বিশ্বকাপের মঞ্চে প্রতিটি দলই লড়ে প্রতিপক্ষকে হারানোর জন্য। কিন্তু ২০২৬ বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে সেই লড়াই সীমাবদ্ধ থাকছে না শুধু ৯০ মিনিটের ফুটবলে। মাঠে প্রতিপক্ষের পাশাপাশি খেলোয়াড়দের মোকাবিলা করতে হচ্ছে প্রকৃতিরও। যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে বিস্তৃত ‘হিট ডোম’ এমন এক তাপপ্রবাহের জন্ম দিয়েছে, যা বড় প্রভাব ফেলছে মাঠের পারফরম্যান্সে। আবহাওয়াবিদদের মতে, এই হিট ডোমের কারণে আগামী কয়েক দিন বিপজ্জনক মাত্রার তাপপ্রবাহ অব্যাহত থাকবে।
‘হিট ডোম’ তাপ ও আর্দ্রতাকে একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের ওপর আটকে রাখে। এর ফলে দিনের পর দিন তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায় এবং পরিবেশ আরও অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে। মার্কিন জাতীয় আবহাওয়া পরিসেবার পূর্বাভাস অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্য-পশ্চিম ও পূর্ব উপকূলের কিছু এলাকায় হিট ইনডেক্স ১০৫ থেকে ১১৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। অর্থাৎ শরীর যে তাপমাত্রা অনুভব করবে, তা বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছে যেতে পারে।
এই তাপপ্রবাহ যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা দিবস ফোর্থ অব জুলাইয়ের ছুটির সপ্তাহান্ত পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। এ বছর দেশটি তাদের স্বাধীনতার ২৫০তম বার্ষিকী উদযাপন করছে। ফলে টরন্টো, কানসাস সিটি, নিউ জার্সির ইস্ট রাদারফোর্ড এবং ফিলাডেলফিয়ায় অনুষ্ঠিতব্য বিশ্বকাপ ম্যাচগুলোও এই তীব্র গরমের প্রভাবের মধ্যে পড়বে। সাধারণত সন্ধ্যার পর তাপমাত্রা কিছুটা কমে আসে। কিন্তু এবার সেই স্বস্তিও মিলবে না বলে মনে করছেন আবহাওয়াবিদরা।
আগামী ৫ জুলাই নিউ জার্সিতে শেষ ষোলোর ম্যাচ খেলবে ব্রাজিল। সেদিন নিউইয়র্কে ২০১৩ সালের পর সর্বোচ্চ তাপমাত্রা দেখা যেতে পারে– এমনটাই জানিয়েছেন অ্যাকুওয়েদারের জ্যেষ্ঠ আবহাওয়াবিদ অ্যালান রেপার্ট। তিনি বলেন, ‘সূর্য ডুবে যাওয়ার পরও প্রচণ্ড গরম থাকবে। আমরা এমন একটি আবহাওয়ার ধরনে রয়েছি, যেখানে দিনের বেশির ভাগ বিকেল এবং এমনকি সন্ধ্যার সময়ও প্রচণ্ড গরম থাকবে।’
সন্ধ্যার ম্যাচগুলোতেও গরম পুরোপুরি কমবে না বলেই মনে করেন তিনি, ‘তখন সূর্য ডুবে যাবে। এতে পরিস্থিতি কিছুটা ভালো হবে, কিন্তু তার পরও গরম থাকবে।’
হিট ডোমের আওতায় থাকা ম্যাচ ভেন্যুগুলোর মধ্যে আটলান্টা, ডালাস ও হিউস্টনের স্টেডিয়ামগুলোতে রয়েছে খোলা-বন্ধ করা যায় এমন ছাদ এবং শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা। ফলে এসব স্টেডিয়ামের ভেতরে খেলোয়াড় ও দর্শকরা তুলনামূলক স্বস্তি পাবেন। তবে স্টেডিয়ামে পৌঁছানোর পথ সব জায়গায় এতটা আরামদায়ক নয়। বিশেষ করে ডালাসে আধুনিক স্টেডিয়ামে হাঁটতে যাওয়াটাই অনেকের কাছে আগুনের ওপর দিয়ে হাঁটার মতো অনুভূতি হতে পারে। কারণ কংক্রিট ও অ্যাসফল্টে (পিচের রাস্তা) ভরা, গাড়িনির্ভর টেক্সাসের এই শহরটি তাপ শোষণের দিক থেকে সবার ওপরে।
নিউ জার্সির হ্যাকেনস্যাক ইউনিভার্সিটি মেডিকেল সেন্টারের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক আলিনা মিতিনা সমর্থকদের যতটা সম্ভব ছায়াযুক্ত স্থানে থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। একই সঙ্গে মাথা ঘোরা বা তাপজনিত অসুস্থতার প্রাথমিক লক্ষণগুলো সম্পর্কে সতর্ক থাকার কথাও বলেছেন। তিনি বলেন, ‘এ ধরনের পরিস্থিতিতে ছায়াযুক্ত স্থান সত্যিই মানুষের জীবন বাঁচাতে পারে। তাই পর্যাপ্ত ছায়া এবং পানি কেনার ব্যবস্থা থাকলে, আমার মনে হয় সবাই অনেক ভালো অবস্থায় থাকবে।’
এক বছর আগে যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত ক্লাব বিশ্বকাপেও তীব্র গরম বড় আলোচনার বিষয় ছিল। সে সময় আন্তর্জাতিক ফুটবলারদের সংগঠন ফিফপ্রো এই পরিস্থিতিকে একটি ‘সতর্কবার্তা’ হিসেবে উল্লেখ করেছিল। সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার বিশ্বকাপে প্রতিটি ম্যাচের দুই অর্ধেই বাধ্যতামূলক তিন মিনিটের হাইড্রেশন বিরতি চালু করেছে ফিফা। এই সিদ্ধান্তকে অনেকেই খেলোয়াড়দের স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন। তবে সমালোচকদের মতে, বারবার খেলা থেমে যাওয়ায় ম্যাচের স্বাভাবিক ছন্দ নষ্ট হয়।