কর ব্যবস্থাপনা দারিদ্র্য দূরীকরণের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। কর ব্যবস্থাপনা উন্নত করতে হবে, যাতে কর আদায়ের পরিমাণ বাড়ে। কর ব্যবস্থাপনা অবশ্যই নীতিমালার নির্দেশনা কঠোরভাবে অনুসরণ করবে, পক্ষপাতিত্ব বা ক্ষমতাবানদের সুবিধা দেওয়া যাবে না। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির বর্তমান প্রবণতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সরকারকে বিদ্যমান আইনগুলো পর্যালোচনা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সংশোধন করা সমীচিন হবে।...

আর্টিফিশিয়াল ইনটেলিজেন্সের সবজান্তা শরিক চ্যাট জিপিটির কাছে জানতে না চেয়েও বলা যায়, ২০২৬-২৭-এর বাজেটকে ঘিরে কথার ফুলঝুরি এবার ‘বাজেটঘাটতি’ নিয়েই ঝরেছে বেশি। তীব্র টানাটানির অর্থনীতির সংসারে সবাইকে স্বস্তি দিতে, এক চিলতে হাসি ও প্রত্যাশা প্রাপ্তির পদাবলি শুনতে ও শোনাতে সময় গড়িয়ে ৩০ জুনে যে লাউ সেই কদু বিশাল ঘাটতির বাজেট পাসে ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত হবেই। মহামান্য রাষ্ট্রপতি অর্থ বিল ও অর্থ আইনে সানুগ্রহ স্বাক্ষর দান করলে বাজেট কার্যকর হয়ে যাবে। তবে এবারের বাজেট বাস্তবায়ন পারঙ্গমতার ওপর নির্ভর করবে এর উদ্দেশ্য বিধেয় পূরণ। নতুন নির্বাচিত সরকার। খাদের কিনারা থেকে নিমজ্জমান অর্থনীতিকে টেনে তুলতে হবে, হাতে সময় কম। ঘরে-বাইরে সমস্যারা সর্বত্র। জনগণের প্রত্যশা পাহাড়সমান। সাধ ও সাধ্যের মধ্যে যেন যোজন যোজন দূরত্ব। তার পরও বড় বাজেট, ব্যয়ের তো বটেই। ব্যয় করতে গেলে আয় লাগবে। বাড়ন্ত ব্যয় নিজের আয় না থাকলে ধারকর্জ করে বাস্তবায়ন করা যাবে, তবে সেই ধারকর্জের টাকা শোধ করতে গেলে আবার আয়ের বাজেটেই বাড়বে টান। সে কারণে মিডিয়ায় সবাই বলছে আয় তো হবে না, তা জেনেও কেন আয়ের বাজেট বাড়ানো হচ্ছে? তা দেখিয়ে কি বেশি ব্যয় করার চেষ্টা, যা করা হয়েছে বিগত দেড় দশকে। এবারের ব্যয় আগের মতো লুটপাটের ইচ্ছে নিয়ে নয়, থাকবে নেগেটিভ অথবা পজিটিভলি প্রত্যাশা পূরণের প্রয়াস।
সোজাসাপ্টা ভাষায় বলা যায়, ব্যয়ের বাজেট বাস্তবায়নে আয়ের জোগান বা সংস্থানে যতটুকু কম পড়ে সেটাই ঘাটতি বাজেট। আর বাজেট বাস্তবায়নে ব্যয়ের যে বরাদ্দ দেওয়া আছে তা পূরণে আয়ের লক্ষ্যমাত্রা যতটুকু অপূরণীয় থাকে সেটাকে বাজেটের ঘাটতি বলা যায়।
প্রকৃতপক্ষে ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হয় রাজনৈতিক অর্থনীতির প্রতিশ্রুতি হিসেবে, এটি করা হয় জনগণের অর্থনীতিকে চাঙ্গা, গতিশীল, কর্মসংস্থানমুখী বিনিয়োগ এবং জীবনযাত্রার ব্যয় সহনশীল করার জন্য। ভাবখানা এই–আমি যদি ব্যয় না করি তাহলে অর্থনীতিতে সম্পদ ও সেবা সৃষ্টি হবে না, উৎপাদন ও সরবরাহের চাহিদা, গণ-আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে পারবে না। সরকারের এ প্রত্যয় ও পরিকল্পনায় এটাও কাজ করে যে অর্থনীতি সচল হলে রাজস্ব আয় বাড়বে এবং রাজস্ব আয় বাড়ানোর দ্বারা অর্থনীতিতে আয়বৈষম্য কমানো সহজতর হবে। সব সরকারের লক্ষ্য থাকে অর্থনীতিতে আয়-ব্যয়ে ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা করা এবং পরস্পর পরিপূরক ভূমিকা পালন।