ঢাকা ১৬ আষাঢ় ১৪৩৩, মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
কঙ্গোর বিপক্ষে মাইনোকে একাদশে চান রুনি টেকসই প্যাকেজিং ও ডিজিটাল প্রযুক্তিতে বদলে যাচ্ছে বৈশ্বিক খাদ্যশিল্প কাইলি জেনারের বিরুদ্ধে মামলা কাজের প্রলোভনে অপহরণ, টেকনাফের পাহাড়ি আস্তানা থেকে চার যুবক উদ্ধার গত ১৫ বছরের তুলনায় দেশে খুন, ডাকাতিসহ সার্বিক অপরাধ কমেছে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শিক্ষায় বাজেটের ২৫ শতাংশ বরাদ্দ চেয়ে গণতান্ত্রিক ছাত্রজোটের বিক্ষোভ বিশ্বের প্রথম ১৬ মেগাওয়াট টিএলপি ভাসমান বায়ু বিদ্যুৎ প্ল্যাটফর্ম দ্য প্রিমিয়ার ব্যাংক পিএলসির ২৭তম বার্ষিক সাধারণ সভা অনুষ্ঠিত জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বর্ষপূর্তি ঘিরে ছাত্রশক্তির কর্মসূচি ধর্ম পরিবর্তন বিষয়ে যা বললেন উর্ফি জাভেদ ইকুয়েডরের বিপক্ষে নিখুঁত ফুটবল খেলতে হবে: আগুইরে বগুড়ায় কুকুরকে নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যাচেষ্টা, অভিযুক্ত গ্রেপ্তার রাজস্ব আদায়ের বাস্তবভিত্তিক টার্গেট নির্ধারণ জরুরি ডিবিএইচের সাধারণ সভায় ১৫ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ অনুমোদন দুই পা নেই, তবুও স্বপ্নের পথে অদম্য জান্নাতুল বাজেটে ঘাটতি ঘাটতির বাজেট বিশ্বকাপের আসল হিরো ২০ জনকে নিয়োগ দেবে সরকারি বিদ্যুৎ কোম্পানি আন্তর্জাতিক মঞ্চে ইডকলের জয়জয়কার বিশ্বকাপ থেকে বিদায়ের পর ভক্তদের কাছে ক্ষমা চাইলেন সন হিয়াং-মিন রান্নাঘরের তেল চিটচিটে ভাব দূর করতে চট্টগ্রাম বোর্ডে এবার এইচএসসি পরীক্ষার্থী এক লাখ তিন মামলায় জামিন পেলেন কণ্ঠশিল্পী মমতাজ দেয়ালের রঙে ফুটুক ঘরের ব্যক্তিত্ব রাজস্ব আদায় বড় চ্যালেঞ্জ: এনবিআর চেয়ারম্যান মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটির ‘নেক্সট জেন’ দলের সাফল্য কমিউনিটি ক্লিনিক হবে ‘হেলথ হাব’ মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ইনুর ১০ বছরের কারাদণ্ড উদ্যোক্তা গড়তে ১০ প্রকল্প বাস্তবায়ন ও ৬টি নতুন প্রকল্প হচ্ছে: ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী খামেনির জানাজায় যোগ দিতে তেহরান যাচ্ছেন স্পিকার

বাজেটে ঘাটতি ঘাটতির বাজেট

প্রকাশ: ৩০ জুন ২০২৬, ০৪:৪৪ পিএম
বাজেটে ঘাটতি ঘাটতির বাজেট
ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ

কর ব্যবস্থাপনা দারিদ্র্য দূরীকরণের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। কর ব্যবস্থাপনা উন্নত করতে হবে, যাতে কর আদায়ের পরিমাণ বাড়ে। কর ব্যবস্থাপনা অবশ্যই নীতিমালার নির্দেশনা কঠোরভাবে অনুসরণ করবে, পক্ষপাতিত্ব বা ক্ষমতাবানদের সুবিধা দেওয়া যাবে না। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির বর্তমান প্রবণতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সরকারকে বিদ্যমান আইনগুলো পর্যালোচনা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সংশোধন করা সমীচিন হবে।...

আর্টিফিশিয়াল ইনটেলিজেন্সের সবজান্তা শরিক চ্যাট জিপিটির কাছে জানতে না চেয়েও বলা যায়, ২০২৬-২৭-এর বাজেটকে ঘিরে কথার ফুলঝুরি এবার ‘বাজেটঘাটতি’ নিয়েই ঝরেছে বেশি। তীব্র টানাটানির অর্থনীতির সংসারে সবাইকে স্বস্তি দিতে, এক চিলতে হাসি ও প্রত্যাশা প্রাপ্তির পদাবলি শুনতে ও শোনাতে সময় গড়িয়ে ৩০ জুনে যে লাউ সেই কদু বিশাল ঘাটতির বাজেট পাসে ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত হবেই। মহামান্য রাষ্ট্রপতি অর্থ বিল ও অর্থ আইনে সানুগ্রহ স্বাক্ষর দান করলে বাজেট কার্যকর হয়ে যাবে। তবে এবারের বাজেট বাস্তবায়ন পারঙ্গমতার ওপর নির্ভর করবে এর উদ্দেশ্য বিধেয় পূরণ। নতুন নির্বাচিত সরকার। খাদের কিনারা থেকে নিমজ্জমান অর্থনীতিকে টেনে তুলতে হবে, হাতে সময় কম। ঘরে-বাইরে সমস্যারা সর্বত্র। জনগণের প্রত্যশা পাহাড়সমান। সাধ ও সাধ্যের মধ্যে যেন যোজন যোজন দূরত্ব। তার পরও বড় বাজেট, ব্যয়ের তো বটেই। ব্যয় করতে গেলে আয় লাগবে। বাড়ন্ত ব্যয় নিজের আয় না থাকলে ধারকর্জ করে বাস্তবায়ন করা যাবে, তবে সেই ধারকর্জের টাকা শোধ করতে গেলে আবার আয়ের বাজেটেই বাড়বে টান। সে কারণে মিডিয়ায় সবাই বলছে আয় তো হবে না, তা জেনেও কেন আয়ের বাজেট বাড়ানো হচ্ছে? তা দেখিয়ে কি বেশি ব্যয় করার চেষ্টা, যা করা হয়েছে বিগত দেড় দশকে। এবারের ব্যয় আগের মতো লুটপাটের ইচ্ছে নিয়ে নয়, থাকবে নেগেটিভ অথবা পজিটিভলি প্রত্যাশা পূরণের প্রয়াস।

সোজাসাপ্টা ভাষায় বলা যায়, ব্যয়ের বাজেট বাস্তবায়নে আয়ের জোগান বা সংস্থানে যতটুকু কম পড়ে সেটাই ঘাটতি বাজেট। আর বাজেট বাস্তবায়নে ব্যয়ের যে বরাদ্দ দেওয়া আছে তা পূরণে আয়ের লক্ষ্যমাত্রা যতটুকু অপূরণীয় থাকে সেটাকে বাজেটের ঘাটতি বলা যায়।

