বিশ্বকাপ শুরু হলেই আলোকদিয়ার বাজারের চেহারা বদলে যায়। বাজারের প্রতিটি দোকান, মোড় আর চায়ের দোকানে ফুটবল নিয়ে তর্ক-বিতর্ক জমে ওঠে। কেউ ব্রাজিল, কেউ আর্জেন্টিনা, কেউ আবার জার্মানির সমর্থক।
আল্লেক ব্রাজিলের পাগল সমর্থক। মজিদ আর্জেন্টিনার। মফিজ জার্মানির। গেদু প্রতিদিন দল বদলায়। আর লেদু? সে ফুটবল ভালোবাসে, কিন্তু কোনো দলের জন্য কারও সঙ্গে ঝগড়া করে না।
বিশ্বকাপ শুরুর কয়েক দিন পর বাজারে এক অদ্ভুত ঘটনা ঘটতে শুরু করল।
রাতে যে দলের পতাকা টাঙানো হয়, সকালে দেখা যায় তার পাশে অন্য দলের পতাকা ঝুলছে। ব্রাজিলের পাশে আর্জেন্টিনা, আর্জেন্টিনার পাশে জার্মানি, জার্মানির পাশে আবার ব্রাজিল!
পুরো বাজারে হইচই পড়ে গেল।
আল্লেক রেগে বলল, এটা আর্জেন্টিনার সমর্থকদের কাজ!
মজিদ প্রতিবাদ করল, বরং ব্রাজিলের লোকজন করছে!
মফিজ গম্ভীর মুখে বলল, আমার মনে হয়, এটা আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র।
গেদু ফিসফিস করে বলল, আমি শুনেছি, বিশ্বকাপ দেখতে বিদেশি গুপ্তচর এসেছে।
এই কথা মুহূর্তেই বাজারে ছড়িয়ে পড়ল। পরদিন সবাই একটাই কথা বলতে লাগল–‘আলোকদিয়ার বাজারে নাকি গুপ্তচর ঘুরছে!’
রাতে পাহারার ব্যবস্থা হলো। আল্লেক, মজিদ, মফিজ আর গেদু হাতে টর্চ নিয়ে বসে রইল। কিন্তু লেদু চুপচাপ সবকিছু পর্যবেক্ষণ করছিল।
রাত গভীর হলো। হঠাৎ একটা ছায়ামূর্তি দেখা গেল। লোকটি ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে একটি পতাকা খুলে অন্য একটি পতাকা লাগাতে শুরু করল।
আল্লেক চিৎকার করে উঠল,–ধর! গুপ্তচর!
চারদিক থেকে সবাই ছুটে এল।
কিন্তু লেদু বলল, কেউ এগিয়ো না। আগে দেখি ব্যাপারটা কী।
লোকটি কাজ শেষ করে চলে যেতে লাগল। লেদু নিঃশব্দে তার পিছু নিল। বাজারের সবাই দূর থেকে অনুসরণ করতে লাগল। লোকটি বাজারের শেষ মাথায় পুরোনো একটি ঘরের সামনে এসে থামল।
লেদু এগিয়ে গিয়ে বলল, চাচা, ভয় পাবেন না। আমরা শুধু জানতে চাই, আপনি কেন এটা করছেন?
টর্চের আলোয় দেখা গেল, তিনি বাজারের বৃদ্ধ পাহারাদার।
চাচা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, বাবারা, তোমরা ফুটবল নিয়ে এত ঝগড়া করো যে আমার কষ্ট হয়। তাই আমি সব দলের পতাকা একসঙ্গে লাগিয়ে দিই, যেন কেউ কারও শত্রু না হয়।
কথা শুনে সবাই হতবাক। আল্লেক মাথা নিচু করল। মজিদও চুপ। মফিজের মুখে কোনো কথা নেই। শুধু গেদু বলল, তা হলে গুপ্তচর নেই?
–না।
–ভিনগ্রহবাসীও না?
–না।
–আহা! আমি তো তিন দিন ধরে দূরবিন নিয়ে পাহারা দিলাম!
এ কথা শুনে সবাই হেসে উঠল।
পরদিন লেদু বাজারে একটি নতুন প্রস্তাব দিল, আমরা কেন শুধু নিজের দলের পতাকা টাঙাব? বিশ্বকাপ তো সবার উৎসব। চলুন, বাজারের মাঝখানে সব দেশের পতাকা একসঙ্গে তুলি।
প্রথমে সবাই অবাক হলেও পরে রাজি হয়ে গেল।
নির্ধারিত দিনে বাজারে মানুষ জড়ো হলো। আল্লেক, মজিদ, মফিজ, গেদু সবাই কাজ করছে। কিন্তু পতাকা তোলার সময় আবার ঝামেলা।
আল্লেক বলল, ব্রাজিলের পতাকা মাঝখানে থাকবে।
মজিদ বলল, না, আর্জেন্টিনার থাকবে।
মফিজ বলল, জার্মানির আগে কিছু হবে না।
তর্ক শুরু হয়ে গেল।
ঠিক তখন লেদু দড়ি হাতে নিয়ে বলল, পতাকার জন্য যদি বন্ধুত্ব নষ্ট হয়, তা হলে পতাকা তোলারই দরকার নেই।
সবাই চুপ হয়ে গেল। লেদুর কথা শুনে বাজারের মানুষ হাততালি দিল। শেষ পর্যন্ত সব দেশের পতাকা একসঙ্গে উড়ল আকাশে। সেদিন সন্ধ্যায় আলোকদিয়ার বাজার যেন উৎসবের রঙে রঙিন হয়ে উঠল। গেদু হাসতে হাসতে বলল, আমি আজ থেকে সব দলের সমর্থক!
আল্লেক বলল, তা হলে হারলেও কষ্ট পাবি না।
গেদু উত্তর দিল, সেটাই তো সুবিধা!
এই কথা শুনে আবার হাসির রোল পড়ে গেল।
সেদিন থেকে আলোকদিয়ার বাজারে বিশ্বকাপ এলেই মানুষ লেদুর কথা মনে করে। কারণ সে সবাইকে বুঝিয়েছিল, ফুটবল মানুষকে ভাগ করার জন্য নয়, এক করার জন্য। আর সেই কারণেই লেদুই হয়ে উঠেছিল আলোকদিয়ার বাজারের বিশ্বকাপের আসল হিরো।