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট প্রাক্কলনের সময় তিনটি বিষয় সামনে দর্শন বা দৃষ্টিভঙ্গি হিসেবে এসেছে–১. ভঙ্গুর অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে হবে। কেননা, অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়লে বেকারত্ব বাড়বে, দ্রব্যমূল্য সবার জন্য অসহনীয় হয়ে উঠবে, ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগ প্রকারান্তরে রাজস্ব আয়ের ক্ষেত্রে খরা দেখা দেবে, ব্যয় করার সক্ষমতা কমে যাবে। এটি একটি ঘূর্ণায়মান প্রক্রিয়া। ২. দীর্ঘদিন ধরে অর্থনীতির প্রধান পুঁজি সরবরাহ খাত ব্যাংক ও পুঁজিবাজার যথা ভূমিকার স্থানে নেই, পুঁজি পাচার হয়ে গেছে, যা ফিরিয়ে আনা সময়সাপেক্ষ হওয়ায় ব্যাংক ও বিনিয়োগ খাতকে পর্যাপ্ত ভর্তুকি দিয়ে হলেও এর চলতশক্তি বজায় রাখা বা বাড়ানো। ৩. কৃষিসহ বিভিন্ন খাতে উদ্দীপনা সৃষ্টি করে ভবিষ্যতের জন্য টেকসই ও খাদ্য নিরাপত্তার পরিবেশ তৈরি করা। মানসম্মত শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ দিয়ে মানবসম্পদের উন্নয়ন ঘটানো, গণমুখী স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা নিশ্চিত করে জনস্বাস্থ্যসেবাকে গণস্বাস্থ্য অভিমুখীকরণের দ্বারা স্বাস্থ্য খাতের উপযোগিতায় যে ক্ষরণ তা রোধ করা। অর্থনীতির সব খাতকে মূল ভরকেন্দ্রে শামিল করতে খাতভিত্তিক সৃজনশীল উদ্যোগ নেওয়া। শিক্ষা, স্বাস্থ্য সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ খাতগুলোকে ক্ষেত্রবিশেষে সুশাসন, জবাবদিহি ও দায়িত্বশীল করে তোলা।
এই তিন লক্ষ্যমাত্রা পরিপালনে সরকারকে বড় ব্যয়ের বাজেট বানাতে হয়েছে আর সিম্পল বা গাণিতিক সূত্রে রাজস্ব আয়ের বাজেট বড় হতেই হয়েছে। বিস্তর সমালোচনা হতেই পারে আয় ব্যয়ের এই যোজন যোজন ফারাক কমানো হবে কীভাবে, যা না হলে অর্থনীতির চাকা ঘুরবে না, আয়ের পালে বাতাস বইবে না। তাই সরকারকে আয় ও ব্যয়ের ক্ষেত্রে করণীয় সম্পর্কে দৃঢ়চিত্ত ও প্রতিশ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে। স্বাধীনতার ৫৩ বছরের মাথায় চব্বিশের জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থানের মর্মবাণী তিনটি–
১. পাবলিক মানি আয়-ব্যয়ে ন্যায্যতা নিশ্চিতকরণ, চাকরিসহ সব নাগরিক সুবিধা সৃষ্টিতে বৈষম্য কমাতে হবে, ২. সর্বত্র সুশাসন ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা আবশ্যক হয়ে দাঁড়াবে, ৩. দেশ অর্থনীতি ও জাতিকে স্বনির্ভর, স্বাবলম্বী হতে হবে। কেননা, বহিরাগত পক্ষ প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে ইচ্ছাকৃত কিংবা অনিচ্ছাকৃতভাবে জাতীয় অর্থনীতিকে দুর্বল বলয়ে দেখতে বা রাখতে চাচ্ছে। স্বাধীনতার জন্য রক্ত দেওয়া জাতির দেশ বাংলাদেশ কারও ট্রাপে না পড়ে বরং কীভাবে এর থেকে উত্তরণ ঘটানো যায় সেটা দেখতে হবে। একটাই বিকল্প–নিজেকে স্বাবলম্বী করে তোলা, টেকসই করে তোলা, লাগসই প্রযুক্তি পানির আধার তৈরিতে খাল কাটায় কর্মসংস্থান, ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড দিয়ে সবার পারচেজিং পাওয়ার বাড়ানো। মানসম্মত শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করে দেশের ও বাইরের চাকরিতে ঢোকার পথ তৈরিতে দৃঢ়চিত্ত পদক্ষেপ সৃষ্টি প্রয়োজন হবে। রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোকে দায়িত্বশীল হতে হবে। সরকারের দ্বারা রক্তক্ষরণ সৃষ্টিকারী পথ-পন্থাগুলোকে ক্রমশ উধাও করা।
