ড. মাহবুবুল হক বাংলাদেশের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও সাহিত্য অঙ্গনে এক অনন্য নাম। তার পরিচিতি বিভিন্ন পরিসরে পরিব্যাপ্ত। লেখালেখি, সম্পদনা, শিক্ষকতা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে তার কৃতিত্ব ও প্রয়াস তাকে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব রূপে প্রতিষ্ঠিত করেছে। বাংলা বানানের বিশেষজ্ঞ, মননশীল প্রাবন্ধিক ও পরিশ্রমী গবেষক হিসেবে তিনি দেশ-বিদেশে সুধীজনের কাছে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়েছেন।
কুমিল্লা সিসিএন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. মাহবুবুল হক একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে ছিলেন নেতৃস্থানীয় সংগঠক।
বহুমাত্রিক মাহবুবুল হক একুশে পদক, বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, নজরুল পদক, ফিলিপস পুরস্কার, মুক্তিযুদ্ধ পদক, মধুসূদন পদক, চট্টগ্রাম একাডেমি পুরস্কার, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন সাহিত্য পুরস্কার, রশীদ আল ফারুকী সাহিত্য পুরস্কারসহ অসংখ্য পুরস্কার, পদক ও সম্মাননা অর্জন করেছেন।
ড. মাহবুবুল হক চট্টগ্রামে অবস্থান করেও জাতীয় মানের কাজই উপহার দিয়েছেন। পরিণত হয়েছেন জাতীয় ব্যক্তিত্বে। সামগ্রিকভাবে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের গবেষণায় তার অবদান উল্লেখ করার মতো। চট্টগ্রামের ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির গবেষণায় তার কৃতিত্ব অসামান্য ও অতুলনীয়। চট্টগ্রামবাসী এজন্য তার কাছে ঋণী।
বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের অধ্যাপক, গবেষক, চিন্তাশীল লেখক এবং সুবক্তা বিশেষ করে শিক্ষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী একজন তাত্ত্বিক গবেষকের নাম অধ্যাপক ড. মাহবুবুল হক। ৩ নবেম্বর ১৯৪৮ সালে ফরিদপুরের মধুখালী গ্রামে মাহবুবুল হকের জন্ম। তার বাবার নাম আবদুল মালেক মোল্লা, মায়ের নাম মোসাম্মৎ হাজেরা খাতুন।
চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠ চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুল থেকে ১৯৬৪ সালে কৃতিত্বের সঙ্গে মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এ স্কুলে আমারও পড়ার সুযোগ হয়েছে। ১৯৬৬ সালে চট্টগ্রাম কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক এবং একই কলেজ থেকে ১৯৬৯ সালে বাংলায় বিএ এবং ১৯৭০ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় এমএ পাস করেন।
ড. মনিরুজ্জামানের তত্ত্বাবধানে তিনজন আধুনিক কবি ‘সমর সেন, সুভাষ মুখোপাধ্যায় ও সুকান্ত ভট্টাচার্যের বিষয়ে গবেষণা করে ১৯৯৭ সালে তিনি পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। ড. মাহবুবুল হকের বিষয়ে তার পিএইচডির তত্ত্বাবধায়ক ড. মনিরুজ্জামান বলেন, ‘সাহিত্য কে না ভালোবাসে? কিন্তু সাহিত্যের পেছনে চাই যত্ন। সবাই যত্নশীল নন। যত্নবান হতে হলে লাগে ধৈর্য্য, শ্রমপ্রিয়তা এবং বৈজ্ঞানিক শৃঙ্খলা। ড. মাহবুবুল হকের দৃষ্টি সাহিত্যের এই হয়ে ওঠার নিয়মনীতি এবং প্রয়োজনীয় কর্মোপাদানের প্রতি। মাহবুবু সাহিত্যিক নন, সাহিত্যকর্মী। প্রমথনাথ বিশীর ভাষা বলতে গেলে, তার কর্মের মরু-জিহ্বা। তার অবসরকে এমন করে শুষে নিয়েছে যে সেখানে সাহিত্যের মরূদ্যান দেখা দিতে পারে কি!
