যুক্তরাষ্ট্রে ফুটবল বিশ্বকাপ মানেই শুধু মাঠের লড়াই নয়, হাজার হাজার কিলোমিটার ভ্রমণ, ব্যয়বহুল যাতায়াত, বিশাল আয়োজনে লজিস্টিকসের চ্যালেঞ্জ এবং শহরভেদে ভিন্ন এক অভিজ্ঞতার গল্পও। স্টেডিয়াম থেকে স্টেডিয়ামে ঘুরে বিশ্বকাপ কভার করতে গিয়ে মাঠের বাইরের সেই বাস্তব চিত্রই উঠে এসেছে এই প্রতিবেদনে।
যুক্তরাষ্ট্রে ফুটবল বিশ্বকাপ কভার করার অভিজ্ঞতায় প্রথমত, সবকিছু কিলোমিটারের পরিবর্তে মাইলে মাপা হয়, এবং প্রতিটি স্টেডিয়াম গুগল ম্যাপসের দেখানো দূরত্বের চেয়ে কিছুটা বেশি দূরে বলে মনে হয়। টুর্নামেন্টটি দ্রুতই ভূগোল, লজিস্টিকস এবং ‘কাছাকাছি’র যুক্তরাষ্ট্রের সংজ্ঞার একটি পাঠে পরিণত হয়েছে।
তবে সমর্থকদের চেয়ে সাংবাদিকদের জন্য পরিস্থিতি কিছুটা সহজ। ফিফা নির্দিষ্ট হোটেলগুলো থেকে মিডিয়ার জন্য বিশেষ শাটল বাস চালায়। যতক্ষণ আপনি সময়মতো সেখানে পৌঁছাতে পারবেন- যদিও খুব কম লোকেরই সেখানে থাকার সামর্থ্য আছে, বিশেষ করে এমন দেশগুলোর সাংবাদিকদের, যেখানে ডলারের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে চলেছে- ততক্ষণ আপনি বিনামূল্যে যাতায়াতের সুযোগ পাবেন।
তবে ভক্তরা ততটা ভাগ্যবান নন। যারা নিউইয়র্ক থেকে নিউজার্সিতে যাতায়াত করেন, তারা সম্ভবত সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। ম্যাচের দিনগুলোতে নিউজার্সি ট্রানজিটের যাওয়া-আসার পাসের দাম প্রায় ৯৮ মার্কিন ডলার, যেখানে সাধারণ দিনে একই যাত্রায় ২০ ডলারের কিছু বেশি খরচ হয়।
জিলেট স্টেডিয়াম বা লেভিস স্টেডিয়ামের মতো নয়, টুর্নামেন্ট চলাকালে যে কয়েকটি ভেন্যুকে তাদের আসল নাম ধরে রাখার অনুমতি দেওয়া হয়েছে, মেটলাইফ স্টেডিয়াম তাদের মধ্যে অন্যতম। এটি একটি বিশাল বাটির মতো স্টেডিয়াম, যেখানে ৮০ হাজারেরও বেশি দর্শক ধারণক্ষমতা রয়েছে। সৌভাগ্যবশত, পরিবহন ব্যবস্থা নিয়ে নানা চ্যালেঞ্জ এবং ফিফার উচ্চ টিকিটমূল্য সত্ত্বেও আসনগুলো পূর্ণ ছিল।
অন্যদিকে, আটলান্টা একটি মনোরম বিস্ময় হয়ে উঠেছে। স্টেডিয়ামটি শহরের কেন্দ্রস্থল থেকে হাঁটা পথের দূরত্বে অবস্থিত। এর আগে অলিম্পিক আয়োজন করার অভিজ্ঞতা থাকায়, শহরটি এ ধরনের বড় আয়োজনের ব্যাপারে বেশ স্বাচ্ছন্দ্য বলেই মনে হয়। ওয়ার্ল্ড অব কোকাকোলা এবং জর্জিয়া অ্যাকোয়ারিয়াম সেইসব ভক্তদের জন্য আকর্ষণীয় বিনোদনের ব্যবস্থা করে, যারা অনেকের জন্য জীবনে একবারের এই যাত্রায় এসেছেন।
এখানে গণমাধ্যমকর্মীরাও বেশ আরাম-আয়েশে আছেন। এখানকার চমৎকার বুফে লাঞ্চ দেশের ক্রিকেট সাংবাদিকদের জন্য সাধারণ ব্যাপার হলেও, ফুটবল সংবাদদাতাদের জন্য তা প্রায় কিংবদন্তিতুল্য। দ্বিতীয়বার খাবার নেওয়ার পর আমাদের বেশিরভাগই ‘পেশাগত কারণে’ আটলান্টায় থাকার মেয়াদ বাড়ানোর কথা ভেবেছিলাম।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের শহরগুলোর একটি অভ্যাস আছে, যা ভ্রমণকারী ভক্ত এবং সাংবাদিকদের বারবার অপ্রস্তুত করে দিয়েছে। নিউইয়র্ক ছাড়া বাকি শহরগুলো আশ্চর্যজনকভাবে তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়ে। সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার মধ্যেই বেশিরভাগ শহরের কেন্দ্রস্থল জনশূন্য হয়ে যায়, এবং উদযাপন বা শোক প্রকাশের জন্য কোনো জায়গা খুঁজে পাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
ফিলাডেলফিয়ায় সন্ধ্যা সাতটার একটি ম্যাচের পর আমরা রাতের খাবারের খোঁজে শহরজুড়ে উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরতে লাগলাম। অবশেষে, আমরা একটি টাকোর দোকান খুঁজে পেলাম, যেটি বীরত্বের সঙ্গে যেন কারফিউ উপেক্ষা করেছিল।
নিউইয়র্কে ফেরার বাসটি মধ্যরাতের অনেক পরে পৌঁছায়। ফলে ব্রাজিল বনাম হাইতির ম্যাচের পর আমাদের শত শত জনকে একটি বাস টার্মিনালে অপেক্ষা করতে হয়।
আয়োজক শহরগুলোর মধ্যে ডালাস সম্ভবত সবচেয়ে ভালো কাজ করেছে। ৯টি বিশ্বকাপ ম্যাচ থাকায়, শহরটির আয়োজক কমিটি সমর্থক ও ক্লান্ত সংবাদকর্মী- উভয়কেই স্বাগত জানাতে আন্তরিক প্রচেষ্টা করেছে। এর মিডিয়া সেন্টারটি প্রথম শ্রেণির, যা সাংবাদিকদের ম্যাচের দিন ছাড়া অন্য দিনগুলোতে আর্লিংটনে প্রতিদিন যাতায়াতের কষ্ট থেকে মুক্তি দেয় এবং আমাদের জন্য সম্ভাব্য সব ধরনের আরামের ব্যবস্থা করে।
তবে আগত সমর্থকদের টার্গেট ও ওয়ালমার্টে তীর্থযাত্রার মতো করে যাওয়ার উত্তেজনা দেখে ট্যাক্সিচালকেরা পুরোপুরি হতবাক।
থিওটোনিয়াস/অমিয়/