বজলু ভাই দল পাল্টিয়ে মহাবিপদে পড়েছেন। ব্রাজিলিয়ান মানে তার সাবেক সাপোর্টার দলের ছেলেপেলে তাকে মনে মনে বিশ্বাসঘাতক, বেঈমান বলে গালি দেয়। আর বর্তমান দলের মানে আর্জেন্টিনা সাপোর্টাররা তাকে সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখে। তিনি দ্বিধা-দ্বন্দ্বের অকূল পাথারে সাঁতার কেটে কেটে ভাবছেন, আবার আগের দলেই ব্যাক করবেন কি না! তবে সেটাতে বিপত্তি আরও বাড়বে, কমবে না। তখন আসল উদ্দেশ্য তো সফল হবেই না, বাড়তি পাওনা হিসেবে ব্রাজিলের সাপোর্টাররা তাকে আর্জেন্টিনার স্পাই আর আর্জেন্টিনার সাপোর্টাররা তাকে ব্রাজিলের স্পাই ভেবে বসে থাকবে।
বজলু ভাইয়ের দল পাল্টানোর পেছনের কারণটা লোকজন নানাভাবে ব্যাখ্যা করছে। এটা এই মহল্লায় এক প্রকার পিএইচডির টপিক হয়ে গেছে।
ব্রাজিলিয়ান সাপোর্টারদের গবেষণা অনুযায়ী, দল পাল্টানোর সম্ভাব্য কারণগুলো হলো–প্রতিপক্ষের থেকে টাকা খেয়েছে, ব্রাজিলের সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স খানিকটা খারাপ, গার্লফ্রেন্ডের প্রেশার কিংবা বিদেশি ষড়যন্ত্র।
অন্যদিকে আর্জেন্টিনা সাপোর্টারদের মতে, ব্রাজিলের স্পাই হয়ে কাজ করবে, আগামীতে আর্জেন্টিনা যাওয়ার প্ল্যান আছে, তাই ভিসা পাওয়ার ক্ষেত্রে সুবিধা হবে কিংবা আর্জেন্টিনার এবার যে পারফরম্যান্স তাতে কাপ ওরাই পাবে–তাই আগেভাগে দল পাল্টিয়ে বিজয় মিছিলে শরিক হওয়ার আয়োজন করছে।
তবে বজলু ভাইয়ের দল পাল্টানোর বিষয়টা অনেক সহজ ছিল না। এর জন্য তাকে অনেক কিছু বিসর্জন দিতে হয়েছে।
ব্রাজিল যে তার কত প্রিয় ছিল! ২০০৬ ছিল তার প্রথম বিশ্বকাপ দেখা। তখন বড় চাচা, যিনি আর্জেন্টিনার প্লাটিনাম ক্যাটাগরির সমর্থক, বলেছিলেন, মনের ওপর জোরের দরকার নেই। যাদের খেলা মন থেকে ভালো লাগবে তাকেই সাপোর্ট করবি। আমাকে দেখ, ২০০২ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা যে পারফরম্যান্স করেছে, এদের শাস্তিস্বরূপ সামনের একযুগ থাপড়ানো উচিত ছিল। কিন্তু দেখ, এবারও ‘ভামোস ভামোস’ বলে চিল্লাচিল্লি করতেছি। মন রে, সবকিছুই মনের খেলা!
কাকার গতি, আদ্রিয়ানোর তেজ, কার্লোসের ফ্রি-কিক, রোনালদিনহোর ড্রিবলিং আর রোনালদোর চুলের স্টাইল তাকে এমনভাবে বিমোহিত করেছিল যেন ফুটবল বলতেই সে ব্রাজিলকে বুঝত। ব্রাজিল হলো ফুটবলের সূর্য আর বাকি দলগুলো গ্রহ-উপগ্রহ। তবে সেবার ফুটবলের সূর্য অক্ষচ্যুত হয়েছিল কোয়ার্টার ফাইনালেই।
তবু আটকে থাকেনি বজলু ভাই। একে একে চারটি বিশ্বকাপ চলে গেছে। ব্রাজিল কাপ জিততে তো পারেইনি, বরং ২০১৪ সালের সেমিফাইনালে সাত গোল খেয়ে ‘সেভেন আপ’ নামক কোমল পানীয়র সঙ্গে নিজের নাম জড়িয়ে ফেলেছে। তবু ব্রাজিল ছাড়েনি সে। বিপদে দলের পাশে না থাকলে সাপোর্টার হয়ে লাভ কী! তবে এবার কী ঘটল?
এবার আসল ঘটনা বলি–
কয়েক মাস আগে হঠাৎ করেই বজলু ভাইয়ের উচ্চ রক্তচাপ ধরা পড়ে। নিয়মিত মাথাব্যথা, বুক ধড়ফড়, ঘুমের সমস্যা–এসব নিয়ে একদিন ডাক্তার দেখাতে গেলেন। ডাক্তার অনেকক্ষণ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে জিজ্ঞেস করলেন, কোনো মানসিক চাপ আছে?
বজলু ভাই দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ডাক্তার সাহেব, ২০০৬ সাল থেকে ব্রাজিল সাপোর্ট করি।
ডাক্তার চুপ হয়ে গেলেন।
– তারপর?
– তারপর আর কী! ২০০৬ গেল, ২০১০ গেল, ২০১৪ সালে সাত গোল খেলাম, ২০১৮ গেল, ২০২২ গেল...
ডাক্তার এবার সহানুভূতির দৃষ্টিতে তাকালেন, বুঝতে পারছি।
তিনি প্রেসক্রিপশন লিখতে শুরু করলেন। বজলু ভাই উঁকি দিয়ে দেখলেন, ওষুধের তালিকার নিচে মোটা অক্ষরে লেখা, ব্রাজিলের খেলা দেখা সীমিত করুন। প্রয়োজনবোধে আর্জেন্টিনা সাপোর্ট শুরু করুন।
বজলু ভাই অবাক। বললেন, এটা কি কোনো নতুন চিকিৎসা পদ্ধতি?
ডাক্তার গম্ভীর মুখে বললেন, চিকিৎসাবিজ্ঞানে একে বলে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা। রোগ হওয়ার আগে কারণ দূর করা।
– কিন্তু ডাক্তার সাহেব, এত বছরের ভালোবাসা?
– ভালোবাসা থাকুক। তবে রোগীকেও তো বাঁচিয়ে রাখতে হবে।
তারপর এক মাস ধরে দোটানায় ভুগেছেন বজলু ভাই। একদিকে দুই দশকের প্রেম, অন্যদিকে নিজের জীবন। মানুষ ভাবে দল পাল্টানো খুব সহজ। আসলে তা নয়।
২০ বছরের অভ্যাস, হাজারো স্মৃতি, অগণিত তর্ক-বিতর্ক, অসংখ্য ফেসবুক পোস্ট, শত শত ‘হেক্সা আসছে’ স্ট্যাটাস, তিনটি ব্রাজিল জার্সি, দুটি পতাকা আর একখানা হলুদ-সবুজ মাফলারকে বিদায় জানানো চাট্টিখানি কথা নয়।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলার সিদ্ধান্ত নিলেন। তবে বজলু ভাইয়ের সবচেয়ে বড় ভয় অন্য জায়গায়। বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার পর ফলোআপে গিয়ে যদি ডাক্তার প্রেসক্রিপশনের নিচে লিখে দেন, ‘আর্জেন্টিনা বন্ধ করুন। এবার জার্মানি শুরু করুন।’
তাহলে বজলু ভাই নিশ্চিত, রক্তচাপের চেয়ে বড় সমস্যা হবে পরিচয় সংকট।