক করে বলে, তোরা কথা কম বল, জার্মানি সেভেন আপের বাপ। 
রহিম কাকা বিরক্ত হয়ে বলেন, তোরা চা খেতে আসিস, না বিশ্বকাপ পরিচালনা করতে আসিস?
হাসির রোল পড়ে যায়। এর পর শুরু হয় স্লোগানের লড়াই। 
নাবিল বলে, ব্রাজিল মানেই সেভেন আপ, আর্জেন্টিনা জেতে বিশ্বকাপ। 
আরহাম হেসে বলে, আর্জেন্টিনা তো হারপিক, জার্মানি দেয় গোল।
বিপ্লব বলে, ঠিক বলেছ ঠিক।
জার্মানি দল গোলের ইঞ্জিন, স্টার্ট হলে থামানো মুশকিল!
আব্রাম  বলে,  ফ্রান্স মানেই গতির  ফুটবল, মনে রেখো এটা এমবাপ্পের দল। 
এভাবেই স্লোগান চলতে থাকে। আর চায়ের কাপে ধোঁয়া উড়তে থাকে।
একদিন চার বন্ধু বাজি ধরল, যার দল আগে বিদায় নেবে, সে সবাইকে বিরিয়ানি খাওয়াবে।
তার পর শুরু হলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার। আরহাম লিখল, ব্রাজিল হারলে এক সপ্তাহ মোবাইল ধরব না। নাবিল লিখল, আর্জেন্টিনা চ্যাম্পিয়ন হলে পুরো গ্রাম নীল-সাদা পতাকায় সাজাব। আব্রাম লিখল, ফ্রান্স হারবে? আগে সূর্য পশ্চিমে উঠুক! আর বিপ্লব লিখল, শেষ হাসিটা আমার।
বিশ্বকাপ যত এগোতে লাগল, ততই কারও দল হোঁচট খেল, কারও স্বপ্ন ভাঙল। যে সবচেয়ে বেশি বড়াই করত, সে-ই একদিন সবচেয়ে চুপচাপ বসে রইল।
ফাইনালের পর আবার চারজন রহিম কাকার দোকানে মিলল। আজ কারও হাতে পতাকা নেই।
রহিম কাকা বললেন, কী রে, আজ তোদের গলা বসে গেছে নাকি?
আরহাম হেসে বলল, বুঝেছি, বড় বড় কথা বলে কাপ জেতা যায় না।
নাবিল বলল, আমি তো ভাবছিলাম দলের কোচ আমিই!
আব্রাম বলল, আমি কাপ রাখার জন্য আলমারিতে জায়গাও ঠিক করে ফেলেছিলাম!
বিপ্লব মাথা চুলকে বলল, আর আমি এমন বক্তৃতা দিয়েছি যে গ্রামের মানুষ ভাবছে আমি জার্মান দলের মুখপাত্র!
রহিম কাকা জিজ্ঞেস করলেন, তা হলে সবচেয়ে বড় চ্যাম্পিয়ন কে?
চারজন একসঙ্গে বলল, আপনার চায়ের দোকান!
–কেন?
নাবিল বলল, এখানেই তো প্রতিদিন চারটা বিশ্বকাপ, আটটা সেমিফাইনাল আর ষোলোটা ঝগড়া হয়েছে!
বিপ্লব বলল, আগামী বিশ্বকাপেও ঝগড়া হবে।
আরহাম সঙ্গে সঙ্গে বলল, তবে এবার নিয়ম বদলাবে।
–কী নিয়ম?
আব্রাম হেসে বলল, যে হারবে সে বিরিয়ানি খাওয়াবে, আর যে জিতবে সে মিষ্টি খাওয়াবে!
রহিম কাকা হেসে বললেন, বাহ! বাহ! তা হলে তোদের বিশ্বকাপে হারলেও খাওয়া, জিতলেও খাওয়া!
