ঢাকা ১৭ আষাঢ় ১৪৩৩, বুধবার, ০১ জুলাই ২০২৬

সর্বশেষ
চট্টগ্রামে চিনিগুঁড়ার দাম কেজিতে বেড়েছে ৭০ টাকা যুক্তরাষ্ট্রের স্বপ্নযাত্রায় বসনিয়ার বাধা পোলাওয়ের চালে নৈরাজ্য কত সময় ব্যয় করছেন সোশ্যাল মিডিয়ায়? ভাঙ্গায় দুই পক্ষের সংঘর্ষ: গুলিতে যুবক নিহত, আহত ১৫ মানুষের বিকল্প হতে কতদূর বর্ণবাদের শিকার টাইব্রেকারে মিস করা ফুটবলাররা ভ্যান্স-রুবিওর ভিন্ন মন্তব্য, ট্রাম্প প্রশাসনে মতপার্থক্যের ইঙ্গিত! রেশন-ভাতা হারানোর শঙ্কায় মুসলিমরা উৎপাদনশীল খাতে ঋণ বাড়াতে বড় ছাড় ১০৬ বছরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মেসি আরও গোল করুক, কিন্তু বিশ্বকাপ ট্রফি আমি চাই: এমবাপ্পে রোনালদোর অনন্য রেকর্ড ভাঙলেন এমবাপ্পে, ধারের কাছেও নেই মেসি সাধারণ করদাতাদের ধরা হলেও ছাড় পাচ্ছে বড়রা! ফেভারিট বেলজিয়ামের সামনে লড়াকু সেনেগাল ‘একাত্তরে আমরা কোনো অপরাধ করিনি, ক্ষমা চাইব কেন?’ শেকৃবিতে পশু চিকিৎসায় প্রযুক্তির ছোঁয়া নকআউট পর্বে দ্বিতীয় সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড় গিলবার্তো মোরা গোল্ডেন বুট নির্ধারণের নিয়ম কী? মেসিকে টপকে শীর্ষে এমবাপ্পে বুনো উদ্ভিদ বেগুনি হুড়হুড়ে জলাবদ্ধতার দুষ্টচক্রে রাজধানী ময়মনসিংহে খাল পুনর্খনন কর্মসূচি: কোটি টাকার প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ ১ জুলাই: তুলা, বৃশ্চিক, ধনু, মকর, কুম্ভ ও মীনের আজকের রাশিফল ১ জুলাই: মেষ, বৃষ, মিথুন, কর্কট, সিংহ ও কন্যার আজকের রাশিফল ইংল্যান্ডের বিপক্ষে রূপকথার খোঁজে কঙ্গো গিলের রূপকথার দুই হাত ১ জুলাই ২০২৬ তারিখের নামাজের সময়সূচি বিশ্বকাপে নতুন প্রতিপক্ষ ‘হিট ডোম’ শেষ ষোলোতে ফ্রান্সের প্রতিপক্ষ প্যারাগুয়ে, ম্যাচ কবে? ক্লোসাকে ছাড়িয়ে মেসির আরও কাছে এমবাপ্পে

বুনো উদ্ভিদ বেগুনি হুড়হুড়ে

প্রকাশ: ০১ জুলাই ২০২৬, ০৮:২৮ এএম
আপডেট: ০১ জুলাই ২০২৬, ০৮:৩৮ এএম
বুনো উদ্ভিদ বেগুনি হুড়হুড়ে
ছবি: ময়মনসিংহ আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তার কার্যালয়ের পেছনে দেখা বেগুনি হুড়হুড়ে

বেগুনি হুড়হুড়ে আমাদের চারপাশের চেনা প্রকৃতির এক সুপরিচিত কিন্তু অবহেলিত আগাছাজাতীয় উদ্ভিদ। রাস্তার পাশে, পরিত্যক্ত জমিতে কিংবা ফসলের খেতের আইলে ছোট ছোট বেগুনি ফুলের এ গাছটি প্রায়ই আমাদের চোখে পড়ে। অবহেলায় বেড়ে উঠলেও এই গাছের রয়েছে অনেক ঔষধি গুণাগুণ।

বেগুনি হুড়হুড়ের বৈজ্ঞানিক নাম Cleome rutidosperma, এটি Cleomaceae পরিবারের উদ্ভিদ। এটি ইংরেজিতে Blue Capparid, Fringed Spiderflower, Purple Cleome নামে পরিচিত। বেগুনি হুড়হুড়ে ক্রান্তীয় আফ্রিকা অঞ্চলের আদি উদ্ভিদ হলেও এটি বর্তমানে বাংলাদেশ, ভারতসহ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে এটি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। বেগুনি হুড়হুড়ের ছবিটি গত ১৩ জুন ময়মনসিংহ আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তার কার্যালয়ের পেছন থেকে তুলেছি। 