সমাজে কর্মিষ্ঠ মানুষের সংখ্যা খুব যে বেশি থাকে বা দেখা যায়, তা নয়। তবু জীবন শতভাগ পূর্ণ হয়েছে এমন দাবি তাদের মধ্যে সফলতম মানুষটিরও নেই। এ যেন হর-গৌরী অবস্থা, অর্ধেক বা একাংশ গৌরী-সৌভাগ্য ধন্য ও ধনময়, বাকি অঙ্গ রুক্ষ।’ ...‘এমফিলে আমি তার পরীক্ষক ছিলাম। আনিস স্যার তাকে সরাসরি পিএইচডিতে না নিয়ে আমার সঙ্গে পিএইসডি করার নির্দেশ দেন। মাহবুবের গবেষণার বিষয় ছিল: ‘তিনজন আধুনিক কবি: সমর সেন, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, সুকান্ত ভট্টচার্য। মাহবুব কাজটি শেষ করতে বহু সময় ব্যয় করে। দীর্ঘদিন বাংলা একাডেমিতে প্রকাশের অপেক্ষায় পড়ে থাকে। ২০০৫-এ কলকাতা থেকে প্রকাশিত হয়। মাহবুবের থিসিসের আভ্যন্তরিক পরীক্ষক অধ্যাপক আনিসুজ্জামান এবং বহিঃপরীক্ষক শিলিগুড়ি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক-সমালোচক অশ্রুকুমার শিকদার মাহবুবের গবেষণার যে মূল্যায়ন করেছিলেন মাহবুবের জন্য তা শ্লাঘার বিষয়। উভয়েই স্বীকার করেছেন দুই বাংলাতেই এই তিনজন আধুনিক কবি সস্পর্কে এত গভীর ও তথ্যসমৃদ্ধ আলোচনা বিরল। বস্তুত, মাহবুব এই কবিত্রয়কে নতুনভাবে এবং তথ্য ও বিশেষণসহকারে নবমূল্যায়নের সূত্রে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করেছেন বলা যায়। (৭৫ বছর পূর্তিতে মাহবুবুল হক সংবর্ধনাগ্রন্থ)
স্কুলজীবন থেকেই তার লেখালেখি শুরু। অষ্টম শ্রেণিতে ‘নবদিগন্ত’ নবম ও দশম শ্রেণিতে চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুলবার্ষিকী সম্পাদনার মাধ্যমে সম্পাদনায় হাতেখড়ি। ১৯৬৪-এর দ্বিমাসিক সাহিত্যপত্র ‘কলরোল’ সম্পাদনা করেন। এই পত্রিকাতেই একুশের প্রথম আলেখ্য-উপন্যাসিকাতা–সেন রচিত ‘লাল রং পলাশ’ প্রকাশিত হয়। ১৯৬৭-তে ‘মিছিল’, ‘অন্বেষা’, ‘পদাতিক’, ‘রবিকরে কবিকণ্ঠ’; ১৯৭৯-তে ‘সাহসী ঠিকানা’, ১৯৮১-তে চিটাগাং গাইড’, ১৯৯৫-এ দৈনিক আজাদীর উদ্যোগে ঐতিহাসিক সম্পাদনাগ্রন্থ ‘হাজার বছরের চট্টগ্রাম’ প্রকাশ করে এবং ১৯৯৭ ও ২০০১-এ ‘আজিকে এ আকাশতলে’ সম্পাদনা করেন। আবুল ফজল, আবদুল হক চৌধুরী, ওহীদুল আলম প্রমুখের প্রয়াণ স্মরণপত্রসহ বহু স্মরণিকা ও সংকলন সম্পাদনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি, তার সম্পাদনার মধ্যে অন্যতম নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূস সংবর্ধনা স্মারক (২০০৭) এবং চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষার ওপর গবেষণামূলক প্রবন্ধ এবং লোকমান খান শেরওয়ানি স্মারকগ্রন্থ অন্যতম।
চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুলে অধ্যয়নকালে আবৃত্তি, অভিনয়, বিতর্ক, চিত্রাঙ্কন চর্চায় সক্রিয় হন। চট্টগ্রাম কলেজে অধ্যায়নকালে সৃজনশীল সাংস্কৃতিক নানা কর্মতৎপরতার মাধ্যমে সাংস্কৃতিক অঙ্গনে সাড়া জাগান। তার পরিচালনায় ১৯৬৬ সালে বাংলা একাডেমির বটমূলে ছায়ানাট্য ‘লাল রং পলাশ’-এর মঞ্চায়ন বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে চমক সৃষ্টি করে।
এ বিষয়ে বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক ও গবেষক আবুল মোমেন বলেন, ‘কৃতিত্বপূর্ণ ফল করে আমার এক বছর আগে কলেজে ঢুকেছেন তিনি। বন্ধুদের নিয়ে প্রকাশ করলেন পত্রিকা ‘কলরোল’। কীভাবে যেন আমি সেটার সঙ্গে জড়িয়ে গেলাম। সেই সুবাদে মাহবুবু ভাইয়ের লালখান বাজার বাঘঘোনার বাসায় আমার যাতায়াত শুরু। সে বোধ হয় ১৯৬৫ সালে কথা। তখন আমরাও কলেজে ঢুকেছি। সেটা ছাত্র ইউনিয়নের রমরমা কাল। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তখন ছাত্রসংগঠন স্বনামে কাজ করতে পারত না। ছাত্র ইউনিয়নের চট্টগ্রাম কলেজে-সংগঠনের নাম ‘ইউএসপিপি-ইউনাইটেড স্টুডেন্টস প্রগ্রেসিভ পার্টি’। ছাত্রলীগের সংগঠনের নাম ছিল ‘যাত্রিক’। ওদের বাঙালি জাতীয়তাবাদের আবেগ তখন থেকেই কাজ করছিল, কী ছাত্র ইউনিয়ন কী আন্তর্জাতিকতাবাদ।
তখন ছাত্রসংগঠনের মধ্যে মূল প্রতিযোগিতা ছিল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, লেখালেখি, প্রকাশনা, প্রতিদ্বন্দ্বীদের বক্তৃতার মান নিয়ে। এ সময়ে মাহবুব ভাই শুরু করলেন ছায়ানাট্য প্রদর্শন–লাল রং পলাশ। আমি আর বেনুআপা (সদ্যপ্রয়াত মনোয়ারা কবি বেনু) অথবা আমি আর খুরশিদ ভাইয়ের বোন বেবি (মার্কিন প্রবাসী, তার নামও সম্ভবত মনোয়ারা)। এটা নিয়ে আমরা অনেক জায়গায় গেছি। একবার পুরো ধারাভাষ্য রেকর্ড করা হয়েছিল ওয়ার সিমেট্রিতে গিয়ে নির্জনতার মধ্যে।’
১৯৬৭ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নবনির্মিত বিশাল মিলনায়তনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ‘লাল রং পলাশ’-এর মঞ্চায়ন ছিল সে সময়ে ওই অঞ্চলের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে সাড়া জাগানো ঘটনা। চট্টগ্রাম কলেজে সাংস্কৃতিক কর্মতৎপরতার পাশাপাশি মাহবুবুল হক ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হন। তিনি বামপন্থি ছাত্র সংগঠন ছাত্র ইউনিয়নের চট্টগ্রাম জেলার সভাপতি ও কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি হিসেবে ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানে ও একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দেন। মুক্তিযুদ্ধের সময়ে তিনি আগরতলায় একক ও যৌথভাবে একাধিক ক্যাম্প পরিচালনার দায়িত্ব সফলতার সঙ্গে পালন করেন।