চারজন চায়ের কাপ ঠুকিয়ে একসঙ্গে বলল, মাঠে চ্যাম্পিয়ন হয় একজন, কিন্তু বন্ধুত্বের বিশ্বকাপে আমরা চারজনই চ্যাম্পিয়ন।

অ্যান্টি-করোসিভ প্রেম

প্রকাশ: ২৩ জুন ২০২৬, ০২:১৭ পিএম
অ্যান্টি-করোসিভ প্রেম
এঁকেছেন মাসুম

হাশেম কাকা সবকিছুতেই সমাধান খুঁজে পান। মরিচা ধরা তালা থেকে শুরু করে ভাঙা সম্পর্ক–সবকিছুর জন্য তার কাছে একটাই জবাব, ‘ভাই, আগে অ্যান্টি-করোসিভ লাগাও।’
কেউ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে, ‘কাকা, মানুষের সম্পর্কেও আবার অ্যান্টি-করোসিভ লাগে নাকি?’
কাকা চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে গম্ভীর মুখে বলেন, ‘লাগে তো! আজকাল মানুষের মনে লোহার থেকেও বেশি দ্রুত মরিচা ধরে।’
পাড়ার মিজান সাহেব তখন নিজের সংসারের অভিজ্ঞতা নিয়ে বললেন, ‘আমার বউ তো ছোট বিষয়েও রাগ করে। এর কোনো অ্যান্টি-করোসিভ আছে?’
হাশেম কাকা চোখ বন্ধ করে কিছুক্ষণ চিন্তা করলেন। তার পর বললেন, ‘আছে। প্রতিদিন একটু প্রশংসা, মাঝে মাঝে চা বানিয়ে দেওয়া, আর মাসে একদিন বাজারে গেলে নিজে থেকে দাম না জিজ্ঞেস করে সঙ্গে সঙ্গে থাকা।’
মিজান সাহেব হতাশ হয়ে বললেন, ‘এত দামি জিনিস? বাজারের অ্যান্টি-করোসিভই সস্তা!’
কাকা হেসে বললেন, ‘বাজারেরটা লোহার মরিচা ঠেকায়, আর এটা সংসারের মরিচা।’
সেদিন থেকে পাড়ায় নতুন তত্ত্ব চালু হলো–
লোহার জন্য রং, আর সম্পর্কের জন্য যত্নের ঢং।
কিন্তু বিপদ হলো রহিম মিয়া ব্যাপারটা একটু বেশি সিরিয়াসলি নিয়ে ফেললেন। তিনি বাড়ির দরজা, জানালা, সাইকেল–সবখানে অ্যান্টি-করোসিভ লাগালেন। এমনকি স্ত্রীর পুরোনো রাগের তালিকার খাতায় পাশে লিখে রাখলেন–‘এখানে প্রলেপ দিতে হবে।’
স্ত্রী খাতা দেখে বললেন, ‘এই যে, আমার রাগেরও আবার মরিচা ধরে?’
রহিম মিয়া বললেন, ‘ধরে তো! পুরোনো রাগগুলোই তো সবচেয়ে বেশি জমে থাকে।’
স্ত্রী মুচকি হেসে বললেন, ‘তা হলে আগে তোমার জিহ্বায় অ্যান্টি-করোসিভ লাগাও। বেশি কথা বলার কারণে ওখানেই ক্ষয় বেশি।’
তার পর থেকে রহিম মিয়া নাকি কম কথা বলেন। পাড়ার লোকজন বলে, ‘দেখেছ, অ্যান্টি-করোসিভের আসলে কাজ করা শুরু হয়েছে!’
হাশেম কাকার শেষ মন্তব্য, ‘জীবনে মরিচা পড়বেই। তবে সময়মতো একটু হাসি, একটু ভালোবাসা আর একটু ক্ষমার প্রলেপ দিলে মানুষও চকচকে থাকে।’
আমরা বুঝে গেলাম–অ্যান্টি-করোসিভ শুধু লোহার নয়, সম্পর্কেরও প্রয়োজন।

ফুটবল বিশেষজ্ঞ বউ

প্রকাশ: ২৩ জুন ২০২৬, ০২:০৬ পিএম
ফুটবল বিশেষজ্ঞ বউ
এঁকেছেন মাসুম

আমার বিয়ের কয়েক বছর পরের ঘটনা। তখন বিশ্বকাপ ফুটবল চলছে। ছোটবেলা থেকেই আমি আর্জেন্টিনার ডাই হার্ড ফ্যান। আটঘাট বেঁধে আর্জেন্টিনা আর ক্যামেরুনের খেলা দেখতে বসেছি। প্রথম রাউন্ডের প্রথম খেলায় আর্জেন্টিনা হেরে বসে আছে। আজকের খেলায় হারলে আর্জেন্টিনা প্রথম রাউন্ড থেকেই বাদ।
সবে মাত্র খেলা শুরু হবে, বউ এসে বলল, আজ যে তোমার একটা দাওয়াতে যাওয়ার কথা সেটা কি খেয়াল আছে?
