বিশ্বজুড়ে মানুষের জীবনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব ক্রমেই বাড়ছে। বর্তমানে বিশ্বের দুই-তৃতীয়াংশের বেশি মানুষ কোনো না কোনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করেন। গড়ে একজন ব্যবহারকারী প্রতিদিন প্রায় ২ ঘণ্টা ৩৯ মিনিট সময় কাটান এসব প্ল্যাটফর্মে, যা বছরে ৪০ দিনেরও বেশি। আপনার যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার এই হিসাবের সঙ্গে কতটা মেলে?
প্রতিবছর ৩০ জুন বিশ্বজুড়ে পালিত হয় ‘সোশ্যাল মিডিয়া ডে’। ডিজিটাল সংবাদমাধ্যম ম্যাশেবল ২০১০ সালে দিনটি চালু করে। উদ্দেশ্য ছিল বিশ্ব যোগাযোগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বাড়তে থাকা প্রভাবকে স্বীকৃতি দেওয়া। ১৬ বছর পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আর শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়; এটি এখন বিশ্বের দুই-তৃতীয়াংশের বেশি মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
আল-জাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০০৫ সালে বিশ্বে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীর সংখ্যা ছিল ৫০ কোটিরও কম। ২০১৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২২৭ কোটিতে। আর ২০২৫ সালে এই সংখ্যা পৌঁছেছে ৫৬৬ কোটিতে। সাশ্রয়ী স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটের বিস্তার এ বৃদ্ধির বড় কারণ।
বিশ্বজুড়ে ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের তথ্য প্রকাশকারী প্ল্যাটফর্ম ডেটারিপোর্টালের তথ্য অনুযায়ী, একজন সক্রিয় ব্যবহারকারী সপ্তাহে গড়ে ১৮ ঘণ্টা ৩৬ মিনিট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সময় কাটান। অর্থাৎ প্রতিদিন প্রায় ২ ঘণ্টা ৩৯ মিনিট।
এই হিসাবে একজন মানুষ বছরে ৪০ দিনের বেশি সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যয় করেন। বিশ্বজুড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের গড় হার ৬৮ শতাংশ। তবে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় এ হার আরও বেশি।
জনসংখ্যার অনুপাতে সবচেয়ে বেশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারী রয়েছে পূর্ব এশিয়ায়। সেখানে ৮৮ দশমিক ১ শতাংশ মানুষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করেন। এরপর রয়েছে উত্তর ইউরোপ। সেখানে ব্যবহারকারীর হার ৭৯ শতাংশ। পশ্চিম ইউরোপে এ হার ৭৭ দশমিক ৭ শতাংশ এবং উত্তর আমেরিকায় ৭৪ শতাংশ।
অন্যদিকে সবচেয়ে কম ব্যবহারকারী রয়েছে মধ্য আফ্রিকায়। সেখানে মাত্র ১২ দশমিক ১ শতাংশ মানুষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করেন। পূর্ব আফ্রিকায় এ হার ১২ দশমিক ৬ শতাংশ। আর পশ্চিম আফ্রিকায় ১৯ শতাংশ মানুষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করেন বলে জানিয়েছে ডেটারিপোর্টাল।
পরিসংখ্যানভিত্তিক তথ্য প্রকাশকারী প্রতিষ্ঠান স্ট্যাটিস্টা, গবেষণা সংস্থা কেপিওসের সহযোগিতায় বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোর একটি তালিকা প্রকাশ করেছে। তালিকাটি মাসিক সক্রিয় ব্যবহারকারীর সংখ্যার ভিত্তিতে তৈরি করা হয়েছে।
গত অক্টোবর পর্যন্ত তথ্য অনুযায়ী, তালিকার শীর্ষে রয়েছে ফেসবুক। প্ল্যাটফর্মটির মাসিক সক্রিয় ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৩০৭ কোটি। ফেসবুকে এখন সব ধরনের ভিডিওর জন্য ‘রিলস’ ডিফল্ট ফরম্যাট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ফেসবুকের মালিকানাধীন ইনস্টাগ্রাম ও হোয়াটসঅ্যাপের মাসিক সক্রিয় ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৩০০ কোটি করে। ফেসবুক ২০১২ সালে ইনস্টাগ্রাম এবং ২০১৪ সালে হোয়াটসঅ্যাপ অধিগ্রহণ করে।
গুগলের মালিকানাধীন ইউটিউবের মাসিক সক্রিয় ব্যবহারকারীর সংখ্যা ২৫৮ কোটি। ২০১৭ সালে আন্তর্জাতিকভাবে যাত্রা শুরু করা টিকটকের ব্যবহারকারী প্রায় ১৯৯ কোটি বলে ধারণা করা হয়। তবে বিভিন্ন সূত্রে এ সংখ্যা কিছুটা ভিন্ন হতে পারে।
এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বাড়তে থাকা ব্যবহার নিয়ে উদ্বেগও বাড়ছে। বিশেষ করে শিশু ও কিশোরদের ওপর এর প্রভাব নিয়ে নানা দেশে আলোচনা চলছে।
ইউরোপীয় পার্লামেন্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ন্যূনতম বয়স ১৬ বছর নির্ধারণের প্রস্তাব সমর্থন করেছে। একই সঙ্গে কম বয়সীদের জন্য ‘ইনফিনিট স্ক্রল’ ও ‘অটোপ্লে’র মতো আসক্তিকর ফিচার নিষিদ্ধ করারও প্রস্তাব দিয়েছে।
যদিও এখন পর্যন্ত পুরো ইউরোপীয় ইউনিয়নে এ বিষয়ে কোনো একক আইন কার্যকর হয়নি। তবে কয়েকটি সদস্যরাষ্ট্র নিজ উদ্যোগে পদক্ষেপ নিয়েছে।
এ ক্ষেত্রে পথ দেখিয়েছে অস্ট্রেলিয়া। গত ডিসেম্বরে দেশটি বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করে।
এরপর আরও কয়েকটি দেশ একই পথে হেঁটেছে। গত মার্চে ইন্দোনেশিয়া ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধ করে। এ ধরনের আইন কার্যকর করা এশিয়ার প্রথম দেশ এটি।
একই মাসে কার্যকর হওয়া ব্রাজিলের ‘ডিজিটাল স্ট্যাটিউট অব চিলড্রেন অ্যান্ড অ্যাডোলেসেন্টস’ আইনে ১৬ বছরের কম বয়সী ব্যবহারকারীদের অ্যাকাউন্ট একজন অভিভাবকের সঙ্গে যুক্ত করার বাধ্যবাধকতা রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে ‘ইনফিনিট স্ক্রল’-এর মতো আসক্তিকর ফিচার নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
এপ্রিল মাসে তুরস্ক ১৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে বিধিনিষেধ আরোপ করে একটি আইন পাস করে।
চলতি জুনে যুক্তরাজ্য সরকারও ১৬ বছরের কম বয়সীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। এই বিধিনিষেধ ২০২৭ সালের বসন্ত থেকে কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে। সূত্র: আল-জাজিরা