প্রকৃতপক্ষে ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হয় রাজনৈতিক অর্থনীতির প্রতিশ্রুতি হিসেবে, এটি করা হয় জনগণের অর্থনীতিকে চাঙ্গা, গতিশীল, কর্মসংস্থানমুখী বিনিয়োগ এবং জীবনযাত্রার ব্যয় সহনশীল করার জন্য। ভাবখানা এই–আমি যদি ব্যয় না করি তাহলে অর্থনীতিতে সম্পদ ও সেবা সৃষ্টি হবে না, উৎপাদন ও সরবরাহের চাহিদা, গণ-আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে পারবে না। সরকারের এ প্রত্যয় ও পরিকল্পনায় এটাও কাজ করে যে অর্থনীতি সচল হলে রাজস্ব আয় বাড়বে এবং রাজস্ব আয় বাড়ানোর দ্বারা অর্থনীতিতে আয়বৈষম্য কমানো সহজতর হবে। সব সরকারের লক্ষ্য থাকে অর্থনীতিতে আয়-ব্যয়ে ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা করা এবং পরস্পর পরিপূরক ভূমিকা পালন।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট প্রাক্কলনের সময় তিনটি বিষয় সামনে দর্শন বা দৃষ্টিভঙ্গি হিসেবে এসেছে–১. ভঙ্গুর অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে হবে। কেননা, অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়লে বেকারত্ব বাড়বে, দ্রব্যমূল্য সবার জন্য অসহনীয় হয়ে উঠবে, ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগ প্রকারান্তরে রাজস্ব আয়ের ক্ষেত্রে খরা দেখা দেবে, ব্যয় করার সক্ষমতা কমে যাবে। এটি একটি ঘূর্ণায়মান প্রক্রিয়া। ২. দীর্ঘদিন ধরে অর্থনীতির প্রধান পুঁজি সরবরাহ খাত ব্যাংক ও পুঁজিবাজার যথা ভূমিকার স্থানে নেই, পুঁজি পাচার হয়ে গেছে, যা ফিরিয়ে আনা সময়সাপেক্ষ হওয়ায় ব্যাংক ও বিনিয়োগ খাতকে পর্যাপ্ত ভর্তুকি দিয়ে হলেও এর চলতশক্তি বজায় রাখা বা বাড়ানো। ৩. কৃষিসহ বিভিন্ন খাতে উদ্দীপনা সৃষ্টি করে ভবিষ্যতের জন্য টেকসই ও খাদ্য নিরাপত্তার পরিবেশ তৈরি করা। মানসম্মত শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ দিয়ে মানবসম্পদের উন্নয়ন ঘটানো, গণমুখী স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা নিশ্চিত করে জনস্বাস্থ্যসেবাকে গণস্বাস্থ্য অভিমুখীকরণের দ্বারা স্বাস্থ্য খাতের উপযোগিতায় যে ক্ষরণ তা রোধ করা। অর্থনীতির সব খাতকে মূল ভরকেন্দ্রে শামিল করতে খাতভিত্তিক সৃজনশীল উদ্যোগ নেওয়া। শিক্ষা, স্বাস্থ্য সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ খাতগুলোকে ক্ষেত্রবিশেষে সুশাসন, জবাবদিহি ও দায়িত্বশীল করে তোলা।

এই তিন লক্ষ্যমাত্রা পরিপালনে সরকারকে বড় ব্যয়ের বাজেট বানাতে হয়েছে আর সিম্পল বা গাণিতিক সূত্রে রাজস্ব আয়ের বাজেট বড় হতেই হয়েছে। বিস্তর সমালোচনা হতেই পারে আয় ব্যয়ের এই যোজন যোজন ফারাক কমানো হবে কীভাবে, যা না হলে অর্থনীতির চাকা ঘুরবে না, আয়ের পালে বাতাস বইবে না। তাই সরকারকে আয় ও ব্যয়ের ক্ষেত্রে করণীয় সম্পর্কে দৃঢ়চিত্ত ও প্রতিশ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে। স্বাধীনতার ৫৩ বছরের মাথায় চব্বিশের জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থানের মর্মবাণী তিনটি–

১. পাবলিক মানি আয়-ব্যয়ে ন্যায্যতা নিশ্চিতকরণ, চাকরিসহ সব নাগরিক সুবিধা সৃষ্টিতে বৈষম্য কমাতে হবে, ২. সর্বত্র সুশাসন ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা আবশ্যক হয়ে দাঁড়াবে, ৩. দেশ অর্থনীতি ও জাতিকে স্বনির্ভর, স্বাবলম্বী হতে হবে। কেননা, বহিরাগত পক্ষ প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে ইচ্ছাকৃত কিংবা অনিচ্ছাকৃতভাবে জাতীয় অর্থনীতিকে দুর্বল বলয়ে দেখতে বা রাখতে চাচ্ছে। স্বাধীনতার জন্য রক্ত দেওয়া জাতির দেশ বাংলাদেশ কারও ট্রাপে না পড়ে বরং কীভাবে এর থেকে উত্তরণ ঘটানো যায় সেটা দেখতে হবে। একটাই বিকল্প–নিজেকে স্বাবলম্বী করে তোলা, টেকসই করে তোলা, লাগসই প্রযুক্তি পানির আধার তৈরিতে খাল কাটায় কর্মসংস্থান, ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড দিয়ে সবার পারচেজিং পাওয়ার বাড়ানো। মানসম্মত শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করে দেশের ও বাইরের চাকরিতে ঢোকার পথ তৈরিতে দৃঢ়চিত্ত পদক্ষেপ সৃষ্টি প্রয়োজন হবে। রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোকে দায়িত্বশীল হতে হবে। সরকারের দ্বারা রক্তক্ষরণ সৃষ্টিকারী পথ-পন্থাগুলোকে ক্রমশ উধাও করা।

দারিদ্র্য হ্রাস এবং সাম্প্রতিক সময়ে বৈষম্য কমানো নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোর জন্য একটি বড় উদ্বেগের বিষয়। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে অর্থনৈতিক বৈষম্য দূরীকরণ, পারত পক্ষে নিরসনে উল্লেখযোগ্য উন্নতি সাধন করতে হবে। এ লক্ষ্য অর্জনে সম্পদের পুনর্বণ্টন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যা মূলত করব্যবস্থা ও কল্যাণমূলক নীতির মাধ্যমে পরিচালিত হয়। তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে কর ও ব্যয়ের প্রভাবকে সংকীর্ণ দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হয়েছে।

দারিদ্র্য মানুষের শত্রু, এটি মানুষকে অপমানিত ও অমানবিক করে তোলে। দারিদ্র্য সরকারগুলোর জন্য একটি গুরুতর চ্যালেঞ্জ। এর প্রভাব হলো জীবনের মৌলিক চাহিদার অভাব। বিভিন্ন দেশে দারিদ্র্য দূরীকরণের প্রচেষ্টা মূলত শিক্ষাকে কেন্দ্র করে হয়েছে, যা অর্থনৈতিক, প্রযুক্তিগত ও বুদ্ধিবৃত্তিক উন্নয়নের চাবিকাঠি হিসেবে দেখা হয়েছে। দারিদ্র্যের কারণ হিসেবে দেখা যায় দুর্নীতি, দুর্বল শাসন, ঋণের বোঝা, বেকারত্ব, কম উৎপাদনশীলতা, জনসংখ্যা বৃদ্ধি, বিশ্বায়ন, অকার্যকর সরকারি নীতি এবং দক্ষতা প্রশিক্ষণের অভাব।

করব্যবস্থা দারিদ্র্য দূরীকরণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ: ব্যক্তিগত ও সরকারি খাতের উন্নয়ন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং দারিদ্র্য হ্রাসে এর ভূমিকা অপরিসীম। দারিদ্র্য এমন একটি বিষয় যা প্রতিটি রাষ্ট্রের সরকারের বিশেষ মনোযোগ দাবি করে। এজন্য সরকারের নীতি দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে টেকসই জীবিকা অর্জনে সহায়তা করার দিকে মনোযোগী হওয়া। এ দৃষ্টিভঙ্গি হলো সমাজ, পরিবার ও ব্যক্তিকে অর্থনৈতিকভাবে ক্ষমতায়িত করা একটি সুসংগঠিত ও সমন্বিত দারিদ্র্য দূরীকরণ কর্মসূচির মাধ্যমে।

নীতিনির্ধারকরা যদি সত্যিই দারিদ্র্য দূর করতে এবং দরিদ্র জনগণের জীবনমান উন্নত করতে চান, তবে তাদের কর ও স্থানান্তর ব্যবস্থাকে পুনর্গঠন করতে হবে, যাতে দরিদ্ররা বিশেষত অতিদরিদ্ররা অতিরিক্ত করভার বহন না করে এবং যথাযথ সুবিধা পায়।

সরকারকে কর ও স্থানান্তর ব্যবস্থা এমনভাবে নকশা করতে হবে যাতে দরিদ্রদের আয় বা ভোগ কর-পরবর্তী সময়ে আগের চেয়ে কম না হয়। সংক্ষেপে, রাজস্বনীতি দরিদ্রদের কল্যাণ উন্নত করবে, তাদের দারিদ্র্যে ঠেলে দেবে না বা বঞ্চনা বাড়াবে না। এখনো একটি কঠিন বাস্তবতা হলো, জনসেবা (যেমন শিক্ষা ও স্বাস্থ্য) নিশ্চিত করতে দরিদ্র দেশগুলোকে আরও বেশি কর সংগ্রহ করতে হবে এবং তা প্রগতিশীল ও ন্যায়সঙ্গত উপায়ে করতে হবে। উন্নয়নশীল দেশগুলোর করনীতি অনেক সময় অভিজাতদের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে, যা নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। এর ফলে ভ্যাটের মতো পশ্চাদগামী করের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে এবং কোম্পানিগুলোকে অতিরিক্ত কর ছাড় দেওয়া হয়েছে। তাই কর ব্যবস্থাপনা দারিদ্র্য দূরীকরণের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। কর ব্যবস্থাপনা উন্নত করতে হবে, যাতে কর আদায়ের পরিমাণ বাড়ে। কর ব্যবস্থাপনা অবশ্যই নীতিমালার নির্দেশনা কঠোরভাবে অনুসরণ করবে, পক্ষপাতিত্ব বা ক্ষমতাবানদের সুবিধা দেওয়া যাবে না। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির বর্তমান প্রবণতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সরকারকে বিদ্যমান আইনগুলো পর্যালোচনা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সংশোধন করা সমীচিন হবে।