বেগুনি হুড়হুড়ে একটি একবর্ষজীবী, খাড়া বা কিছুটা শায়িত ভেষজ উদ্ভিদ। উদ্ভিদটি সাধারণত ১৫ থেকে ৭০ সেন্টিমিটার (প্রায় ১ থেকে ২.৫ ফুট) পর্যন্ত লম্বা হয়ে থাকে। এর কাণ্ড নরম, সবুজ এবং বহু শাখাবিশিষ্ট। কাণ্ডের গায়ে সূক্ষ্ম লোম এবং ছোট ছোট নরম কাঁটা বা খাঁজ দেখা যায়, যা একে খসখসে ভাব দেয়। এর পাতাগুলো যৌগিক এবং ত্রিপত্রক (Trifoliate)। অর্থাৎ একটি বোঁটায় তিনটি করে ছোট পাতা বা ফলক থাকে। পাতাগুলোর আকৃতি ডিম্বাকার বা ল্যান্সের মতো (Lanceolate)। পাতার কিনারা মসৃণ বা সামান্য খাঁজকাটা হতে পারে এবং পাতার উপরিভাগ ও নিচের পিঠে হালকা লোম থাকে।

এই উদ্ভিদের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ হলো এর ফুল। ফুলগুলো আকারে বেশ ছোট এবং এর রং হালকা বেগুনি থেকে নীলচে-বেগুনি হয়ে থাকে। প্রতিটি ফুলে ৪টি পাপড়ি থাকে, যা ওপরের দিকে ডানা মেলার মতো করে সাজানো থাকে।

ফুল থেকে ৪টি দীর্ঘ পুংকেশর বাইরের দিকে বের হয়ে থাকে, যা দেখতে কিছুটা মাকড়সার পায়ের মতো দেখায়। এই কারণেই একে ‘স্পাইডার ফ্লাওয়ার’ বলা হয়। সাধারণত সারা বছরই, বিশেষ করে বর্ষাকালের ভ্যাপসা গরমে এই গাছে ফুল ফুটতে দেখা যায়। ফুল ফোটার পর গাছে সরু, লম্বাটে এবং ক্যাপসুল আকৃতির ফল (Pod) হয়। ফলগুলো দেখতে অনেকটা ছোট সর্ষের ছড়ার মতো। ফল পরিপক্ব হলে ফেটে যায় এবং ভেতর থেকে অসংখ্য ছোট, কালচে-বাদামি বা কালো রঙের বীজ ছিটকে বের হয়। এই বীজের গায়ে সূক্ষ্ম দাগ বা খাঁজ (Ridges) থাকে।

আগাছা হিসেবে গণ্য হলেও লোকজ চিকিৎসায় বেগুনি হুড়হুড়ের ব্যবহার রয়েছে। এর পাতার রস কান পাকা রোগ, কানের ব্যথা এবং শরীরের বিভিন্ন অংশের বাতের ব্যথা উপশমে ব্যবহার করা হয়। বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গেছে, এই উদ্ভিদে প্রচুর পরিমাণে ফ্ল্যাভোনয়েড ও ফেনোলিকের উপাদান রয়েছে, যা শক্তিশালী অ্যান্টি অক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে। এর পাতার নির্যাসে ব্যাকটেরিয়া প্রতিরোধী (Antibacterial) গুণাগুণও পাওয়া গেছে। এ ছাড়া এর পাতার রস জৈব বালাইনাশক হিসেবে কিছু ক্ষতিকারক পোকা দমনে ব্যবহার করা যায়।

প্রকৃতির বুকে কোনো সৃষ্টিই বৃথা নয়–বেগুনি হুড়হুড়ে তার অন্যতম বড় প্রমাণ। পথের পাশে এই অতি সাধারণ গাছটি যেমন তার হালকা বেগুনি ফুলের হাসিতে আমাদের চারপাশকে সুন্দর করে তোলে, তেমনি এর ভেতরের ঔষধি গুণ মানব কল্যাণে ভূমিকা রাখে। একে স্রেফ আগাছা না ভেবে এর গুণাগুণ সম্পর্কে সচেতন হওয়া প্রয়োজন।

ওরে শুভ্রবসনা রজনীগন্ধা

প্রকাশ: ২৬ জুন ২০২৬, ০৯:০৮ এএম
ওরে শুভ্রবসনা রজনীগন্ধা
রমনা উদ্যানে ফোটা রজনীগন্ধা ফুল –ছবি লেখক

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের একটা বিরহের গানে রজনীগন্ধার রিক্ত রূপের মধ্যে যেন ফুটে উঠেছে এক প্রচণ্ড হাহাকার, শুভ্রতার আড়ালে থাকা নীল কষ্ট- ‘ওরে শুভ্রবসনা রজনীগন্ধা বনের বিধবা মেয়ে,/ হারানো কাহারে খুঁজিস নিশীথ-আকাশের পানে চেয়ে।’

রজনীগন্ধা ফুলকে কবি নজরুল তুলনা করেছেন বনের বিধবা মেয়ে হিসেবে যে আসলে সাথিহীন, নিরন্তর তার ফুটে ওঠা হয়তো কোনো সাথির খোঁজে। রমনা উদ্যানের নার্সারির ভেতরে গিয়েও দেখলাম রজনীগন্ধার সেই নিঃসঙ্গতাকে। দক্ষিণপূর্ব কোণে এক ফালি বেডে কয়েক সারি রজনীগন্ধা ফুলের গাছ। তবে সেখানে কোনো গাছে ফুল নেই, শুধু একটা গাছের মাঝখান থেকে পাতা ডিঙিয়ে যেন আকাশ ছুঁতে চাইছে এক ডাটি ফুল। গ্রীষ্মের এক সকালে রজনীগন্ধা ফুলের সেই একটি মঞ্জরিকে দেখেই মনে হলো- ‘চাহিছে আকাশ আনত-নয়ন সুন্দর তব চোখে,/ রজনী-গন্ধা তব মুখে চেয়ে বিকালে কানন-লোকে।’ নজরুলের এ কথাগুলো ব্যক্ত হয়েছে তার প্রার্থনা কবিতায়। কিন্তু সে কবিতাটি কোনো গ্রন্থেই নেই, (অপ্রকাশিত)।