মনে পড়ল, আজ আমার শালার জন্য মেয়ে দেখতে যাওয়ার কথা। আমি বললাম, বাদ।
বউ বলল, কী বাদ? খেলা দেখা? 
– না। মেয়ে দেখতে যাওয়া বাদ। দুনিয়া তছনছ হয়ে গেলেও আজ মেয়ে দেখতে যাওয়া সম্ভব না। আজ ক্যামেরুনকে যেকোনো উপায়ে হারাতেই হবে। ইজ্জত কা সওয়াল।
বউ অভিমান করে বলল, তুমি আমার কথা শুনবে না?
– তোমার কথা তো বহুদূর, আমেরিকার প্রেসিডেন্ট এসে অনুরোধ করলেও কাজ হবে না। আর্জেন্টিনার আজ বাঁচা মরার লড়াই।
– লক্ষ্মীটি! তুমি আমার কলিজার টুকরা...
– রাখো তোমার কলিজার টুকরা, অন্য সময় তো লোহার টুকরা, নিদেনপক্ষে একটা কাঠের টুকরা বলেও ডাক দেও না।
বউ এবার হুমকি দিল, আজ যদি আমার কথা না শোনো তবে আমার মরা মুখ দেখবা।
আমি হেসে ফেলে বললাম, আরে ধুর! তোমার জীবিত মুখই ঠিকমতো দেখতে চাই না, আবার মরা মুখ দেখব! ছ্যা ছ্যা!
বউ রাগ করে উঠে গেল। আমি খেলায় মেতে গেলাম। 
কিছুক্ষণ পর বউ ফিরে এসে বলল, আচ্ছা, এই ফুটবল খেলা দেখে কী মজা পাও? একটা বল নিয়ে শুধু দৌড়াদৌড়ি। কোনো সুস্থ মানুষ এসব করে? 
আমার বউ খেলাধুলার খ-ও বোঝে না, পৃথিবীতে শুধু দুজন খেলোয়াড়ের নাম জানে। মাশরাফি আর তামিম ইকবাল। তাও মানুষের মুখে শুনে শুনে। তামিমের ব্যাটিং একদিন তারে দেখাইছিলাম।
– তাহলে তুমি যাবে না? 
আমি বললাম, না। প্রয়োজনে শহিদ হয়ে যাব, এই ঘরে আজ রক্তারক্তি হয়ে যাবে, রাম দা নিয়ে কোপাকোপি হবে, তবু আমার কথা নড়নচড়ন হবে না। – এসব বলে লাভ হবে না। আমি তোমার কাপড় ইস্ত্রি করে আনছি, তুমি রেডি হও।
বউ চলে যেতেই চিন্তিত হয়ে পড়লাম। যতই জারিজুরি করি, বউ রেগে গেলে খবর আছে।
খেলা শুরু হয়ে গেছে। খেলার ১০ মিনিটেই ক্যামেরুন এক গোল দিয়ে বসেছে। আমি ঘামতে শুরু করলাম। কিছুক্ষণ পর আরেকটা! আমি উত্তেজনায় চিৎকার করে উঠলাম। 
চিৎকার শুনে বউ ইস্ত্রি করা ফেলে দৌড়ে এসে দেখে আমি সোফায় পড়ে আছি। বউ বলল, কী হয়েছে? 
আমি বললাম, তাড়াতাড়ি প্রেশারের ট্যাবলেট দাও, উত্তেজনায় প্রেশার বেড়ে গেছে।
বউ দৌড়ে গিয়ে অন্য রুম থেকে ট্যাবলেট নিয়ে এল। ওষুধ খেয়ে স্বস্তির নিশ্বাস নিচ্ছি, এমন সময় কাপড় পোড়া একটা গন্ধ নাকে এসে লাগল। বউকে বলতেই ভোঁ করে দিল একটা দৌড়! ওমা! বউ দৌড়ায় কেন?
