নকআউট পর্বের শুরু থেকেই লড়াই দারুণভাবে জমে উঠেছে। জাপানের বিপক্ষে ব্রাজিল জিতলেও ঘাম ঝরাতে হয়েছে। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন জার্মানি ও তিনবারের রানার্সআপ নেদারল্যান্ডসের। দুটি দলই মঙ্গলবার শেষ বত্রিশ রাউন্ডের ম্যাচে টাইব্রেকারে হেরে বিদায় নিয়েছে। রোমাঞ্চকর ও নাটকীয়তায় ভরপুর এমন মঞ্চে মাঠে নামছে এবারের বিশ্বকাপের প্রধান আয়োজক যুক্তরাষ্ট্র। তাদের প্রতিপক্ষ ইউরোপের সমীহ জাগানো দল বসনিয়া অ্যান্ড হার্জেগোভিনা। সান ফ্রান্সিসকোর সান্ত ক্লারার লেভাইস স্টেডিয়ামে ম্যাচটি মাঠে গড়াবে বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) সকাল ৬টায়।
‘বি’ গ্রুপ থেকে তৃতীয় সেরা দলের একটি হয়ে নকআউটে এসেছে বসনিয়া। স্বাগতিক কানাডার সঙ্গে ১-১ গোলে ড্র করে মিশন শুরুর পর সুইজারল্যান্ডের কাছে অসহায় আত্মসমর্পণ করে ৪-১ গোলে। শেষ ম্যাচে কাতারকে ৩-১ গোলে হারিয়ে শেষ পর্যন্ত টিকিট কেটেছে নকআউটের। অন্যদিকে স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্র ‘ডি’ গ্রুপের সেরা হয়ে নকআউটে এসেছে। নিজেদের প্রথম দুই ম্যাচে প্যারাগুয়ে ও অস্ট্রেলিয়াকে সহজে হারালেও অপ্রত্যাশিতভাবে শেষ ম্যাচে ছিটকে পড়া তুরস্কের কাছে হার মানে ৩-২ গোলে। যে কারণে বসনিয়ার বিপক্ষে মাঠে নামার আগে বেশ সতর্ক মার্কিন শিবির।
নকআউট পর্বের এই ম্যাচটি এক ভিন্ন রঙের লড়াই। একদিকে স্বাগতিকরা নিজেদের মাটিতে ইতিহাস লেখার স্বপ্নে বিভোর। অন্যদিকে বসনিয়া অদম্য সাহস, ইস্পাতকঠিন মানসিকতা আর চমক দেখানোর প্রবল ইচ্ছা নিয়ে হাজির। এই ম্যাচে শুধু একটি জয় নয়, বাজি রাখা আছে গর্ব, আবেগ এবং স্বপ্নের ভবিষ্যৎ। যুক্তরাষ্ট্রের শক্তি তাদের গতি, প্রেসিং এবং আক্রমণে বৈচিত্র্য। কোচ মরিসিও পোচেত্তিনোর অধীনে দলটি অনেক বেশি সংগঠিত এবং আত্মবিশ্বাসী। ফোলারিন বালোগুন, জিও রেইনা, ক্রিশ্চিয়ান পুলিসিচ-এই ত্রয়ী মুহূর্তেই ম্যাচের চিত্র বদলে দিতে পারে। বিশেষ করে পুলিসিচের সৃজনশীলতা ও বালোগুনের ফিনিশিং আমেরিকার সবচেয়ে বড় অস্ত্র।
অন্যদিকে বসনিয়া যেন নিঃশব্দ এক ঝড়। খুব বেশি আলোচনায় না থাকলেও দলটি খুব গোছালো। তাদের ফুটবল হয়তো চোখ ধাঁধানো নয়, কিন্তু কার্যকর। কম সুযোগ তৈরি করেও প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে জানে তারা। বসনিয়ার সবচেয়ে বড় নাম নিঃসন্দেহে এডিন জেকো। অভিজ্ঞ এই স্ট্রাইকারের এটি শেষ বিশ্বকাপ। বয়স হয়তো