লেখক: ঘাটতি বাজেট বিশ্লেষক

রাজস্ব আদায়ের বাস্তবভিত্তিক টার্গেট নির্ধারণ জরুরি

প্রকাশ: ৩০ জুন ২০২৬, ০৪:৫৫ পিএম
আপডেট: ৩০ জুন ২০২৬, ০৫:১৬ পিএম
রাজস্ব আদায়ের বাস্তবভিত্তিক টার্গেট নির্ধারণ জরুরি
মো. হেলাল উদ্দিন

সমুদয় রাজস্ব আয় চলে যাচ্ছে পরিচালন ব্যয়ে। উন্নয়ন যতটুকু হচ্ছে তা দেশ-বিদেশ থেকে বিভিন্নভাবে ধারকর্জ করে। এ কারণে প্রতি বছর রাজস্বের একটা বিরাট অংশ চলে যায় ঋণের সুদ গুনতে। এ বিষয়ে দৃষ্টি দেওয়া দরকার। সরকার কৃচ্ছ্রসাধনের মাধ্যমে পরিচালন ব্যয় কমিয়ে বিরাট আকারের কথিত টার্গেট কমিয়ে আনতে পারে।...

দেশ পরিচালনা এবং জাতীয় অর্থনৈতিক উন্নয়নে কর আদায় আবশ্যক। এই কর সাধারণত জাতীয় রাজস্ব বোর্ড আহরণ করে থাকে। এবারের বাজেটে কর আদায়ের লক্ষমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড আদায় করবে ৬ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা। অবশিষ্ট টাকা আসবে নন-এনবিআর আর নন-ট্যাক্স রেভিনিউ থেকে।

বিগত অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য নেওয়া হয়েছিল প্রায় ৬ লাখ কোটি টাকা। কিন্তু এ পর্যন্ত ৪ লাখ কোটি টাকাও আদায় করা সম্ভব হয়নি। এ বছরের রাজস্ব আদায়ের জন্য যে টার্গেট নির্ধারণ করা হয়েছে তার পরিমাণ প্রায় ৭ লাখ কোটি টাকা। অথচ কীভাবে, অর্থাৎ কোন জাদুবলে এ টার্গেট অর্জন করা হবে, তা বোধ্যগম্য নয়।

গত ১১ জুন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট জাতীয় সংসদে উত্থাপন করা হয়েছে। আমরা দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছিলাম একজন ব্যবসায়ী ও ব্যবসাবান্ধব অভিজ্ঞ ব্যক্তিকে অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়ার জন্য। এর আগেও একজন ব্যবসায়ীকে অর্থমন্ত্রী করা হয়েছিল। কিন্তু জাতির অত্যন্ত দুর্ভাগ্য তিনি কোনো প্রকার ব্যবসাবান্ধব নীতি প্রণয়ন করতে পারেননি। এবার বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সরকার গঠনের সময় একজন বিজ্ঞ রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীকে অর্থমন্ত্রী করায় দেশের ব্যবসায়ী সমাজ আশ্বস্ত হয়। ধারণা করা হয়েছিল, একজন ব্যবসাবান্ধব অর্থমন্ত্রী ব্যবসায়ীদের সুখ-দুঃখের কথা বুঝবেন অর্থাৎ প্রকৃত ব্যবসাবান্ধব করনীতি গ্রহণ করবেন। এতে করে একদিকে যেমন সরকারের কর আদায়ের বাস্তবসম্মত লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হবে, তেমনি ব্যবসায়ীরাও হয়রানিমুক্ত পরিবেশে কর প্রদানের মাধ্যমে তাদের শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য স্বাচ্ছন্দ্যে পরিচালনা করতে পারবেন।

এই মুহূর্তে জাতীয় অর্থনীতিতে একটা মন্দাবস্থা বিরাজ করছে। ইরান যুদ্ধের কারণে সরকার জ্বালানি তেল ও বিদ্যুতের মূল্য বাড়িয়ে দিয়েছে। এর নেতিবাচক প্রভাব শিল্প-বাণিজ্যের ওপর পড়ছে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প এবং ব্যবসা তথা এসএমই খাত তাদের ব্যবসার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে হিমশিম খাচ্ছে। বাজেটে সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে। স্বভাবতই বেসরকারি শিল্প ব্যবসার কর্মচারীরাও অতিরিক্ত বেতন-ভাতা দাবি করবে। বর্তমান পরিস্থিতিতে বেসরকারি খাতের পক্ষে এই অর্থের জোগান দেওয়া প্রায় অসম্ভব। এর মাধ্যমে শিল্পব্যবসার অঙ্গনে একটা নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি উদ্ভবের আশঙ্কা রয়েছে।

সাধারণত জাতীয় রাজস্ব বোর্ড তিনটি খাত থেকে রাজস্ব আদায় করে থাকে। এগুলো হলো–আমদানি শুল্ক, ভ্যাট ও আয়কর। এগুলো নিয়মিত পরিসরে আদায়ের পাশাপাশি বিভিন্নভাবে জরিমানা আদায়ের মাধ্যমে রাজস্ব আয় করে থাকে।

দেখা গেছে, বিগত বছরগুলোতে আমদানি শুল্ক আদায়ের পরিমাণ স্থির অবস্থায় রয়েছে। এজন্য সরকার অবশিষ্ট দুটি খাত অর্থাৎ ভ্যাট ও আয়কর আদায়ের পরিমাণ বাড়াতে চাচ্ছে। এ লক্ষ্যে গত ২৪ জুন সংসদ সদস্যের প্রশ্নের উত্তরে অর্থমন্ত্রী জানান–মুদি, প্রসাধনী দোকানসহ ক্ষুদ্র, অতি ক্ষুদ্র ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে ভ্যাট ও করের আওতায় আনা হবে। উল্লেখ্য, ভ্যাটের মূলনীতি হলো ভ্যাট প্রদান করবে ভোক্তা। ব্যবসায়ীরা কালেক্টরের ভূমিকায় থাকবে। আমাদের প্রশ্ন অর্থ মন্ত্রী ক্ষুদ্র এবং অতিক্ষুদ্র ব্যবাসায়ীরা কীভাবে ভোক্তার কাছ থেকে ভ্যাট এবং কর আদায় করবে তা আমাদের বোধগম্য নয়। আর এখানে কতইবা রাজস্ব আদায় হবে তার সঠিক পরিসংখ্যান কি রাজস্ব বোর্ডের কাছে আছে? ১৯৯১ সালে বিএনপি সরকারের অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমানের সময় ভ্যাট প্রবর্তন করা হয়। তখন বলা ছিল হাটবাজারে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ওপর ভ্যাট আরোপ করা হবে না। কিন্তু এই সিদ্ধান্তটি ভ্যাট আদায়ের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