কিছুক্ষণ পর হতাশ মুখে বউ সামনে এসে দাঁড়াল। হাতে এই ঈদে কেনা আমার শখের পাঞ্জাবি। সামনে এনে মেলতেই দেখা গেল মাঝখানে জানালার মতো হয়ে গেছে। সেখান থেকেই পোড়া গন্ধ আসছে। পাঞ্জাবিটা কিনে আমি শুধু ঈদের দিন একবার পরেছি।
ভেতরে ভেতরে আমি এত খুশি হলাম যা বলার না। যাক, বউকে ঘায়েল করার অস্ত্র পাওয়া গেছে। পোড়া পাঞ্জাবি হবে বউকে ঘায়েল করার মোক্ষম সুযোগ। 
গম্ভীর মুখ করে বসে রইলাম। ভীষণ রাগী রাগী চেহারা নিয়ে বউয়ের দিকে তাকালাম। বেচারা অপরাধী মুখ নিয়ে বসে আছে। আমি নিশ্চিত এখন আর দাওয়াতে যেতে বলবে না।
কোনো কথা না বলে চুপচাপ খেলা দেখতে লাগলাম। ক্যামেরুন গায়ের জোরে খেলছে, আর্জেন্টিনা ভালো খেলেও গোল পাচ্ছে না। আমি হা-হুতাশ করছি। একবার উঠছি আবার বসছি। 
দুই গোলে পিছিয়ে আছে শুনে বউ বলল, আর্জেন্টিনা একটা বিরাট ভুল করে ফেলেছে। 
আমি টিভি থেকে চোখ না সরিয়ে বললাম, কী ভুল?
ক্যামেরুন একটা শক্তিশালী দল। এই দলের বিপক্ষে তামিম আর মাশরাফিরে নামানো দরকার ছিল। এই দুজনকে হায়ার কইরা নিলে নিশ্চিত আজকে আর্জেন্টিনা জিততে পারত।
বউয়ের বিশেষজ্ঞ মতামত শুনে আমি স্তম্ভিত হয়ে গেলাম, মুখ থেকে নিজের অজান্তেই কোঁত করে একটা শব্দ বের হলো। 
বউ বলল, আবার কী হলো? 
আমি বললাম, যদি তোমার জামাইরে জীবিত দেখতে চাও, তবে দৌড়ে গিয়ে আরেকটা প্রেশারের ট্যাবলেট আনো। খেলা বিষয়ে তোমার মতামত শুনে আমার প্রেশার আরও বেড়ে গেছে। 
খেলা বিশেষজ্ঞ বউ আমার ট্যাবলেট আনতে দৌড় শুরু করল।

ডাক্তারের চেম্বারে একদিন

প্রকাশ: ১৭ জুন ২০২৬, ০৪:১৮ পিএম
আপডেট: ১৭ জুন ২০২৬, ০৪:২৪ পিএম
ডাক্তারের চেম্বারে একদিন
ছবি এআই

বিনা দাওয়াতে জ্বর আমার বাড়িতে আণ্ডাবাচ্চা নিয়ে হাজির হয়েছে। কীভাবে তাদের আপ্যায়ন করব বুঝতে পারছি না। আমি জ্বরে কুঁ কুঁ করছি। 
এ অবস্থায় বউ বলছে একজন প্রাইভেট ডাক্তারের কাছে যেতে। বাঙালির বৈশিষ্ট্য হচ্ছে সবকিছুতেই প্রাইভেট খোঁজা, শুধু চাকরিটা হতে হবে সরকারি।  
বউয়ের কথা অমান্য করে কার সাধ্য?
আগে যতই ভুজুংভাজুং করুক, পুরুষ মানুষ সাধারণত রিং পরার পর থেকেই বউয়ের আনুগত্য মেনে চলতে বাধ্য হয়। এ ছাড়া তার আর উপায়ও থাকে না। সরি, আমি বিয়ের রিঙের কথা বলি নাই, হার্টের রিঙের কথা বলছি। 
হার্টের রিং পরার পর থেকেই আমি সিংহ থেকে বিড়াল হয়ে গেছি। বউয়ের আঁচলে আশ্রয় নিয়েছি। আগে বউ আমাকে ভয় পেত, এখন আমি বউকে ভয় পাই। 
রেডি হতে গিয়ে দেখি–মানিব্যাগে হাজার দশেক টাকা ছিল, এখন  সাত হাজার। বাকি তিন হাজার গেল কই?
আমি বউকে ডেকে বললাম, তুমি আমার মানিব্যাগ থেকে হাজার তিনেক টাকা নিয়েছ?