বেড়েছে, কিন্তু বড় ম্যাচে গোলের ক্ষুধা এখনো অটুট। বসনিয়ার স্বপ্ন একটাই– আমেরিকার গতি থামিয়ে ম্যাচটিকে ধৈর্যের লড়াইয়ে নিয়ে যাওয়া। স্বাগতিক হওয়া যেমন আশীর্বাদ, তেমনি কখনো কখনো চাপেরও নাম। গ্যালারিভর্তি সমর্থক, কোটি মানুষের প্রত্যাশা-সবকিছুই যুক্তরাষ্ট্রের কাঁধে বাড়তি দায়িত্ব চাপিয়ে দিয়েছে। এই ম্যাচে তারা ফেবারিট, কিন্তু নকআউটে ফেবারিট তকমার মূল্য খুব কম। একটি ভুল, একটি মুহূর্তের মনোযোগহীনতা সব স্বপ্ন ভেঙে দিতে পারে।
একদিকে আমেরিকার গর্জন, অন্যদিকে বসনিয়ার নীরব ঝড়, একদিকে গ্যালারির গর্জন, অন্যদিকে আন্ডারডগের সাহস। একদিকে স্বপ্নের ভার, অন্যদিকে হারানোর কিছু না থাকার স্বাধীনতা। ফুটবলপ্রেমীদের জন্যও এটি শুধু একটি ম্যাচ নয়, এটি আবেগের এক বিস্ফোরণ। এখন দেখার শেষ পর্যন্ত কোন দল ইতিহাস গড়ে বাজিমাত করে।
যুক্তরাষ্ট্রের কোচ মরিসিও পচেত্তিনো ম্যাচের আগে খেলোয়াড়দের সতর্ক করে দিয়েছেন। তার মতে, বসনিয়াকে দুর্বল ভাবার সুযোগ নেই। পচেত্তিনো বলেন, ‘নকআউট ম্যাচে ফেবারিট বলে কিছু থাকে না। ৯০ মিনিটে একটি ভুল পুরো টুর্নামেন্ট শেষ করে দিতে পারে।’ তিনি বিশেষভাবে বসনিয়ার জমাট রক্ষণ এবং দ্রুত কাউন্টার অ্যাটাকের কথা উল্লেখ করেন। বিশেষ করে সেট-পিসে বসনিয়া বিপজ্জনক হতে পারে বলে মনে করছেন তিনি।
মার্কিন অধিনায়ক টিম রিম বলেন, ‘বসনিয়াকে ছোট করে দেখার কোনো সুযোগ নেই। এটা বিশ্বকাপের নকআউট। এখানে প্রতিটি দলই নিজেদের প্রমাণ করে এসেছে।’
তিনি আরও যোগ করেন, ‘বসনিয়া খুব সংগঠিত দল। তারা দ্রুত ম্যাচের পরিস্থিতি বদলে দিতে পারে। আমাদের শুরু থেকেই মনোযোগী থাকতে হবে।’
অন্যদিকে বসনিয়ার কোচ সার্জেই বারবারেজ জানিয়ে দিয়েছেন, তার দল ভয় পেয়ে খেলবে না। সাবেক কিংবদন্তি ফুটবলার বারবারেজ বলেন, ‘আমরা এখানে শুধু অংশ নিতে আসিনি। লড়াই করতে এসেছি। যুক্তরাষ্ট্র ভালো দল, তাদের গতি ও আক্রমণভাগ শক্তিশালী। কিন্তু আমাদেরও নিজস্ব পরিকল্পনা আছে। আমরা নিজেদের ফুটবল খেলব।’
বসনিয়ার অভিজ্ঞ ৪০ বছর বয়সী অধিনায়ক এডিন জেকো বলেন, ‘এ ধরনের ম্যাচই খেলোয়াড়দের ক্যারিয়ারে স্মরণীয় হয়ে থাকে। আমরা জানি যুক্তরাষ্ট্র ফেবারিট। কিন্তু ফুটবল কাগজে-কলমে খেলা হয় না। মাঠেই সব প্রমাণ করতে হয়।’
মুখোমুখি পরিসংখ্যান
মোট ম্যাচ: ৩
যুক্তরাষ্ট্র জয়: ২
ড্র: ১
বসনিয়া জয়: ০
যুক্তরাষ্ট্রের গোল: ৫
বসনিয়ার গোল: ৩
** বিশ্বকাপে এবারই প্রথম মুখোমুখি হচ্ছে দুই দেশ।