প্রতিষ্ঠার ১০৫ বছর অতিক্রম করে ১০৬ বছরে পদার্পণ করছে প্রাচ্যের অক্সফোর্ডখ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। এক শতাব্দীর বেশি সময় ধরে জ্ঞানচর্চার এই বিদ্যাপীঠ শুধু ডিগ্রি প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান হয়ে থাকেনি; বরং অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, গণতন্ত্রের পক্ষে অবস্থান এবং জাতীয় চেতনার অন্যতম প্রধান বাতিঘর হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
বাংলার ইতিহাসের প্রায় প্রতিটি সন্ধিক্ষণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রথমেই সংযুক্ত হয়েছে। ভাষার অধিকারের প্রশ্নে ১৯৪৮ থেকে ১৯৫২ সালের আন্দোলন, ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৬ সালের ছয় দফা, ১৯৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থান, ১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন কিংবা সাম্প্রতিক ২০২৪ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলন; প্রতিটি পর্বেই এই ক্যাম্পাস হয়ে উঠেছে প্রতিরোধের ভাষা, সাহসের ঠিকানা। ইতিহাসের কঠিন মুহূর্তে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা শুধু দর্শক হয়ে থাকেননি; বরং সময়ের প্রয়োজনে নেতৃত্ব দিয়েছেন, উৎসর্গ করেছেন জীবন, লিখেছেন জাতির নতুন অধ্যায়।
বিশ্বের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ই জ্ঞানচর্চায় খ্যাতির শিখরে পৌঁছেছে। কিন্তু একটি রাষ্ট্রের জন্ম, বিকাশ ও গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার সঙ্গে এত গভীরভাবে জড়িয়ে থাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদাহরণ খুব বেশি নেই। তাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নাম নয়; এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা ও বিবর্তনের জীবন্ত দলিল।
এই প্রতিষ্ঠানের জন্মও ঘটে দীর্ঘ সংগ্রামের ভেতর দিয়ে। বঙ্গভঙ্গ-পরবর্তী সময়ে পূর্ব বাংলায় উচ্চশিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণের দাবির প্রেক্ষাপটে ১৯১২ সালের ২ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের ভাইসরয় লর্ড হার্ডিঞ্জ পূর্ববঙ্গে একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দেন। এরপর ঢাকার উচ্চবর্ণের হিন্দু জমিদার এবং উচ্চশ্রেণির মুসলমানদের মিলিত উদ্যোগে এগিয়ে যায় সেই স্বপ্ন। জগন্নাথ হলের জন্য জমি ও অর্থ দান করেন বালিয়াটির জমিদার কিশোরী লাল। কার্জন হলের জন্য ভাওয়াল রাজকুমাররা জমি ও আর্থিক সহায়তা প্রদান করেন। নবাব স্যার সলিমুল্লাহ, নবাব সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী, শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকসহ তৎকালীন মুসলিম নেতারাও এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
১৯১২ সালে ব্যারিস্টার আর. নাথানের নেতৃত্বে গঠিত কমিটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সুপারিশ করে। ১৯১৩ সালে নাথান কমিটির প্রতিবেদন এবং একই বছরের স্যাডলার কমিশনের ইতিবাচক মতামতের ভিত্তিতে ১৯২০ সালের ১৩ মার্চ ভারতীয় আইনসভায় পাস হয় ‘দ্য ঢাকা ইউনিভার্সিটি অ্যাক্ট, ১৯২০।’ এরপর ১৯২১ সালের ১ জুলাই রমনার সবুজ প্রান্তরে প্রায় ৬০০ একর জমির ওপর আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। আজকের সেই দিনটিই উদযাপিত হবে বিশ্ববিদ্যালয় দিবস হিসেবে।
এবারের ১০৬তম বিশ্ববিদ্যালয় দিবসের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে– ‘গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও উচ্চশিক্ষায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।’ প্রতিপাদ্যটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অতীত ও বর্তমানের মধ্যে সেতুবন্ধ তৈরি করেছে। এই প্রতিষ্ঠান বরাবর সমাজ, রাষ্ট্র, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও মুক্তবুদ্ধির চর্চাকে প্রাধান্য দিয়েছে।
দিবসটি উপলক্ষে আজ বুধবার সকাল থেকেই উৎসবের রঙে রঙিন হবে পুরো ক্যাম্পাস। বিভিন্ন হল ও হোস্টেল থেকে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা শোভাযাত্রাসহ স্মৃতি চিরন্তন চত্বরে সমবেত হবেন। সেখান থেকে উপাচার্যের নেতৃত্বে বের হবে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা। টিএসসি প্রাঙ্গণে জাতীয় পতাকা, বিশ্ববিদ্যালয় ও হলগুলোর পতাকা উত্তোলনের পাশাপাশি কেক কাটার মধ্য দিয়ে শুরু হবে আনুষ্ঠানিকতা। সংগীত বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা পরিবেশন করবেন জাতীয় সংগীত, বিশ্ববিদ্যালয়ের থিম সং, রবীন্দ্রসংগীত ও নজরুলসংগীত। বিদেশি শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ অনুষ্ঠানটিকে দেবে আন্তর্জাতিকতার ভিন্ন মাত্রা।
এরপর টিএসসি মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হবে আলোচনা সভা। ‘গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও উচ্চশিক্ষায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়’ শীর্ষক এ আলোচনায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন ইংরেজি বিভাগের ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। একই দিনে সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের উদ্যোগেও আয়োজন করা হয়েছে বিশেষ প্যানেল আলোচনা, যেখানে দেশের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও অর্থনীতিবিদরা অংশ নেবেন।
দিবসটি ঘিরে ক্যাম্পাসের নিরাপত্তাব্যবস্থাও জোরদার করা হয়েছে। দুপুর আড়াইটা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় যানবাহন চলাচল নিয়ন্ত্রিত থাকবে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের এই উদ্যোগের লক্ষ্য, উৎসবমুখর পরিবেশে নির্বিঘ্নভাবে কর্মসূচি সম্পন্ন করা।
কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের সাফল্য কেবল তার র্যাঙ্কিং, গবেষণা কিংবা অবকাঠামো দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। একটি বিশ্ববিদ্যালয় কতটা সমাজকে বদলে দিতে পেরেছে, মানুষের মুক্তচিন্তাকে কতটা বিকশিত করেছে এবং সংকটের মুহূর্তে কতটা সাহসের সঙ্গে সত্যের পাশে দাঁড়িয়েছে, সেই প্রশ্নের উত্তরের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে তার প্রকৃত মহিমা। সেই বিচারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শুধু বাংলাদেশের নয়, সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসে এক অনন্য প্রতিষ্ঠান।
তাই ১০৬ বছরে দাঁড়িয়ে থাকা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শুধুই অতীতের গৌরবের স্মৃতিস্তম্ভ নয়। এটি আগামী দিনেরও প্রেরণা, যেখানে জ্ঞানের আলো, মুক্তচিন্তার সাহস এবং ন্যায়ের পক্ষে আপসহীন অবস্থান ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে পথ দেখাবে এবং অতীতের মতো আগামী দিনেও জাতির আশা-আকাঙ্ক্ষার অন্যতম আশ্রয় হয়ে থাকবে প্রাচ্যের অক্সফোর্ডখ্যাত বিদ্যায়তনটি। শুভ জন্মদিন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।