রাতে ফোটে আর গন্ধটাও তার তীব্র, মনমাতানো সৌরভ আর প্রস্ফুটন কালের বিবেচনায় ওর নাম রাখা হয়েছে রজনীগন্ধা। রাতে সে ফুল চোখে না দেখলেও বোঝা যায় যে, বাগানে রজনীগন্ধা ফুল ফুটেছে। সেটি কবি নজরুল ইসলাম বেশ কয়েকবারই টের পেয়েছিলেন। শিউলিমালা গল্পে মুখার্জীর সঙ্গে দাবা খেলতে বসেছিলেন যে ঘরটাতে সে বাড়ির বর্ণনা দিতে গিয়েও তিনি রজনীগন্ধাকে টেনে এনেছেন।

তিনি লিখেছেন, ‘লেক-রোডের পাশে ছবির মতো বাড়িটি। শিউলির সাথে রজনীগন্ধার গন্ধ-মেশা হাওয়া মাঝে মাঝে হলঘরটাকে উদাস-মদির করে তুলছলি!’ আর তাতে যে তাদের দাবাখেলার ব্যাঘাত ঘটছিল সে কথা বলতেও তিনি ভোলেননি। ফুলের গন্ধের এমনই ক্ষমতা!

রজনীগন্ধা একটি কন্দজাতীয় বহুবর্ষজীবী বীরুৎ শ্রেণির গাছ। মাটির নিচে থাকা কন্দ বা পেঁয়াজের মতো মোথা থেকে এর গাছ জন্মে। পাতা সরু ও লম্বা। পাতাগুলো গোড়া থেকে চারদিকে ফোয়ারার জলধারার মতো ছড়িয়ে থাকে। পাতা ৩০ থেকে ৫০ সেন্টিমিটার লম্বা, কিছুটা স্থূল বা পুরু, ফিকে সবুজ। পাতাগুলোর মাঝ থেকে লম্বা একটি ডাটি বা কাঠির মতো শক্ত পুষ্পমঞ্জরির শীষে কয়েকটা ফুল পর্যায়ক্রমে পার্শ্বীয়ভাবে ফোটে। প্রায় ৯০ সেন্টিমিটার লম্বা মঞ্জরিদণ্ডের মাথায় ২৫ থেকে ৪০ সেন্টিমিটার স্থানজুড়ে ছোট ছোট কলিকার মতো ফুল সারিবদ্ধভাবে ফোটে। মঞ্জরিদণ্ডের নিচের ফুলগুলো আগে ফোটে ও ধীরে ধীরে ওপরের কুঁড়িগুলো ফোটে। ফুল ছোট কলিকার মতো, সুগন্ধযুক্ত, ধবধবে সাদা রঙের। লম্বা সবুজ ডাঁটায় ৬০টি পর্যন্ত ফুল ফুটতে পারে। 

সাদা মোমের মতো নলাকার ফুলের পাপড়ি মুখের কাছে প্রসারিত ও ছয়টি খণ্ডে বিভক্ত। পুষ্পনলের মধ্যে থাকে ছয়টি পুরুষকেশর ও তিন-ভাগযুক্ত একটি গর্ভমুণ্ড। এসব হলো সেসব ফুলের কথা যেগুলোর পাপড়ি থাকে এক স্তরে। বহুস্তরী পাপড়ির ডবল রজনীগন্ধা ফুলও আছে। সেসব জাতের ফুল বড়, কিন্তু ফুলের ঘ্রাণ কম, যা এ দেশে ‘ভুট্টা রজনীগন্ধা’ নামে পরিচিত। সম্প্রতি উদ্ভিদ প্রজননবিদদের কল্যাণে গোলাপি ও কমলা ফুলের রজনীগন্ধার জাত এ দেশে এসেছে। শোনা গেছে, অন্য দেশে নাকি লাল, হলুদ ও সবুজ রঙের রজনীগন্ধা ফুলও আছে। এবার বোধহয় রজনীগন্ধার বিধবা পরিচয় ঘুচবে। এ দেশে এখন যশোরের একটি বেসরকারি সংস্থা বাণিজ্যিকভাবে এসব জাত চাষের জন্য নিয়ে এসেছে বলে জানা গেছে। সাদা ফুলের সিঙ্গেল ও ডবল জাতের রজনীগন্ধা এখন দেশের অনেক স্থানেই বাণিজ্যিকভাবে চাষ করা হচ্ছে।

