চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের ২০২৬-২০২৭ অর্থ বছরের বাজেট ঘোষণা করেছেন মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন।
মঙ্গলবার (৩০ জুলাই) দুপুরে নগরীর থিয়েটার ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে এ বাজেট ঘোষণা করে তিনি।
এটি তার আমলে দ্বিতীয় বাজেট। ২০২৬-২০২৭ অর্থ বছরের ২ হাজার ২৬০ কোটি ২৪ লক্ষ টাকার প্রস্তাবিত বাজেট ঘোষণা করেন। একইসাথে ২০২৫-২০২৬ অর্থ বছরের ১ হাজার ৬৬৫ কোটি ৯২ লক্ষ ১৬ হাজার ৪০০ টাকার সংশোধিত বাজেটও অনুমোদন করা হয়।
বাজেট বক্তব্যে চসিক মেয়র নগরবাসীর আশা-আকাক্সক্ষার প্রতিফলন ঘটানোর প্রত্যাশা ও চট্টগ্রাম মহানগরকে ক্লিন-গ্রিন, হেলদি ও সেফ সিটি, আধুনিক প্রযুক্তিসম্পন্ন ও অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ বাসযোগ্য নান্দনিক পর্যটন নগর হিসেবে প্রতিষ্ঠার প্রতিজ্ঞা ব্যক্ত করেন।
তিনি বলেন, চসিকে অনুমোদিত জনবল ৪২২৬ জন। যা পর্যাপ্ত নয়। যেকারণে অস্থায়ী ভিত্তিতে জনবল নিয়োগ করে চসিকের কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। বেতন-ভাতা পরিশোধ এবং নগর উন্নয়নে বিপুল পরিমাণ অর্থ খরচ হয়। অপরদিকে চসিকের প্রধান আয়ের উৎস গৃহকর। তাই বন্দর, রেলওয়ে, ৩৬টি কন্টেইনার টার্মিনাল ও অয়েল কোং লিমিটেডসহ বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও কর্পোরেট হাউজগুলোকে অবশ্যই রাজস্ব পরিশোধ করতে হবে।
তিনি বলেন, নগর দূষণ রোধে আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো গাছ। অনিয়ন্ত্রিত দখল, পাহাড় উজাড় ও বন ধ্বংসের কারণে সবুজ আচ্ছাদন কমে গেছে। তাই সবাইকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে বৃক্ষরোপণে অংশ নিতে হবে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় চট্টগ্রাম শহরকে সবুজ-শ্যামল ও বাসযোগ্য নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে বনজ, ফলদ ও ঔষধি গাছের সমন্বয়ে পাঁচ লক্ষ গাছের চারা রোপণ করা হয়েছে এবং ২০২৬-২০২৭ অর্থ বছরে দশ লক্ষ গাছের চারা রোপণের পরিকল্পনা রযেছে। পরিবেশ দুষণের কারণে এখন কয়েকটি ঋতুর ছোঁয়া অনুভবও করা যাচ্ছে না। তাই কর্ণফুলিকে দূষণমুক্ত এবং পাহাড় কাটা বন্ধ করতে হবে।
হকারদের কারণ নগরে যানজট হয়। এই সমস্যা দীর্ঘ দিনের। সমস্যার সমাধানে আন্ডারগ্রাউন্ড মার্কেট গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান মেয়র।
কিছু সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন মেয়র। তা হল : চলমান নিয়োগ কার্যক্রম স্বচ্ছতার সাথে সম্পন্ন করা। দক্ষ জনবল গড়ার লক্ষ্যে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিভিন্ন প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা। বর্তমান কাজের পরিধি এবং ভবিষ্যৎ চাহিদা বিবেচনায় নতুন সাংগঠনিক কাঠামো প্রণয়ন এবং অনুমোদনের ব্যবস্থা গ্রহণ। বিভিন্ন সেবা কার্যক্রমসহ চসিকের কার্যক্রমসমূহ ডিজিটালাইজেশন করার উদ্যোগ গ্রহণ। বিএফআইডিসি রোডে চসিকের মালিকানাধীন ৮ একর জায়গা এওয়াজ বদলের মাধ্যমে চট্টগ্রাম নগরীতে সেনাবাহিনী কর্তৃক আধুনিক আন্তর্জাতিক মানের হাসপাতাল নির্মাণের উদ্যোগ। এছাড়াও সম্ভাব্য ৪৪টি আয়বর্ধক প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে কয়েকটি প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছে।
