পদ্মা সেতু চালুর পর দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের প্রত্যাশা ছিল রাজধানীর সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগ, শিল্পায়নের গতি বৃদ্ধি ও পর্যটন খাতের প্রসার। কিন্তু চার বছর পেরিয়ে গেলেও সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। ফরিদপুরের ভাঙ্গা থেকে বরিশাল হয়ে পটুয়াখালীর কুয়াকাটা পর্যন্ত প্রায় ১৯৫ কিলোমিটার মহাসড়ক এখনো দুই লেনেই আটকে আছে। যানবাহনের সংখ্যা কয়েক গুণ বাড়লেও সড়কের সক্ষমতা বাড়েনি। ফলে প্রতিদিনই সৃষ্টি হচ্ছে যানজট, বাড়ছে দুর্ঘটনা, দীর্ঘ হচ্ছে যাত্রার সময়। এ অবস্থায় ভাঙ্গা-বরিশাল-কুয়াকাটা মহাসড়ক চার কিংবা ছয় লেনে উন্নীত করার দাবিতে নতুন করে সোচ্চার হয়েছেন দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ।
সাম্প্রতিক সময়ে দাবি আদায়ে বরিশাল ও ঢাকায় মানববন্ধন, আলোচনা সভাসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালিত হয়েছে। ব্যবসায়ী, পেশাজীবী, নাগরিক সমাজ ও রাজনৈতিক নেতারা এক কণ্ঠে বলছেন, পদ্মা সেতুর পূর্ণ সুফল পেতে এই সড়ক সম্প্রসারণের বিকল্প নেই।
দক্ষিণাঞ্চলবাসীর অভিযোগ, পদ্মা সেতু চালুর পর মহাসড়কটিতে বাস, ট্রাক, কাভার্ডভ্যান ও ব্যক্তিগত গাড়ির চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। কিন্তু দুই লেনের সড়ক সেই চাপ সামাল দিতে পারছে না। ফলে প্রায়ই দীর্ঘ যানজট তৈরি হচ্ছে, পণ্য পরিবহন ব্যাহত হচ্ছে এবং বাড়ছে প্রাণঘাতী দুর্ঘটনার ঝুঁকি।
সংসদেও বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। বরিশাল-৫ আসনের এমপি ও বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা মজিবর রহমান সরওয়ার সম্প্রতি ভোলা-বরিশাল সেতু নির্মাণের পাশাপাশি ভাঙ্গা থেকে কুয়াকাটা পর্যন্ত ছয় লেনের মহাসড়ক নির্মাণের দাবি জানান। তিনি বলেন, ‘যোগাযোগ অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা দূর না হলে দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাবে না।’ পটুয়াখালী, বরগুনা, ঝালকাঠি ও পিরোজপুর জেলার সংসদ সদস্যরাও একই দাবি তুলেছেন।
সড়ক ও জনপথ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ২০১৬ সালে ভাঙ্গা-বরিশাল-কুয়াকাটা মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০১৮ সালে একনেক সভায় ১ হাজার ৮৬৮ কোটি টাকার এই প্রকল্প প্রস্তাব করা হয়েছিল। ২০২০ সালের জুনের মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও ভূমি অধিগ্রহণসহ নানা জটিলতায় তা এগোয়নি। পরে প্রকল্প ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৫ হাজার ৮৯৯ কোটি টাকায়। গত বছরের সেপ্টেম্বরে অনুমোদনের ঠিক আগে পুনর্মূল্যায়নের জন্য এটি প্রত্যাহার করা হলে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। তবে পরে পরিকল্পনা কমিশনের এনইসি সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত একনেক সভায় প্রকল্পটির অনুমোদন দেওয়া হয়। এর আওতায় ফরিদপুরের ভাঙ্গা থেকে কুয়াকাটা পর্যন্ত মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এদিকে চলতি বছরের ১৮ মার্চ গোমা সেতুর উদ্বোধন অনুষ্ঠানে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম জানান, পদ্মা সেতু চালুর পর চাপ বাড়ায় বরিশাল-কুয়াকাটা মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। প্রাথমিক কাজও শুরু হয়েছে। এতে কুয়াকাটার সঙ্গে যোগাযোগ সহজ হবে এবং স্থানীয় অর্থনীতি উপকৃত হবে। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, ঘোষণার পরও মাঠে কোনো অগ্রগতি দৃশ্যমান নয়।
রাজনৈতিক মতভেদ থাকলেও দক্ষিণাঞ্চলের উন্নয়নে ব্যবসায়ী, নাগরিক সমাজ, রাজনৈতিক নেতা ও জনপ্রতিনিধিদের মধ্যে ঐকমত্য দেখা গেছে। বরিশাল চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি এবায়দুল হক চাঁন বলেন, ‘সড়ক সংকীর্ণ হওয়ায় প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনা ও যানজট হচ্ছে। ব্যবসা-বাণিজ্য ও পর্যটন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পদ্মা সেতু চালুর পরও ভাঙ্গা থেকে বরিশাল পৌঁছাতে চার ঘণ্টার বেশি সময় লাগছে। ফলে ব্যবসায়ীরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন।’
বরিশাল বিভাগ উন্নয়ন ও স্বার্থ সংরক্ষণ কমিটির সভাপতি নজরুল ইসলাম বলেন, ‘দুই লেনের সড়কে বিপুল যানবাহনের চাপ সামাল দেওয়া যাচ্ছে না। ফলে শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক বিকাশও বাধাগ্রস্ত হয়েছে। প্রকল্প নিয়ে বারবার সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের কারণে মানুষের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে।’
বীর মুক্তিযোদ্ধা কে এস এ মহিউদ্দিন মানিক (বীরপ্রতীক) বলেন, ‘ভাঙ্গা থেকে কুয়াকাটা পর্যন্ত ছয় লেনের মহাসড়ক যত দ্রুত বাস্তবায়ন হবে, তত দ্রুত দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ পদ্মা সেতু ও এক্সপ্রেসওয়ের পূর্ণ সুফল ভোগ করতে পারবেন। একই সঙ্গে কৃষি, পর্যটন ও বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডও নতুন গতি পাবে।’