কলিকার মতো নলাকার ফুল আর গোলাপের মতোই সুগন্ধ। তাই রজনীগন্ধার ইংরেজি নাম রাখা হয়েছে টিউবরোজ। তবে উদ্ভিদতাত্ত্বিকরা বলেন, এ গাছের মাটির নিচে থাকা স্ফীত টিউব বা কন্দ থেকে এ ফুল জন্মে বলেই এর নাম হয়েছে টিউবরোজ। উদ্ভিদতাত্ত্বিক নাম Polianthes tuberosa ও গোত্র অ্যাসপ্যারাগাসি। রজনীগন্ধা মধ্য ও দক্ষিণ মেক্সিকোর গাছ। ১৭ শতক থেকে রজনীগন্ধা ফুল সুগন্ধী দ্রব্য উৎপাদনের জন্য ব্যবহৃত হয়ে আসছে। তৎকালীন ফরাসি রানিও সে সুগন্ধী ব্যবহার করতেন।

নজরুলের বেশ কয়েকটি গান, কবিতা ও গল্পে রজনীগন্ধা ফুলের উল্লেখ পাওয়া যায়। প্রায় সবক্ষেত্রেই এ ফুলকে তিনি প্রতীক করেছেন মানুষের ব্যথার সঙ্গে। ব্যথার দান বইয়ে ঘুমের ঘোরে গল্পটিতেও সে দৃশ্যকল্পটি এক অপার্থিব ঐন্দ্রজালিক মোহ তৈরি করে- ‘মদি খোশবুর মাদকতায় মলিকা-মালতীর মঞ্জুল মঞ্জরিমালা মলয় মারুতকে মাতিয়ে তুলেছিল উগ্র রজনীগন্ধার উদাস সুবাস অব্যক্ত অজানা একটা শোক-শঙ্কায় বক্ষ ভরে তুলেছিল।’ 

আইরিশ কবি অস্কার ওয়াইল্ড ১৮৮৫ সালে এক পত্রে লিখেছিলেন- ‘এটা শুনে আমি অত্যন্ত মর্মাহত যে, রজনীগন্ধা ফুলকে দলা-পাকানো ফুল বলে নামকরণ করা হয়েছে। এটি মোটেও দলা-পাকানো নয়, আর যদি তা হতোও, কোনো কবির এতটা হৃদয়হীন হওয়া উচতি নয় যে, তিনি এমন কথা বলবেন। এখন থেকে প্রতিটি শব্দের দুটি ব্যুৎপত্তি থাকা আবশ্যক–একটি কবির জন্য এবং অন্যটি বিজ্ঞানীর জন্য।’

লেখক: কৃষিবিদ ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ

বর্ষার জলমোরগ

প্রকাশ: ২৫ জুন ২০২৬, ০৮:২৭ এএম
বর্ষার জলমোরগ
চাঁপাইনবাবগঞ্জের রহনপুরের চরইল বিলের ধানখেতের ওপর উড়ন্ত পুরুষ জলমোরগ। ছবি: লেখক

২৯ জুন ২০১৮ সালের ঘটনা। অতি বিরল সোনাজঙ্ঘা (Painted Stork), খুন্তে বক (Eurasian Spoonbill) ও মাঝারি পানকৌড়ির (Indian Cormorant) ছবি তোলার জন্য চাঁপাইনবাবগঞ্জের ভারত সীমান্তবর্তী রহনপুরের চরইল বিলে এসেছি। পুরো সকালটা অরুণ মাঝির নৌকায় চড়ে বিলের বিভিন্ন স্থানে ঘুরে ঘুরে বিরল পাখিগুলোর ছবি তুললাম। এরপর রহনপুর প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক মাশওয়ারুল হক জিকেন ভাইয়ের মাছের খামার কাম আম বাগানে দুপুরের খাবারের আতিথ্য গ্রহণ করলাম। পেটপুরে মজাদার খাবার খেয়ে আবারও অরুণ মাঝির নৌকায় চড়ে বিলে নামলাম। ক্যামেরার ভিউ ফাইন্ডারে চোখ রেখে অপেক্ষায় আছি নতুন বা বিচিত্র কোনো পাখির দেখা পাই কি না। এমন সময় ধানখেতের ভেতর থেকে মাথায় লাল শিরস্ত্রাণযুক্ত একটি পাখি উড়াল দিল। সঙ্গে সঙ্গে ক্যামেরার শাটার গর্জে উঠল। খানিকটা পথ উড়ে পাখিটি মাটিতে নেমে মুহূর্তের মধ্যেই ঝোপের ভেতর যেন হাওয়া হয়ে গেল। যদিও বেশ দূর থেকে ক্লিক করলাম, কিন্তু ছবি একেবারে খারাপ হলো না। ত্রিশ বছর আগে বাগেরহাট জেলার ফকিরহাটের সাতশৈয়া গ্রামে প্রথম এই প্রজাতির একটি স্ত্রী পাখির ছবি তুলেছিলাম। ছেলেবেলায় আব্বার কাছে শুনেছিলাম এই পাখিকে পোষ মানিয়ে একই প্রজাতির বুনো পাখি ধরা হতো। গ্রামের অনেকেই এ কাজ করতেন। তবে বন্যপ্রাণী আইনে বুনো পাখি ধরা ও পোষা নিষিদ্ধ। 