বউ বলল, হ্যাঁ, জরুরি দরকার ছিল নিয়েছি। অনলাইনে একটা ড্রেসের অর্ডার করেছি। এতে সমস্যা কী? 
আমি মিনমিনে গলায় বললাম, নিয়ে ভালো করেছ। আমাকে জিগ্যেস করে নিলে ভালো হতো...।
বউ চোখ গরম করে বলল, সব সময় তোমার ওপর নির্ভর করে থাকতে  হবে কেন? তুমি কি আমাকে আত্মনির্ভরশীল হতে দেবে না? 
এরপর আর কথা চলে না। 
তুমি বাসার নিচে গিয়ে পাঁচ মিনিট দাঁড়াও, আমি আধা ঘণ্টার মধ্যে রেডি হয়ে আসছি। জাস্ট শাড়ি পাল্টাব। 
আমি বাসার নিচে চায়ের দোকানে গিয়ে বসলাম। ভাবলাম বড় করে এককাপ চা খাই, ভালো লাগবে। এই দোকানের চায়ের কাপ ছোট। দিন দিন চায়ের কাপ এতটাই ছোট হচ্ছে যে মনে হচ্ছে অচিরেই চায়ের দোকানে ড্রপার সিস্টেম চলে আসবে। তিন ড্রপ পাঁচ টাকা, সাত ড্রপ দশ টাকা।  
চা খেয়ে ঝিম মেরে বসে রইলাম। দোকানের সামনে একজন ভিক্ষুক বসা। তার সামনে ছোট একটা সাইনবোর্ড। সাইনবোর্ডে লেখা– নগদ / বিকাশে ভিক্ষা নেওয়া হয়। বিশ টাকা ভিক্ষা দিলে পাঁচ টাকা ক্যাশব্যাক!
আধুনিক যুগে আধুনিক ভিক্ষুক! 
বউ আমাকে পাঁচ মিনিট অপেক্ষা করতে বলেছিল, বের হলো এক ঘণ্টা পর। নায়িকাদের মতো সাজগোছ করা। চোখে আবার লেন্স লাগিয়েছে। এখনকার মেয়েরা সৌন্দর্য বৃদ্ধি  করার জন্য চোখে লেন্স লাগায়। আমাদের বাপ-দাদার সময় একটাই লেন্স ছিল, চোখে ছানি পড়া।
আমি বিরক্ত গলায় বললাম, তুমি জামাইকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে যাচ্ছ না ফ্যাশন শো করতে যাচ্ছ?
বউ আমার চেয়েও বিরক্ত গলায় বলল, তুমি কি চাও আমি ফকিরের বউয়ের মতো বের হই? এতে তোমার মান থাকবে? এই রাস্তার মাঝখানে আমার সঙ্গে ঝগড়া করতে চাও?
একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললাম, তিন ধরনের মানুষের সঙ্গে কখনোই ঝগড়া করি না আমি। এরা হচ্ছে নারী, মহিলা এবং বউ। এদেরকে ঝগড়ায় হারানো পুরুষের পক্ষে সম্ভব না। তোমার মতো মোটা মেয়ের সঙ্গে তো আরও না।
আমার ওজন মাত্র বায়ান্ন কেজি। আমি মোটা হলাম কীভাবে? 
আমি আরেকটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললাম, আমি তোমার শরীর নিয়ে কথা বলি নাই, মাথার কথা বলছি।
ডাক্তারের ভিজিট দুই হাজার টাকা। 
ডাক্তারের চেম্বারে ঢুকেছি। ডাক্তার সাহেব রোগের বর্ণনা শুনে বললেন, রাতে কী খেয়েছেন? 
বউ বলল, মাটন বিরিয়ানি, সালাদ, সঙ্গে বাদামের জুস।
ডাক্তার বললেন, এটা আপনার ফেসবুক না, ডাক্তারের চেম্বার। সত্যি করে বলেন আপনার হাজবেন্ড গতকাল রাতে কী খেয়েছেন। 
বউ মিনমিনে গলায় বলল, রুটি আর আলু ভাজি।
ডাক্তার সাহেব খসখস করে কতগুলো পরীক্ষা লিখে দিয়ে বললেন, এই টেস্টগুলো করে নিয়ে আসেন। তার পর ওষুধ দেব।
আমি কুঁ কুঁ করতে করতে বললাম, ডাক্তার সাহেব, এতগুলো টেস্ট যে দিলেন, এর বিল কে দেবে?