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর মাহবুবুল হক দেশ গড়ার গঠনমূলক কাজে সংগঠক হিসেবে কাজ শুরু করেন। সে সময়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদানের আমন্ত্রণ পেয়েও তিনি তাতে সাড়া দেননি। বাংলা একাডেমির গবেষক হিসেবে মনোনয়ন পেয়েও যোগ দেননি তাতে। ১৯৭৬-এ বাবার আকস্মিক মৃত্যুর পর পরিবারের হাল ধরতে তিনি চাকরি নিতে বাধ্য হন এবং পেশা হিসেবে শিক্ষকতাকেই বেছে নেন। কর্মজীবনের শুরু ১৯৭৮ সালে, রাঙ্গুনিয়া কলেজে বাংলা বিভাগের প্রভাষক হিসেবে। ১৯৮১ সালে যোগ দেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের বাংলা বিভাগে। ১৯৯৮ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে যোগ দেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অবসর গ্রহণের পর তিনি নোয়াখালী প্রযুক্তি বিজ্ঞান বিশ্ববিদ্যালয়ের উপচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
জীবনের আলোকিত ও লোভনীয় অনেক হাতছানি থাকা সত্ত্বেও মানুষ গড়ার কারিগর শিক্ষাকতাকে তিনি পেশা হিসেবে গ্রহণ করেছেন। অধ্যাপক মাহবুবুল হকের প্রথম গবেষণাধর্মী গ্রন্থ ‘ম্যাক্সিম গোর্কির মা’ ১৯৭৯ সালে প্রকাশিত হয়। সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের অন্যতম প্রতিভাধর ও জনপ্রিয় সাহিত্যিক ম্যাক্সিম গোর্কির ‘মা’ উপন্যাসটি বিশ্বসাহিত্যে এক অসাধারণ সংযোজন। অধ্যাপক মাহবুবুল হক বহুল আলোচিত এবং জনপ্রিয় উপন্যাসটিকে বাংলাভাষীয় পাঠকদের কাছে অধিকতর হৃদয়গ্রাহী করে তুলে ধরেছেন। মাহবুবুল হকের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণে উপন্যাসটি পাঠকের মনে বিশেষভাবে রেখাপাত করে চিন্তার প্রসার ঘটিয়েছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন। ছাত্রজীবনে এ বইটি আমার একটি প্রিয় বই হিসেবে সংরক্ষণ করেছি।
বাংলা সাহিত্যের মৌলিক গবেষক বলে খ্যাত এবং সুবক্তা ড. মাহবুবুল হক শুধু দেশেই নয়, বিদেশেও একজন সুবক্তা হিসেবে ব্যাপকভাবে পরিচিত। বাংলা সাহিত্যের এবং চট্টগ্রামের ইতিহাসবিষয়ক গবেষণায় তার সুচিন্তিত বক্তব্য একাগ্রচিত্তে শোনার সুযোগ আমার হয়েছে। তার বক্তব্য থেকে আমি অনেক কিছু ধারণ করে নিজেকে শুদ্ধ করার চেষ্টা করেছি।