মেয়র জানান, নগরীর সড়ক অবকাঠামোর নকশাগত ধারণক্ষমতা যেখানে সর্বোচ্চ ১০ টন, সেখানে বন্দরের ভারী যানবাহন নিয়মিতভাবে ২০ থেকে ৩৫ টন পর্যন্ত অতিরিক্ত ওজন বহন করে চলাচল করছে। একটি সড়কের গড় আয়ুষ্কাল যেখানে স্বাভাবিকভাবে তিন থেকে পাঁচ বছর থাকার কথা, সেখানে অতিরিক্ত ওজন বহনকারী এসব যানবাহনের কারণে সড়ক দ্রুত ভেঙে পড়ছে।
এছাড়া, চট্টগ্রাম নগরীতে ছোটো-বড় মিলিয়ে ১০ লক্ষাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে বলে ধারণা করা হলেও বর্তমানে ট্রেড লাইসেন্সের সংখ্যা দেড় লক্ষেরও কম। ফলে বিপুল পরিমাণ সম্ভাব্য রাজস্ব আদায় হচ্ছে না। ট্রেড লাইসেন্সের সংখ্যা দ্বিগুণ করার লক্ষ্য নিয়ে চসিক কাজ করছে।
মেয়র জানান, দায়িত্ব নিয়ে তিনি চসিকের দেনা কমিয়েছেন। ২০২৪ সালের ০৩ নভেম্বর দায়িত্বগ্রহণের সময় চসিকের দেনা ছিল ৫৯৬ কোটি টাকা। এখন দেনা কমে হয়েছে ৩৮০ কোটি টাকা।
পরিকল্পনাধীন কিছু প্রকল্পের কথা তুলে ধরেন মেয়র। তা হল, চসিকের আওতায় প্রাথমিক সড়কের উন্নয়ন প্রকল্প। যার আনুমানিক ব্যয় ২২০০ কোটি টাকা। চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসনের লক্ষ্যে ২১টি খালসহ অন্যান্য খাল খনন প্রকল্প। যার ব্যয় ধরা হয়েছে ৩,৫০০ কোটি টাকা। সিডিএ কর্তৃক বাস্তবায়িত ৩৬টি খালসহ রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনার জন্য ২৮০০ কোটি টাকার প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। এছাড়া ৪০০ কোটি টাকা ব্যয়ে এআইভিত্তিক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা প্রকল্প হাতে নিয়েছে চসিক। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের আওতায় কোরিয়ান সরকারের অর্থায়নে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য ল্যান্ডফিল নির্মাণ প্রকল্প। ডেভেলপমেন্ট অফ স্মার্ট ট্রাফিক সিস্টেম ফর ডিফেরেন্ট এরিয়াস অফ চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নামে ৪৫০ কোটি টাকার আরো একটি প্রকল্প নিতে যাচ্ছে সংস্থাটি।
এছাড়া চসিকের উন্মুক্ত স্থানসমূহ আধুনিকায়ন, উন্নয়ন ও সবুজায়নে ৪৫০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প নিচ্ছে চসিক। ৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে কিচেন মার্কেট কাম বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণ প্রকল্প গ্রহণ করতে যাচ্ছে। এছাড়া হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে রেল ক্রসিং-এর ওপর ওভারপাস নির্মাণ প্রকল্পও প্রক্রিয়াধীন আছে। ৩০০ কোটি টাকা ব্যয়ে নতুন করে দেওয়ানহাট ব্রিজ নির্মাণের প্রকল্পও নিতে যাচ্ছে সংস্থাটি। ২৯৮ কোটি টাকা ব্যয়ে বর্জ্য সংগ্রহে আধুনিক যান-যন্ত্রপাতি সংগ্রহ প্রকল্প গ্রহণ করেছে। ২০৩ কোটি টাকা ব্যয়ে আধুনিক নগর ভবন নির্মাণ কাজ চলছে।