এবারের বাজেটে আয়কর এবং ভ্যাটের পরিধি বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে। বর্তমান এনবিআরের যে জনবল এবং দক্ষতার অভাব রয়েছে তাতে কোনো ক্রমেই ট্যাক্স ও ভ্যাটের আওতা বিস্তৃত করা সম্ভব হবে বলে আমরা মনে করি না। এ ধরনের প্রসঙ্গ এলেই এনবিআর প্রথম অভিযোগ করে–১. তাদের জনবল স্বল্পতা, ২. যথাসময়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ ছাড় না দেওয়া, ৩. দক্ষ জনবল না থাকায় অটোমেশন চালু করা যাচ্ছে না। এগুলো তাদের পুরোনো অভিযোগ। জনবলসংকট দূর করার জন্য বাংলাদেশে অনেক স্বনামধন্য সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতিতে অনার্সে অধ্যায়নরত ইন্টার্নশিপ করছে, এমন ছাত্রদের দিয়ে জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যন্ত আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে সমস্যাটির সমাধান করা যায়। দক্ষ জনবলের অভাবে অটোমেশন চালু করা যাচ্ছে না।  আমাদের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থায় সুপরিয়র সার্ভিসের জন্য বিসিএস বাধ্যতামূলক। প্রশ্ন থাকে যে, সারা পৃথিবি এখন ডিজিটালাইজেশনের মাধ্যমে ক্যাশলেস লেনদেন শুরু করেছে। এর জন্য আইন সংশোধন করে স্বনামধন্য সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় যেমন–বুয়েট, ব্র্যাক, নর্থসাউথ, ইস্টওয়েস্টসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে আইটিতে পারদর্শী ছাত্রছাত্রীদের বিশেষ পরীক্ষার মাধ্যমে সরাসরি সুপিরিয়র সার্ভিসে অন্তর্ভুক্ত করা এবং সেই সঙ্গে আইটি-সংক্রান্ত পদে পদায়ন করা যেতে পারে। এই বিশাল অঙ্কের রাজস্ব আহরণ করার জন্য যে দক্ষতা, সততা, মানবিকতা দরকার তা যদি না থাকে তাহলে এ অর্থসংগ্রহ করা যাবে কি না তার অনিশ্চয়তা ও সংশয় থেকেই যাবে।

ব্যবসায়ীরা দাবি করেছেন, এখন থেকে অর্থবছরের আয়কর ও ভ্যাট রিটার্নের অর্থবছরের ৬ মাসের মধ্যে অর্থাৎ ডিসেম্বরের মধ্যে পরিশোধ করবেন। পরবর্তী ৬ মাসে যাচাইবাছাই করে এনবিআরের বা সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের কর্মকর্তার কোনো দাবি থাকলে ওই ৬ মাসের মধ্যে নিষ্পত্তি করতে হবে। ভ্যাট ও আয়করদাতাকে বছরান্তে সার্টিফিকেট দিতে হবে। যেমনভাবে বিদ্যুৎ, পানি ও গ্যাসের ক্ষেত্রে বছরান্তে দেয় বিল পরিশোধের সার্টিফিকেট দেওয়া হয়। এতে অতীতের কোনো ভূতুড়ে কথিত বকেয়া কর এসএমই খাতের ব্যবসায়ীদের কাছে দাবি করতে পারে না। তেমনিভাবে পরবর্তীতে কোনো কারণেই অডিট অথবা অর্থ ডকসের নামে ভ্যাট ও করদাতার কাছে অর্থাৎ নতুন করদাতা ও এসএমই খাতের ব্যবসায়ীদের কাছে পূর্ববর্তী অর্থ দাবি না করে করব্যবস্থাকে মানবিক করার ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

আমাদের দেশে ভ্যাট প্রথা চালুর সময় এই ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল যে, বিদ্যমান আবগারি শুল্ক ও বিক্রয় কর উঠিয়ে দিয়ে আধুনিক করব্যবস্থা হিসেবে ভ্যাটের প্রচলন করা হলো। পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে যে ভ্যাট আদায় করা হয়, তা স্রেফ বিক্রয় কর। বিগত সরকারগুলো তাদের দেওয়া অঙ্গীকার থেকে বিচ্যুত হয়ে এ ভ্যাট চালু করেছিল। ব্যবসায়ীরাও সরকারের রাজস্ব আদায়ে সহযোগিতা করতে তা মেনে নিয়েছিল। প্রথমে প্যাকেজ ভ্যাট অর্থাৎ দোকান পর্যায়ে বাৎসারিক একটি নির্দিষ্ট হারে এবং পরে বেচাকেনার হিসাব পদ্ধতি অনুসরণ করে এ ভ্যাট আদায়ের প্রস্তাব করা হলে ব্যবসায়ীরা তা মেনে নেয়। সরকার এ সময় বলেছিল, এসএমই খাতের ব্যবসাগুলোকে এর আওতামুক্ত রাখা হবে। বছরে ৩ কোটি টাকা বিক্রি পর্যন্ত দোকান ব্যবসায়ীদের থেকে ভ্যাট আদায় করা হবে না। প্রথমে সেই অঙ্গীকার মেনে চললেও বর্তমানে তা সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। এখন দৈনিক ১২০০ থেকে ১৩০০ টাকা বিক্রি হলেও সেসব দোকান ব্যবসা থেকে ভ্যাট আদায় করা হচ্ছে।

দেশে মোট ভ্যাট রেজিস্ট্রেশন হয়েছে ৮ লাখ। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ১ লাখ ৫৬ হাজার কোটি টাকা আদায় হয়েছে ভ্যাট থেকে। এর মধ্যে এলটিইউ-ভুক্ত ১০৯টি প্রতিষ্ঠান প্রায় ৬০ শতাংশ ভ্যাট প্রদান করে। বড় ৫ হাজার প্রতিষ্ঠান প্রদান করে ৯৮ শতাংশ। এখানে ভ্যাট ফাঁকির পরিমাণ বিস্তর। এটা বন্ধ করা গেলে রাজস্ব আদায়ের জন্য সারা দেশের ক্ষুদ্র, অতি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের করজালে প্রবেশ করানোর প্রয়োজন হয় না। এতে বিশাল সংখ্যক ব্যবসায়ী যে হয়রানির শিকার হবে তাতে সরকারের জনপ্রিয়তা হ্রাস পেতে পারে। যেহেতু গত দুই বছর এফবিসিসিআই প্রশাসক কর্তৃক পরিচালিত হচ্ছে, সেহেতু এবার বাজেটে ব্যবসায়ীদের মতামত উপেক্ষিত হয়েছে।

সরকার কর আদায় করে মূলত দেশের উন্নয়নের স্বার্থে। সাধারণ কথায় বলা হয়, কর আদায়ের মাধ্যমে সরকারের আয়ের একটা অংশ পরিচালন খাতে ব্যয় করার পর অবশিষ্ট টাকা উন্নয়নে ব্যয় করা হবে। অথচ সমুদয় রাজস্ব আয় চলে যাচ্ছে পরিচালন ব্যয়ে। উন্নয়ন যতটুকু হচ্ছে তা দেশ-বিদেশ থেকে বিভিন্নভাবে ধারকর্জ করে। এ কারণে প্রতি বছর রাজস্বের একটা বিরাট অংশ চলে যায় ঋণের সুদ গুনতে। এ বিষয়ে দৃষ্টি দেওয়া দরকার। সরকার কৃচ্ছ্রসাধনের মাধ্যমে পরিচালন ব্যয় কমিয়ে বিরাট আকারের কথিত টার্গেট কমিয়ে আনতে পারে।

লেখক: সভাপতি, বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতি ও সাবেক সহসভাপতি, এফবিসিসিআই

শিল্প ও টেলিভিশনের এক অনন্য কারিগর মুস্তাফা মনোয়ার

প্রকাশ: ৩০ জুন ২০২৬, ০৯:১০ এএম
আপডেট: ৩০ জুন ২০২৬, ০৯:১১ এএম
শিল্প ও টেলিভিশনের এক অনন্য কারিগর মুস্তাফা মনোয়ার
মুস্তাফা মনোয়ার। ছবি: খবরের কাগজ

চলে গেলেন মুস্তাফা মনোয়ার। তিনি ছিলেন এমন একজন শিল্পী, যিনি প্রকৃতির গন্ধ ও পরিবেশের আবহকে অত্যন্ত সচেতনভাবে তার শিল্পচর্চায় ধারণ করেছিলেন। মানুষের খুব কাছাকাছি এসে তিনি জীবনকে নানা দিক থেকে ভালো বেসেছেন। তার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছিল চিত্রকলায়। কিন্তু তিনি শুধু একজন প্রথাগত চিত্রশিল্পী হয়ে থাকেননি। তার মূল লক্ষ্য ছিল কীভাবে শিল্প-সংস্কৃতির মাধ্যমে আমাদের সামাজিক জগৎ ও মানববিজ্ঞানকে সমৃদ্ধ ও সংরক্ষণ করা যায়।

মুস্তাফা মনোয়ারকে অসংকোচে বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব বলা যায়। তার এই যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৯৫৪ সালে, যখন বাংলাদেশে (তৎকালীন পাকিস্তান আমলে) পাইলট প্রজেক্ট হিসেবে টেলিভিশনের যাত্রা শুরু হয়। কলিম শরাফী, জামান আলী খান ও জামিল চৌধুরীর মতো পরিচালকদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে তিনি টেলিভিশনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন।

মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই তিনি টেলিভিশনের খুঁটিনাটি এমনভাবে আয়ত্ত করেছিলেন যে, তা দেখে খোদ টেলিভিশনের সংশ্লিষ্টরাও অবাক হয়েছিলেন। তার মধ্যে যেন এক ধরনের ‘ম্যাজিক’ ছিল। তিনি নাটক, সমসাময়িক অনুষ্ঠান ও বিশেষ করে ছোটদের ছবি আঁকার অনুষ্ঠান পরিচালনা করতেন। এই ছবি আঁকার ক্লাসেই তিনি আমাকে যুক্ত করেছিলেন, কারণ আমার সঙ্গে তার আগে থেকেই ঘনিষ্ঠতা ছিল।

টেলিভিশনের শুরুর দিকে তিনি নাট্য পরিচালনায় যে মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন, তা অতুলনীয়। অনেক পরিচালক যেখানে কাজ করতে গিয়ে হিমশিম খেতেন, সেখানে মুস্তাফা মনোয়ার অনায়াসেই অনুষ্ঠান পরিচালনা করে দর্শকদের মন জয় করে নিয়েছিলেন। নাটকের কলাকুশলীরা তাকে এতটাই আপন করে নিয়েছিলেন যে, অনেকেই তাকে ভালোবেসে ‘মন্টু মামা’ বলে ডাকতেন। তৎকালীন পাকিস্তান আমলে নাসিমার সহায়তায় তার পরিচালিত নাটকগুলো ছিল অত্যন্ত জনপ্রিয়। বলা যায়, মুস্তাফা মনোয়ার ছাড়া টেলিভিশনের সব বড় অনুষ্ঠান সগৌরবে সম্পন্ন হওয়া কঠিন ছিল।
টেলিভিশনের চাকরির পাশাপাশি তিনি শিল্পকলা একাডেমির পরিচালক এবং জাতীয় চারুশিল্পের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এ ছাড়া বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চেয়ারম্যানের পদেও তার বলিষ্ঠ অংশগ্রহণ ছিল। তিনি যেখানেই কাজ করেছেন, সেখানে একটি ইতিবাচক ও গভীর ছাপ রেখে গেছেন।

আমাদের ঐতিহ্যবাহী গ্রাম্য পুতুল নাচকে আধুনিক ও শিল্পসম্মত রূপে উপস্থাপনে তার অবদান অসাধারণ। তিনি নিজেই পুতুল তৈরি করতেন এবং নাটক রচনা করতেন। এই পুতুল নাচ নিয়ে তিনি বিশ্বের অনেক দেশে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। এ ছাড়া বাংলাদেশের ব্যাংক নোটের নকশা ও শিল্প-চিন্তার বিকাশেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। মুস্তাফা মনোয়ার ছিলেন শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীনের যোগ্য সহযোগী।

শিল্পাচার্য যেমনটি চেয়েছিলেন, অর্থাৎ এমন একটি শিল্পকলার জগত তৈরি করা যেখানে মানুষ শুধু শিল্পী হবে না, বরং সংস্কৃতির ধারক হবে। মুস্তাফা মনোয়ার সেই লক্ষ্যকে সামনে রেখেই কাজ করে গেছেন। এ দেশের শিল্প আন্দোলন ও সাংস্কৃতিক জগতকে সংকীর্ণতা থেকে মুক্ত করতে তিনি এক অনন্য যন্ত্র হিসেবে কাজ করেছেন। শিল্পের জগতে তার অবদান এবং এই সংগ্রাম ছিল নিরবচ্ছিন্ন।

লেখক: চিত্রশিল্পী, ইমেরিটাস অধ্যাপক, চারুকলা অনুষদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় 

শিক্ষা খাতে বাজেট: বিনিয়োগ নাকি দুর্নীতির নতুন সুযোগ?

প্রকাশ: ২৯ জুন ২০২৬, ০৫:০২ পিএম
শিক্ষা খাতে বাজেট: বিনিয়োগ নাকি দুর্নীতির নতুন সুযোগ?
ড. সুলতান মাহমুদ রানা

শিক্ষা খাতে সর্বোচ্চ বাজেট নিঃসন্দেহে একটি সাহসী এবং ইতিবাচক সিদ্ধান্ত। কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, বাজেটের অঙ্ক উন্নয়ন নিশ্চিত করে না; উন্নয়ন নিশ্চিত করে এর সঠিক ব্যবহার। আজকের বাংলাদেশে প্রশ্নটি তাই বাজেটের আকার নিয়ে নয়। প্রশ্নটি হলো, আমরা কি শিক্ষাকে সত্যিই জাতীয় উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করতে প্রস্তুত?...

বাংলাদেশের নতুন বাজেট নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার ভিড়ে শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন খাতে ইতিহাসের সর্বোচ্চ বরাদ্দের বিষয়টি বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে। অর্থমন্ত্রী শিক্ষা খাতে যে বরাদ্দের প্রস্তাব দিয়েছেন, তা নিঃসন্দেহে দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী হওয়ার সুযোগ তৈরি করে। কারণ শিক্ষা এমন একটি খাত, যেখানে ব্যয় আসলে ব্যয় নয়; এটি এক ধরনের বিনিয়োগ। সড়ক, সেতু কিংবা ভবন নির্মাণ একটি দেশের অবকাঠামো গড়ে তোলে। কিন্তু শিক্ষা গড়ে তোলে মানুষের সক্ষমতা। আর মানুষের সক্ষমতার ওপরই নির্ভর করে একটি রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন।

কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতায় সবচেয়ে বড় একটি প্রশ্ন সামনে এসে যায়। সেটি হলো শিক্ষা খাতে সর্বোচ্চ বাজেট কি সত্যিই শিক্ষার সর্বোচ্চ উন্নয়ন নিশ্চিত করবে? নাকি অতীতের মতো এবারও বিপুল অর্থের একটি বড় অংশ দুর্বল প্রশাসন, অদক্ষতা, অনিয়ম এবং দুর্নীতির জালে আটকে যাবে?

এ কথা সত্য যে দীর্ঘদিন পর শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধির মাধ্যমে সরকার একটি ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে। কারিগরি শিক্ষা সম্প্রসারণ, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার উন্নয়ন, নতুন শিক্ষা অবকাঠামো নির্মাণ, ডিজিটাল ল্যাব স্থাপন এবং দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে প্রায় সব বিশ্লেষণেই একটি সতর্কবার্তা রয়েছে। বরাবরই আমরা লক্ষ করেছি যে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার সবচেয়ে বড় সংকট অর্থ নয়; বরং যথাযথ ব্যবস্থাপনা কিংবা সুশাসনের অভাব।

বাংলাদেশে শিক্ষা নিয়ে আমরা দীর্ঘদিন ধরে একটি অদ্ভুত দ্বৈত বাস্তবতা দেখে আসছি। একদিকে শিক্ষার হার বেড়েছে, বিদ্যালয়ের সংখ্যা বেড়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বেড়েছে, বাজেটও বেড়েছে। অন্যদিকে শিক্ষার গুণগত মান, গবেষণা, উদ্ভাবন, দক্ষতা উন্নয়ন এবং কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি হয়নি। হাজার হাজার শিক্ষার্থী প্রতি বছর ডিগ্রি অর্জন করছে। কিন্তু চাকরির বাজার বলছে, যোগ্য লোক পাওয়া যাচ্ছে না। অর্থাৎ শিক্ষিত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, কিন্তু দক্ষ মানুষের সংখ্যা সেই অনুপাতে বাড়ছে না। এই বৈপরীত্যের পেছনে অন্যতম কারণ শিক্ষা প্রশাসনের দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতা।

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার দিকে তাকালে দেখা যায়, প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত প্রায় প্রতিটি স্তরে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত কেন্দ্রীভূত। বিদ্যালয়ের শিক্ষক, প্রধান শিক্ষক, উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা, জেলা শিক্ষা প্রশাসন, অধিদপ্তর–সবকিছু এমন একটি আমলাতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যে পরিচালিত হয়, যেখানে অনেক সময় শিক্ষার চেয়ে প্রশাসন বড় হয়ে ওঠে। শিক্ষকরা শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের চেয়ে নানা ধরনের রিপোর্ট, ফরম, ডাটা অ্যান্ট্রি এবং প্রশাসনিক কাজ নিয়ে বেশি ব্যস্ত থাকেন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন অনেক ক্ষেত্রে নির্ভর করে প্রশাসনিক অনুমোদনের ওপর, যা অকারণ বিলম্ব এবং অনিয়মের সুযোগ সৃষ্টি করে।