অধ্যাপক মাহবুবুল হকের দীর্ঘ গবেষণার ফসল ‘বাংলা বানানের নিয়ম’ গ্রন্থতি দেশে-বিদেশে বিদগ্ধ পণ্ডিতদের প্রশংসা অর্জন করেছে। এ গ্রন্থে বাংলা গবেষণার ক্ষেত্রে তার মৌলিক চিন্তাচেতনার পরিচয় মেলে। বাংলা ভাষায় অধ্যাপক মাহবুবুল হকের মতো এত বেশি প্রবন্ধ এবং গবেষণামূলক গ্রন্থ আর কেউ লিখেছেন কি না আমার জানা নেই। আমার মতে এ ক্ষেত্রে তিনি একক ও অনন্য সাধারণ কৃতিত্বের অধিকারী।
জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) কর্তৃক ড. মাহবুবুল হকের ১৩টি বই স্কুলে পাঠ্যবই হিসেবে মনোনীত এবং পাঁচটি স্কুলপাঠ্য বই প্রকাশিত হয়েছে। যা দেশে শিক্ষা প্রসারের ক্ষেত্রে তার অন্যতম অসাধারণ অবদান হিসেবে বিবেচিত। এ পর্যন্ত তার ১৪টি মৌলিক পবেষণাবিষয়ক প্রবন্ধ ও সম্পাদিত গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। যা বাংলা সাহিত্যের জন্য খুবই প্রয়োজনীয় ও মূল্যবান গ্রন্থ বলে বিবেচিত হয়েছে। তার প্রকাশিত গবেষণাগ্রন্থ এবং প্রবন্ধের একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা এখানে তুলে ধরছি– ১. ম্যাক্সিম গোর্কির মা (১৯৭৯), ২. ঐতিহাসিক বস্তুবাদ পরিচিতি (১৯৮১), ৩. আধুনিক বাংলা সাহিত্যের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস (১৯৮২), ৪. বাংলা বানানের নিয়ম (১৯৯১), ৫. আশুতোষ চৌধুরী (১৯৯৪), ৬. পাঠ্যবইয়ে বাংলা বানানের নিয়ম (১৯৮২ সাল), ৭. বিশ্ব তারিখ অভিধান (২০০০ সাল), ৮. বাংলা ভাষা: কয়েকটি প্রসঙ্গ (২০০৪), ৯. তিনজন আধুনিক কবি: সমর সেন, সুভাষ মুখোপাধ্যায় ও সুকান্ত ভট্টচার্য (২০০৫), ১০. সংস্কৃতি ও লোকসংস্কৃতি (২০০৮), ১১. বাংলা ভাষা: কয়েকটি প্রসঙ্গ (২০০৯), ১২. বাংলা সাহিত্য: নানা নিবন্ধ (২০০৯), ১২. বাংলা সাহিত্যের আধুনিক যুগ: নানা নিবন্ধ (২০১০), ১৩. নজরুল তারিখ অভিধান (২০১০), ১৪. ‘বাংলার লোকসাহিত্য: সমাজ ও সংস্কৃতি (২০১০), ১৫. বাংলা সাহিত্যের দিগ্বিদিক (২০১১), ১৬. রবীন্দ্রনাথ ও জ্যোতিরিন্দ্রনাথ (২০১১), ১৭. প্রবন্ধ সংগ্রহ (২০১২), ১৮. অন্বেষার আলোয় চট্টগ্রাম (২০১২), ১৯. রবীন্দ্রসাহিত্য রবীন্দ্রভাবনা (২০১৪), ২০. বাংলা কবিতা: রঙে ও রেখায় (২০১৫), ২১. বইয়ের জগৎ: দৃষ্টিপাত ও আলোকপাত (২০১৬), ২২. মুক্তিযুদ্ধ ফোকলোর ও অন্যান্য (২০১৫), ২৩. লোকসংস্কৃতি ও লোকসাহিত্য (২০১৬), ২৪. খটকা বানান অভিধান (২০১৬), ২৫. লোকসংস্কৃতি চর্চা (২০২২), ২৬. নজরুলকে নিয়ে (২০২২), ২৭. বাংলা কথাসাহিত্য: রঙে ও রেখায় (২০২২), ২৮. চট্টগ্রামে শেখ মুজিব (২০২২), ২৯. শেখ মুজিব তারিখ অভিধান (২০২৩), ৩০. চট্টগ্রামী সহজ পাঠ (২০২৩)। চট্টগ্রামে শেখ মুজিব এবং শেখ মুজিব তারিখ অভিধান গ্রন্থ দুটো গবেষণার ক্ষেত্রে অসাধারণ ও নির্ভরযোগ্য গবেষণা গ্রন্থ।
