চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে (চবি) জায়ান্ট স্ক্রিনে ফুটবল ম্যাচ দেখার সময় সিগারেট খাওয়াকে কেন্দ্র করে ছাত্রদল ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া স্টুডেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের মধ্যে দুই দফা মারামারির ঘটনা ঘটেছে। এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে গিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ও সহকারী প্রক্টরসহ কয়েকজন আহত হয়েছেন। একই ঘটনায় ছাত্রশক্তি ও ছাত্রদলের দুই নেতাও মারধরের শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
জানা যায়, গত ২৯ জুন রাত ১১টায় ছাত্রদলের উদ্যোগে জায়ান্ট স্ক্রিনে ব্রাজিল বনাম জাপান ফুটবল ম্যাচ দেখানোর আয়োজন করা হয়। এ সময় ছাত্রদলের ভলান্টিয়াররা আয়োজকের দায়িত্ব পালন করছিলেন।
খেলার হাফটাইমে মার্কেটিং বিভাগের ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ দিশান ও একই বিভাগের শিক্ষার্থী ইয়াফির সঙ্গে ছাত্রদলের ক্রীড়া সম্পাদক এবং ক্রীড়াবিজ্ঞান বিভাগের ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মামুনের কথা-কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে তাদের মধ্যে ধস্তাধস্তির ঘটনা ঘটে।
পরে ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল নোমান দিশানকে ঘটনাস্থল থেকে সরিয়ে নিয়ে যান এবং বিষয়টি নিয়ে বাড়াবাড়ি না করার পরামর্শ দেন। তবে এ সময় দিশান ও ইয়াফি ছাত্রদলের কয়েকজন নেতাকর্মীর হাতে মারধরের শিকার হন বলে অভিযোগ ওঠে।
প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, ঘটনার জের ধরে মঙ্গলবার (৩০ জুন) রাত ১২টার দিকে জিরো পয়েন্ট এলাকায় দিশান, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া স্টুডেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য পলাশ মোল্লাসহ কয়েকজন মামুনকে মারধর করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
ঘটনার পর তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের শাহজালাল হলে আশ্রয় নেন। ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা সেখানে পৌঁছানোর পর তাদের সামনেই মারধরের ঘটনায় জড়িত দুজনকে মোটরসাইকেলে করে আলাওল হলে নিয়ে যান ছাত্রশক্তি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শাখার মুখ্যসচিব উলফাতুর রহমান রাকিব।
ছাত্রদলের অভিযোগ, মারধরের ঘটনায় অভিযুক্ত পলাশ মোল্লা ছাত্রশক্তির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকায় রাকিব তাকে সরিয়ে নিতে সহায়তা করেন এবং তিনিও ঘটনায় জড়িত।
এরপর ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা রাকিবকে ফোন করে ঘটনাস্থলে ডাকেন। সেখানে গেলে তাকেও মারধর করা হয় বলে অভিযোগ ওঠে। এ সময় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে গিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক হোসেন শহীদ সরওয়ার্দী ও সহকারী প্রক্টরও আহত হন।
ঘটনা সম্পর্কে ছাত্রদলের ক্রীড়া সম্পাদক মামুন বলেন, ’গতদিন দিশান ও ইয়াফি খেলা দেখার স্থানে সিগারেট খাচ্ছিল। আমি তাদের বাধা দিলে ধাক্কাধাক্কির ঘটনা ঘটে। আজ আমি কয়েকজনকে নিয়ে খেলা দেখতে যাচ্ছিলাম। এ সময় দিশান, পলাশ মোল্লা, আরবি বিভাগের ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের রেজাউরসহ আরও কয়েকজন এসে আমাদের মারধর করে। পরে আমরা একত্রিত হলে ছাত্রশক্তির নেতা উলফাতুর রহমান রাকিব দিশান ও পলাশ মোল্লাকে মোটরসাইকেলে করে সরিয়ে নিয়ে যায়। পরে তাদের নামিয়ে দিয়ে ফিরে আসলে সেখানে আবার অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে।’
এ বিষয়ে দিশানের সঙ্গে ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে মারধরের শিকার ছাত্রশক্তি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শাখার মুখ্যসচিব উলফাতুর রহমান রাকিব বলেন, ’আমি তখন ক্যাম্পাসে ছিলাম না। পরে আমার বন্ধু পলাশ মোল্লা ফোন দিয়ে জানায় তাকে শাহজালাল হল থেকে মেডিকেলে নিয়ে যেতে। আমি মোটরসাইকেলে করে তাদের মেডিকেলে পৌঁছে দিই। এরপর ছাত্রদলের কয়েকজন আমাকে শাহজালাল হলের সামনে ডাকে। সেখানে গেলে আমাকে মারধর করা হয়।’
ব্রাহ্মণবাড়িয়া স্টুডেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী পলাশ মোল্লা বলেন, ’ওই রাতে খেলাকে কেন্দ্র করে আমাদের জুনিয়র দিশানকে ছাত্রদলের কয়েকজন কর্মী মারধর করেছিলেন। পূর্বের সেই ঘটনার জের ধরে আজ রাতে জিরো পয়েন্টে দিশানের সঙ্গে আবারও কথা-কাটাকাটি ও উত্তেজনা সৃষ্টি হয়।’
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাবেদ বলেন, ’জিরো পয়েন্টে আমাদের এক জুনিয়র মামুনের ওপর হামলা করা হয়। আমরা উপস্থিত হতে না হতেই দেখতে পাই ছাত্রশক্তি নেতা উলফাতুর রহমান রাকিব দুইজনকে নিয়ে দ্রুত মোটরসাইকেলে চলে যায়। তারা সবাই বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্রাহ্মণবাড়িয়া স্টুডেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য।’
ছাত্রদলের সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. ইয়াসিন বলেন, ’আমাদের কর্মী মামুনের ওপর হামলার পর কারও মাথা ঠিক ছিল না। এজন্য এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে। তবে আমাদের কোনো সদস্য যদি অন্যায়ের সঙ্গে জড়িত থাকে, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক হোসেন শহীদ সরওয়ার্দী বলেন, ’গতকালের খেলা এবং সেটিকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট মতভেদের জেরে দুই পক্ষের মধ্যে হাতাহাতি হয়েছে। দুই পক্ষকে থামাতে গিয়ে আমি মাঝখানে ছিলাম। আপাতত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং একজন আহত হয়েছেন। আমরা তথ্য ও ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব। আগামীকাল দুই পক্ষকেই ডাকা হয়েছে। আর সাংবাদিকদের যে হেনস্থা করা হয়েছে, সাংবাদিকরা সমাজের আয়না। আশা করি ছাত্রদলও এ বিষয়ে সাংগঠনিক পদক্ষেপ নেবে।’
আল আরাফ/খাদিজা রুমি/