দুর্নীতির বিষয়টি আরও উদ্বেগজনক। শিক্ষক নিয়োগ, বদলি, পদোন্নতি, বিদ্যালয় নির্মাণ, শিক্ষা উপকরণ ক্রয়, প্রশিক্ষণ কর্মসূচি, প্রকল্প বাস্তবায়ন–বিভিন্ন পর্যায়ে অনিয়মের অভিযোগ নতুন নয়। বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা গেছে, শিক্ষা খাতে বরাদ্দকৃত অর্থের একটি অংশ প্রকৃত উন্নয়নের পরিবর্তে অপচয় কিংবা অনিয়মের কারণে কাঙ্ক্ষিত ফল দিতে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে জনগণের একটি বড় অংশের মধ্যে ধারণা তৈরি হয়েছে যে শিক্ষা খাতে শুধু অর্থ বাড়ালেই সমস্যার সমাধান হবে না।

আসলে বাংলাদেশ এখন এমন এক অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে শিক্ষা খাতে অর্থের পাশাপাশি সুশাসনকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যবস্থার হাতে যত বেশি অর্থ দেওয়া হবে, অপচয়ের ঝুঁকিও তত বেশি বাড়বে।

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার বড় সমস্যা হলো, এটি এখনো মূলত সনদ উৎপাদনমুখী। একজন শিক্ষার্থী প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত দীর্ঘ পথ পাড়ি দেয়, কিন্তু পুরো ব্যবস্থাটি তাকে চাকরির বাজারের জন্য কতটা প্রস্তুত করছে, সেই প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর নেই।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে হাজার হাজার শিক্ষার্থী ব্যবসায় শিক্ষা, সমাজবিজ্ঞান কিংবা মানবিক বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করছে। কিন্তু প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডেটা অ্যানালিটিক্স, সাইবার নিরাপত্তা, আধুনিক কৃষি, স্বাস্থ্য প্রযুক্তি কিংবা শিল্প ব্যবস্থাপনার মতো খাতে দক্ষ জনবলের ঘাটতি রয়ে যাচ্ছে। ফলে একদিকে বেকারত্ব বাড়ছে, অন্যদিকে শিল্প খাত দক্ষ কর্মীর অভাবে বিদেশি কর্মী নিয়োগ করছে।

এ বাস্তবতায় শিক্ষা বাজেটের একটি বড় অংশ কর্মসংস্থানমুখী দক্ষতা উন্নয়নে বিনিয়োগ করা উচিত। প্রাথমিক শিক্ষায় মৌলিক সাক্ষরতা, গণিত এবং বিশ্লেষণী দক্ষতার ওপর জোর দিতে হবে। মাধ্যমিক পর্যায়ে ডিজিটাল দক্ষতা, যোগাযোগ দক্ষতা, ভাষা শিক্ষা এবং উদ্যোক্তা শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন। উচ্চশিক্ষায় গবেষণা, উদ্ভাবন এবং শিল্প-সংযুক্ত শিক্ষার ওপর জোর বাড়াতে হবে।

বাংলাদেশে এখনো কারিগরি শিক্ষাকে অনেক পরিবার দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষা মনে করে। এ মানসিকতা পরিবর্তন করা প্রয়োজন। একজন দক্ষ টেকনিশিয়ান, প্রোগ্রামার, ইলেকট্রিশিয়ান, মেকানিক বা কৃষি উদ্যোক্তার সামাজিক মর্যাদা বাড়ানো না গেলে কর্মসংস্থানমুখী শিক্ষা বাস্তবায়ন কঠিন হবে।

এবারের বাজেটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মানবসম্পদ উন্নয়নকে আলাদা গুরুত্ব দেওয়া। এটি ইতিবাচক। কারণ চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে প্রতিযোগিতা আর শুধু অবকাঠামো দিয়ে হবে না; হবে দক্ষতা দিয়ে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অটোমেশন এবং প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির যুগে যে দেশ দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করতে পারবে, সেই দেশই এগিয়ে যাবে।

আবারও একই প্রশ্ন সামনে আসে–এ অর্থ ব্যয়ের জবাবদিহি কে নিশ্চিত করবে? বাংলাদেশে শিক্ষা খাতের প্রকৃত সংস্কার শুরু হওয়া উচিত শিক্ষা প্রশাসন থেকে। উপজেলা থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে কর্মসম্পাদন মূল্যায়ন চালু করতে হবে। বিদ্যালয়ভিত্তিক আর্থিক নিরীক্ষা বাধ্যতামূলক করতে হবে। শিক্ষক নিয়োগ সম্পূর্ণ ডিজিটাল ও স্বচ্ছ করতে হবে। শিক্ষাপ্রকল্পগুলোর তথ্য জনগণের জন্য উন্মুক্ত করতে হবে। কোন বিদ্যালয় কত টাকা পেল, কীভাবে ব্যয় করল এবং কী ফল অর্জিত হলো–সেসব তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ করা উচিত।

শিক্ষা খাতে সর্বোচ্চ বাজেট নিঃসন্দেহে একটি সাহসী এবং ইতিবাচক সিদ্ধান্ত। কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, বাজেটের অঙ্ক উন্নয়ন নিশ্চিত করে না; উন্নয়ন নিশ্চিত করে এর সঠিক ব্যবহার। আজকের বাংলাদেশে প্রশ্নটি তাই বাজেটের আকার নিয়ে নয়। প্রশ্নটি হলো, আমরা কি শিক্ষাকে সত্যিই জাতীয় উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করতে প্রস্তুত? আমরা কি শিক্ষাপ্রশাসনের দুর্নীতি ও অদক্ষতার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে প্রস্তুত? আমরা কি ডিগ্রি-নির্ভর শিক্ষা থেকে দক্ষতানির্ভর শিক্ষায় যেতে প্রস্তুত?

যদি উত্তর ‘হ্যাঁ’ হয়, তাহলে এবারের শিক্ষা বাজেট ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আশার আলো হয়ে উঠতে পারে। আর যদি উত্তর ‘না’ হয়, তাহলে ইতিহাসের সর্বোচ্চ শিক্ষা বাজেটও হয়তো কেবল আরেকটি বাজেট হিসেবেই স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

লেখক: অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]

বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন: মহাবিপর্যয়ের হাতছানি

প্রকাশ: ২৯ জুন ২০২৬, ০৪:৪৬ পিএম
আপডেট: ২৯ জুন ২০২৬, ০৪:৪৭ পিএম
বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন: মহাবিপর্যয়ের হাতছানি
ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ

জলবায়ু পরিবর্তন মানব উন্নয়ন ও নিরাপত্তার জন্যও একটি বড় হুমকি। রোগব্যাধির বিস্তার, মানসিক চাপ এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি ব‍্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে।। বিশেষত শিশু, নারী, প্রবীণ ব্যক্তি এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠী এসব ঝুঁকির অধিক শিকার। বস্তুত বিশ্বব‍্যাপী উন্নয়নের সুযোগের ওপর বিরূপ প্রভাব এবং সামাজিক-মানবিক সংকট দ্রুত তীব্রতর হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত নানা বিধ্বংসী অভিঘাতের কারণে। এই ধারা চলতে থাকলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মগুলোর উত্তরাধিকারই হবে জীবন ধারণের এমন বাস্তবতা ও পারিপার্শ্বিকতা, যা অসহনীয় প্রাকৃতিক ঘনঘটায় আবৃত।...