সম্পাদিত গ্রন্থসমূহ: ১. নির্বাচিত প্রবন্ধ: আবুল ফজল (২০০২), ২. শরৎচন্দ্রের শ্রীকান্ত (২০০৪), ৩. সমকালের কবিয়াল (শিশির দত্ত সহযোগে (২০০৭), ৫. শরৎচন্দ্রের শ্রীকান্ত (২০০৪), ৬. সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের পদাতিক (২০০৮), ৭. চাটগাঁভাষার রূপ পরিচয় (২০১২), ৮. অক্টোবর বিপ্লবের বিজয়গাথা (১৯৮২), ৯. মৌমাছি ও মানুষ (মস্কো ১৯৮৮), ১০. টাইম মেশিন (১৯৮৯) অনুবাদ করেছেন। তিনি কয়েকটি শিশুকিশোর গ্রন্থ লিখেছেন। সেগুলো হলো– ১. গল্পে গল্পে ভাষা আন্দোলনা (২০১৮), ২. মরণজয়ী অভিযানের কাহিনি (২০১৭), ৩. ভাষার লড়াই থেকে মুক্তিযুদ্ধ (২০১৬), ৪. গল্পে গল্পে নজরুল (২০০৯), ৫. বীরশ্রেষ্ঠদের কথা (২০০২), ৬. ছড়ায় ছড়ায় বাংলা বানান (২০০১), ৭. কুমির, বিড়াল ও খরগোশের গপপো (২০০১), ৮. বাতাসের কথা (২০০১), ৯. সবই হলো কিসমত (২০০১), ১০. জল পড়ে পাতা নড়ে (সম্পাদিত রবীন্দ্র কিশোর রচনা সংকলন (২০০১)।
বাংলা সাহিত্যে তিনি মৌলিক গবেষণা বা কঠিন কঠিন সাহিত্য রচনা করেই ক্ষান্ত হননি। ছোটদের জন্য তার দায়িত্ববোধ এবং তাদের জন্য কিছু করার প্রচেষ্টা, বোদ্ধামহলের দৃষ্টি কাড়ে। শিশুদের জন্য ৭টি শিশু-কিশোর গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। যা শিশুদের প্রতি দায়িত্ববোধ এবং তাদের মানসিক মননশীলতা গঠনে তার আন্তরিকতার বহিঃপ্রকাশ। প্রবন্ধ ও সমালোচনা বিষয়ে বিভিন্ন শাখা ও উপশাখায় এ পর্যন্ত তিনি প্রায় ২৩১টির অধিক প্রবন্ধ রচনা করেন, যা দেশের বিভিন্ন সংবাদপত্র ও সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে।
তিনি লোকমান খান শেরওয়ানিকে নিয়ে শামসুল হোসাইনের সঙ্গে যৌথভাবে একটি দুর্লভ বইও সম্পাদনা করেছেন, যা বাংলার ইতিহাসে জন্য একটি আকরগ্রন্থ। অধ্যাপনা, গবেষণা ও সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি তিনি জাতীয় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন।
ড. মাহবুবুল হক বাংলা একাডেমি, এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ, জাতীয় শিক্ষাক্রম পাঠ্যপুস্তক বোর্ড এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে বিশেষজ্ঞ হিসেবে দায়িত্ব পালন করে জাতীয়ভাবে ভূমিকা রেখেছেন। এ ছাড়া তিনি জাতীয় গণমাধ্যম ইনস্টিটিউট, লোকপ্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, নজরুল ইনস্টিটিউট, আন্তর্জাতিক ভাষা ইনস্টিটিউট, জাতীয় জাদুঘর, বাংলাদেশ বেতার, শিল্পকলা একাডেমি ও শিশু একাডেমির মতো প্রতিষ্ঠানের বিশেষজ্ঞ গবেষক হিসেবে সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে তার গবেষণাধর্মী প্রবন্ধ উপাস্থাপনার মধ্যদিয়ে তিনি বিদেশেও ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছেন। কলকাতা থেকে শুরু করে বিশ্বভারতী, দিল্লি সবখানে তার সরব পদাচারণা বোদ্ধামহলে চরমভাবে প্রশংসিত।
