‘আগে ১৭০ টাকা কেজি ছিল। কোরবানির ঈদের পর থেকেই চিনিগুঁড়া (পোলাও) চালের দাম বাড়ছে। আকিজ, স্কয়ার, প্রাণসহ বিভিন্ন কোম্পানির এই প্যাকেটজাত চাল ১৯০ টাকা ও বস্তার চাল ১৭০ টাকা কেজি বিক্রি হচ্ছে। দাম আরও বেড়ে ২১০ টাকা হচ্ছে। ২১০ টাকার প্যাকেট রেডি হয়ে গেছে। স্কয়ার, আকিজসহ অন্য কোম্পানি থেকে এ কথা জানিয়েছে। কোম্পানি ইচ্ছামতো দাম বাড়াচ্ছে।’ চিনিগুঁড়া চালের বাড়তি দামের ব্যাপারে এভাবেই ক্ষোভ প্রকাশ করেন কারওয়ান বাজারের নুর ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী মো. শাহজাহান।
অন্য বাজারের খুচরা চাল বিক্রেতা ও রাইসমিল মালিকরাও দাম বৃদ্ধিতে অবাক হয়েছেন। তারা বলেন এত কেন এই চালের দাম! মিলে তো বাড়েনি। তাদের অভিযোগ, করপোরেটরা প্যাকেটজাত করে ভালোমানের দোহাই দিয়ে ইচ্ছামতো দাম বাড়াচ্ছে। বাজারে চরম নৈরাজ্য চলছে। গতকাল রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এমনই তথ্য পাওয়া গেছে।
বাজারে দেখা গেছে, আগের মতোই পাইকারি ও খুচরা দোকান পোলাওয়ের চালে ভরা। কারওয়ান বাজারের মায়ের দোয়া স্টোরের স্বত্বাধিকারী মো. শাহ আলম খান খবরের কাগজকে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘সিন্ডিকেট করেই করপোরেটরা দাম বাড়াচ্ছে। আগে ১৭০ টাকায় বিক্রি করলেও কয়েক দিন ধরে বিভিন্ন কোম্পানির লোকজন ১৯০ টাকার প্যাকেটজাত এই চাল দিয়ে গেছে। খোলা চালের দামও বেশি। ১৬২ টাকা কেজি কেনা। বিক্রি করছি ১৭০ টাকায়। কয়েক দিন আগে এটা ১৩০ থেকে ১৪০ টাকা কেজি বিক্রি হয়।’
এক প্রশ্নের জবাবে এই মুদি ব্যবসায়ী বলেন, ‘করপোরেটদের দাপটে সব কিছুর দাম বাড়ছে। প্যাকেটের নামে তারা অনেক বেশি দাম নিচ্ছে। কিছু হলেই ভোক্তা অধিদপ্তর শুধু আমাদের ধরে। তাদের ধরে না। তাদের ধরলে এত বেশি দাম বাড়বে না।’
এ সময় ইন্দিরা রোডের ক্রেতা মো. দুলাল খবরের কাগজকে বলেন, ‘ধানের দাম কি এত বেড়েছে যে, চালের দাম বেড়েই যাচ্ছে? করপোরেটরা সিন্ডিকেট করেই এভাবে দাম বাড়াচ্ছে। এটা ফাজলামি ছাড়া আর কিছুই নয়। সরকারকে এটা দেখা দরকার।
এই বাজারের হাজি রাইস এজেন্সির বিক্রয়কর্মী খবরের কাগজকে বলেন, খোলা পোলাওয়ের চাল আগে ১৩০ থেকে ১৪০ টাকা কেজি ছিল। কয়েক দিন ধরে দাম বেড়েছে। মোজ্জামেল কোম্পানির এই চাল সবচেয়ে ভালো, তা ১৭০ টাকা কেজি বিক্রি হচ্ছে। ৫০ কেজির বস্তার দাম হচ্ছে ৮ হাজার ৫০০ টাকা। জনতা রাইস এজেন্সির স্বত্বাধিকারী মো. খলিলুর রহমানও ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘পোলাওয়ের চাল নাকি রপ্তানি হচ্ছে। এ জন্য দাম বাড়ছে। কিছু কোম্পানির লোকজন বলছে। এই বাজারের অন্য বিক্রেতাদেরও একই অভিযোগ বিভিন্ন অজুহাতে করপোরেটরা বাড়াচ্ছে দাম। বিষয়টি সরকারের দেখা দরকার।’ অন্য ভোক্তাদেরও একই অভিযোগ।
এদিকে মোহাম্মদপুরের কৃষি মার্কেট, টাউন হল বাজার ও নিউ মার্কেটের খুচরা বিক্রেতারা জানান, কয়েক দিন ধরে কোম্পানির লোকরা বেশি করে দাম বাড়িয়েছেন। আরও বেশি দামের চাল আসছে। কোম্পানির লোকজন বলে গেছেন।
টাউন হল বাজারের বিসমিল্লাহ স্টোরের মো. ইসমাইল খবরের কাগজকে বলেন, ‘স্কয়ার কোম্পানির লোকরা জানিয়েছেন, ১৯০ টাকার প্যাকেট বেশি করে রাখেন। কারণ ২১০ টাকার প্যাকেট রেডি হয়ে গেছে। তাড়াতাড়ি চলে আসবে। তখন বেশি দামে কিনতে হবে।’