রহনপুরের চরইল বিলের ধানখেতে হাওয়া হয়ে যাওয়া পাখিটি আর কেউ নয়, এ দেশের এক দুর্লভ আবাসিক পাখি জলমোরগ। এগুলো কোড়া বা বন কোড়া নামেও পরিচিত। ইংরেজি নাম Watercock বা Kora। র‌্যালিডি গোত্রের পাখিটির বৈজ্ঞানিক নাম গ্যালিক্রেক্স সিনেরিয়া। বাংলাদেশ ছাড়াও চীন এবং ফিলিপিন্সসহ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অনেক দেশেই পাখিটির দেখা মিলে।  

প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ ও স্ত্রী জলমোরগের দেহের দৈর্ঘ্য যথাক্রমে ৪২-৪৩ ও ৩৬ সেন্টিমিটার। ওজন যথাক্রমে ৩০০-৬৫০ ও ২০০-৪৩৪ গ্রাম। পুরুষ ও স্ত্রী পাখির পালকের রং একনজরে বাদামি। দেহের উপরটায় গাঢ় বাদামির ওপর হলদে রঙের ছোপ দেখা যায়। দেহের নিচের অংশে হলদের ওপর সরু বাদামি ডোরা থাকে। মাথার চাঁদি কালচে-বাদামি। কপালের সামনের ত্রিকোণাকার বর্মটি হলদে। চোখ ও চঞ্চু হলদে। লেজ খাটো ও আঙুল লম্বা। পা ও আঙুলের রং সবুজাভ। কিন্তু প্রজননকালে পুরুষের পালকের রং ধূসরাভ-কালো হয়ে যায়। দেহের উপরটায় ধূসর ও হলদে ছিট-ছোপ দেখা যায়। কপালে দেখা দেয় লাল টুকটুকে খাড়া বর্ম। চোখ ও চঞ্চুর রং হয় লালচে। পা ও আঙুল হয় সবুজাভ-লালচে। অপ্রাপ্তবয়স্ক পাখি দেখতে বড়গুলোর মতোই; তবে দেহতল লালচে-পীত। 

জলমোরগ হাওর, বিল, নলবন, জলাভূমি, প্লাবিত ধানখেত বা ঘাসবনে বিচরণ করে। অতি লাজুক পাখিটি দিবাচর হলেও খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। কারণ এরা লুকিয়ে লুকিয়ে চলাফেরা করে। সচরাচর একাকী বা জোড়ায় দেখা যায়। ভোরবেলা ও গোধূলিলগ্ন ছাড়াও বাদলা দিনে বেশ সক্রিয় থাকে। পানিতে ভাসমান আগাছায় বা ধানখেতে হেঁটে হেঁটে জলজ উদ্ভিদের বীজ ও গোড়া, ধান, খোলকজাতীয় প্রাণী, কীটপতঙ্গ, ছোট মাছ ইত্যাদি খায়। ‘উটুম্ব-উটুম্ব-উটুম্ব...’ স্বরে ডাকে।

আষাঢ় অর্থাৎ জুন থেকে আগস্ট প্রজননকাল। এ সময় পুরুষ পাখি নিজের সীমানা রক্ষা করতে অন্য পুরুষের সঙ্গে মারামারিও করতে পারে। নলবন, ভাসমান ধানগাছ বা জলাভূমির ঝোপঝাড়ে ধানগাছ বা ঘাস দিয়ে গোলাকার বাসা বানায়। ডিম পাড়ে ৫-৬টি। রং হলদে বা লালচে-বাদামি ছিটছোপসহ সাদা, ফ্যাকাশে বা ইট লাল। স্ত্রী একাই ডিমে তা দেয়। ডিম ফুটে ছানা বেরোতে ২৩ দিন সময় লাগে। ছানারা বাসা থেকে নেমে যখন মায়ের পেছন পেছন হেঁটে যায়, তখন দেখতে বেশ লাগে। আয়ুষ্কাল কমবেশি পাঁচ বছর। 

লেখক: পাখি ও বন্যপ্রাণী প্রজনন ও চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ
গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর

সৌন্দর্যে অনন্য গোলাপি অলকানন্দা

প্রকাশ: ২৪ জুন ২০২৬, ০৮:১৭ এএম
সৌন্দর্যে অনন্য গোলাপি অলকানন্দা
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বোটানিক্যাল গার্ডেনে গোলাপি অলকানন্দা ছবি: লেখক

গোলাপি অলকানন্দা একটি চমৎকার লতানো গুল্মজাতীয় উদ্ভিদ। এর মনোহরা গোলাপি রঙের ফুলের জন্য এটি বাগানবিলাসী মানুষের কাছে ভীষণ জনপ্রিয়। মূলত ব্রাজিলের আদি বাসিন্দা হলেও ক্রান্তীয় এবং উপক্রান্তীয় অঞ্চলের আবহাওয়ায় এ গাছটি দারুণভাবে মানিয়ে নিয়েছে। উদ্ভিদের বৈজ্ঞানিক নাম Allamanda blanchetii, এটি Apocynacae পরিবারের উদ্ভিদ। ইংরেজিতে এই উদ্ভিদ purple allamanda, violet allamanda নামে পরিচিত। 