মাহবুব হক বহু গুণে গুণান্বিত একজন বহুমাত্রিক মানুষ। তার হস্তলিপি, তার হাতের আঁকা বর্ণগুলো মুদ্রিত টাইপে ছাপার বইকেও হার মানায়।
ড. মাহবুবুল হক একাধারে অধ্যাপক, ভাষাবিদ, প্রাবন্ধিক, সমালোচক এবং শিক্ষাবিদ। আমার কাছে সবসময় আকর্ষণীয় মনে হয়েছে তার পরিপাট্য গুণ। এ কারণেই তার বক্তব্য, লেখায় ও চিন্তায় বিষয়মুখিতা যেমন প্রাধান্য পেয়েছে তেমনি স্পষ্টতা রয়েছে তার পরিবেশনায়। যে কোনো বিষয়কে তার সামগ্রিক চারিত্র্যবিচারের মাধ্যমে যথাযথ ও সংহত রূপে তুলে ধরা মাহবুবুল হকের প্রধান গুণ। মাহবুব নির্দিষ্টভাবে বলতে বা লিখতে ভালোবাসেন, অধিকাংশ মানুষের মতো এলোমেলোভাবে নয়। তার লেখনীজীবন ও কর্মজীবনের সাফল্যও আমার মনে হয় এই গুণটির কারণেই অধিক।
আমাদের প্রিয় এই মানুষটি তার জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়গুলো ব্যয় করেছেন এ দেশের শোষিত-বঞ্চিত মানুষের অধিকার আদায়ের লড়াই-সংগ্রামে। এ দেশের ছাত্রদের জন্য একটি অসাম্প্রদায়িক বৈজ্ঞানিক শিক্ষাব্যবস্থা কায়েমের জন্য নেতৃত্ব দিয়েছেন আন্দোলন-সংগ্রামে। আজও যা অর্জিত হয়নি। সার্বক্ষণিক রাজনৈতিককর্মী হিসেবে মাহবুব ভাই তার জীবনের তারুণ্য মেহনতি মানুষের জন্য উৎসর্গ করেছেন। ব্যক্তিগত লাভের জন্য, প্রতিষ্ঠার জন্য কিছুই করেননি। এ ধরনের দৃষ্টান্ত আমাদের পচনশীল সমাজে খুবই বিরল। তাকে আমরা ২০২৪-এর ২৪ জুলাই হারিয়েছি। তার মৃত্যুতে বাংলাসাহিত্যের গবেষণার যে শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে তা অপূরণীয়।
ডা. মাহবুবুল হকদের মতো একজন ধীশক্তিসম্পন্ন মানুষ যুগে যুগে জন্মান না। বহু পুণ্যের ফলে জাতির ভাগ্যাকাশে অবির্ভূত হন এসব ধুমকেতুসম্পন্ন গবেষক। তিনি মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের একজন নিরলস যোদ্ধা ছিলেন। শিক্ষক ও গবেষক হিসেবে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের চর্চা এবং গবেষণায় অনবদ্য ভূমিকা তিনি পালন করেছেন। বাংলা ভাষার গবেষণা তাকে আন্তর্জাতিক খ্যাতি দিয়েছে। এ দেশের শুদ্ধ সংস্কৃতি চর্চা এবং প্রগতিশীল সংস্কৃতির সংগ্রামের ইতিহাসে তার নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক
[email protected]