এই বাজারের নোয়াখালী রাইস স্টোরের বিক্রয়কর্মী আব্দুর রহিমও একই তথ্য জানান। বলেন, সাগর কোম্পানির বস্তার পোলাওয়ের চাল ১৬২ টাকা কেজি কেনা। বিক্রি করছি ১৭০ টাকায়। আকিজ, প্রাণ, স্কয়ারসহ বিভিন্ন কোম্পানির প্যাকেটজাত চালের দাম হঠাৎ করে বেড়ে গেছে। ১৯০ টাকা কেজি। মিলে ২১০ টাকার প্যাকেট তৈরি হয়ে গেছে। যেকোনো সময়ে চলে আসবে। কোম্পানির লোকরা বলে গেছেন।’ এ সময় আকিজ অ্যাসেনশিয়ালসের প্যাকেটে লেখা দেখা যায় দিনাজপুরের সেরা ধান, ১৯০ টাকা কেজি।
কিন্তু দিনাজপুর, নওগাঁ, ঠাকুরগাঁও, চাঁপাইনবাবগঞ্জে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বর্তমানে পোলাওয়ের ধান বাজারে কেনাবেচা হচ্ছে না। ধানের দাম বাড়েনি। কয়েক মাস আগে কেনাবেচা হয়েছে ২ হাজার ৫০০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ৩ হাজার টাকা মণ। দিনাজপুর চেম্বারের পরিচালক তৌহিদুর রহমান পাটোয়ারী (মোহন) খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমরা যে দামে ধান কিনি তা থেকে কিছু লাভ করে চাল বিক্রি করি। পোলাও ধান আড়াই হাজার থেকে ৩ হাজার টাকায় ১ মণ কেনা হয়। তাতে ২২ কেজি চাল হয়। তা সর্বোচ্চ ১৩৫ থেকে ১৩৮ টাকা কেজি বিক্রি হচ্ছে। আগে এটা ১২৪ টাকা কেজি বিক্রি করা হতো। নাম বলছি না। অনেক করপোরেট আমাদের কাছ থেকে চাল কিনে প্যাকেটজাত করে ১৯০ টাকা কেজি বিক্রি করছে। যে যা ইচ্ছা সেই দাম আদায় করছে। সরকার কী করছে? তাদের ধরুক। ১ কেজির প্যাকেটে সর্বোচ্চ ৫ থেকে ১০ টাকা খরচ হতে পারে। সেখানে কেজিতে বেশি নিচ্ছে ৪০ থেকে ৫০ টাকা।’
এক প্রশ্নের জবাবে আদর অ্যান্ড মমতা অটো রাইসমিলসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, ‘চালের দাম বাড়ায় আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি। তাই সরকারকে বলব কৃষককে প্রণোদনা দিয়ে ধানের উৎপাদন খরচ কমানো হোক। যাতে চালের দাম কমে। এতে ব্যবসা ভালো চলবে। ভোক্তারাও কম দামে চাল কিনতে পারবেন।’
চাঁপাইনবাবগঞ্জের মোজাম্মেল অটো রাইসমিলসের চেয়ারম্যান হারুন-অর রশিদ খবরের কাগজকে বলেন, ‘বর্তমানে ধান কেনাবেচা হচ্ছে না। এবারে পোলাওয়ের ধানের দাম বেশি। আড়াই হাজার থেকে ৩ হাজার টাকা মণ কেনা হয়। ৫০ কেজির চাল সাড়ে ৭ হাজার টাকায় বা কেজি ১৫০ টাকা বিক্রি করা হচ্ছে। আগে এটা বিক্রি করা হয় ১৩৬ টাকায়।’
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমরা সবচেয়ে ভালোমানের ধান কিনি। তাই চালও ভালো। এ জন্য দাম একটু বেশি। আমাদের চাল সবচেয়ে ভালো ক্লায়েন্টরা (ভোক্তা) কেনেন। ধানের দাম বেশি হওয়ায় চালের দাম বাড়ছে। এটা আমরাও চাই না। ভোক্তারা কম দামে চাল খাবেন, এটা আমরাও চাই। তাই ধানের উৎপাদন খরচ কমাতে হবে।’
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক ও কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) সভাপতি এ এইচ এম শফিকুজ্জামান খবরের কাগজকে বলেন, ‘যেভাবে চালের দাম বাড়ছে কোনোভাবেই কাম্য নয়। করপোরেটরা প্যাকেটজাতের নামে কেজিতে ৪০ থেকে ৫০ টাকা বেশি নিচ্ছে, এটা হতে পারে না। কারণ ১ কেজির এক প্যাকেটে কি ৪০ থেকে ৫০ টাকা খরচ হয়? বেশি দাম নেওয়ায় অনেক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশন মামলা করেছে। সেটা মনে রাখতে হবে।’
তিনি বলেন, বাজার কোনো নিয়ন্ত্রণে নেই। লুটপাট শুরু হয়েছে। ভোক্তাদের পকেট কাটা হচ্ছে। সরকারের দায়িত্বে যারা আছেন তারা কী করছেন?