গোলাপি অলকানন্দা একটি চিরসবুজ লতানো গুল্ম। উপযুক্ত অবলম্বন পেলে এটি লতার মতো বেয়ে ১০ থেকে ১৫ ফুট বা তার বেশি উঁচুতে উঠতে পারে। আবার নিয়মিত ছাঁটাই করলে একে সাধারণ গুল্ম বা ঝোপ হিসেবেও চমৎকারভাবে রাখা যায়। এর কাণ্ড কিছুটা নমনীয়, কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তা কাষ্ঠল রূপ নেয়।

এর পাতাগুলো গাঢ় সবুজ, মসৃণ এবং চকচকে। পাতাগুলো সাধারণত উপবৃত্তাকার বা ডিম্বাকার হয়ে থাকে। কাণ্ডের চারপাশ ঘিরে চার বা পাঁচটি পাতা চক্রাকারে (Whorled) সাজানো থাকে। পাতার এই ঘন বিন্যাস ফুলহীন অবস্থাতেও গাছটিকে বেশ দৃষ্টিনন্দন করে রাখে।

গোলাপি অলকানন্দার সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ হলো এর ফুল। ফুলগুলো দেখতে অনেকটা মাইক বা ট্রাম্পেটের (Trumpet-shaped) মতো। ফুল সাধারণত আড়াই থেকে তিন ইঞ্চি চওড়া হয়। এর রঙের শেডটি অসাধারণ। ফুলের পাপড়িগুলো হালকা বেগুনি থেকে শুরু করে গভীর ম্যাজেন্টা বা পার্পল রঙের হয়ে থাকে, আর ফুলের ভেতরের দিকটা বা গলাটা কিছুটা কালচে বা গাঢ় তামাটে বেগুনি রঙের হয়।

অনুকূল পরিবেশে ফুল শেষে গাছে ছোট, গোলাকার এবং কাঁটাযুক্ত ফল হতে দেখা যায়। তবে গৃহস্থালি বাগানে এই ফল খুব একটা চোখে পড়ে না। এই গাছটি যেমন সুন্দর, এর পরিচর্যা করাও কিন্তু বেশ সহজ। সামান্য যত্নেই এই গাছ থেকে প্রচুর ফুল পাওয়া সম্ভব। 

এই ফুল গাছ মূলত রৌদ্রোজ্জ্বল পরিবেশ পছন্দ করে। প্রচুর আলো পেলে এর ফুলের রং যেমন উজ্জ্বল হয়, তেমনি ফুলের সংখ্যাও বাড়ে। তবে হালকা ছায়াতেও এটি বেঁচে থাকতে পারে। সুনিষ্কাশিত এবং জৈব উপাদানসমৃদ্ধ সামান্য অম্লীয় মাটি এই গাছের বৃদ্ধির জন্য সবচেয়ে ভালো। গাছে নিয়মিত পানি দেওয়া উচিত, তবে গোড়ায় যেন পানি জমে না থাকে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।

বছরের শুরুর দিকে বা শীতের শেষে গাছটিকে হালকা ছেঁটে দিলে নতুন ডালপালা গজায় এবং বসন্ত ও গ্রীষ্মে প্রচুর ফুল ফোটে।

গোলাপি অলকানন্দা বহুবর্ষজীবী হওয়ায় বছরের প্রায় সিংহভাগ সময়ই, বিশেষ করে গ্রীষ্ম ও বর্ষাকালে এটি ফুলে ফুলে ভরে থাকে। বাগানের দেয়াল, তোরণ (Arch), ট্রেলিস বা বারান্দার গ্রিল বেয়ে ওঠার জন্য এটি আদর্শ। আবার বড় টবে লাগিয়ে ছাঁটাইয়ের মাধ্যমে একে সুন্দর একটি ঝোপের আকারও দেওয়া যায়।

Apocynaceae পরিবারের অন্যান্য গাছের মতো এর কাণ্ড বা পাতা ভাঙলে একধরনের সাদা আঠালো রস বা কষ বের হয়। এই রস ত্বকে লাগলে চুলকানি বা অ্যালার্জি হতে পারে, তাই গাছ ছাঁটাইয়ের সময় কিছুটা সতর্ক থাকা ভালো।

পরিশেষে বলা যায়, গোলাপি অলকানন্দার রাজকীয় বেগুনি আভা যেকোনো প্রকৃতিপ্রেমীর মন কেড়ে নিতে পারে। সামান্য পরিচর্যা আর প্রচুর ভালোবাসায় এ গাছটি আপনার বাগান বা বাড়ির আঙিনাকে করে তুলতে পারে অনন্য ও দৃষ্টিনন্দন।

লেখক: অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগ, মুমিনুন্নিসা সরকারি মহিলা কলেজ, ময়মনসিংহ

হারিয়ে যেতে বসা হলুদ পাহাড়ি কচ্ছপ উদ্ধার

প্রকাশ: ২৩ জুন ২০২৬, ০৯:২৭ এএম
আপডেট: ২৩ জুন ২০২৬, ০৯:৩১ এএম
হারিয়ে যেতে বসা হলুদ পাহাড়ি কচ্ছপ উদ্ধার
ছবি: খবরের কাগজ

চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় বস্তাবন্দি অবস্থায় হারিয়ে যেতে বসা একটি হলুদ পাহাড়ি কচ্ছপ উদ্ধার করেছে বন বিভাগ। পরে উদ্ধারকৃত কচ্ছপটিকে সংরক্ষিত বনাঞ্চলে অবমুক্ত করা হয়েছে।