ডাক্তার সাহেব অবাক হয়ে বললেন, কেন? আপনারা দেবেন।
আমরা দেব কেন? আমরা অগ্রিম ফি দিয়ে এসেছি, আপনি রোগ ধরতে না পেরে এতগুলো টেস্ট ধরিয়ে দিলেন। এটা তো আপনার ব্যর্থতা। আপনার ব্যর্থতার দায় আপনার। বিল আপনি দেবেন। 
ডাক্তার সাহেব কঠিন চোখে আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন।

ফিফার বাপ

প্রকাশ: ১৭ জুন ২০২৬, ০৪:০২ পিএম
ফিফার বাপ
এঁকেছেন মাসুম

নতুনপাড়া গ্রামের মানুষ ফুটবল নিয়ে এমন পাগল যে, বিশ্বকাপ এলেই গ্রামের গরু-ছাগল পর্যন্ত যেন দুই দলে ভাগ হয়ে যায়। কেউ ব্রাজিলের সমর্থক, কেউ আর্জেন্টিনার। বাজার, মাঠ, এমনকি চায়ের দোকানেও আলোচনা চলতে থাকে!
এই গ্রামের সবচেয়ে বড় ফুটবল বিশেষজ্ঞ ছিলেন কুদ্দুস মিয়া। যদিও তিনি জীবনে কোনো ফুটবল ম্যাচ মাঠে খেলেননি, তবু তার দাবি–‘বিশ্বকাপ সম্পর্কে আমি যা জানি, ফিফার লোকজনও তা জানে না!’
গ্রামের লোকজন তাই তাকে ডাকত–‘ফিফার বাপ’।
একদিন বিকেলে মান্নানের চায়ের দোকানে বসে কুদ্দুস মিয়া ঘোষণা দিলেন–‘এইবার বিশ্বকাপ কে জিতবে, আমি এখনই বলে দিতে পারি।’
সবাই চুপ করে তার দিকে তাকাল।
নাসের মিয়া বললেন–‘তা হলে বলেন শুনি কোন দল জিতবে?’
কুদ্দুস মিয়া গম্ভীর মুখে চায়ে চুমুক দিয়ে বললেন–‘যে দল সবচেয়ে বেশি গোল দেবে, সেই দলই জিতবে।’
কয়েক সেকেন্ড নীরবতার পর পুরো দোকান হাসিতে ফেটে পড়ল।
রহিম বলল–‘এইটা তো আমরা সবাই জানি!’
কুদ্দুস মিয়া মাথা নেড়ে বললেন–‘জানো ঠিকই, কিন্তু আমার মতো আত্মবিশ্বাস নিয়ে বলতে পারো কি?’
এর পর থেকে গ্রামের সবাই তাকে আরও বেশি ‘ফিফার বাপ’ বলতে শুরু করল।
বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার কয়েক দিন আগে কুদ্দুস মিয়া ঘোষণা দিলেন যে, তিনি নিজের বাড়ির ছাদে গ্রামের সবচেয়ে বড় পতাকা উড়াবেন। সকালে দেখা গেল সত্যিই বিশাল এক কাপড় উড়ছে। কিন্তু কাছে গিয়ে সবাই হতবাক। ওটা কোনো দেশের পতাকা নয়, স্থানীয় স্কুলের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতার ব্যানার!
নাসের মিয়া বললেন–‘চাচা, এইটা কোন দেশের পতাকা?’
কুদ্দুস মিয়া একবার তাকিয়ে বললেন–‘তোমরা বুঝবা না। এইবার নতুন একটা দল খেলতে নামছে।’
–দলের নাম কী?
–নতুনপাড়া ইউনাইটেড।
কেউ কেউ মজা বুঝলেও গ্রামের কয়েকজন বৃদ্ধ সত্যি সত্যিই বিশ্বাস করে ফেললেন।
একজন তো বলেই বসলেন–‘মনে হয় ইউরোপের কোনো দেশ হবে!’
বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার দিন কুদ্দুস মিয়া গ্রামের মাঠে বড় পর্দায় খেলা দেখানোর ব্যবস্থা করলেন। সবাই রাতে মাঠে হাজির।
কুদ্দুস মিয়া গর্ব করে বললেন–‘আজ তোমরা আন্তর্জাতিক মানের সম্প্রচার দেখবা।’
কিন্তু খেলা চালু করার বদলে তিনি ভুল করে নিজের নাতির অনলাইন ক্লাস চালু করে দিলেন। পর্দায় শিক্ষক বলছেন–‘বাচ্চারা, আজ আমরা ভগ্নাংশের যোগ-বিয়োগ শিখব।’
কুদ্দুস মিয়া হাততালি দিয়ে বললেন–‘দেখছ? ম্যাচের আগে কোচ কৌশল শিখাচ্ছে!’
পনেরো মিনিট পরও যখন ভগ্নাংশই চলতে থাকল, তখন সবাই বুঝল ব্যাপারটা।
রাগে একজন চিৎকার করল–‘এইটা তো ক্লাস!’
কুদ্দুস মিয়া বললেন–‘বড় টুর্নামেন্টে সবই হয়। একটু ধৈর্য ধরো।’
এর পর কোনোভাবে আসল খেলা চালু হলো। কিন্তু বিপদ এখানেই শেষ নয়। বিদ্যুৎ চলে গেল। সবাই হতাশ!
কুদ্দুস মিয়া সঙ্গে সঙ্গে বললেন–‘চিন্তা নাই। আমার কাছে বিশেষ ব্যবস্থা আছে।’
তিনি ঘর থেকে একটা পুরোনো রেডিও নিয়ে এলেন।
রেডিও চালু হতেই শোনা গেল–‘আজকের আবহাওয়ার খবর!’
লোকজন আবার হাসতে শুরু করল।
এক সপ্তাহ পর কুদ্দুস মিয়া নিজেকে ফুটবল বিশ্লেষক ঘোষণা করলেন। তিনি প্রতিদিন নতুন নতুন ভবিষ্যদ্বাণী করতেন।
একদিন বললেন–‘যে দল কাল জিতবে, তাদের জার্সির রং হবে লাল, নীল, হলুদ অথবা সাদা।’
রহিম বলল–‘চাচা, তা হলে তো প্রায় সব দলই এর মধ্যে পড়ে!’
কুদ্দুস মিয়া উত্তর দিলেন–‘এই জন্যই তো আমি বিশেষজ্ঞ!’
ফাইনালের দিন পুরো নতুনপাড়া উত্তেজনায় ফেটে পড়ল।
কুদ্দুস মিয়া সকাল থেকেই বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন।
কারণ তিনি আগের দিন ঘোষণা দিয়েছেন–‘আমি নিশ্চিত, ফাইনালে যে দল জিতবে তারা হারবে না।’
এই রহস্যময় ভবিষ্যদ্বাণী শুনে সবাই বিভ্রান্ত। খেলা শেষে সত্যিই যে দল জিতল, তারা হারেনি। কুদ্দুস মিয়া আনন্দে লাফিয়ে উঠলেন।
–দেখলা? আমার ভবিষ্যদ্বাণী শতভাগ সঠিক!
নাসের মিয়া বললেন–‘এইটা তো স্বাভাবিক কথা!’
–‘স্বভাবিক হোক আর অসাধারণ হোক, ঠিক তো হয়েছে!’
পরদিন তিনি নিজের সম্মানে সংবর্ধনার আয়োজন করলেন।
বড় ব্যানার টাঙানো হলো–‘বিশ্ববিখ্যাত ফুটবল বিশ্লেষক ফিফার বাপ কুদ্দুস মিয়াকে গণসংবর্ধনা।’
কিন্তু অনুষ্ঠানে উপস্থিত মাত্র চারজন। একজন এসেছেন খিচুড়ি খেতে, একজন বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচতে। একজন ভুল করে ভেবেছেন এখানে নাকি সরকারি অনুদান দেওয়া হবে। আরেকজন এসেছেন মাইকের শব্দ শুনে।
তবুও কুদ্দুস মিয়া মঞ্চে উঠে বললেন–‘আপনাদের ভালোবাসা দেখে আমি অভিভূত।’
ঠিক তখনই পাশের বাড়ির ছাগল মঞ্চে উঠে ব্যানার খেতে শুরু করল।
আশপাশের লোকজন হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খেতে লাগল।
কুদ্দুস মিয়া বললেন–‘দেখছ? পশুরাও আমার অনুষ্ঠান মিস করতে চায় না!’