যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট এক ঐতিহাসিক রায়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্ষমতা অভূতপূর্বভাবে বাড়িয়ে দিয়েছেন। দেশটির শীর্ষ আদালত রায় দিয়েছেন যে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট এখন থেকে দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক বা ফেডারেল রিজার্ভ ছাড়া অন্য যেকোনো স্বাধীন সরকারি সংস্থার প্রধানকে যেকোনো সময় বরখাস্ত করতে পারবেন।
আদালতের এই রায়ের ফলে দীর্ঘ ৯১ বছরের পুরোনো এক আইনি নজির বাতিল হয়ে গেল, যা এতদিন রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখার স্বার্থে এই স্বাধীন সংস্থাগুলোর শীর্ষ কর্মকর্তাদের সুরক্ষা দিয়ে আসছিল।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প স্বাধীন সংস্থাগুলোর ওপর নিজের একক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চাইলেও সুপ্রিম কোর্ট ফেডারেল রিজার্ভের ক্ষেত্রে একটি বড় ব্যতিক্রম রেখেছে। আদালত ৫-৪ ভোটে ট্রাম্প প্রশাসনের সেই আবেদন খারিজ করে দিয়েছেন, যার মাধ্যমে তারা ফেডারেল রিজার্ভের গভর্নর লিসা কুককে তাৎক্ষণিকভাবে পদ থেকে অপসারণ করতে চেয়েছিল।
জো বাইডেন কর্তৃক মনোনীত এবং প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নারী ফেড গভর্নর লিসা কুকের বিরুদ্ধে বন্ধকী জালিয়াতির অভিযোগ এনে ট্রাম্প তাকে বরখাস্ত করতে চেয়েছিলেন। যদিও কুক শুরু থেকেই এই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন।
ফেড গভর্নর লিসা কুককে অপসারণের চেষ্টা রুখে দিয়ে প্রধান বিচারপতি জন রবার্টস রায়ে লিখেছেন, প্রেসিডেন্টকে যদি যেকোনো সময়, যেকোনো কারণে, আগাম নোটিশ ছাড়া এবং কোনো আইনি তদারকি ছাড়াই ফেডারেল রিজার্ভের সদস্যকে অপসারণের অনুমতি দেওয়া হয়, তবে তা এই পদের সুরক্ষাকে স্রেফ খেয়ালখুশি মতো চাকরিতে পরিণত করবে।
ট্রাম্পের সমালোচকদের মতে, লিসা কুককে সরানোর মূল উদ্দেশ্য ছিল মার্কিন সুদের হার নীতির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। ট্রাম্প দ্রুত সুদের হার কমাতে চান, যাতে সরকারের ঋণ নেওয়ার খরচ কমে এবং সাধারণ মানুষ সস্তায় ঋণ পায়। কিন্তু ফেডারেল রিজার্ভ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের স্বার্থে সুদের হার অপরিবর্তিত রাখায় ট্রাম্প তাদের ওপর ক্ষুব্ধ ছিলেন।
ফেডারেল রিজার্ভ রক্ষা পেলেও অন্যান্য স্বাধীন সংস্থাগুলোর ক্ষেত্রে ট্রাম্পের জন্য একচ্ছত্র ক্ষমতা অনুমোদন করেছেন সুপ্রিম কোর্টের ৬ রক্ষণশীল বিচারপতি। এর ফলে ১৯৩৫ সালের পর থেকে চলে আসা বিখ্যাত ‘হামফ্রিস এক্সিকিউটর’ মামলার রায় বাতিল হয়ে গেল, যে রায়ে বলা হয়েছিল রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখতে প্রেসিডেন্ট চাইলেই কারণ ছাড়া স্বাধীন সংস্থার প্রধানদের সরাতে পারবেন না।
প্রধান বিচারপতি জন রবার্টস সংখ্যাগরিষ্ঠের পক্ষে রায়ে লেখেন যে, সংস্থার প্রধানদের বরখাস্ত করার ক্ষেত্রে এই আইনি সুরক্ষা সংবিধানের ক্ষমতার পৃথকীকরণ নীতির পরিপন্থি। এর ফলে ট্রাম্প ইতোপূর্বে ফেডারেল ট্রেড কমিশনের রেবেকা স্লটারসহ বিভিন্ন কমিশনের যেসব কর্মকর্তাদের কোনো কারণ ছাড়াই বরখাস্ত করেছিলেন, সুপ্রিম কোর্টের রায়ে তার আইনি বৈধতা নিশ্চিত হলো।
আদালতের এই ঐতিহাসিক রায় ঘোষণার পরপরই নিজের সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম 'ট্রুথ সোশ্যাল'-এ উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি একে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার ক্ষেত্রে ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এবং নজিরবিহীন এক ঐতিহাসিক রায় হিসেবে অভিহিত করেছেন।
অন্যদিকে, আদালতের তিন উদারপন্থি বিচারপতির পক্ষে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে জাস্টিস সোনিয়া সোতোমেওর সতর্ক করে বলেন, এই রায়ের ফলে মার্কিন প্রশাসনে অস্থিরতা, বশ্যতা এবং এমনকি স্বৈরাচারী নিপীড়নের পথ সুগম হতে পারে।
তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন যে, প্রেসিডেন্ট এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী হয়ে আবির্ভূত হলেন, তবে এই ক্ষমতা তাকে দেশের জনগণ বা সংবিধান দেয়নি, দিয়েছে এই আদালতের ছয়জন বিচারপতি। সূত্র: এনডিটিভি
আজহার/অমিয়/