গতকাল সোমবার বেলা ১২টার দিকে উপজেলার বাজালিয়া ইউনিয়ন পরিষদ কমপ্লেক্সের সামনে থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় বস্তাবন্দি কচ্ছপটিকে উদ্ধার করা হয়।

জানা যায়, বাজালিয়া ইউনিয়ন পরিষদ কমপ্লেক্সের সামনে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা দাঁড়িয়ে ছিল। চালক একটি দোকান থেকে খাবার খেয়ে অটোরিকশায় ওঠার সময় সামনের সিটের পাশে বস্তাবন্দি অবস্থায় কচ্ছপটি দেখতে পান। এর পর স্থানীয়রা বড়দুয়ারা বিট কাম চেক স্টেশন কর্মকর্তাকে খবর দেন। পরে তারা এসে হলুদ পাহাড়ি কচ্ছপটি উদ্ধার করে সংরক্ষিত বনাঞ্চলে অবমুক্ত করেন।

বড়দুয়ারা বিট কাম থেকে স্টেশন কর্মকর্তা মো. ফজলুল কাদের চৌধুরী বলেন, এটি মূলত মহাবিপন্ন প্রজাতির হলুদ পাহাড়ি কচ্ছপ। সাধারণত এরা ডাঙায় বসবাস করে। উদ্ধারের পরপরই কচ্ছপটি সংরক্ষিত বনাঞ্চলে অবমুক্ত করা হয়েছে।

প্রসঙ্গত, বন বিভাগ ও প্রকৃতি সংরক্ষণবিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা আইইউসিএনের হিসাবে বাংলাদেশে মোট ৩০ প্রজাতির কচ্ছপ পাওয়া যায়। এদের মধ্যে হলুদ পাহাড়ি কচ্ছপ হচ্ছে একটি মহাবিপন্ন প্রজাতি। এরা ডাঙাতেই বেশি সময় থাকে।

রূপবতী সাদা মথ গাছফড়িং

প্রকাশ: ২২ জুন ২০২৬, ০৮:২৩ এএম
রূপবতী সাদা মথ গাছফড়িং
মিরপুরে জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানে সম্প্রতি দেখা সাদা মথ গাছফড়িং। ছবি: লেখক

মিরপুর থেকে প্রকৃতিবন্ধু জিয়া ভাই গত ২৩ মে খবর দিলেন, জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানে বন আসরা গাছে ফুল ফুটেছে। দেখতে হলে যেন চট করে চলে যাই সেখানে। পরদিন যেতে পারলাম না, গেলাম তার পরের দিন, ২৫ মে। সকাল সকাল গিয়েও ব্যর্থ হলাম সে ফুল দেখতে। হায়! সব যে ঝরে গেছে। তলায় বাসি ও শুকনো বাদামি ফুল পড়ে আছে। ইয়া লম্বা বিশাল গাছের ডালপালার দিকে যতই তাকিয়ে ফুল খুঁজতে থাকি, কোথাও পাই না। হতাশ হয়ে তাই এবার নিচের দিকে তাকালাম। আশপাশের ঝোপঝাড়ে পোকামাকড় খুঁজতে লাগলাম। বেশ কয়েক রকমের মাকড়সার দেখা পেলাম। কিন্তু একটা গাছের ডালে পাতার আড়ালে লুকিয়ে বসে থাকা এমন একটি পোকার দেখা পেলাম, যা আগে দেখিনি।

পোকাটি দেখতে ছোট সাদা মথের মতো, কিন্তু এর তাঁবুর মতো ডানার গড়ন, সূক্ষ্ম মলিন মেরুন দাগের আঁকিবুঁকির দুধেল চেহারা দেখে মুগ্ধ হলাম। কে সে সুন্দরী? ছবি তুলে সেদিনের মতো ফিরে এলাম। আবার  ১৩ জুন গেলাম সে উদ্যানে। এবার অন্য স্পট, ক্যান্টিনের কাছাকাছি বাতিলতাগাছ।

এবার আরও বিস্মিত হলাম। একটা ডালে অনেকগুলো পোকা লাইন ধরে বসে আছে। একসঙ্গে এত পোকা? ১০-১২টা হবে। বিরক্ত করলেও উড়াল দিল না বা লাফাল না, একটু পাশ ফিরে শোয়ার মতো অবস্থানটা সামান্য বদলাল। কৌতূহল হলো এবার তাদের নিয়ে। এবারও ছবি তুলে ফিরে এসে তাকে চিনতে বসলাম বইপত্র ও ইন্টারনেট নিয়ে। ইন্টারনেট ঘেঁটে ওর পরিচয় জানা গেল অবশেষে। নাম তার সাদা মথ গাছফড়িং বা হোয়াইট মথ প্ল্যান্টহপার, তবে সে মথ না- হপার। এ পোকাটিকে নিয়ে কিছু গবেষণাপত্রও পেলাম নেটে। কিন্তু বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষের ২০তম খণ্ডে হেমিপ্টেরা বর্গের মধ্যে এ পোকাটির কোনো উল্লেখ পেলাম না। বাংলাদেশে এটি নথিভুক্ত কি না, তা জানা নেই।

