বেগুনি হুড়হুড়ে আমাদের চারপাশের চেনা প্রকৃতির এক সুপরিচিত কিন্তু অবহেলিত আগাছাজাতীয় উদ্ভিদ। রাস্তার পাশে, পরিত্যক্ত জমিতে কিংবা ফসলের খেতের আইলে ছোট ছোট বেগুনি ফুলের এ গাছটি প্রায়ই আমাদের চোখে পড়ে। অবহেলায় বেড়ে উঠলেও এই গাছের রয়েছে অনেক ঔষধি গুণাগুণ।
বেগুনি হুড়হুড়ের বৈজ্ঞানিক নাম Cleome rutidosperma, এটি Cleomaceae পরিবারের উদ্ভিদ। এটি ইংরেজিতে Blue Capparid, Fringed Spiderflower, Purple Cleome নামে পরিচিত। বেগুনি হুড়হুড়ে ক্রান্তীয় আফ্রিকা অঞ্চলের আদি উদ্ভিদ হলেও এটি বর্তমানে বাংলাদেশ, ভারতসহ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে এটি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। বেগুনি হুড়হুড়ের ছবিটি গত ১৩ জুন ময়মনসিংহ আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তার কার্যালয়ের পেছন থেকে তুলেছি।
বেগুনি হুড়হুড়ে একটি একবর্ষজীবী, খাড়া বা কিছুটা শায়িত ভেষজ উদ্ভিদ। উদ্ভিদটি সাধারণত ১৫ থেকে ৭০ সেন্টিমিটার (প্রায় ১ থেকে ২.৫ ফুট) পর্যন্ত লম্বা হয়ে থাকে। এর কাণ্ড নরম, সবুজ এবং বহু শাখাবিশিষ্ট। কাণ্ডের গায়ে সূক্ষ্ম লোম এবং ছোট ছোট নরম কাঁটা বা খাঁজ দেখা যায়, যা একে খসখসে ভাব দেয়। এর পাতাগুলো যৌগিক এবং ত্রিপত্রক (Trifoliate)। অর্থাৎ একটি বোঁটায় তিনটি করে ছোট পাতা বা ফলক থাকে। পাতাগুলোর আকৃতি ডিম্বাকার বা ল্যান্সের মতো (Lanceolate)। পাতার কিনারা মসৃণ বা সামান্য খাঁজকাটা হতে পারে এবং পাতার উপরিভাগ ও নিচের পিঠে হালকা লোম থাকে।
এই উদ্ভিদের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ হলো এর ফুল। ফুলগুলো আকারে বেশ ছোট এবং এর রং হালকা বেগুনি থেকে নীলচে-বেগুনি হয়ে থাকে। প্রতিটি ফুলে ৪টি পাপড়ি থাকে, যা ওপরের দিকে ডানা মেলার মতো করে সাজানো থাকে।
ফুল থেকে ৪টি দীর্ঘ পুংকেশর বাইরের দিকে বের হয়ে থাকে, যা দেখতে কিছুটা মাকড়সার পায়ের মতো দেখায়। এই কারণেই একে ‘স্পাইডার ফ্লাওয়ার’ বলা হয়। সাধারণত সারা বছরই, বিশেষ করে বর্ষাকালের ভ্যাপসা গরমে এই গাছে ফুল ফুটতে দেখা যায়। ফুল ফোটার পর গাছে সরু, লম্বাটে এবং ক্যাপসুল আকৃতির ফল (Pod) হয়। ফলগুলো দেখতে অনেকটা ছোট সর্ষের ছড়ার মতো। ফল পরিপক্ব হলে ফেটে যায় এবং ভেতর থেকে অসংখ্য ছোট, কালচে-বাদামি বা কালো রঙের বীজ ছিটকে বের হয়। এই বীজের গায়ে সূক্ষ্ম দাগ বা খাঁজ (Ridges) থাকে।
আগাছা হিসেবে গণ্য হলেও লোকজ চিকিৎসায় বেগুনি হুড়হুড়ের ব্যবহার রয়েছে। এর পাতার রস কান পাকা রোগ, কানের ব্যথা এবং শরীরের বিভিন্ন অংশের বাতের ব্যথা উপশমে ব্যবহার করা হয়। বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গেছে, এই উদ্ভিদে প্রচুর পরিমাণে ফ্ল্যাভোনয়েড ও ফেনোলিকের উপাদান রয়েছে, যা শক্তিশালী অ্যান্টি অক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে। এর পাতার নির্যাসে ব্যাকটেরিয়া প্রতিরোধী (Antibacterial) গুণাগুণও পাওয়া গেছে। এ ছাড়া এর পাতার রস জৈব বালাইনাশক হিসেবে কিছু ক্ষতিকারক পোকা দমনে ব্যবহার করা যায়।
প্রকৃতির বুকে কোনো সৃষ্টিই বৃথা নয়–বেগুনি হুড়হুড়ে তার অন্যতম বড় প্রমাণ। পথের পাশে এই অতি সাধারণ গাছটি যেমন তার হালকা বেগুনি ফুলের হাসিতে আমাদের চারপাশকে সুন্দর করে তোলে, তেমনি এর ভেতরের ঔষধি গুণ মানব কল্যাণে ভূমিকা রাখে। একে স্রেফ আগাছা না ভেবে এর গুণাগুণ সম্পর্কে সচেতন হওয়া প্রয়োজন।