সম্ভাব্য প্রাকৃতিক মহাবিপর্যয় কত দূরে? বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই-অক্সাইডের ঘনত্ব ২০২৫ সালে ৪২৭ দশমিক ৩৫ পিপিএমে (parts per million) উন্নীত হয়েছে। ৪০০ পিপিএম অতিক্রম করাকেই বিজ্ঞানীরা অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে বিবেচনা করেছিলেন, আর সেই সীমা অতিক্রান্ত হয়েছে ২০১৫ সালেই। উল্লেখ্য, কার্বন ডাই-অক্সাইড ছাড়াও অন্যান্য গ্রিনহাউস গ্যাস রয়েছে। বায়ুমণ্ডলে পুঞ্জীভূত সব গ্রিনহাউস গ্যাসের মধ‍্যে কার্বন ডাই-অক্সাইডের অংশ প্রায় ৮০ শতাংশ। কাজেই বাস্তব পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। পৃথিবী ক্রমাগত উষ্ণ থেকে উষ্ণতর হয়ে উঠছে। যতদিন থেকে তথ‍্য সংরক্ষিত আছে তার মধ‍্যে ২০২৪ সাল সবচেয়ে উষ্ণ বছর ছিল। এ বছর বৈশ্বিক উষ্ণতা নতুন চূড়ায় যেতে পারে। বর্তমান সময়ে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে, বিশেষ করে ইউরোপ এবং দক্ষিণ ও মধ‍্য এশিয়ার বিভিন্ন দেশে অসহনীয় তাপপ্রবাহ চলমান রয়েছে। এমন বাস্তবতায় মানবসভ্যতা এবং পৃথিবীর জীববৈচিত্র্য ইতোমধ্যেই অস্তিত্বগত সংকটের মুখোমুখি।

তদুপরি, গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ বেড়েই চলেছে এবং সেই সঙ্গে বাড়ছে বৈশ্বিক উষ্ণতা। অর্থাৎ জলবায়ু পরিবর্তন দ্রুত অবনতির পথে এগিয়ে যাচ্ছে। এর অভিঘাত এখন পৃথিবীর সর্বত্র ক্রমবর্ধমান। বৃষ্টিপাতের অস্বাভাবিকতা, বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, খরা, দাবানল, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, জীববৈচিত্র্যের ক্ষয়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন এবং অভ্যন্তরীণ জনস্থানান্তর বিশ্বজুড়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে। জাতিসংঘের তথ‍্যানুযায়ী, ২০২৪ সালে বিশ্বে ১৫০টিরও বেশি নজিরবিহীন জলবায়ু-সম্পর্কিত দুর্যোগ সংঘটিত হয়েছে। এসব মারাত্মক প্রাকৃতিক দুর্যোগ নির্দেশ করে যে, বৈশ্বিক জলবায়ু সংকট অবনতির দ্রুত গতিধারায়।

ফলে আজ বিশ্বের প্রায় সব মানুষই কোনো না কোনোভাবে ঝুঁকির মধ‍্যে রয়েছে যদিও দরিদ্র, প্রান্তিক এবং অতিশয় জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলগুলোর মানুষ গুরুতর ক্ষয়ক্ষতিতে নিপতিত। প্রকৃতপক্ষে, বিশ্বের অসংখ‍্য মানুষের জীবন, স্বাস্থ‍্য, খাদ‍্যনিরাপত্তা, মানসম্পন্ন পানির প্রাপ‍্যতা, বাসস্থান এবং জীবিকার ওপর গুরুতর বিরূপ প্রভাব পড়ছে।

জলবায়ু পরিবর্তন মানব উন্নয়ন ও নিরাপত্তার জন্যও একটি বড় হুমকি। রোগব্যাধির বিস্তার, মানসিক চাপ এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি ব‍্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে।। বিশেষত শিশু, নারী, প্রবীণ ব্যক্তি এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠী এসব ঝুঁকির অধিক শিকার। বস্তুত বিশ্বব‍্যাপী উন্নয়নের সুযোগের ওপর বিরূপ প্রভাব এবং সামাজিক-মানবিক সংকট দ্রুত তীব্রতর হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত নানা বিধ্বংসী অভিঘাতের কারণে। এই ধারা চলতে থাকলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মগুলোর উত্তরাধিকারই হবে জীবন ধারণের এমন বাস্তবতা ও পারিপার্শ্বিকতা, যা অসহনীয় প্রাকৃতিক ঘনঘটায় আবৃত। দেশ-দেশান্তর বিবেচনায় নিলে দেখা যাবে বাংলাদেশের মতো জলবায়ু-ভঙ্গুর দেশগুলো বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তনের নানা অভিঘাতে পৃথিবীর অন‍্যান‍্য অঞ্চলের তুলনায় অধিক আক্রান্ত এবং ফলে ব্যাপকতর ক্ষয়ক্ষতির শিকার।

বাংলাদেশের দিকে একটু নজর দেওয়া যাক। বাংলাদেশ নানা কারণে একটি উচ্চ জলবায়ু ঝুঁকির দেশ। এগুলোর মধ‍্যে রয়েছে দেশের ভৌগোলিক অবস্থান, সমুদ্রপীঠ থেকে স্বল্প উচ্চতা, অসংখ‍্য নদ-নদী, দীর্ঘ উপকূলীয় অঞ্চল এবং উচ্চ জনঘনত্ব। ফলে এ দেশে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত বিশেষভাবে প্রকট। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় ঘন ঘন ও তীব্র বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন, খরা এবং তাপপ্রবাহের ঘটনা বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সঙ্গে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে জলোচ্ছ্বাসের সংখ‍্যা এবং সেই সঙ্গে লবণাক্ততার অনুপ্রবেশ বেড়ে যাওয়ার ফলে উপকূলীয় অঞ্চলে কৃষি, মৎস্যসম্পদ, সুপেয় পানির প্রাপ্তি এবং মানুষের জীবনযাত্রা ক্রমবর্ধমানভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। জীববৈচিত্র্য, বনভূমি এবং জলাভূমির ওপরও এর ব‍্যাপক নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে, বিশেষ করে সুন্দরবন নানা ধরনের ঝুঁকির সম্মুখীন। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান এবং মানবিক নিরাপত্তার ওপরও চাপ বাড়ছে।

অন‍্যান‍্য জলবায়ু-ভঙ্গুর দেশও অব‍্যাহত জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে একইভাবে নানা ঝুঁকি এবং সংকটে পড়ছে। মালদ্বীপ, টোভালো, কিরিবাতি এবং অন‍্যান‍্য কিছু দ্বীপরাষ্ট্র সমুদ্রপীঠ উঁচু হতে থাকার পরিপ্রেক্ষিতে তলিয়ে যেতে পারে। বর্তমান উন্নত বিশ্ব কিছু দেরিতে হলেও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত নানা সংকটের শিকারে পরিণত হবে।

একদিকে বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের ধারা ত্বরান্বিত হচ্ছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র শুধু প্যারিস চুক্তি থেকে বেরিয়ে যায়নি, দেশটির সরকার ও সরকারের অনুসারীরা সাধারণত এখনো জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তবতাকেই অস্বীকার করছে এবং জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহারকে উৎসাহিত করছে। ২০২৫ সালের ৩০তম কপ সম্মেলনও পৃথিবীকে ভবিষ্যতে বাসযোগ্য রাখার লক্ষ্যে গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ দ্রুত ও ব্যাপকভাবে কমিয়ে আনার বিষয়ে আশাব্যঞ্জক কোনো অঙ্গীকার তুলে ধরতে পারেনি।

অবশ্যই অভিযোজন, ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ ও নিরসন, জলবায়ু অর্থায়ন, সক্ষমতা বৃদ্ধি, এবং প্রযুক্তি হস্তান্তর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এসব ব্যবস্থার প্রয়োজন সৃষ্টি হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে, আর জলবায়ু পরিবর্তনের মূল কারণ পৃথিবীর ধারাবাহিক উষ্ণায়ন যার মূল উৎস ক্রমবর্ধমান গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ। কাজেই সর্বাগ্রে বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ দ্রুত কমিয়ে আনার ওপর বিশেষ জোর দিতে হবে। একই সঙ্গে অন্যান্য বিষয়েও যথাযথ গুরুত্ব দিতে হবে। কিন্তু বিজ্ঞান বলছে, মূল সমস্যার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নিয়ে, অর্থাৎ প্রয়োজন অনুযায়ী দ্রুত বৈশ্বিক নিঃসরণ কমানো না গেলে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে। যেখানে অভিযোজনসহ অন্যান্য উদ্যোগে সব দেশ যৌথভাবে এগিয়ে এলেও সেগুলো কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়বে। তখন কাঙ্ক্ষিত সফলতা সুদূরপরাহত হয়ে যেতে পারে।