দারিদ্র্য হ্রাস এবং সাম্প্রতিক সময়ে বৈষম্য কমানো নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোর জন্য একটি বড় উদ্বেগের বিষয়। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে অর্থনৈতিক বৈষম্য দূরীকরণ, পারত পক্ষে নিরসনে উল্লেখযোগ্য উন্নতি সাধন করতে হবে। এ লক্ষ্য অর্জনে সম্পদের পুনর্বণ্টন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যা মূলত করব্যবস্থা ও কল্যাণমূলক নীতির মাধ্যমে পরিচালিত হয়। তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে কর ও ব্যয়ের প্রভাবকে সংকীর্ণ দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হয়েছে।
দারিদ্র্য মানুষের শত্রু, এটি মানুষকে অপমানিত ও অমানবিক করে তোলে। দারিদ্র্য সরকারগুলোর জন্য একটি গুরুতর চ্যালেঞ্জ। এর প্রভাব হলো জীবনের মৌলিক চাহিদার অভাব। বিভিন্ন দেশে দারিদ্র্য দূরীকরণের প্রচেষ্টা মূলত শিক্ষাকে কেন্দ্র করে হয়েছে, যা অর্থনৈতিক, প্রযুক্তিগত ও বুদ্ধিবৃত্তিক উন্নয়নের চাবিকাঠি হিসেবে দেখা হয়েছে। দারিদ্র্যের কারণ হিসেবে দেখা যায় দুর্নীতি, দুর্বল শাসন, ঋণের বোঝা, বেকারত্ব, কম উৎপাদনশীলতা, জনসংখ্যা বৃদ্ধি, বিশ্বায়ন, অকার্যকর সরকারি নীতি এবং দক্ষতা প্রশিক্ষণের অভাব।
করব্যবস্থা দারিদ্র্য দূরীকরণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ: ব্যক্তিগত ও সরকারি খাতের উন্নয়ন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং দারিদ্র্য হ্রাসে এর ভূমিকা অপরিসীম। দারিদ্র্য এমন একটি বিষয় যা প্রতিটি রাষ্ট্রের সরকারের বিশেষ মনোযোগ দাবি করে। এজন্য সরকারের নীতি দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে টেকসই জীবিকা অর্জনে সহায়তা করার দিকে মনোযোগী হওয়া। এ দৃষ্টিভঙ্গি হলো সমাজ, পরিবার ও ব্যক্তিকে অর্থনৈতিকভাবে ক্ষমতায়িত করা একটি সুসংগঠিত ও সমন্বিত দারিদ্র্য দূরীকরণ কর্মসূচির মাধ্যমে।
নীতিনির্ধারকরা যদি সত্যিই দারিদ্র্য দূর করতে এবং দরিদ্র জনগণের জীবনমান উন্নত করতে চান, তবে তাদের কর ও স্থানান্তর ব্যবস্থাকে পুনর্গঠন করতে হবে, যাতে দরিদ্ররা বিশেষত অতিদরিদ্ররা অতিরিক্ত করভার বহন না করে এবং যথাযথ সুবিধা পায়।
সরকারকে কর ও স্থানান্তর ব্যবস্থা এমনভাবে নকশা করতে হবে যাতে দরিদ্রদের আয় বা ভোগ কর-পরবর্তী সময়ে আগের চেয়ে কম না হয়। সংক্ষেপে, রাজস্বনীতি দরিদ্রদের কল্যাণ উন্নত করবে, তাদের দারিদ্র্যে ঠেলে দেবে না বা বঞ্চনা বাড়াবে না। এখনো একটি কঠিন বাস্তবতা হলো, জনসেবা (যেমন শিক্ষা ও স্বাস্থ্য) নিশ্চিত করতে দরিদ্র দেশগুলোকে আরও বেশি কর সংগ্রহ করতে হবে এবং তা প্রগতিশীল ও ন্যায়সঙ্গত উপায়ে করতে হবে। উন্নয়নশীল দেশগুলোর করনীতি অনেক সময় অভিজাতদের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে, যা নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। এর ফলে ভ্যাটের মতো পশ্চাদগামী করের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে এবং কোম্পানিগুলোকে অতিরিক্ত কর ছাড় দেওয়া হয়েছে। তাই কর ব্যবস্থাপনা দারিদ্র্য দূরীকরণের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। কর ব্যবস্থাপনা উন্নত করতে হবে, যাতে কর আদায়ের পরিমাণ বাড়ে। কর ব্যবস্থাপনা অবশ্যই নীতিমালার নির্দেশনা কঠোরভাবে অনুসরণ করবে, পক্ষপাতিত্ব বা ক্ষমতাবানদের সুবিধা দেওয়া যাবে না। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির বর্তমান প্রবণতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সরকারকে বিদ্যমান আইনগুলো পর্যালোচনা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সংশোধন করা সমীচিন হবে।
লেখক: ঘাটতি বাজেট বিশ্লেষক