একটি গবেষণাপত্রে দেখলাম, ভারতীয় কীটতত্ত্ববিদরা এ পোকাকে লাক্ষা উৎপাদী উদ্ভিদের ক্ষতিকর পোকা হিসেবে নতুনভাবে চিনেছেন। এ পোকার আশ্রয়দাতা বা পোষক গাছ হিসেবে তারা অড়হর, পলাশ, বরই, শিশুগাছজাতীয় বৃক্ষ ইত্যাদিকে চিহ্নিত করেছেন। এর আগে ফিলিপিন্স ও ভারতে কোকোয়া এবং কাঞ্চনগাছে এ পোকার আক্রমণ লক্ষ্য করা গেছে। এমনকি আসামে লেবুজাতীয় গাছ এদের দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হতে দেখা গেছে। ডালিয়া, জুঁই ও আমের মুকুলও এ পোকা দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যদিও এদের ক্ষতির মাত্রা খুব কম, তবুও তাকে এসব গাছের অপ্রধান ক্ষতিকর পোকা হিসেবে গণ্য করা হয়। 

গবেষকরা ঝাড়খন্ড রাজ্যের রাজধানী রাঁচির নামকুমে ফেব্রুয়ারি-মার্চে প্রাপ্তবয়স্ক পোকা ও নভেম্বর-ডিসেম্বরে এদের বাচ্চাদের দেখতে পেয়েছেন। আমি প্রাপ্তবয়স্ক পোকার দেখা পেলাম এ দেশে মে-জুনে। প্রাপ্তবয়স্ক স্ত্রী সাদা মথ গাছফড়িং কচি নরম পাতার মধ্যশিরায় ডিম পাড়ে। ডিম ফুটে বাচ্চারা বেরিয়েই প্রাপ্তবয়স্কদের মতো লাফাতে শুরু করে। বয়স ও বৃদ্ধির ওপর নির্ভর করে বাচ্চাদের আকার ছোট-বড় হয়। পূর্ণবর্ধিত নিম্ফ বা বাচ্চার দেহের দৈর্ঘ্য প্রায় ৪ মিলিমিটার ও মোমবৎ সূক্ষ্ম আঁশ দ্বারা আবৃত। রসাল পাতার নিচের দিকে বা শাখার ডগায় মোমজাতীয় ক্ষরিত পদার্থের লম্বা, কোঁকড়ানো পশমের মতো আঁশ বা তন্তু প্রায়শই বাচ্চাদের আড়াল করে রাখে। এদের ডানার প্যাডগুলো সুগঠিত, তাতে একটি কালো রঙের আড়াআড়ি রেখা ও পায়ুখণ্ডের পিঠে একটি কালো দাগ থাকে। পূর্ণাঙ্গ পোকা সাধারণত সাদা রঙের, ১০ থেকে ২০ মিলিমিটার লম্বা হয়। সবচেয়ে চওড়া অংশের মাপ হয় ৪-৫ মিলিমিটার। এদের সামনের ডানাজোড়া চওড়া, ত্রিভুজাকার, গোড়ার অংশে দুটি কমলা রঙের ডোরা দাগ থাকে। পোকাটিকে হঠাৎ দেখে একটা গোজ বা কীলক-আকৃতির বলে মনে হয়, যা ওপর থেকে দেখলে পার্শ্বীয়ভাবে চাপা দেখায়। পিছনের ডানাজোড়া স্বচ্ছ। 

এই গাছফড়িংরা সাধারণত গাছের কচি ডগা, নতুন পাতা ও ফুল থেকে রস চুষে খেয়ে শুকিয়ে ফেলে। শুধু তাই না, খাওয়ার সময় এরা একধরনের মিষ্টি মধুরস ছাড়ে যার কারণে সেখানে আঠালো চটচটে দাগ হয় ও সেসব আঠালো অংশে এক ধরনের কালো ছাতার মতো আবরণ পড়ে। এটি এক ধরনের ছত্রাক, কালি ছত্রাক বা শুঁটি মোল্ড। এতে পোষকগাছ দুর্বল ও রোগগ্রস্ত হয়ে পড়ে। এমনকি এর বাচ্চারাও রস চুষে খাওয়ার সময় একই কাজ করে, নিম্ফ বা বাচ্চার নিঃসৃত রসে কচি ডগা ঢেকে যায়।

সাদা মথ গাছফড়িং হেমিপ্টেরা বর্গের ফ্ল্যাটিডি গোত্রের এক ধরনের শোষক পোকা, প্রজাতিগত নাম Lawana conspersa. তিনটি ধাপে এদের জীবনচক্র সম্পন্ন হয়- ডিম, নিম্ফ ও পূর্ণাঙ্গ। যেহেতু এদের জীবনচক্রে কোনো পিউপা বা পুত্তলি  দশা নেই, তাই এদের জীবনচক্রকে অসম্পূর্ণ বলে গণ্য করা হয়। কোকোয়া গাছে এদের জীবনচক্র ১০৪.৭ দিনে সম্পন্ন হতে দেখা গেছে। এ দেশে এ পোকাটি নিয়ে বিস্তারিত গবেষণা হতে পারে।  

লেখক: কৃষিবিদ ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