বলাবাহুল্য, বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশ বিশেষভাবে সংকটাপন্ন হয়ে পড়বে। বাংলাদেশ শুধুই ভুক্তভোগী, জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের কোনো ভূমিকা নেই। কেননা বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ‍্যাস নিঃসরণে বাংলাদেশের অংশ মাত্র শূন্য দশমিক ৪০ শতাংশ। গ্রিনহাউস গ‍্যাস নিঃসরণ কমানোর ক্ষেত্রেও স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে বাংলাদেশের তেমন দায় নেই এবং সার্বিক পরিপ্রেক্ষিতে তেমন কিছু করারও নেই। অবশ‍্য বাংলাদেশ প‍্যারিস চুক্তির আওতায় জাতীয়ভাবে নির্ধারিত অবদানভিত্তিক যথাসম্ভব কম কার্বন নিঃসরণকারী উন্নয়ন প্রক্রিয়া অনুসরণে অঙ্গীকারবদ্ধ। প্রকৃতপক্ষে আমাদের মূল কাজ হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলার লক্ষ্যে দেশ থেকে বরাদ্দ ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডল থেকে সংগৃহীত অর্থের পরিমাণ এবং এক্ষেত্রে সক্ষমতা যতদূর সম্ভব বৃদ্ধি করার প্রচেষ্টা অব‍্যাহত রাখা এবং সব সময় প্রাপ্ত অর্থ ও সক্ষমতার পরিকল্পিত সদ্ব্যবহার করা। পাশাপাশি একই চিন্তাধারার দেশগুলোর সঙ্গে মিলিত হয়ে বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে এমন চাপ সৃষ্টি করার চেষ্টা আমাদের করতে হবে, যাতে বিজ্ঞানের তাগিদ-নির্ধারিত মাত্রায় এবং সময়ে বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ হ্রাসের কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়।

উল্লেখ্য‍, জাতিসংঘের আন্তঃরাষ্ট্রীয় জলবায়ু পরিবর্তন প‍্যানেলের ষষ্ঠ মূল্যায়ন অনুসারে, পৃথিবীকে আগামীতে বাসযোগ‍্য রাখতে হলে বাৎসরিক বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ‍্যাস নিঃসরণ-২০১৯-এর তুলনায় ৪৩ শতাংশ হ্রাস করতে হবে ২০৩০ সাল নাগাদ, ৬০ শতাংশ কমাতে হবে ২০৩৫ সাল নাগাদ এবং ৮৪ শতাংশ কমাতে হবে ২০৫০ সাল নাগাদ। কিন্তু কমানো তো হচ্ছেই না বরং বৈশ্বিক নিঃসরণ বেড়েই চলেছে।

লেখক: অর্থনীতিবিদ এবং পরিবেশ ও 
জলবায়ু পরিবর্তন বিশেষজ্ঞ

করিডর : বিশিষ্টজনের অভিমত

প্রকাশ: ২৯ জুন ২০২৬, ১১:৩০ এএম
আপডেট: ২৯ জুন ২০২৬, ১১:৩৪ এএম
করিডর : বিশিষ্টজনের অভিমত
খবরের কাগজ ইনফোগ্রাফ

বাংলাদেশ থেকে মায়ানমার হয়ে চীন পর্যন্ত একটি অর্থনৈতিক করিডর করার প্রস্তাব দিয়েছে বেইজিং। গত শুক্রবার বেইজিংয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের মধ্যে অনুষ্ঠিত দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে এ প্রস্তাব দেওয়া হয়। চীনের এই প্রস্তাবকে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখছে বিএনপি সরকার। প্রস্তাবটি বাস্তবায়িত হলে সে দেশের কুনমিংয়ের সঙ্গে বাংলাদেশের সরাসরি বাণিজ্যিক রুট তৈরি হবে। এই করিডরের প্রধান রুটটি হবে মায়ানমারের রাখাইনের ওপর দিয়ে। এ ছাড়া বাংলাদেশের চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরের মাধ্যমে জলপথেও এই করিডর কার্যকর হবে। 

এদিকে চীনের সঙ্গে ত্রিদেশীয় এই করিডর নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার ডালপালা মেলতে শুরু করেছে বিভিন্ন মহলে। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিভিন্ন সংগঠন বিষয়টি নিয়ে এখনো পর্যালোচনা করছে।

এটা আসলে কানেকটিভিটি: মুন্সি ফয়েজ আহমেদ, সাবেক রাষ্ট্রদূত

চীন-মায়ানমার-বাংলাদেশ ইকোনমিক করিডর বলা হলেও এটা আসলে একধরনের কানেকটিভিটি। চীনের এই প্রস্তাবিত করিডরের মূল রুট যাবে মায়ানমারের রাখাইনের ভেতর দিয়ে। কিন্তু রাখাইনসহ সে দেশের বিভিন্ন স্থানে এখন গৃহযুদ্ধ চলছে। এ কারণে নিরাপত্তার বিষয়টি এখন ঝুঁকিপূর্ণ ঠিকই, কিন্তু চীন চাইলে নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করতে পারে। তবে অর্থনৈতিক কানেকটিভিটিকে কাজে লাগানোর উপায় নিয়ে আগে থেকেই ভাবতে হবে। এর সঙ্গে মায়ানমারের রাখাইনের অর্থনৈতিক উন্নয়নও জড়িত। এটি হলে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সহজ হতে পারে। কারণ রাখাইন শান্ত হলে এবং সেখানে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড শুরু হলে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের পরিবেশ সৃষ্টি হবে, যা বাস্তবায়ন সহজ হবে। চীনের এই করিডরের বিষয়টিকে নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখার সুযোগ কম। 

এটিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া উচিত: অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক

যেহেতু চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের কাছ থেকে এই ত্রিদেশীয় করিডরের প্রস্তাব এসেছে, তাই এটিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া উচিত। এটিকে আমি ইতিবাচক প্রস্তাব বলে মনে করি। এটি আমাদের জন্য একটি বড় সুযোগ, একে অবহেলা করা ঠিক হবে না। চীনের এই প্রস্তাবটি নিয়ে আমাদের শিগগিরই গবেষণা শুরু করা উচিত, এ কারণেই যে এর মাধ্যমে আমাদের ব্যবসায়ীদের, ফার্মাসিউটিক্যাল খাতে, শিক্ষা, কৃষি, চিকিৎসাসহ অন্যান্য কোন কোন খাতে উপকার হবে। সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের অধীনে ৬ থেকে ৯ মাসের মধ্যে অথবা যত দ্রুত সম্ভব বাংলাদেশের পক্ষ থেকে একটি সদিচ্ছার বার্তা দিতে হবে চীনকে। মায়ানমারের ভেতর দিয়ে চীনের সঙ্গে করিডর হলে শুধু চীনের পণ্য আমদানি নয়, বাংলাদেশের পণ্যও কীভাবে চীন ও মায়ানমারে রপ্তানি করা সম্ভব, সেটি খতিয়ে দেখতে হবে, না হলে এটি টেকসই হবে না। এই করিডরের মাধ্যমে রাখাইনের অর্থনীতিও চাঙা হবে, এতে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনেরও সুযোগ সৃষ্টি হবে। এই করিডরের সঙ্গে ভূ-রাজনীতিরও একটি যোগসূত্র আছে। কাজেই প্রস্তাবটি যেহেতু দুই দেশের শীর্ষ পর্যায়ের মাধ্যমে এসেছে, তাই এটিকে হালকাভাবে নেওয়া বা দেরি করা ঠিক হবে না। 

নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে করিডর করা সম্ভব হবে না: ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) স ম মাহবুব-উল-আলম, নিরাপত্তা বিশ্লেষক

যেকোনো কানেকটিভিটির অন্যতম শর্তই হচ্ছে নিরাপত্তা। নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে করিডর করা সম্ভব হবে না। আর যদি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায় তবে করিডর করা সম্ভব হবে। তবে নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে বলেই চীন হয়তো করিডরের প্রস্তাব দিয়েছে। চীনের পক্ষে রাখাইনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব। এই করিডর হলে নিরাপত্তা থাকবে, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়বে, কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। এতে সবার জন্যই ভালো হবে। যদিও এই করিডর নিয়ে অনেক আগে থেকেই আলোচনা চলছে। এর আগে কুনমিং থেকে রেললাইন করার বিষয়টি আলোচনায় ছিল। কিন্তু মায়ানমারে অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে তা আর এগোয়নি। সব পক্ষ চেষ্টা করলে মায়ানমারের পরিস্থিতি স্থিতিশীল করা সম্ভব।